📄 মেহমান হিসেবে নবীজি ﷺ
নবীজি ﷺ সর্বাধিক দানশীল ছিলেন এবং হাত খুলে দান করতেন। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, 'দানের ব্যাপারে নবীজি ﷺ মানুষের মাঝে সবচেয়ে উদার ছিলেন। আর এই উদারতা রমাদানে সবচেয়ে বেশি হত। প্রতি বছর রমাদানে জিবরীল তাঁর কাছে আসতেন এবং তাকে তিনি পুরো কুরআন পড়ে শোনাতেন। জিবরীল যখন তাঁর সাথে দেখা করতেন, তিনি বাতাসের চেয়েও উদার হয়ে যেতেন (দ্রুতগতিতে দান করতেন)।” ২৮৩
আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, “নবীজি ﷺ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উদার ও সাহসী ছিলেন।” ২৮৪
ইবনে হিব্বান রাহ. বলেন, “উদারতার অন্যতম দিক হলো, অতিথিদের সাথে ভালো আচরণ করা। আরবরা মেহমানকে সম্মান করা ও খাওয়ানোকে উদারতা হিসেবে বিবেচনা করত। যারা এটা করত না, তাদের উদার হিসেবে ধরা হতো না। তারা এটিকে এতই গুরুত্ব দিত যে, কেউ কেউ এক মাইল-দুই মাইল ঘুরে অতিথি (আপ্যায়ন করার জন্য মানুষ) খুঁজে বেড়াত।” ২৮৫
উম্মুল মুমিনীন খাদিজা রাযি. নবীজিকে সবচেয়ে কাছে থেকে দেখেছেন, সবচেয়ে ভালোভাবে চিনতেন। তিনি তাঁর ব্যাপারে বলতে গিয়ে বলেছেন, “আল্লাহর কসম, আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, সত্যবাদী, অসহায়কে সাহায্য করেন, গরীবকে দান করেন, অতিথিকে সম্মান করেন এবং দুর্যোগে (অন্যদের) সাহায্য করেন।” ২৮৬
এর মধ্যে খাদিজা তাঁর গুণ হিসেবে বলেছেন, তিনি "অতিথিকে সম্মান করেন"; নবীজি মেহমান ও দূতদের উদারভাবে আতিথেয়তা করতেন।
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, “নবীজির কাছে কিছু চাইলে তিনি কখনোই 'না' বলতেন না।” ২৮৭
নববী রাহ. বলেন, “এর অর্থ হলো, তাঁর কাছে পার্থিব কোনো কিছু চাইলে তিনি কখনোই 'না' বলতেন না। এটি তাঁর মহানুভবতার উদাহরণ।” ২৮৮
সাহল ইবনে সাদ থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ উদার এবং তিনি উদারতাকে ভালোবাসেন। তিনি উত্তম আখলাক ভালোবাসেন এবং মন্দ আখলাক ঘৃণা করেন।”২৮৯ এ-কারণে আমর ইবনে হারিস রাযি. বলেন, “রাসূলুল্লাহ মৃত্যুকালে তাঁর সাদা খচ্চর, হাতিয়ার এবং একটি জমি, যা তিনি সাদাকা করেছিলেন রেখে গিয়েছিলেন। এ-সব ছাড়া কোনো স্বর্ণ বা রৌপ্যমুদ্রা, দাস-দাসী বা কোনো জিনিস রেখে যাননি।” ২৯০ নবীজির ﷺ মৃত্যুর সময় ৩০ সা'র বিনিময়ে তাঁর বর্ম এক ইহুদীর কাছে বন্ধক রাখা ছিল। ২৯১
টিকাঃ
২৮২. বুখারী (৬০১৮) ও মুসলিম (৪৭)।
২৮৩. বুখারী (৬) ও মুসলিম (২৩০৮)।
২৮৪. বুখারী (২৮২০) ও মুসলিম (২৩০৭)।
২৮৫. রওযাত আল-উকালা (পৃষ্ঠা ২৫৯)।
২৮৬. বুখারী (৪) ও মুসলিম (১৬০)।
২৮৭. বুখারী (৬০৩৪) ও মুসলিম (২৩১১)।
