📘 নবীজির সংসার > 📄 নবীজির ﷺ স্ত্রীদের ভরণপোষণ বাড়ানোর দাবি করার ঘটনা

📄 নবীজির ﷺ স্ত্রীদের ভরণপোষণ বাড়ানোর দাবি করার ঘটনা


নবীজি পরিবারে অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে কীভাবে কাজ করেছেন তার বিবরণ এ ঘটনায় পাওয়া যায়-
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. এ-ঘটনা বর্ণনা করেন, “আবু বাকর রাযি. এসে রাসূলুল্লাহর নিকটে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তিনি তার দরজায় অনেক লোককে বসাবস্থায় দেখলেন। তবে তাদের কাউকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি।” তিনি (বর্ণনাকারী জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি.) বলেন, “এরপর তিনি আবু বাকরকে রাযি. প্রবেশের অনুমতি প্রদান করলে তিনি প্রবেশ করলেন। এরপর উমার রাযি. এলেন এবং তিনি অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তখন তাকেও প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা হলো। তিনি নবীজিকে চিন্তাযুক্ত ও নীরব বসে থাকতে দেখলেন। তার চারপাশে তার সহধর্মিণীগণ বসে ছিলেন।” ১৭ তিনি (বর্ণনাকারী জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি.) বলেন, “উমার রাযি. বললেন, 'নিশ্চয়ই আমি নবীজির নিকটে এমন কথা বলব, যা তাকে হাসাবে।' এরপর তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, আপনি যদি খারিজার কন্যাকে (উমরের রাযি.-এর স্ত্রী) আমার কাছে খোরপোশ (হাতখরচ) তলব করতে দেখতেন, তা হলে (তৎক্ষণাৎ) আপনি তার দিকে অগ্রসর হয়ে তার কাঁধে আঘাত করতেন। তখন রাসূলুল্লাহ হেসে উঠলেন এবং বললেন, 'আমার চারপাশে তোমরা যাদের দেখতে পাচ্ছ, তারা আমার কাছে খোরপোশ দাবি করছে।' অমনি আবু বাকর রাযি. আয়িশা রাযি.-এর দিকে ছুটলেন এবং তার ঘাড়ে আঘাত করলেন। উমারও রাযি. দাঁড়িয়ে গেলেন এবং হাফসার রাযি. দিকে অগ্রসর হয়ে তার ঘাড়ে আঘাত করলেন। তারা উভয়ে বললেন, 'তোমরা নবীজির কাছে এমন জিনিস দাবি করছ, যা তার কাছে নেই।' তখন তারা (নবীজির সহধর্মিণীগণ) বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমরা আর কখনো রাসূলুল্লাহর কাছে এমন জিনিস চাইব না, যা তার কাছে নেই।'
এরপর এ-আয়াত নাযিল হলো-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ إِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسَبِّحْكُنَّ سَمَاحًا جَمِيلًا (۲۸) وَإِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللَّهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَاتِ مِنْكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا
“হে নবীজি, আপনি আপনার সহধর্মিণীদের বলে দিন, তোমরা যদি পার্থিব জীবনের ভোগ ও বিলাসিতা কামনা কর, তা হলে এসো আমি তোমাদের ভোগবিলাসের ব্যবস্থা করে দিই এবং সৌজন্যের সাথে তোমাদের বিদায় করে দিই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকালকে কামনা কর, তা হলে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণা, আল্লাহ তাদের জন্য মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন।” (আল কুরআন, ৩৩: ২৮- ২৯)
