📄 কন্যাদের এমনভাবে বড় করেছেন যেন তারা দুনিয়াকে তুচ্ছ মনে করে
আবদুল্লাহ ইবনে উমার রাযি. থেকে বর্ণিত, একদা রাসূল ﷺ ফাতিমার ঘরে গেলেন। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলেন না। আলি রাযি. ঘরে এলে ফাতিমা রাযি. তাকে এ-কথা জানালেন। তিনি নবীজির ﷺ কাছে গিয়ে এ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তখন তিনি বললেন, 'আমি তার দরজায় নকশা-করা পর্দা ঝুলতে দেখেছি। দুনিয়ার চাকচিক্যের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?'
আলি রাযি. ফাতিমার কাছে এসে ঘটনা খুলে বললেন। ফাতিমা রাযি. বললেন, 'তিনি আমাকে এ-সম্পর্কে তাঁর যা ইচ্ছা তা যেন নির্দেশ দেন।' তখন নবীজি বললেন, 'অমুক পরিবারের অমুকের নিকট এটি পাঠিয়ে দাও; তাদের প্রয়োজন আছে।” ১৯৩
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “মুহাল্লাব এবং অন্যরা বলেন, 'নবীজি নিজের ব্যাপারে যা অপছন্দ করতেন, সেটি তাঁর মেয়ের জন্যও অপছন্দ করতেন। ভালো জিনিস তাদের জন্য এ-জীবনে পুরস্কার হলে আখিরাতে তখন সেটার জন্য কোনো পুরস্কার থাকবে না। এ-হাদীসে তিনি বোঝাতে চাননি যে, দরজায় পর্দা লাগানো হারাম।” ১৯৪
টিকাঃ
১৯৩. বুখারী (২৬১৩) ও আবু দাউদ (৪১৪৯)।
১৯৪. ফাতহুল বারী (২২৯/৫)।
📄 দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বোত্তম হওয়ার ব্যাপারে সন্তানদের শেখাতেন
আলি রাযি. থেকে বর্ণিত, “ফাতিমা রাযি. যাঁতা চালানোর কষ্ট সম্পর্কে একবার অভিযোগ প্রকাশ করলেন। এ-সময় নবীজির হাতে কিছু যুদ্ধবন্দি এলো। ফাতিমা রাযি. নবীজির কাছে গেলেন। কিন্তু তাঁকে না পেয়ে আয়িশার রাযি. কাছে তার (চাহিদার) কথা বলে এলেন। নবীজি যখন ঘরে এলেন, তখন ফাতিমার রাযি. আসা ও তার চাওয়ার ব্যাপারে আয়িশা রাযি. তাঁকে জানালেন। (আলী রাযি. বলেন) নবীজি আমাদের ঘরে এলেন। আমরা তখন বিছানায় শুয়ে ছিলাম। তাঁকে দেখে আমি উঠে বসতে চাইলাম। কিন্তু তিনি বললেন, 'তোমরা যেভাবে ছিলে, সেভাবেই থাকো।' এরপর তিনি আমাদের মাঝে এমনভাবে বসে পড়লেন যে, আমি তাঁর দুই পায়ের শীতলতা আমার বুকে অনুভব করলাম। তিনি বললেন, 'তোমরা যা চেয়েছিলে, আমি কি তার চেয়েও উত্তম জিনিস শিক্ষা দেব না?' তোমরা যখন ঘুমানোর উদ্দেশে বিছানায় যাবে, তখন চৌত্রিশবার আল্লাহু আকবার, তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ পড়ে নেবে। এটি খাদেম অপেক্ষা অনেক উত্তম।” ১৯৫
নবীজি তাদের খাদেম দেননি এ-কারণে যে, তাঁর কাছে যা-ই আসত, তা-ই তিনি দান করে দিতেন। তাঁর সন্তানদের জন্য তিনি অনুরূপ চাইতেন, যেন তারাও দান করে আখিরাতে পুরস্কার লাভ করে।
এ-ছাড়া এই হাদীস থেকে শেখা যায়, কতটা যত্নের সাথে নবীজি তাঁর মেয়ে ও মেয়ে-জামাইকে বোঝাতেন। তিনি ঘরে ঢুকে তাদেরকে উঠতেও বলেননি, বরং বিছানায় তাদের দুজনের মাঝে বসে নরমভাবে বোঝালেন পুরো বিষয়টি। তাদের প্রার্থিত জিনিসের চেয়ে উত্তম ছিল আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ, ধৈর্যধারণ এবং পার্থিব জীবনের ধোঁকায় না পড়া। ১৯৬
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, ফাতিমা রাযি. নবীজির কাছে এসে একজন খাদেম চাইলেন। নবীজি তাকে একটি দুআ শেখালেন,
اللهُمَّ رَبَّ السَّمَاوَاتِ وَرَبَّ الْأَرْضِ وَرَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، رَبَّنَا وَرَبَّ كُلَّ شَيْءٍ، فَالِقَ الْحَبِّ وَالنَّوَى، وَمُنْزِلَ التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْفُرْقَانِ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ شَيْءٍ أَنْتَ آخِذُ بِنَاصِيَتِهِ، اللهُمَّ أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ، اقْضِ عَنَّا الدَّيْنَ، وَأَغْنِنَا مِنَ الْفَقْرِ
