📄 আত্মীয়দের আমল সংশোধন করতেন
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, “আমি আমার চাচী (আল্লাহর রাসূলের স্ত্রী) মায়মুনার বাড়িতে রাত কাটালাম। নবী ﷺ তাঁর প্রয়োজনাদি সেরে মুখ-হাত ধুয়ে শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর জেগে উঠে তিনি পানির মশকের (পাত্র) মুখ খুললেন। এরপর মাঝারি রকমের এমন উযু করলেন যে, তাতে বেশি পানি লাগালেন না, অথচ পুরো উযুই করলেন। তারপর তিনি সালাত আদায় করতে লাগলেন। তখন আমিও জেগে উঠলাম। তবে আমি কিছুটা পরে উঠলাম। এজন্য যে, আমি এটা পছন্দ করলাম না, তিনি আমার অনুসরণকে দেখে ফেলেন। যা হোক, আমি উযু করলাম। তখনো তিনি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। আমি গিয়ে তাঁর বাম পার্শ্বে দাঁড়ালাম। তখন তিনি আমার কান ধরে তাঁর ডান দিকে আমাকে ঘুরিয়ে নিলেন। এরপর তের রাকআত সালাত পূর্ণ করলেন। ২৫৯
টিকাঃ
২৫৯. বুখারী (৬৩১৬) ও মুসলিম (৭৬৩)।
📄 কেউ পাপ করতে গেলে তাকে থামাতেন
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, ফযল ইবনে আববাস রাযি. একই বাহনে আল্লাহর রাসূলের ﷺ পিছনে বসেছিলেন। এরপর খাশআম গোত্রের জনৈক মহিলা উপস্থিত হলো। তখন ফযল রাযি. সেই মহিলার দিকে তাকাচ্ছিলেন এবং মহিলাটিও তার দিকে তাকাচ্ছিল। আল্লাহর রাসূল ﷺ ফযলের চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে দিলেন। মহিলাটি বলল, 'আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর বান্দার উপর ফরযকৃত হজ্ব আমার বয়োঃবৃদ্ধ পিতার উপর ফরজ হয়েছে। কিন্তু তিনি বাহনের উপর স্থির থাকতে পারেন না, আমি কি তাঁর পক্ষ হতে হজ্ব আদায় করবো?' তিনি বললেন, “হ্যাঁ (আদায় কর)।” ঘটনাটি বিদায় হজ্বের সময়ের। ২৬০
টিকাঃ
২৬০. বুখারী (১৫১৩) ও মুসলিম (১৩৩৪)।
📄 গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আত্মীয়দের সাহায্য চাইতেন
কাব ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত আকাবার শপথের ঘটনায় তিনি বলেন, “আমরা হজ্বের জন্য বের হলাম এবং তাশরীকের দিনগুলোর (জিলহজ্বের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ) মাঝের দিনে নবীজি ﷺ আকাবায় আমাদের সাথে দেখা করবেন বলে জানালেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে আমরা রাসূলুল্লাহর আগমনের অপেক্ষায় ছিলাম। একসময় তিনি তাঁর চাচা আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবের সাথে এলেন। আব্বাস তখনো তার পিতৃধর্মের অনুসারী ছিলেন। তবে ভাতিজা মুহাম্মদের কাজে তিনি যুক্ত থাকতে আগ্রহী ছিলেন, যেন তিনি নিরাপদ থাকেন।
আমরা বসে পড়লাম। আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব প্রথম কথা বললেন, 'খাযরাজের লোকজন, আমাদের মধ্যে মুহাম্মদ-এর অবস্থা সম্পর্কে তোমরা জানো। আমরা তাঁকে আমাদের লোকদের থেকে নিরাপত্তা দিয়েছি। ফলে তিনি এ-এলাকায় সুরক্ষিত এবং নিরাপদ আছেন। এখন তিনি তোমাদের সাথে মিলিত হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন তোমরা যদি মনে করো যে, মুহাম্মদকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিসমূহ তোমরা পুরোপুরি পালন করতে পারবে এবং বিরোধিতাকারীদের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করতে পারবে, তা হলে তো ভালোই। আর যদি তোমরা মনে করো, মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে রক্ষা করতে পারবে না, তবে তাঁকে রেখে যাও। কারণ, তিনি নিজ সম্প্রদায় থেকে নিরাপদে আছেন।' আনসাররা বললেন, 'আপনার কথা আমরা শুনেছি। রাসূলাল্লাহ, এবার আপনি কথা বলুন এবং আপনার প্রতিপালকের পক্ষে আমাদের থেকে যত অঙ্গীকার নিতে চান, নিন।' রাসূলুল্লাহ্ কথা বললেন, কুরআন তিলাওয়াত করলেন, তাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিলেন এবং তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন...।” ২৬১
টিকাঃ
২৬১. আহমাদ (১১৯৪৪)।
📄 আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করতেন
