📄 নবীজি ﷺ আত্মীয়দের সাথে উত্তম ব্যবহার করতে বলতেন
জায়িদ ইবনে আরকাম থেকে বর্ণিত, মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী খুম নামক নদীর ধারে নবীজি আমাদের মাঝে একদিন উঠে দাঁড়িয়ে খুতবা দিচ্ছিলেন। প্রথমে তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন, এরপর আমাদের নাসিহা আকারে বললেন, “শোনো, আমি তো কেবল একজন মানুষ; হয়তো সে-সময় খুব কাছে যখন আল্লাহর বার্তাবাহক আসবে, আর আমিও ফিরে যাব (মারা যাব)। আমি তোমাদের মাঝে দুটো ভারী জিনিস রেখে যাচ্ছি—প্রথমটি কুরআন, যাতে আছে পথনির্দেশনা ও আলো; যে এটি দৃঢ়ভাবে ধরে থাকবে, সে হেদায়েত পাবে, নাহলে পথভ্রষ্ট হবে। আর (দ্বিতীয়) হলো, আমার আহল—আমার পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের খেয়াল রেখো (তিনবার বললেন)।”
আবু বাকর রাযি. বলতেন, “নবীজির পরিবারের যত্ন নাও।” ২৪২
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “এর অর্থ হলো, তার পরিবারের প্রতি ক্ষতি বা খারাপ আচরণ কোরো না।” ২৪৩
হুসাইন ইবনে সাবরা রাযি. যায়েদকে রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাঁর আহল কারা? তাঁর স্ত্রীগণ কি এর মাঝে অন্তর্ভুক্ত?’ তিনি বললেন, ‘তাঁর স্ত্রীগণ তাঁর আহলের অন্তর্গত, কিন্তু এখানে তাদের কথা বলা হয়েছে, যারা সাদাকা নিতে পারবে না।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তারা কারা?’ যায়েদ উত্তর দিলেন, ‘আলির পরিবার, আকিলের পরিবার, জাফরের পরিবার এবং আব্বাসের পরিবার।’ ২৪৪
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, আবু বাকর রাযি. আলীকে রাযি. বললেন, “যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ, আমি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষায় নিজের আত্মীয়দের তুলনায় নবীজির আত্মীয়দের বেশি গুরুত্ব দেব।” ২৪৫
টিকাঃ
২৪২. বুখারী (৩৭১৩)।
২৪৩. ফাতহুল বারী (৭৯/৭)।
২৪৪. মুসলিম (২৪০৮)।
২৪৫. বুখারী (৩৭১২)।
📄 নবীজি ﷺ তাঁর মায়ের কবর দেখতে গিয়ে কাঁদতেন
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি তাঁর মায়ের কবর দেখতে যেতেন। সেখানে তিনি কাঁদতেন এবং তাঁর আশেপাশে যারা থাকত, তারাও কাঁদত। তিনি বলতেন, “আমি আমার রব্বের কাছে তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করার অনুমতি চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি আমাকে অনুমতি দেননি; তখন আমি তার কবর যিয়ারতের জন্য অনুমতি চেয়েছি। তাই কবর জিয়ারত করো, এটা মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেয়।” ২৪৬ তাঁর কাঁদার কারণ ছিল তাঁর মা ইসলাম আসার আগেই মারা গিয়েছিলেন।
বুরাইদা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি চিহ্নিত-করা এক কবরের কাছে পৌঁছলেন। তিনি বসলেন, তাঁর সাথে সাহাবীরাও বসল। তারপর তিনি এমনভাবে মাথা নাড়ালেন, যেন কথা বলবেন, কিন্তু কাঁদা শুরু করলেন। উমার ইবনে খাত্তাব রাযি. তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কাঁদছেন কেন, আল্লাহর রাসূল?’ তিনি বললেন, “এটি আমিনা বিনতে ওহাবের কবর। আমি আমার রব্বের কাছে তার কবর যিয়ারত করার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করার অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন না। তাই আমি দুঃখে কাঁদছি।” বুরাইদা বলেন, 'আমি তখনকার মতো এত বেশি মানুষ কাঁদতে কখনো দেখিনি।” ২৪৭
টিকাঃ
২৪৬. মুসলিম (৯৭৬)।
২৪৭. দালা'ঈল আন-নুবুওয়্যাহ গ্রন্থে বায়হাকী (১৮৯/১)।
📄 নিকটাত্মীয়দের ইসলামের দিকে ডাকতেন
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, “তোমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করো!”— আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাযিল করলে নবীজি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “হে কুরাইশ, নিজেদের রক্ষা করো, আমি তোমাদের আল্লাহর কাছ থেকে রক্ষায় কিছুই করতে পারব না। হে আব্দে মানাফের সন্তানেরা, নিজেদের রক্ষা করো, আমি তোমাদের আল্লাহর কাছ থেকে রক্ষায় কিছুই করতে পারব না। হে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব, নিজেকে রক্ষা করুন, আমি আপনাকে আল্লাহর কাছ থেকে রক্ষায় কিছুই করতে পারব না। হে সাফিয়্যা, নবীর ফুফু, নিজেকে রক্ষা করুন, আমি আপনাকে আল্লাহর কাছ থেকে রক্ষায় কিছুই করতে পারব না। হে ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ, আমার সম্পদ থেকে যা ইচ্ছা চেয়ে নাও, আমি তোমাদের আল্লাহর কাছ থেকে রক্ষায় কিছুই করতে পারব না।” ২৪৮