তিনি আয়িশাকে রাযি. দিয়ে (আয়াতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে) শুরু করলেন। তিনি বললেন, “আয়িশা, আমি তোমার সাথে একটি (গুরুত্বপূর্ণ) বিষয়ে আলাপ করতে চাই। তবে সে-বিষয়ে তোমার পিতামাতার সঙ্গে পরামর্শ না করে তোমার ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করাই আমি পছন্দ করি।” তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, আপনার ব্যাপারে আমি কি আমার পিতামাতার কাছে পরামর্শ নিতে যাব? (এর কোনো প্রয়োজন নেই) বরং আমি আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আখিরাতকেই বেছে নিয়েছি। তবে আপনার কাছে আমার একান্ত নিবেদন, আমি যা বলেছি, সে-সম্পর্কে আপনি আপনার অন্যান্য স্ত্রীদের কারও কাছে ব্যক্ত করবেন না।' তিনি বললেন, “তাদের যে-কেউ সে- বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি অবশ্যই তাকে বলে দেব। কারণ আল্লাহ আমাকে কঠোরতা আরোপকারী ও অত্যাচারীরূপে নয়, বরং সহজ পন্থায় (শিক্ষাদানকারী) হিসেবে প্রেরণ করেছেন।” এরপর বাকি স্ত্রীদেরও একই ব্যাপার বলা হলো এবং তারাও আয়িশার মতো একই উত্তর দিলেন.' ১৬৮
এ-ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা পাই কীভাবে নবীজি তাঁর স্ত্রীদের সাথে সমস্যা হলে সমাধান করতেন। প্রথমেই তিনি কথা না বাড়িয়ে চুপ ছিলেন। কোনো সমস্যার শুরুতে তর্ক করা কোনো সমাধান আনে না, বরং সমস্যাকে ঘনীভূত করে। দ্বিতীয়ত, তিনি তাদেরকে দুটো সুযোগ দিলেন-হয় তারা তার সাথে থাকবে যেভাবে আছে, সেভাবে; নতুবা তারা চাইলে তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারেন।
ইসলামী শরীয়াহ এমনটিই শেখায়-যদি স্ত্রী স্বামীর সাধ্যের অতিরিক্ত ভরণপোষণ দাবি করে, তা হলে স্বামী তাকে তার সাথে থাকার বা তাকে ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে পারেন। আল্লাহর রাসূল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদেরকে সতর্কতার সাথে ধীরেসুস্থে চিন্তাভাবনা করতে বলেছেন। এ-ধরনের আচরণ বর্তমানে অনেক স্বামীর আচরণের বিপরীত। তারা দেখা যায়, সমস্যায় জড়িয়ে পড়লে তালাকের হুমকি দিতে থাকে। এমনকি বলতে থাকে, ‘তুমি যদি এ-ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাও, তা হলে তুমি তালাক। তুমি ফোন ধরলে তালাক। তোমার অমুক-অমুক বান্ধবীর সাথে কথা বললে তালাক।'
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তিনি রেগে গিয়ে আঘাত করেননি, বরং আবু বাকর ও উমার রাযি. তাদের মেয়েদের আঘাত করতে গেলে তিনি বাধা দিলেন। কারণ, আঘাত দিয়ে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। বরং আলোচনা ও একে অপরকে বোঝানোর চেষ্টা করার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়। নিজের পরিবারে ধনাঢ্য জীবন ছেড়ে স্বামীর অসচ্ছল পরিবারে (হয়তো স্বামীর আয় কম বা সে ছাত্র বা দরিদ্র) যাওয়ার পর আর্থিক সমস্যার মোকাবেলা করতে হতে পারে। সে-ক্ষেত্রে স্ত্রীর একে তাকদীরের ফয়সালা মেনে নিয়ে সবর করতে হবে। আল্লাহ বলেন, “আমিই তাদের মধ্যে জীবিকা বণ্টন করি তাদের পার্থিব জীবনে এবং একজনকে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নীত করি, যাতে একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে।” (আল কুরআন, ৪৩:৩২)
স্বামীর সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে তাকে খরচের ব্যাপারে চাপাচাপি করা উচিত নয়। এতে করে হয়তো স্ত্রীর চাপে পড়ে সে হারাম পথে পা বাড়াবে। ঘুষ বা চুরির মতো ঘৃণ্য পথে আয় বাড়াবার চেষ্টা করবে। ফলে স্বামী একসময় চাকরি থেকে বহিষ্কৃত হতে পারে বা জেলেও যেতে পারে। এর দ্বারা সে একই সাথে তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়টিই হারাবে। স্বামীরও মাথায় রাখা উচিত তার স্ত্রী সচ্ছল পরিবার থেকে এসেছে। তাই তার যা পছন্দ, তা পূরণ করায় হালালের মধ্যে থেকে স্বামী সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। স্ত্রী প্রজ্ঞাবান হলে স্বামীর চেষ্টাকে অবশ্যই বুঝতে পারবে এবং স্বামীর প্রতি তার ভালোবাসা আরও বেড়ে যাবে এবং চাহিদা কম থাকবে।