২৮৮. মুসলিম গ্রন্থের (৭১/৫) ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)।
২৮৯. মুসতাদারাক আল হাকিম (১৫২)।
২৯০. বুখারী (২৭৩৯)।
২৯১. বুখারী (২৯১৬) ও মুসলিম (১৬০৩)।
📄 অতিথিকে সম্মান করা ঈমানের অঙ্গ
নবীজি মুহাম্মদ ﷺ বলেন, “যে-ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ বিচারের দিনে ঈমান রাখে, সে যেন অতিথিকে সম্মান করে।” ২৯২
সম্মান করার অর্থ হলো, তাকে হাসিমুখে অভিবাদন করা, আপ্যায়নে দেরি না করা, থাকার নিরাপদ স্থান দেওয়া এবং নিজে খাদ্য পরিবেশন করা।
নবীজি ﷺ অতিথি আপ্যায়নকারীর প্রশংসা করে বলেছেন, সে মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, “নবীজি ﷺ তাবুকে এক খুতবায় বলেন, “তার থেকে উত্তম কেউ নেই, যে ঘোড়ার লাগাম ধরে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে এবং মানুষের ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকে। আবার একজন ভেড়াওয়ালা বেদুইন লোকের থেকে উত্তম কেউ নেই, যে তার অতিথিকে খাবার ও আশ্রয় দেয় এবং তার অধিকার আদায় করে।”২৯৩
আল্লাহর রাসূল ﷺ এর ব্যাখ্যা করে বলেছেন, অতিথি আপ্যায়ন করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। তিনি বলেন, “কোনো অতিথিকে এক রাত থাকতে দেওয়া প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। তাই কোনো অতিথি বা আগন্তুক যদি কারও আঙিনায় আসে, তবে সে (অতিথি) তার (বাড়ির মালিকের) ওপর ঋণ। সে (অতিথি) চাইলে তার অধিকার নিতে পারে, বা চাইলে সে তা ছেড়েও দিতে পারে।” ২৯৪
আসিম আবাদী রাহ. বলেন, “খাত্তাবি রাহ. বলেন, 'অতিথিকে আপ্যায়ন করা, থাকতে দেওয়া এবং সম্মান করা মহৎ মানুষদের গুণ এবং সৎকর্মশীলদের অভ্যাস। যে অতিথিকে আপ্যায়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিল, সে নিন্দনীয় কাজ করল।” ২৯৫ একবার নবীজি উসমান ইবনে মাসউনকে রাযি. বললেন, “তোমার অতিথির তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।” ২৯৬
টিকাঃ
২৯২. বুখারী (৬০১৮) ও মুসলিম (৪৭)।
২৯৩. আহমদ (১৯৮৮)।
২৯৪. আবু দাউদ (৩৭৫০) এবং ইবনে মাজাহ (৩৬৭৭)।
২৯৫. আওন আল-মাবুদ (১৫৪/১০)।
২৯৬. আবু দাউদ (১৩৬৯)।
📄 মেহবানের আতিথেয়তার সীমা নবীজি ﷺ নির্ধারণ করে দিয়েছেন
আবু শুরায়হ রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেন, “যে-ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ বিচারের দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে যা দেওয়া উচিত, তা দিয়ে সম্মান করে।” তারা জিজ্ঞেস করল, 'সেটি কী, আল্লাহর রাসূল?' তিনি বললেন, “এক দিন-এক রাত বা তিন দিন আতিথেয়তা করা, এর অতিরিক্তটুকু তার জন্য সাদাকা। কোনো মুসলিমের জন্য জায়েজ নয় এত লম্বা সময় তার ভাইয়ের কাছে থাকা, যা তাকে পাপ করতে বাধ্য করে।” তারা জিজ্ঞেস করল, 'আল্লাহর রাসূল, কীভাবে সে পাপ করতে বাধ্য করে?' তখন তিনি বললেন, “মেজবানের কাছে থাকার মাধ্যমে যখন কিনা তাকে দেওয়ার মতো কিছুই তার অবশিষ্ট থাকে না।” ২৯৭