নববী রাহ. বলেন, “এর অর্থ হলো, আখিরাতে মুক্তি পেতে তারা যেন নবীজির সাথে সম্পর্কের ওপর নির্ভর না করে। কারণ, আল্লাহর নির্ধারিত কোনো ক্ষতি থেকে তাদের রক্ষা করার কোনো ক্ষমতা তাঁর নেই।” ২৪৯
মুসলিমে বর্ণিত এ-হাদীসের শেষে আরও বলেছেন, “কিন্তু আমার সাথে আপনাদের আত্মীয়তার বন্ধন আছে, সেটি আমি ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে ধরে রাখব।” ২৫০
টিকাঃ
২৪৮. বুখারী (২৭৫৩) ও মুসলিম (২০৬)।
২৪৯. মুসলিম গ্রন্থের (৮০/৩) ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)।
২৫০. মুসলিম (২০৪)।
📄 চাচা আবু তালিবকে পথপ্রদর্শনে আগ্রহী ছিলেন
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “আল্লাহ নবীজিকে প্রথমে তাঁর ঘনিষ্ঠ নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করতে বলার কারণ হলো, যদি তারা ইসলামের সত্যতা মেনে নেয়, তবে অন্যদেরও ইসলামের পথে আনা যাবে।” ২৫১ নবীজি আলিকে রাযি. ছোট থাকা অবস্থাতেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম শিশু।
তিরমিযী রাহ. বলেন, “আলিমদের মাঝে কেউ কেউ বলেন যে, প্রথম প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ছিলেন আবু বাকর, আলি মাত্র আট বছর বয়সে মুসলিম হন এবং খাদিজা ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম নারী।” ২৫২
সাঈদ ইবন মুসায়্যিব রাহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, “যখন আবু তালিব মুমূর্ষু অবস্থায় পৌঁছলেন, তখন নবীজি তার কাছে গেলেন। আবু জাহল তখন তার কাছে বসে ছিল। নবীজি তাকে লক্ষ করে বললেন, “চাচাজান, لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ কালেমাটি একবার পড়ুন, তা হলে আমি আপনার জন্য আল্লাহর কাছে কথা বলতে পারব।” তখন আবু জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনু আবু উমাইয়া বলল, 'আবু তালিব, তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হতে ফিরে যাবে?' এরা দুজন তার সাথে এ-কথাটি বারবার বলতে থাকল। সর্বশেষ আবু তালিব তাদের সাথে বলল, 'আমি 'আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরেই আছি।' এ-কথার পর নবীজি বললেন, “আমি আপনার জন্য ক্ষমা চাইতে থাকব, যে-পর্যন্ত আপনার ব্যাপারে আমাকে নিষেধ করা না হয়।' এ প্রসঙ্গে এ-আয়াতটি নাযিল হলো—‘নবী ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য—যদি তারা নিকটাত্মীয়ও হয়, যখন তাদের কাছে এ-কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামী।' (আল কুরআন, ৯:১১৩)। আরও নাযিল হলো, “আপনি যাকে ভালোবাসেন, ইচ্ছা করলেই তাকে হিদায়াত করতে পারবেন না।”” (আল কুরআন, ২৮:৫৬) ২৫৩
অন্য হাদীসে এসেছে, নবীজি ﷺ তাকে বললেন, “চাচা, বলুন, 'আল্লাহ ছাড়া ইবাদাতের যোগ্য কেউ নেই', আমি তা হলে আল্লাহর সামনে আপনার জন্য এ-ব্যাপারে সাক্ষ্য দেব।” ২৫৪
আরেকটি সহীহ হাদীসে এসেছে, আহমদ বর্ণনা করেন, আবু তালিব নবীজিকে ﷺ বলেছিলেন, “এমন যদি না হতো যে, কুরাইশরা আমার সমালোচনা করে বলবে, মৃত্যুভয়ে আমি কথাগুলো বলছি, তা হলে আমি অবশ্যই তোমাকে খুশি করার জন্য কথাগুলো বলতাম।” ২৫৫
আবু তালিব কাফের হয়ে মারা গেলেও নবীজি তার জন্য সুপারিশ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর সুপারিশের কারণেই আবু তালিব জাহান্নামে সবচেয়ে কম শাস্তি পাবে। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেন, "জাহান্নামে সবচেয়ে কম শাস্তি আবু তালিব পাবে। তা হলো তিনি (আগুনের) দুটো জুতা পরে থাকবেন, যা তার মগজকে পর্যন্ত সিদ্ধ করে ফেলবে।” ২৫৬
আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আবু তালিব কি আপনার কারণে উপকৃত হবে? কারণ, তিনি তো আপনার হিফাযাত করতেন, আপনার পক্ষ হয়ে (অন্যের প্রতি) ক্রোধান্বিত হতেন। রসূলুল্লাহ্ উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ, তিনি কেবল পায়ের গ্রন্থি পর্যন্ত জাহান্নামের আগুনে থাকবেন, আর যদি আমি না হতাম তবে জাহান্নামের অতল তলেই তিনি অবস্থান করতেন।” ২৫৭
টিকাঃ
২৫১. ফাতহুল বারী (৫০৩/৮)।
২৫২. তিরমিযী (৬৪২/৫)।
২৫৩. বুখারী (৩৮৮৪) ও মুসলিম (২৪)।
২৫৪. বুখারী (১৩৬০)।
২৫৫. আহমাদ (৯২৩৭)।
২৫৬. মুসলিম (২১১)।
২৫৭. মুসলিম (২০৯)।