📘 নবীজির সংসার > 📄 মেয়ে ও জামাতার মনোমালিন্যে হস্তক্ষেপ করতেন না

📄 মেয়ে ও জামাতার মনোমালিন্যে হস্তক্ষেপ করতেন না


সাহল ইবনে সাদ থেকে বর্ণিত, নবীজি ফাতিমার রাযি. বাড়িতে গেলেন এবং তিনি সেখানে আলিকে খুঁজে পেলেন না। তখন তিনি ফাতিমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার চাচাতো ভাই ১৮৭ কোথায়?” তিনি উত্তর দিলেন, 'আমাদের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছিল। তাই দুপুরে না ঘুমিয়ে তিনি রেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন।' রাসূল এক লোককে খুঁজতে বললেন। লোকটি এসে জানাল, আলি রাযি. মসজিদে ঘুমাচ্ছেন। তিনি তার কাছে গেলেন এবং তাঁর জামার কিছু ধুলা তার ওপর পড়ল। তখন তিনি ধুলো ঝেড়ে দিতে দিতে তাকে বললেন, “ওঠো, আবু তুরাব১৮৮!” ১৮৯
এখানে লক্ষণীয় যে, নবীজি ফাতিমাকে তাদের মধ্যে বিবাদ সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞেস করেননি। বরং তিনি আলির রাযি. কাছে গিয়ে তাকে খুশি করার চেষ্টা করেছেন। তিনি তাকে মজা করে “আবু তুরাব” নামে ডেকে তার মন ভালো করার চেষ্টা করেছেন। তিনি এখানে ফাতিমাকে রাযি. রাগানোর ব্যাপারে কিছুই বললেন না—যদিও ফাতিমা তাঁর অনেক আদরের কন্যা ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। মেয়ের পরিবারে সমস্যা তৈরি হলে অনেক বাবা-মাই বরং তা আরও উসকে দেয়।
ইবনে বাত্তাল রাহ. বলেন, “সবচেয়ে ভালো মানুষদেরও তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সমস্যা দেখা দিতে পারে; কারণ, রাগ মানবপ্রকৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকি রেগে গিয়ে বাড়ি ছেড়েও সে চলে যেতে পারে, এজন্য তাকে দায়ী করা উচিত নয়। সম্ভবত এটিও আলীর রাযি.। বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে যে, তিনি আশঙ্কা করছিলেন হয়তো ক্রুদ্ধ অবস্থায় ফাতিমাকে রাযি.। তিনি এমন কিছু বলে ফেলবেন, যা ফাতিমার রাযি. মর্যাদার পরিপন্থী। তাই তিনি বাড়ির বাইরে থাকাকেই সমীচীন মনে করলেন—যতক্ষণ না দুজনে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন।” ১৯০
বিবাদের উত্তাপ আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে স্বামীর উচিত ঘর ছেড়ে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে চলে যাওয়া। এতে করে দুজনেই শান্ত হওয়া এবং নিজেদের ভুল সম্পর্কে চিন্তা করার সময় পাবে।
অন্যদিকে ফাতিমা বাড়ি ছেড়ে যাননি, বরং বাড়িতেই থেকেছেন। তিনিও যদি বাড়ি ছেড়ে নিজের বাবার বাসায় চলে যেতেন, তা হলে সমস্যা সমাধান হওয়ার কোনো পথ তো থাকতই না, বরং বাড়ত। কেননা, নিজের বাড়িতে স্বামী একসময় ফিরে আসবে, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বিবাদের পর স্ত্রীকে তার বাবার বাসা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে স্বামী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ নাও করতে পারেন।

টিকাঃ
১৮৭. আলী রা. আল্লাহর রাসূলের চাচাতো ভাই হওয়া সত্ত্বেও ফাতিমার চাচাতো ভাই বলে সম্বোধনের কারণ হচ্ছে আরবের প্রচলিত একটি সাধারণ পরিভাষা এটি। ফাতহুল বারি- ২/৪৪২
১৮৮. আলীর (রা) একটি ডাকনাম, যার অর্থ ধুলোধূসরিত মানুষ।
১৮৯. বুখারী (৪৪১) ও মুসলিম (২৪০৯)।
১৯০. ফাতহুল বারী (৫৮৮/১০)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 কন্যাদের কেউ তাঁর কাছে বেড়াতে এলে স্বাগত জানাতেন

