📘 নবীজির সংসার > 📄 মেহমানদের সাথে বসে একসাথে হেসে গল্প করতেন

📄 মেহমানদের সাথে বসে একসাথে হেসে গল্প করতেন


নবীজি ﷺ মুক্ত গোলাম সাওবান বলেন, “এক বেদুইন আমাদের কাছে অতিথি হিসেবে আসলেন। নবীজি ﷺ তাঁর সঙ্গে ঘরের সামনে বসলেন। তিনি তাকে ইসলাম ও সালাতের ব্যাপারে মানুষের ভালোলাগা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে নবীজিকে ﷺ সুসংবাদ দিতে থাকল, একপর্যায়ে আমি নবীজির ﷺ মুখ (খুশিতে) উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখলাম। এরপর দুপুরে খাওয়ার সময় ঘনিয়ে এল। আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাকে ডেকে নিচু স্বরে বললেন, “আয়িশার বাড়িতে গিয়ে বলো, নবীজির একজন অতিথি এসেছে।” আয়িশা বললেন, 'আল্লাহর কসম যিনি তাঁকে হেদায়াত ও সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন, আমাদের বাসায় কারও জন্য কোনো খাবার নেই।' এভাবে প্রত্যেক স্ত্রীর বাসা তিনি ﷺ আমাকে পাঠালেন এবং তারাও আয়িশার মতো একই কথা বললেন। শেষে নবীজির ﷺ চেহারা মলিন দেখতে পেলাম。
বেদুইন লোকটি বুদ্ধিমান ছিল, তিনি বুঝতে পেলেন কী ঘটছে। সে নবীজিকে ﷺ বলল, 'আমরা মরুভূমির মানুষ কঠিন সময়ে অভ্যস্ত। শহরের মানুষের মতো আমরা নই। আমাদের একজনের জন্য কিছু খেজুর ও সামান্য দুধ যথেষ্ট, এটিই আমাদের জন্য উত্তম খাবার।' সে যখন কথাগুলো বলছিল, সে-সময় সামরা নামের এক বকরী তাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। সেটার দুধ আগেই দোহন করা হয়ে গিয়েছে। নবীজি ﷺ সেটাকে “সামরা, সামরা” বলে নাম ধরে ডাকলেন। বকরীটা শব্দ করতে করতে তাঁর কাছে এলো। তিনি বকরীর পা ধরে ওলান ধরলেন, তারপর বললেন, “বিসমিল্লাহ।” তখন সেটার ওলান দুধে ভরে গেল। তিনি একটি পাত্র আনতে বললেন এবং “বিসমিল্লাহ” বলে দুধ দোহাতে শুরু করলেন। এরপর পাত্রটি ভরে ফেলে বললেন, "এটা "বিসমিল্লাহ” বলে তাকে দাও (পান করার জন্য)।"
আমি অতিথিকে দুধ দিলাম এবং তিনি অনেকখানি দুধ পান করলেন এবং রেখে দিতে চাইলেন। নবীজি ﷺ বললেন, “আবার পান করো।” তখন সে আবার পান করল এবং রেখে দিতে চাইল। নবীজি ﷺ বললেন, "আবার পান করো।" এভাবে তার পেট ভরে গেল। নবীজি ﷺ আবার “বিসমিল্লাহ” বলে দুধ দোহালেন এবং পাত্র ভরে ফেললেন। তারপর তিনি ﷺ বললেন, “এটা আয়িশার কাছে পাঠাও, সে যত খুশি যেন পান করে।"
নবীজি আবার "বিসমিল্লাহ” বলে দুধ দোহালেন এবং পাত্র ভরে ফেললেন। এভাবে তাঁর সব স্ত্রীর কাছে পাঠালেন। প্রত্যেকবার তাঁর একেক স্ত্রী পান করত আর তিনি "বিসমিল্লাহ” বলে আরেকজনের কাছে পাঠাতেন। এভাবে তাঁর সব স্ত্রীর কাছে পাঠালেন এবং আমি ফিরে এলাম। তারপর তিনি ﷺ বললেন, "এটা আমাকে দাও।" আমি তাঁকে পাত্রটি দিলাম, তিনি আল্লাহ যতটুকু চাইলেন পান করলেন। এরপর তিনি আমাকে দিলেন এবং আমি পান করলাম এমন এক পানীয়, যা মধুর চেয়েও মিষ্টি এবং কস্তুরির থেকেও সুগন্ধ। নবীজি ﷺ এরপর দুআ করলেন, “আল্লাহ, এর (বকরীর) মালিকের ওপর রহমত বর্ষণ করো।” ৩০০
আবু হুরাইরা রাযি. বলেন, “এক ব্যক্তি নবীজির ﷺ খেদমতে এসে বলল, 'আল্লাহর রাসূল, দারিদ্র্য আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।' তিনি তাকে তাঁর স্ত্রীদের কাছে পাঠালেন। তাঁরা জানালেন, তাদের কাছে পানি ছাড়া কিছু নেই। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “কে আছ, যে এই ব্যক্তিকে মেহমান হিসেবে নিয়ে নিজের সাথে খাওয়াতে পার?” তখন এক আনসারী সাহাবী (আবু তালহা রাযি.) বললেন, 'আমি।' এ বলে তিনি মেহমানকে নিয়ে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, 'রাসূলুল্লাহর ﷺ মেহমানকে সম্মান কর।' স্ত্রী বললেন, 'বাচ্চাদের খাবার ছাড়া আমাদের ঘরে অন্য কিছুই নেই।' আনসারী বললেন, 'তুমি আহার প্রস্তুত কর, বাতি জ্বালাও এবং বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দাও।' সে বাতি জ্বালাল, বাচ্চাদেরকে ঘুম পাড়াল এবং সামান্য খাবার যা তৈরি ছিল, তা উপস্থিত করল। বাতি ঠিক করার বাহানা করে স্ত্রী উঠে গিয়ে বাতিটি নিভিয়ে দিলেন। তারপর তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই অন্ধকারের মধ্যে আহার করার মতো শব্দ করতে লাগলেন এবং মেহমানকে বুঝাতে লাগলেন যে, তারাও সঙ্গে খাচ্ছেন। তারা দুজনেই সারা রাত অভুক্ত অবস্থায় কাটালেন。
ভোরে যখন তিনি রাসূলুল্লাহর ﷺ কাছে গেলেন, তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তোমাদের গত রাতের কাণ্ড দেখে হেসে দিয়েছেন; অথবা বলেছেন, খুশি হয়েছেন এবং এ আয়াত নাযিল করেছেন-“তারা অভাবগ্রস্ত সত্ত্বেও নিজেদের উপর অন্যদেরকে অগ্রগণ্য করে থাকে। আর যাদেরকে অন্তরের কৃপণতা হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলতাপ্রাপ্ত।”” (আল কুরআন, ৫৯: ৯) ৩০১

