📄 আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করতেন
নবীজি আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করতেন, এমন বহু উদাহরণ পাওয়া যাবে। তিনি তাদের ব্যাপারে সজাগ থাকতেন, তাদের মধ্যে কেউ অবিবাহিত থাকলে তার বিয়ের ব্যবস্থা পর্যন্ত করতেন।
উদাহরণস্বরূপ, আবদুল মুত্তালিব ইবনে রাবীআ ইবনে হারিস থেকে বর্ণিত, একবার রাবীআ ইবন হারিস ও আব্বাস ইবনু 'আবদুল মুত্তালিব রাযি. সম্মিলিতভাবে বললেন, 'আমরা যদি এ-ছেলে দুটিকে (অর্থাৎ রাবীআ ইবন হারিস ও ফাযল ইবনু আব্বাস রাযি.) রাসূলুল্লাহর কাছে যদি পাঠিয়ে দিতাম এবং তারা উভয়ে তাঁর কাছে গিয়ে তাদেরকে যাকাত আদায়কারী হিসেবে নিয়োগের জন্য আবেদন করত, তা হলে তারা অন্যান্য আদায়কারীদের ন্যায় যাকাত আদায় করে এনে দিত এবং অন্যান্যরা যেভাবে পারিশ্রমিক পায়, তারাও সেভাবে পারিশ্রমিক পেত।' তারা এ-ব্যাপার নিয়ে আলাপ করছিলেন, এমন সময় আলি ইবনু আবু তলিব রাযি. এসে তাদের মাঝে দাঁড়ালেন। তারা এ-প্রস্তাবটি তার কাছে জানালেন।
আলী রাযি. বললেন, 'তোমরা এ-কাজ কোরো না। আল্লাহর শপথ, তিনি এটা করবেন না (কারণ আমাদের জন্য যাকাত হারাম)।' তখন রাবীআ ইবনু হারিস রাযি. তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, 'আল্লাহর শপথ, তুমি শুধু বিদ্বেষের কারণে আমাদের এরকম বলছ। অথচ তুমি যে রাসূলুল্লাহর জামাতা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছ, এজন্যে তো তোমার প্রতি আমরা কোনো বিদ্বেষ পোষণ করছি না। তখন আলী রাযি. বললেন, 'এদের দুজনকে পাঠিয়ে দাও।' তারা দুজন চলে গেল এবং আলি রাযি. তার জামা খুলে বিছানায় শুয়ে পড়ে বললেন, 'আমি হাসানের পিতা। আল্লাহর কসম, তোমরা (না-বোধক) উত্তর নিয়ে আসা পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়ব না।'
আবদুল মুত্তালিব বললেন, 'রাসূলুল্লাহ যুহরের সালাত আদায় করলেন। আমরা তাড়াতাড়ি তাঁর ফিরে আসার আগেই তাঁর ঘরের কাছে গিয়ে তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। তিনি এসে আমাদের দুজনের কান ধরে (স্নেহসিক্ত কণ্ঠে) বললেন, “তোমাদের মনের কথাটা বলে ফেলো।” তারপর তিনি ও আমরা হুজরার মধ্যে প্রবেশ করলাম। এ-সময় তিনি যায়নাব বিনতে জাহশের রাযি. ঘরে অবস্থান করছিলেন।
এবার আমরা পরস্পরকে কথাটি তোলার জন্য বলছিলাম। অবশেষে আমাদের একজন বললাম, 'আল্লাহর রাসূল, আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহকারী এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী। আমাদের এখন বিয়ের বয়স হয়েছে, অথচ আমরা বেকার। তাই আপনার শরণাপন্ন হয়েছি: অন্যান্য যাকাত আদায়কারীদের মতো আপনি আমাদেরকেও যাকাত আদায়কারী হিসেবে নিয়োগ করুন; অন্যান্যরা যেভাবে যাকাত আদায় করে এনে দেয়, আমরা তা-ই করব এবং তাতে আমরাও কিছু পারিশ্রমিক পাব।' এ-কথার পর তিনি দীর্ঘ সময় ধরে চুপ করে থাকলেন। এমনকি আমরা পুনর্বার আমাদের কথা বলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। পর্দার আড়াল থেকে যায়নাব রাযি. কথা না বলার জন্য আমাদেরকে ইঙ্গিত করলেন।