📄 কন্যাদের কেউ তাঁর কাছে বেড়াতে এলে স্বাগত জানাতেন


আয়িশা রাযি. বলেন, “যখন ফাতিমা নবীজির বাসায় বেড়াতে আসতেন, তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাকে চুমো দিতেন এবং তাঁর জায়গায় তাকে বসতে দিতেন। আর যখন নবীজি ফাতিমাকে দেখতে যেতেন, ফাতিমা উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে চুমো দিতেন এবং তার জায়গায় তাঁকে বসতে দিতেন।” ১৯১
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, ফাতিমা রাযি.। একদিন নবীজির মতো করে হেঁটে আসছিল। তাকে দেখে নবীজি বললেন, “স্বাগতম, আমার মেয়ে!” তারপর তিনি তাকে তার ডানে বা বামে বসতে দিলেন।” ১৯২
এই হাদীস প্রমাণ করে ফাতিমাকে নবীজি কতটা ভালোবাসতেন, শ্রদ্ধা করতেন। সেখানে সে-সব নিষ্ঠুর হৃদয়ের মানুষগুলোর কথা চিন্তা করুন, যারা মনে করে চোখ পাকানো আর রাগ দেখানোর মাধ্যমেই পুরুষত্বের প্রকাশ ঘটানো যায় এবং সন্তান পালন করা যায়। এ-সব আচরণে দূরত্ব ছাড়া আর কিছুই বাড়ে না।

টিকাঃ
১৯১. আবু দাউদ (৫২১৭) ও তিরমিযী (৩৮৭২)।
১৯২. বুখারী (৩৬২৪) ও মুসলিম (২৪৫০)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 কন্যাদের এমনভাবে বড় করেছেন যেন তারা দুনিয়াকে তুচ্ছ মনে করে

📄 কন্যাদের এমনভাবে বড় করেছেন যেন তারা দুনিয়াকে তুচ্ছ মনে করে


আবদুল্লাহ ইবনে উমার রাযি. থেকে বর্ণিত, একদা রাসূল ﷺ ফাতিমার ঘরে গেলেন। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলেন না। আলি রাযি. ঘরে এলে ফাতিমা রাযি. তাকে এ-কথা জানালেন। তিনি নবীজির ﷺ কাছে গিয়ে এ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তখন তিনি বললেন, 'আমি তার দরজায় নকশা-করা পর্দা ঝুলতে দেখেছি। দুনিয়ার চাকচিক্যের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?'
আলি রাযি. ফাতিমার কাছে এসে ঘটনা খুলে বললেন। ফাতিমা রাযি. বললেন, 'তিনি আমাকে এ-সম্পর্কে তাঁর যা ইচ্ছা তা যেন নির্দেশ দেন।' তখন নবীজি বললেন, 'অমুক পরিবারের অমুকের নিকট এটি পাঠিয়ে দাও; তাদের প্রয়োজন আছে।” ১৯৩
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “মুহাল্লাব এবং অন্যরা বলেন, 'নবীজি নিজের ব্যাপারে যা অপছন্দ করতেন, সেটি তাঁর মেয়ের জন্যও অপছন্দ করতেন। ভালো জিনিস তাদের জন্য এ-জীবনে পুরস্কার হলে আখিরাতে তখন সেটার জন্য কোনো পুরস্কার থাকবে না। এ-হাদীসে তিনি বোঝাতে চাননি যে, দরজায় পর্দা লাগানো হারাম।” ১৯৪

টিকাঃ
১৯৩. বুখারী (২৬১৩) ও আবু দাউদ (৪১৪৯)।
১৯৪. ফাতহুল বারী (২২৯/৫)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বোত্তম হওয়ার ব্যাপারে সন্তানদের শেখাতেন

📄 দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বোত্তম হওয়ার ব্যাপারে সন্তানদের শেখাতেন