টিকাঃ
১৬৭. এটি পর্দার আয়াত নাযিলের পূর্বের ঘটনা।
১৬৮. মুসলিম (১৪৭৮)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 নবীজির ﷺ সাথে স্ত্রীদের মজা করার ঘটনা

📄 নবীজির ﷺ সাথে স্ত্রীদের মজা করার ঘটনা


আয়িশা রাযি. বলেন, “রাসূলুল্লাহ মিষ্টান্ন দ্রব্য ও মধু পছন্দ করতেন। আসরের সালাত আদায় করে তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে আসা যাওয়া করতেন এবং তাদের সাথে অন্তরঙ্গ হতেন। একবার তিনি হাফসার রাযি. ঘরে প্রবেশ করলেন এবং সাধারণভাবে যত সময় তাঁর কাছে অবস্থান করতেন, তার চেয়ে বেশি সময় তাঁর কাছে অবস্থান করলেন। আমি এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তখন আমাকে বলা হলো যে, তার স্বগোত্রীয় এক মহিলা এক কৌটা মধু হাদিয়া পাঠিয়েছে। এ থেকে তিনি আল্লাহর রাসূলকে কিছু পান করিয়েছেন। আমি মনে মনে বললাম, আল্লাহর কসম, আমরা অবশ্যই একটা কৌশল গ্রহণ করব।
এরপর আমি এ-ব্যাপারে সাওদার রাযি. সঙ্গে আলোচনা করলাম। আমি বললাম, 'যখন তিনি তোমার ঘরে আসবেন, তখন তিনি অবশ্যই তোমার নিকটে যাবেন। এ-সময় তুমি তাঁকে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি মাগাফীর ১৬৯ খেয়েছেন? তিনি অবশ্য 'না'-ই বলবেন।' তখন তুমি বলবে, 'তা হলে এ-দুর্গন্ধ কীসের?' আর রাসূলুল্লাহর নিজের থেকে দুর্গন্ধ পাওয়াটা খুবই গুরুতর মনে করতেন। তখন তিনি বলবেন, হাফসা আমাকে মধুর শরবত পান করিয়েছে। তখন তুমি তাঁকে বলবে, তা হলে ঐ মধুর পোকা 'উরফুত' গাছের রস সংগ্রহ করেছে। আর আমিও একই কথা বলব। সাফিয়্যা, তুমিও তাঁকে এ-কথা বলবে।'
সাওদা রাযি. বললেন, 'কসম ঐ সত্তার, যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। যখনই তিনি দরজার কাছে এলেন, তখনই আমি তোমার ভয়ে তোমার শেখানো কথাগুলো বলতে প্রস্তুত হলাম।' এরপর তিনি যখন কাছে আসলেন, তখন আমি বললাম, 'আল্লাহর রাসূল, আপনি 'মাগফীর' খেয়েছেন?' তিনি বললেন, 'না।' আমি বললাম, 'তা হলে এ-দুর্গন্ধ কীসের?' তিনি বললেন, 'হাফসা আমাকে মধুর শরবত পান করিয়েছে।' আমি বললাম, 'তা হলে এ মধুর পোকা 'উরফুত' গাছের রস সংগ্রহ করেছে।'
আয়িশা রাযি. বলেন, 'এরপর রাসূলুল্লাহ্ যখন আমার ঘরে এলেন, তখন আমিও তাঁকে তেমনি কথা বললাম। এরপর তিনি সাফিয়্যা রাযি.-এর ঘরে গেলেন, তিনিও তাঁকে তেমনি কথা বললেন। পুনরায় রাসূলূল্লাহ যখন হাফসা রাযি.-এর ঘরে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি তাঁকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনাকে মধু পান করতে দেব কি?' তিনি বললেন, 'এর কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আল্লাহর কসম করেছি, আমি এটি আর খাব না। তবে এটা কাউকে বোলো না।"
তখন আল্লাহ এই আয়াতগুলো নাযিল করলেন, “হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন, তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ? আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আল্লাহ তোমাদের জন্য নিজেদের কসমের বাধ্যবাধকতা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন, আল্লাহ তোমাদের মালিক- মনিব-রক্ষক, আর তিনি সর্বজ্ঞাতা, মহা প্রজ্ঞার অধিকারী। স্মরণ কর-যখন নবী তাঁর স্ত্রীদের কোনো একজনকে গোপনে একটি কথা বলেছিল। অতঃপর সে স্ত্রী যখন তা (অন্য একজনকে) জানিয়ে দিল, তখন আল্লাহ এ-ব্যাপারটি নবীকে জানিয়ে দিলেন। তখন নবী (তাঁর স্ত্রীর কাছে) কিছু কথার উল্লেখ করল আর কিছু কথা ছেড়ে দিল। নবী যখন তা তাঁর স্ত্রীকে জানাল, তখন সে বলল, 'আপনাকে এটা কে জানিয়ে দিল?' নবী বলল, 'আমাকে জানিয়ে দিলেন যিনি সর্বজ্ঞাতা, ওয়াকিফহাল।' যদি তোমরা উভয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা কর (তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম)। কারণ, তোমাদের উভয়ের অন্তর বাঁকা হয়েছে, আর তোমরা যদি তার বিরুদ্ধে পরস্পরকে সাহায্য কর, তবে আল্লাহই তার অভিভাবক এবং জিবরীল ও সৎকর্মশীল মুমিনরাও। তা ছাড়া অন্যান্য ফেরেশতারাও তাঁর সাহায্যকারী। নবী যদি তোমাদের সবাইকে তালাক দিয়ে দেয়, তবে সম্ভবত তাঁর প্রতিপালক তোমাদের পরিবর্তে তাঁকে দেবেন তোমাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী- যারা হবে আত্মসমপর্ণকারিণী, মুমিনা, অনুগতা, তাওবাকারিণী, ইবাদাতকারিণী, রোযা পালনকারিণী—অকুমারী ও কুমারী।” (আল কুরআন, ৬৬: ১-৫) ১৭০