“হে আল্লাহ, সাত আসমান ও জমিনের রব্ব, আরশের রব্ব, আমাদের এবং সব কিছুর রব্ব—যিনি বীজ ও খেজুরের বীজকে দ্বিখণ্ডিত করেন, যিনি তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআন নাযিল করেছেন—আমি আপনার কাছেই আশ্রয় চাই সে-সব কিছুর অনিষ্ট থেকে, যা আপনি নির্ধারণ করেছে কপাল ধরে। হে আল্লাহ, আপনিই প্রথম, আপনার পূর্বে কিছুই ছিল না, আপনিই সর্বশেষ, আপনার পরে কিছুই নেই। আপনি মহান উচ্চ, আপনার ঊ কিছুই নেই। আপনি সব গোপন সম্পর্কে জানেন, আপনার থেকে নিকটবর্তী কিছুই নেই। আমাদের ঋণ পরিশোধ করে দিন এবং দরিদ্র থেকে মুক্তি দিন।” ১৯৭
টিকাঃ
১৯৫. বুখারী (৩৭০৫) ও মুসলিম (২৭২৭)।
১৯৬. ফাতহুল বারী (১২৪/১১)।
১৯৭. মুসলিম (২৭১৩)।
📄 ফাতিমাকে রাযি. নিজের কাজের ব্যাপারে দায়িত্বশীল হতে বলতেন
নবীজি একবার ফাতিমাকে রাযি. বললেন, “ফাতিমা, জাহান্নাম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো। আমি তোমাকে আল্লাহর কাছ থেকে রক্ষা করতে পারব না।” ১৯৮
বুখারীতে এই হাদীস এভাবে এসেছে-“মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতিমা, আমার সম্পদ থেকে কী চাও বলো, (কিন্তু) আমি তোমাকে আল্লাহর কাছ থেকে বাঁচাতে পারব না।” অর্থাৎ, তোমার বংশ তোমাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারবে না। ১৯৯
টিকাঃ
১৯৮. বুখারী (২৭৫৩) ও মুসলিম (২০৪)।
১৯৯. মুসলিম গ্রন্থের (৮০/৩) ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)।
📄 ফাতিমাকে রাযি. তাহাজ্জুদ আদায়ের নির্দেশ দিতেন
আলী ইবনে আবু তালিব রাযি. থেকে বর্ণিত, এক রাতে নবীজি ফাতিমা ও তার কাছে এলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা তাহাজ্জুদ পড়ো না?” আলি বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, আমাদের রূহ আল্লাহর হাতে, তিনি যখন ইচ্ছা করেন, তখন আমরা জেগে উঠি।' নবীজি আমার উত্তর শুনে কিছু না বলে চলে গেলেন। আমি তাঁকে উরুতে আঘাত করে বলতে শুনলাম,
وَكَانَ الْإِنْسَانُ أَكْثَرَ شَيْءٍ جَدَلًا
“বরং মানুষ বড়ই তর্কপ্রবণ।” (কাহাফ : ৫৪) ২০০
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “ইবনে বাত্তাল বলেন, এ-হাদীস থেকে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা ও এর জন্য রাতে ওঠার গুরুত্ব আমরা জানতে পারি। রাতের এই সালাত এতটা গুরুত্বপূর্ণ, নাহলে ঘুমের সময় এসে নবীজি তাদেরকে এভাবে বিরক্ত করতেন না। তিনি সালাতের নির্দেশ দানের ব্যাপারে কুরআনের এই আদেশের বাস্তবায়ন করেছেন-“তোমার পরিবারকে সালাতের নির্দেশ দাও।”” (আল কুরআন, ২০: ১৩২) ২০১
ইবনে বাত্তাল রাহ. আরও বলেন, "আলির দ্রুত উত্তর দেওয়া ও অজুহাত দেখে নবীজি বিস্ময়ে নিজ উরুতে আঘাত করেছিলেন। তিনি তার উত্তর পছন্দ করেননি; কারণ, একটি দায়িত্বের ব্যাপারে আলী রাযি. তাকদীরকে কারণ হিসেবে দাড় করিয়েছিলেন, যা কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। তবে তাহাজ্জুদের সালাত যেহেতু নফল বিষয়, তাই তিনি কুরআনের আয়াতটি বলে আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন। যদি এটি আবশ্যিক কোনো সালাত হতো, তবে তিনি তাদের সেটা না পড়িয়ে চলে যেতেন না।” ২০২
টিকাঃ
২০০. বুখারী (১১২৭) ও মুসলিম (৭৭৫)।
২০১. ফাতহুল বারী (১১/৩)।
২০২. বুখারী (১১৫৬/৩) ও হাসিয়াত আস-সিন্দি (২০৫/৩) গ্রন্থদয়ের ব্যাখ্যায় ইবনে বাত্তাল।