এ থেকে জানা যায়, মেজবানের কাছে অতিথির থাকার সময়ের তিনটি স্তর রয়েছে-আবশ্যিক, প্রশংসনীয় এবং সাদাকাহ। আবশ্যিক হলো, নূন্যতম এক দিন এক রাত থাকা; প্রশংসনীয় হলো, তিন দিন; আর এর উপরে যেটুকু সময় থাকবে, সেটি মেজবানের জন্য সাদাকা।
তবে তিন দিনের বেশি থাকা মেজবানের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। রাসূল ﷺ বলেন, “তার কষ্ট বাড়িয়ে দেওয়ার পর তার কাছে থাকা জায়েজ নয়।” ২৯৮ অর্থাৎ, মেজবান যদি তিন দিনের বেশি থাকতে অনুরোধ না করে, তবে তিন দিনের বেশি তার বাসায় থাকা অতিথির জন্য জায়েজ নয়।
টিকাঃ
২৯৭. বুখারী (৬০১৯) ও মুসলিম (৪৮)।
২৯৮. বুখারী (৬১৩৫)।
📄 নিজের ক্ষুধা ও কষ্টের সময়ও উদারতা দেখাতেন
মিকদাদ ইবনে আমর রাযি. বলেন, “একবার প্রচুর খাদ্য-সংকটে আমার ও আমার দুই সাথির দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি কমে যায়-যায় অবস্থা। তখন আমরা রাসূলুল্লাহর সাহাবীদের কাছে এ-ব্যাপারে জানালাম। কিন্তু তাদের কেউ আমাদের কথা শুনলেন না। সবশেষে আমরা নবীজির কাছে গেলাম। তিনি আমাদের সাথে নিয়ে তার পরিবারের কাছে গেলেন। সেখানে তিনটি বকরী ছিল। নবী বললেন, “তোমরা দুধ দোহন করবে। এ-দুধ আমরা ভাগ করে পান করবো।” এরপর থেকে আমরা দুধ দোহন করতাম। আমাদের সবাই যার যার অংশ পান করতাম। আর আমরা নবীজির অংশ তার জন্য তুলে রাখতাম। তিনি রাত্রে এসে এমনভাবে সালাম দিতেন, যেন ঘুমন্ত মানুষ উঠে না যায়, কিন্তু জাগ্রত লোক শুনতে পায়。
এরপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করতেন। তারপর দুধ পান করতেন। একদা রাতে আমার কাছে শয়তান এলো। আমি আমার অংশ পান করে ফেলেছি। সে বলল, 'মুহাম্মাদ আনসারীদের কাছে গেলে তারা তাকে হাদিয়া দেবে এবং তাদের নিকটে তার এ-অল্প দুধের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যাবে।' তখন আমি এসে সেটুকুও পান করে ফেললাম। দুধ যখন ভালোভাবে আমার পেটে ঢুকে গেল আমি বুঝলাম, এ-দুধ বের করার আর কোনো উপায় নেই, তখন শয়তান আমার থেকে দূরে সরে গিয়ে বলল, 'তোমার ধ্বংস হোক, তুমি একি করলে! তুমি মুহাম্মাদের ভাগের দুধ পান করে ফেলেছ? তিনি জাগ্রত হয়ে যখন তা পাবেন না, তখন তোমার উপর বদ-দুআ করবেন, তোমার সর্বনাশ হয়ে যাবে। তোমার ইহকাল ও পরকাল ধ্বংস হয়ে যাবে।'