নবীজি আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করতেন, এমন বহু উদাহরণ পাওয়া যাবে। তিনি তাদের ব্যাপারে সজাগ থাকতেন, তাদের মধ্যে কেউ অবিবাহিত থাকলে তার বিয়ের ব্যবস্থা পর্যন্ত করতেন।
উদাহরণস্বরূপ, আবদুল মুত্তালিব ইবনে রাবীআ ইবনে হারিস থেকে বর্ণিত, একবার রাবীআ ইবন হারিস ও আব্বাস ইবনু 'আবদুল মুত্তালিব রাযি. সম্মিলিতভাবে বললেন, 'আমরা যদি এ-ছেলে দুটিকে (অর্থাৎ রাবীআ ইবন হারিস ও ফাযল ইবনু আব্বাস রাযি.) রাসূলুল্লাহর কাছে যদি পাঠিয়ে দিতাম এবং তারা উভয়ে তাঁর কাছে গিয়ে তাদেরকে যাকাত আদায়কারী হিসেবে নিয়োগের জন্য আবেদন করত, তা হলে তারা অন্যান্য আদায়কারীদের ন্যায় যাকাত আদায় করে এনে দিত এবং অন্যান্যরা যেভাবে পারিশ্রমিক পায়, তারাও সেভাবে পারিশ্রমিক পেত।' তারা এ-ব্যাপার নিয়ে আলাপ করছিলেন, এমন সময় আলি ইবনু আবু তলিব রাযি. এসে তাদের মাঝে দাঁড়ালেন। তারা এ-প্রস্তাবটি তার কাছে জানালেন।
আলী রাযি. বললেন, 'তোমরা এ-কাজ কোরো না। আল্লাহর শপথ, তিনি এটা করবেন না (কারণ আমাদের জন্য যাকাত হারাম)।' তখন রাবীআ ইবনু হারিস রাযি. তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, 'আল্লাহর শপথ, তুমি শুধু বিদ্বেষের কারণে আমাদের এরকম বলছ। অথচ তুমি যে রাসূলুল্লাহর জামাতা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছ, এজন্যে তো তোমার প্রতি আমরা কোনো বিদ্বেষ পোষণ করছি না। তখন আলী রাযি. বললেন, 'এদের দুজনকে পাঠিয়ে দাও।' তারা দুজন চলে গেল এবং আলি রাযি. তার জামা খুলে বিছানায় শুয়ে পড়ে বললেন, 'আমি হাসানের পিতা। আল্লাহর কসম, তোমরা (না-বোধক) উত্তর নিয়ে আসা পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়ব না।'
আবদুল মুত্তালিব বললেন, 'রাসূলুল্লাহ যুহরের সালাত আদায় করলেন। আমরা তাড়াতাড়ি তাঁর ফিরে আসার আগেই তাঁর ঘরের কাছে গিয়ে তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। তিনি এসে আমাদের দুজনের কান ধরে (স্নেহসিক্ত কণ্ঠে) বললেন, “তোমাদের মনের কথাটা বলে ফেলো।” তারপর তিনি ও আমরা হুজরার মধ্যে প্রবেশ করলাম। এ-সময় তিনি যায়নাব বিনতে জাহশের রাযি. ঘরে অবস্থান করছিলেন।
এবার আমরা পরস্পরকে কথাটি তোলার জন্য বলছিলাম। অবশেষে আমাদের একজন বললাম, 'আল্লাহর রাসূল, আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহকারী এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী। আমাদের এখন বিয়ের বয়স হয়েছে, অথচ আমরা বেকার। তাই আপনার শরণাপন্ন হয়েছি: অন্যান্য যাকাত আদায়কারীদের মতো আপনি আমাদেরকেও যাকাত আদায়কারী হিসেবে নিয়োগ করুন; অন্যান্যরা যেভাবে যাকাত আদায় করে এনে দেয়, আমরা তা-ই করব এবং তাতে আমরাও কিছু পারিশ্রমিক পাব।' এ-কথার পর তিনি দীর্ঘ সময় ধরে চুপ করে থাকলেন। এমনকি আমরা পুনর্বার আমাদের কথা বলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। পর্দার আড়াল থেকে যায়নাব রাযি. কথা না বলার জন্য আমাদেরকে ইঙ্গিত করলেন।
এরপর তিনি বললেন, “মুহাম্মাদের পরিবার-পরিজন তথা বংশধরদের জন্য ‘যাকাত’ গ্রহণ করা সমীচীন নয়। কেননা, যাকাত হলো মানুষের (সম্পদের) ময়লা।২৬২ বরং তোমরা মাহমিয়া এবং নাওফাল ইবনু হারিস ইবনু আবদুল মুত্তালিবকে আমার কাছে ডেকে আনো।” মাহমিয়াহ বনু আসাদ গোত্রের লোক ছিল। তাকে খুমুস বিতরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা দুজনে উপস্থিত হলে প্রথমে তিনি মাহমিয়াকে বললেন, “তুমি তোমার কন্যাকে এ-ছেলে অর্থাৎ ফাযল ইবনু আব্বাসের সাথে বিয়ে দাও। তিনি তা-ই করলেন।” তারপর তিনি নাওফাল ইবনু হারিসকে বললেন, "তুমি এ-ছেলের (অর্থাৎ আমার) সাথে তোমার কন্যার বিয়ে দাও।” তিনি আমাকে বিয়ে করিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি মাহমিয়াকে বললেন, "এ-দুজনের পক্ষ থেকে এত এত পরিমাণ মহরানা খুমুসের তহবিল থেকে আদায় করে দাও।” ২৬৩
টিকাঃ
২৬২. এটি মানুষের সম্পদ এবং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।
২৬৩. মুসলিম (১০৭২)।