আলি রাযি. থেকে বর্ণিত, “ফাতিমা রাযি. যাঁতা চালানোর কষ্ট সম্পর্কে একবার অভিযোগ প্রকাশ করলেন। এ-সময় নবীজির হাতে কিছু যুদ্ধবন্দি এলো। ফাতিমা রাযি. নবীজির কাছে গেলেন। কিন্তু তাঁকে না পেয়ে আয়িশার রাযি. কাছে তার (চাহিদার) কথা বলে এলেন। নবীজি যখন ঘরে এলেন, তখন ফাতিমার রাযি. আসা ও তার চাওয়ার ব্যাপারে আয়িশা রাযি. তাঁকে জানালেন। (আলী রাযি. বলেন) নবীজি আমাদের ঘরে এলেন। আমরা তখন বিছানায় শুয়ে ছিলাম। তাঁকে দেখে আমি উঠে বসতে চাইলাম। কিন্তু তিনি বললেন, 'তোমরা যেভাবে ছিলে, সেভাবেই থাকো।' এরপর তিনি আমাদের মাঝে এমনভাবে বসে পড়লেন যে, আমি তাঁর দুই পায়ের শীতলতা আমার বুকে অনুভব করলাম। তিনি বললেন, 'তোমরা যা চেয়েছিলে, আমি কি তার চেয়েও উত্তম জিনিস শিক্ষা দেব না?' তোমরা যখন ঘুমানোর উদ্দেশে বিছানায় যাবে, তখন চৌত্রিশবার আল্লাহু আকবার, তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ পড়ে নেবে। এটি খাদেম অপেক্ষা অনেক উত্তম।” ১৯৫
নবীজি তাদের খাদেম দেননি এ-কারণে যে, তাঁর কাছে যা-ই আসত, তা-ই তিনি দান করে দিতেন। তাঁর সন্তানদের জন্য তিনি অনুরূপ চাইতেন, যেন তারাও দান করে আখিরাতে পুরস্কার লাভ করে।
এ-ছাড়া এই হাদীস থেকে শেখা যায়, কতটা যত্নের সাথে নবীজি তাঁর মেয়ে ও মেয়ে-জামাইকে বোঝাতেন। তিনি ঘরে ঢুকে তাদেরকে উঠতেও বলেননি, বরং বিছানায় তাদের দুজনের মাঝে বসে নরমভাবে বোঝালেন পুরো বিষয়টি। তাদের প্রার্থিত জিনিসের চেয়ে উত্তম ছিল আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ, ধৈর্যধারণ এবং পার্থিব জীবনের ধোঁকায় না পড়া। ১৯৬
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, ফাতিমা রাযি. নবীজির কাছে এসে একজন খাদেম চাইলেন। নবীজি তাকে একটি দুআ শেখালেন,
اللهُمَّ رَبَّ السَّمَاوَاتِ وَرَبَّ الْأَرْضِ وَرَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، رَبَّنَا وَرَبَّ كُلَّ شَيْءٍ، فَالِقَ الْحَبِّ وَالنَّوَى، وَمُنْزِلَ التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْفُرْقَانِ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ شَيْءٍ أَنْتَ آخِذُ بِنَاصِيَتِهِ، اللهُمَّ أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ، اقْضِ عَنَّا الدَّيْنَ، وَأَغْنِنَا مِنَ الْفَقْرِ
“হে আল্লাহ, সাত আসমান ও জমিনের রব্ব, আরশের রব্ব, আমাদের এবং সব কিছুর রব্ব—যিনি বীজ ও খেজুরের বীজকে দ্বিখণ্ডিত করেন, যিনি তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআন নাযিল করেছেন—আমি আপনার কাছেই আশ্রয় চাই সে-সব কিছুর অনিষ্ট থেকে, যা আপনি নির্ধারণ করেছে কপাল ধরে। হে আল্লাহ, আপনিই প্রথম, আপনার পূর্বে কিছুই ছিল না, আপনিই সর্বশেষ, আপনার পরে কিছুই নেই। আপনি মহান উচ্চ, আপনার ঊ কিছুই নেই। আপনি সব গোপন সম্পর্কে জানেন, আপনার থেকে নিকটবর্তী কিছুই নেই। আমাদের ঋণ পরিশোধ করে দিন এবং দরিদ্র থেকে মুক্তি দিন।” ১৯৭

টিকাঃ
১৯৫. বুখারী (৩৭০৫) ও মুসলিম (২৭২৭)।
১৯৬. ফাতহুল বারী (১২৪/১১)।
১৯৭. মুসলিম (২৭১৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00