টিকাঃ
৩০০. আজুররির আশ-শরীয়াহ গ্রন্থ (১০৪৮)।
৩০১. বুখারী (৩৭৯৮) ও মুসলিম (২০৫৪)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 কাফের হলেও মেহমানকে নবীজি ﷺ সম্মান করতেন

📄 কাফের হলেও মেহমানকে নবীজি ﷺ সম্মান করতেন


নববী রাহ. বলেন, “এই হাদীসে নবীজি ﷺ ও তাঁর পরিবারের ক্ষুধা ও দারিদ্রের ধৈর্য ধারণের বিবরণ উঠে এসেছে। এ থেকে দেখা যায়, সমাজের প্রধান কারও মেহমানদারিতে প্রথমে এগিয়ে আসবেন এবং নিজের সম্পদ থেকে খরচ করবেন। এরপর ভালো কাজে সহযোগিতা হিসেবে তিনি তার সাথিদের সাহায্য চাইতে পারেন। এ-হাদীস কষ্টের সময় একে অপরকে সাহায্য করার শিক্ষা দেয় এবং আনসার ও তার স্ত্রীর কষ্ট আমাদের অনুপ্রাণিত করে।” ৩০২
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, এক কাফের নবীজির মেহমান হলো। নবীজি ﷺ তাঁর জন্য একটি ভেড়ার দুধ দোহন করার আদেশ দিলেন এবং লোকটি তা পান করল। তিনি আবার দুধ দোহন করলেন, লোকটি আবার পান করল। এভাবে সে সাতটি ভেড়ার দুধ পান করল। পরদিন সকালে উঠে সে ইসলাম গ্রহণ করল। ৩০৩