এরপর তিনি বললেন, “মুহাম্মাদের পরিবার-পরিজন তথা বংশধরদের জন্য ‘যাকাত’ গ্রহণ করা সমীচীন নয়। কেননা, যাকাত হলো মানুষের (সম্পদের) ময়লা।২৬২ বরং তোমরা মাহমিয়া এবং নাওফাল ইবনু হারিস ইবনু আবদুল মুত্তালিবকে আমার কাছে ডেকে আনো।” মাহমিয়াহ বনু আসাদ গোত্রের লোক ছিল। তাকে খুমুস বিতরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা দুজনে উপস্থিত হলে প্রথমে তিনি মাহমিয়াকে বললেন, “তুমি তোমার কন্যাকে এ-ছেলে অর্থাৎ ফাযল ইবনু আব্বাসের সাথে বিয়ে দাও। তিনি তা-ই করলেন।” তারপর তিনি নাওফাল ইবনু হারিসকে বললেন, "তুমি এ-ছেলের (অর্থাৎ আমার) সাথে তোমার কন্যার বিয়ে দাও।” তিনি আমাকে বিয়ে করিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি মাহমিয়াকে বললেন, "এ-দুজনের পক্ষ থেকে এত এত পরিমাণ মহরানা খুমুসের তহবিল থেকে আদায় করে দাও।” ২৬৩
টিকাঃ
২৬২. এটি মানুষের সম্পদ এবং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।
২৬৩. মুসলিম (১০৭২)।
📄 আত্মীয়দের প্রতি উদার আচরণ করতেন
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, যখন বদর যুদ্ধের বন্দিদের নিয়ে আসা হলো, তাদের মাঝে নবীজির চাচা আব্বাস ছিলেন। তার পরিহিত কোনো পোশাক ছিল না। তিনি তার জন্য জামার ব্যবস্থা করতে বললেন। আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের (মুনাফিকদের নেতা) কাছে তার পরার জন্য একটি জামা পাওয়া গেল। নবীজি তার চাচাকে সেই জামাটি দিলেন। এ-কারণে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মারা যাবার পর তাকে নবীজি নিজের জামা দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন।
আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত, একবার নবী ﷺ এর কাছে বাহরাইন থেকে কিছু সম্পদ এলো। তিনি বললেন, “তোমরা এগুলো মসজিদে ঢেলে দাও। এটি ছিল তাঁর কাছে-আসা সবচেয়ে বেশি সম্পদ। তিনি মসজিদে সালাত আদায় করতে গেলেন এবং সম্পদগুলোর দিকে ঘুরেও তাকালেন না। এরপর তিনি সালাত শেষে সম্পদগুলো বিতরণ শুরু করলেন এবং এর কিছু কিছু করে যাকে পেলেন, তাকেই দিলেন।
এ-সময় আব্বাস রাযি. এসে বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, আমাকে দান করুন। আমি আমার এবং আকীলের মুক্তিপণ দিয়েছি।' আল্লাহর রাসূল বললেন, "আচ্ছা নাও।” তিনি তার কাপড়ে অঞ্জলি ভরে নিতে লাগলেন। তারপর তা উঠাতে চাইলেন, কিন্তু উঠাতে পারলেন না। তখন তিনি বললেন, 'কাউকে আমার উপর এ-বোঝা উঠিয়ে দিতে বলুন।' আল্লাহর রাসূল বললেন, “না।” তখন তিনি বললেন, 'তা হলে আপনিই আমার উপর উঠিয়ে দিন।' রাসূলূল্লাহ বললেন, “না।”
তিনি তা হতে কিছু কমালেন এবং উঠাতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু উঠাতে পারলেন না। তারপর বললেন, 'কাউকে আমার উপর বোঝাটি উঠিয়ে দিতে বলুন।' তিনি বললেন, “না।” তখন আব্বাস রাযি. বললেন, 'আপনিই একটু আমার উপর উঠিয়ে দিন।' আল্লাহর রাসূল বললেন, “না।” তখন তিনি আবার তা হতে কমালেন এবং কাঁধে উঠিয়ে রওনা হলেন।
