📄 কন্যাদের সান্ত্বনা দিতেন এবং ধৈর্যধারণের শিক্ষা দিতেন
উসামা ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত, নবীজিকে ﷺ তাঁর এক মেয়ে ডেকে পাঠালেন এই বলে যে, তার ছেলে মৃত্যুশয্যায়। এটি শুনে নবীজি ﷺ তাকে সালাম জানিয়ে বার্তা পাঠালেন, "আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন, সবই তাঁর; তিনি যা কিছু নিয়ে যান, সে-সবও তো তাঁর। সব কিছুরই একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে, তাই তাকে ধৈর্যধারণ এবং আল্লাহর কাছে সাওয়াব প্রার্থনা করতে বলো।”
এটি শুনে তাঁর মেয়ে তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে আবার ডেকে পাঠালেন। নবীজি উঠে দাঁড়ালেন। তার সাথে সাদ ইবনে উবাদা, মুআয ইবনে জাবাল, উবাই ইবনে কাব, জায়েদ ইবনে সাবিত ও অন্যান্যরা ছিলেন। শিশুটিকে তিনি তুলে নিলেন এবং বাচ্চাটির গলা দিয়ে খালি পাত্রে পানি ঢালার মতো শব্দ হচ্ছিল। এটি দেখে নবীজির চোখে অশ্রু জমে টলটল করতে লাগল।
সাদ (তাঁর কান্না দেখে) বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল, এটি কী?’ নবীজি বললেন, “এটি রহমত, যা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার অন্তরে দান করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মাঝে দয়ালুদেরকেই কেবল রহমত দেখান।” ২০৬
নববী রাহ. বলেন, “আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন, সবই তাঁর; তিনি যা কিছু নিয়ে যান, সে-সবও তো তাঁর। সব কিছুরই একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে”- কথাগুলোর দ্বারা তিনি তাকে ধৈর্য ধরার ব্যাপারে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। এর অর্থ হলো, আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমার নয়। তিনি তাঁর জিনিসই তাঁর কাছে ফিরিয়ে নিয়েছেন। তাই কারও হতাশ ও অশান্ত হওয়া উচিত নয় এটি ভেবে যে, তিনি যা ধার দিয়েছিলেন, তা তিনি ফিরিয়ে নিয়েছেন।
“আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন সবই তাঁর”—এর অর্থ হলো, আল্লাহ যা দেন, সবই তাঁর সাম্রাজ্যেরই অংশ। তিনি সেটি নিয়ে যা খুশি তা-ই করতে পারেন।
সাদ (তাঁর কান্না দেখে) বিস্মিত হওয়ার কারণ হলো, তিনি ভেবেছিলেন—যে- কোনো ধরনের কান্না হারাম এবং আল্লাহর নবী তা হয়তো ভুলে গিয়েছেন ভেবে তিনি তাকে তা স্মরণ করিয়ে দিলেন। নবীজি তখন তাকে বললেন, চোখে পানি চলে আসা হারাম বা অপছন্দনীয় নয়, বরং এটি দয়া ও রহমত থেকে আসে। আর নিষিদ্ধ হলো, কাঁদার সময় জোরে চিৎকার করা।” ২০৭
টিকাঃ
২০৬. বুখারী (১২৩৮) ও মুসলিম (৯২৩)।
২০৭. মুসলিম গ্রন্থের (২২৫/৬) ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)।
📄 সন্তানের মৃত্যুতে শোকাহত হতেন
যদি কেউ তার সন্তানের মৃত্যুর মাধ্যমে পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, তবে তার মনে রাখা উচিত, নবীজির জীবদ্দশাতেই ফাতিমা রাযি. ছাড়া তাঁর সব সন্তান ইন্তেকাল করেন। ফাতিমাও তাঁর মৃত্যুর কিছুকাল পরই ইন্তেকাল করেন। তাদের মৃত্যুতে নবীজি ﷺ কষ্ট পেতেন, তাঁর চোখ কান্নায় ভিজে যেত, কিন্তু তারপরও আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে, এমন কথাই তিনি বারবার মুখে উচ্চারণ করতেন।
আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহর কন্যা উম্মে কুলসুম মারা যাওয়ার পর তিনি নবীজিকে তার কবরের পাশে বসে থাকতে দেখেছিলেন এবং সে-সময় তাঁর চোখ অশ্রুপূর্ণ ছিল। ২০৮ এগুলো আল্লাহর প্রতি হতাশায় বা ক্রোধে কান্না ছিল না, বরং মমতাময়ী পিতার কন্যাবিয়োগের কষ্ট ছিল তাঁর কান্নার কারণ।
আনাস ইবনে মালিক রাযি. আরও বলেন, “আমরা কামার আবু সাইফের ঘরে গেলাম। তার স্ত্রী নবীজির পুত্র ইবরাহীমকে দুধপান করাতো। নবীজি ইবরাহীমকে কোলে নিয়ে চুমো খেলেন এবং তার ঘ্রাণ নিলেন। পরে ইবরাহীমের মৃত্যুর সময় আমরা তাঁর সাথে ছিলাম। তিনি তখন কাঁদছিলেন।” ২০৯
এটি দেখে আব্দুর রাহমান ইবন আওফ রাযি. বললেন, 'আপনিও, আল্লাহর রাসূল!' শুনে তিনি জবাব দিলেন, “ইবনে আওফ, এ তো করুণার কান্না।” এরপর আরেকবার হলো (অর্থাৎ প্রথম কান্নার পর আবার কাঁদলেন)। এরপর তিনি বললেন, “চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে, অন্তর কষ্টে মুচড়ে ওঠে, কিন্তু আমরা রব্বকে সন্তুষ্ট করে এমন কথা ছাড়া আর কোনো কথা বলব না। ইবরাহীম, তোমার চলে যাওয়াতে তো আমরা কষ্ট পেয়েছি।” ২১০
আনাস ইবনে মালিক রাযি. বলেন, “আমি নবীজির চেয়ে সন্তানদের সাথে অধিকতর দয়ালু আর কাউকে দেখিনি।”
তিনি আরও বলেন, “মদীনার আওয়ালী নামক জায়গায় ইবরাহীম দুধপান করত। নবীজি তাকে দেখতে সে-বাসায় যেতেন। ধোঁয়ায় বাসাটি ভরে থাকত (যেহেতু বাসাটি ছিল একজন কামারের), তাই আমি দ্রুত আগে গিয়ে বলতাম, “আবু সাইফ নবীজি আসছেন, থামো!” নবীজি তারপর ইবরাহীমকে কোলে নিয়ে চুমো খেতেন, তারপর চলে যেতেন।”
টিকাঃ
২০৮. বুখারী (১২৮৫)।
২০৯. বুখারী (১২৮৫)।
২১০. বুখারী (১৩০৩)।