টিকাঃ
৩০২. মুসলিম গ্রন্থের (১২/১৪) ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)।
৩০৩. বুখারী (৫৩৯৭) ও মুসলিম (২০৬৩)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 নবীজি ﷺ অতিথিদের নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করতেন

📄 নবীজি ﷺ অতিথিদের নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করতেন


জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. বলেন, “(খন্দকের যুদ্ধে) পরিখা খনন করা হচ্ছিল, তখন আমি নবীজিকে ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখতে পেলাম। তখন আমি আমার স্ত্রীর কাছে ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'তোমার কাছে কোনো কিছু আছে? আমি রাসূলুল্লাহকে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত দেখেছি।' সে একটি চামড়ার পাত্র এনে তা থেকে এক 'সা ৩০৪ পরিমাণ যব বের করে দিল। আমার বাড়িতে একটি বকরীর বাচ্চা ছিল। আমি সেটি যবেহ করলাম। আর সে (আমার স্ত্রী) যব পিষে দিল। আমি আমার কাজ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে সেও তার কাজ শেষ করল এবং গোশত কেটে কেটে ডেকচিতে ভরলাম।
এরপর আমি রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরে চললাম। তখন সে (স্ত্রী) বলল, 'আমাকে রাসূলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবীদের নিকট লজ্জিত করবেন না।' এরপর আমি রাসুলুল্লাহর কাছে গিয়ে চুপে চুপে বললাম, 'আল্লাহর রাসূল, আমরা আমাদের একটি বকরীর বাচ্চা যবেহ করেছি এবং আমাদের ঘরে এক সা যব ছিল, তা আমার স্ত্রী পিষে দিয়েছে। আপনি আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে আসুন।' তখন নবী উচ্চঃস্বরে সবাইকে বললেন, “হে পরিখা খননকারীরা, জাবির খানার ব্যবস্থা করেছে। এসো, তোমরা সকলেই চল।” এরপর রাসূলুল্লাহ বললেন, “আমার যাওয়ার আগে তোমাদের ডেকচি নামাবে না এবং খামির থেকে রুটিও তৈরি করবে না। আমি (বাড়িতে) এলাম এবং রাসূলুল্লাহ সব সাহাবাদের নিয়ে এলেন। এরপর আমি আমার স্ত্রীর কাছে এলে সে বলল, 'আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন।' আমি বললাম, 'তুমি যা বলেছ, আমি তা-ই করেছি।'
এরপর সে রাসূলুল্লাহর সামনে আটার খামির বের করে দিলে তিনি তাতে মুখের লালা মিশিয়ে দিলেন এবং বারাকাতের জন্য দুআ করলেন। এরপর তিনি ডেকচির কাছে এগিয়ে গেলেন এবং তাতে মুখের লালা মিশিয়ে এর জন্য বারাকাতের দুআ করলেন। তারপর বললেন, “রুটি প্রস্তুতকারিণীকে ডাকো। সে আমার কাছে বসে রুটি প্রস্তুত করুক এবং ডেকচি থেকে পেয়ালা ভরে গোশত বেড়ে দিক। তবে (উনুন হতে) ডেকচি নামাবে না।”
তারা ছিলেন সংখ্যায় এক হাজার। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, তাঁরা সকলেই তৃপ্তি সহকারে খেয়ে বাকি খাদ্য রেখে চলে গেলেন। অথচ আমাদের ডেকচি আগের মতই টগবগ করছিল আর আমাদের আটার খামির থেকেও আগের মতোই রুটি তৈরি হচ্ছিল।” ৩০৫
মুহাজির এবং আনসাররা মূলত এ-ঘটনায় নবীজির অতিথি ছিলেন—যদিও খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছিল জাবিরের রাযি. ঘরে। কারণ খাবার পরিমাণে বেড়ে গিয়ে সবার জন্য যথেষ্ট হওয়া-এ-ঘটনা নবীজির মুজিযা ছিল; কারণ জাবির রাযি. এর খাদ্য গুটি কয়েকজনের জন্য যথেষ্ট ছিল। যেভাবে নবীজি সবাইকে নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করলেন, তা মেহমানদারিতার উদার দৃষ্টান্ত।