তার এ-আসক্তি দেখে বিস্ময়ের সাথে আল্লাহর রাসূল তাকিয়ে থাকলেন, যতক্ষণ না তিনি আমাদের দৃষ্টির আড়াল হলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ সে-স্থানে একটি দিরহাম থাকা পর্যন্ত সেখান হতে উঠে দাঁড়াননি। ২৬৪
ইবনে রজব আল-হাম্বলী বলেন, “এই হাদীস নবীজির উদারতার দৃষ্টান্ত। সম্পদ যতই থাকুক না কেন, সেটার দিকে তিনি মুখ ফিরিয়েও দেখতেন না। অন্যদিকে আব্বাস বেশ তাগড়া এবং শক্তিশালী মানুষ ছিলেন, তাকেও অনেক সম্পদ তুলে নিতে বাধা দেননি। তিনি সম্পদগুলো তোলায় নিজে বা অন্য কাউকে দিয়ে সাহায্য না করার কারণ—হয়তো—তিনি চাচ্ছিলেন তার চাচা যতটুকু নিজে বহন করতে পারে, ততটুকুই যেন নেয়।” ২৬৫
আব্বাসকে কুরাইশদের মাঝে ধনী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বদরের যুদ্ধে বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেতে তিনি তার নিজের ও তার ভাতিজা আকিলের মুক্তিপণ দিতে গিয়ে তার অনেক ঋণ হয়ে গিয়েছিল।
টিকাঃ
২৬৪. বুখারী (৩১৬৫), ফাতহুল বারী (৫১৬/১)।
২৬৫. ফাতহুল বারী (১৭৮/৩)।
📄 নবীজি ﷺ আত্মীয়দের হজ্জের ব্যাপারে অনেক আগ্রহী ছিলেন
আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ ﷺ যুবাআ বিনতে যুবায়র- এর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার হজ্বে যাবার ইচ্ছে আছে?” সে উত্তর দিল, 'আল্লাহর কসম, আমি খুবই অসুস্থবোধ করছি (তবে হজ্বে যাবার ইচ্ছে আছে)।' তার উত্তরে বললেন, “তুমি হজ্বের নিয়্যতে বেরিয়ে যাও এবং আল্লাহর কাছে নিয়ত করে বলো, 'আল্লাহ, যেখানেই আমি বাধাগ্রস্ত হব, সেখানেই আমি আমার ইহরাম শেষ করব।” ২৬৬
টিকাঃ
২৬৬. বুখারী (৫০৮৯) ও মুসলিম (১২০৭)।
📄 আত্মীয়দের স্বাস্থ্য ও সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি হাযমের পরিবারকে সাপের কামড়ে রুকইয়াহ ২৬৭ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তিনি আসমা বিনতে উমায়েসকে একবার জিজ্ঞেস করলেন, “আমার ভাইয়ের সন্তানদের দুর্বল ও পাতলা দেখছি কেন? দারিদ্র্যের আঘাতে তারা জর্জড়িত হয়ে পড়েছে?” আসমা জবাব দিলেন, 'না, তাদের ওপর বদনজর পড়েছে।' তিনি বললেন, "তাদের ওপর রুকইয়াহ করো।” আমি যে রুকইয়াহ করি, সেটির কথা তাঁকে বললাম। তিনি আবার বললেন, "তাদের ওপর রুকইয়াহ করো।” ২৬৮
উম্মে মুনযির বিনতে কায়স রাযি. বলেন, “নবীজি ও আলি আমার বাসায় এলেন। আমাদের কিছু কাঁচা খেজুর ছিল, নবীজি সেগুলো খেতে শুরু করলেন। আলি কেবলই রোগ সেরে উঠেছে, তিনিও কিছু খেজুর খেতে চাইলেন। নবীজি তাকে বলেন, “খেও না। তুমি কেবলি সেরে উঠেছ।”
টিকাঃ
২৬৭. রুকইয়াহ বলতে শরীয়তসম্মত ঝাড়ফুঁককে বুঝায়। অর্থাৎ, কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নামের যিকর, রাসূল এর হাদিসে বর্ণিত দোয়া পাঠ করার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কোন বিপদ থেকে মুক্তি চাওয়া কিংবা রোগ থেকে আরোগ্য কামনা করা। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মাকতাবাতুল আসলাফ থেকে প্রকাশিত আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ রচিত 'রুকইয়াহ' বইয়ে দেখুন। - সম্পাদক
২৬৮. মুসলিম (২১৯৮)।