আমার শরীরে একটি চাদর ছিল। তা দিয়ে আমার পা ঢাকতে গেলে মাথা বের হয়ে যেত, আর মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যেত। ফলে কিছুতেই আমার ঘুম আসছিল না। আমার সাথি দুজন ঘুমিয়ে ছিল। তারা তো আমার মতো কাজ করেনি।
এরপর নবীজি এসে যেভাবে সালাম করতেন, সেভাবেই সালাম করলেন। তারপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করলেন। অতঃপর দুধের নিকটে এসে ঢাকনা খুলে সেখানে কিছুই পেলেন না। এরপর তিনি মাথা আকাশের দিকে তুললেন। আমি তখন (মনে মনে) বললাম, এখনই হয়তো আমার উপর তিনি বদ দুআ করবেন, আর আমি নিঃশেষ হয়ে যাবো। তিনি বললেন, “হে আল্লাহ, যে-লোক আমার খাবারের ব্যবস্থা করে তুমি তার খাদ্যের ব্যবস্থা কর। আর যে আমাকে পান করায়, তাকে তুমি পান করাও।”
তখন আমি চাদরটি নিয়ে গায়ে জড়ালাম এবং একটি ছুরি নিলাম, এরপর (এ ভেবে) বকরীগুলোর কাছে গেলাম যে, এদের মধ্যে যেটি সবচেয়ে বেশি মোটাতাজা, আমি সেটি রাসূলুল্লাহর জন্য যবেহ করবো। সেখানে গিয়ে দেখলাম, সেটি দুধে পরিপূর্ণ এবং অন্যান্য সব বকরীও দুধে পূর্ণ। তখন আমি নবীজির পরিবারের একটি বাসন নিয়ে এলাম, যার মধ্যে তারা দুধ দোহাতেন না। আমি তার মধ্যেই দুধ দোহন করলাম, তখন বাসনের উপরের অংশ ফেনা ভেসে উঠল।
এরপর আমি রাসূলুল্লাহর কাছে গেলাম। তিনি বললেন, “তোমরা কি রাত্রের দুধ পান করেছ?” আমি বললাম, 'আল্লাহর রাসূল, আপনি পান করুন।' তিনি পান করে আমাকে দিলেন। আমি বললাম, 'আল্লাহর রাসূল, আপনি পান করুন।' তিনি পান করে আমাকে দিলেন। আমি যখন বুঝতে পারলাম যে, নবীজি পরিতৃপ্ত হয়ে গেছেন এবং আমি তার নেক দুআ পেয়ে গিয়েছি, তখন আমি খুশিতে হাসতে হাসতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। নবীজি বললেন, “মিকদাদ, এটা তোমার কোনো মন্দ কাজ?” তখন আমি খুলে বললাম। তখন নবী বললেন, "এটি একমাত্র আল্লাহর মেহেরবানি! তুমি কেন আমাকে জানালে না? আমরা আমাদের সঙ্গী দুজনকেও জাগাতাম, তা হলে তারাও এর অংশ পেত।” আমি তখন বললাম, 'যে-মহান স্রষ্টা আপনাকে সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, তার কসম, আপনি যখন পেয়েছেন এবং আমি যখন আপনার সঙ্গে ভাগ পেয়েছি, তখন আর কারও পাওয়া না পাওয়ার আমি তোয়াক্কা করি না।” ২৯৯
রাসূল মিকদাদসহ রাযি. আরও দুজন সাহাবীকে আপ্যায়ন করেছেন। এমনকি যখন তিনি দেখলেন, তাঁর অংশটুকুও খেয়ে ফেলা হয়েছে, তখন তিনি রেগে গিয়ে বদ দুআ না করে ভালো দুআ করেছেন। অপরদিকে মিকদাদ রাযি. রাসূলের দুআ শোনার পর কালক্ষেপন না করে দ্রুত সে দুআ লাভের জন্য কাজে লেগে গেলেন। সাহাবীরা রাসূলের দুআ লাভে এতটাই তৎপর ছিলেন।
টিকাঃ
২৯৯. মুসলিম (২০৫৫)।