টিকাঃ
৩০৪. এক সা' হল ৩ কেজি ১৮৪.২৭২ গ্রাম সমপরিমাণ।
৩০৫. বুখারী (৪১০১) ও মুসলিম (২০৩৯)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 মেহমান হিসেবে যেমন ছিলেন নবীজি ﷺ

📄 মেহমান হিসেবে যেমন ছিলেন নবীজি ﷺ


নবীজি ﷺ অতিথি হিসেবে যথেষ্ট বিনয়ী ছিলেন। অনেক ছোট উপলক্ষ্যেও তাঁকে দাওয়াত করলে তিনি তা কবুল করতেন। তিনি বলতেন, “আমাকে হালাল পশুর পায়া বা কাঁধ যেটিই খেতে দাওয়াত দেয়া হোক, তবু তা আমি কবুল করব।” ৩০৬
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “নবীজি দুই অংশের কথাই বলেছেন। এখানে কাঁধের মাংস তাঁর পছন্দনীয় ছিল, আর পায়ের মাংস তাঁর কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।” ৩০৭
রাসূল ﷺ যে কারও দাওয়াত কবুল করতেন। এমনকি তিনি এক কিশোরের দাওয়াতও কবুল করেছিলেন। আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, “এক দরজি বালক খাবার তৈরি করে আল্লাহর রাসূলকে দাওয়াত করল। সে আল্লাহর রাসূলের সামনে রুটি আর ঝোল দিল, যাতে লাউ ও গোশতের টুকরা ছিল। তারপর সে কাজে ফিরে গেল। আমি নবীকে দেখতে পেলাম, পেয়ালার কিনারা হতে তিনি লাউয়ের টুকরা খুঁজে নিয়ে খাচ্ছেন। সে-দিন হতে আমি সব সময় লাউ ভালোবাসি।” ৩০৮
এ-হাদীস থেকে শেখা যায় যে, উচ্চপদস্থ হলেও সমাজের কোনো নিচু শ্রেণির কেউ দাওয়াত দিলে তা কবুল করা উচিত। রাসূল ﷺ যে-কারও দাওয়াত কবুল করতেন। এর আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় এক ইহুদীর ঘটনায়। আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, “এক ইহুদি নবীজিকে দাওয়াত দিয়ে পাউরুটি আর তেল বা চর্বি খেতে দিল যার গন্ধ বদলে গিয়েছিল। তিনি তার দাওয়াত কবুল করেছিলেন।” ৩০৯
রাসূলের সাথে হঠাৎ কেউ দাওয়াতে চলে এলে তার জন্য মেজবানের কাছে দাওয়াতের আবেদন জানাতেন। আবু মাসউদ আল-আনসারী রাযি. থেকে বর্ণিত, আবু শুয়াইব রাযি. নামক এক আনসারীর একজন গোশত-বিক্রেতা গোলাম ছিল। একদিন আবু শুয়াইব রাযি. তাকে বললেন, 'আমার জন্য পাঁচজন লোকের খাবার তৈরি করো। আমি আশা করছি, নবীজিকে দাওয়াত করব। সেই পাঁচজনের মধ্যে তিনি নিজে ছিলেন একজন। তিনি নবীজির চেহারায় ক্ষুধার ছাপ লক্ষ করেছিলেন। কাজেই তিনি তাঁকে দাওয়াত করলেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে আরেকজন লোক এলেন, যাকে দাওয়াত করা হয়নি। তখন নবী (আনসারীকে) বললেন, "সে আমাদের পিছে পিছে চলে এসেছে। তুমি কি তাকে অনুমতি দেবে? নাহলে সে চলে যাবে।” তিনি বললেন, 'আমি বরং অনুমতি দিচ্ছি, আল্লাহর রাসূল!' ৩১০

টিকাঃ
৩০৬. বুখারী (২৫৬৮)।
৩০৭. ফাতহুল বারী (১৯৯/৫)।
৩০৮. বুখারী (২০৯২) ও মুসলিম (২০৪১)।
৩০৯. আহমদ (১৩৭৮৯)।
৩১০. বুখারী (২৪৫৬) ও মুসলিম (২০৩৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00