টিকাঃ
১৬৯. মাগাফির একপ্রকার বিশেষ দূর্গন্ধযুক্ত আঠাকে বলে।
১৭০. বুখারী (৬৯৭২) ও মুসলিম (১৪৭৪)। ঘটনাটি কিছু রিওয়াতে অন্যভাবেও এসেছে। সেসব রিওয়াতে এসেছে যাইনাব রাযি. এর ঘরে মধু পান করেন এবং আয়িশা ও হাফসা রাযি. পরামর্শ করেন।

📘 নবীজির সংসার > 📄 স্ত্রীদের থেকে কিছু দিনের জন্য একাকী থাকার পদ্ধতির সুফল

📄 স্ত্রীদের থেকে কিছু দিনের জন্য একাকী থাকার পদ্ধতির সুফল


অতিরিক্ত ভরণপোষণ দাবি করার ঘটনা এবং মধুর ঘটনার পর নবীজি স্ত্রীদের থেকে এক মাস দূরে ছিলেন।
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, "এর কারণ হতে পারে, নবীজি এ-সব ঘটনার কারণে বাধ্য হয়ে এক মাস দূরে ছিলেন। বিনয়, ধৈর্য, সহনশীলতা ছিল তাঁর স্বভাবের অংশ; কিন্তু স্ত্রীদের থেকে বারবার এমন আচরণের কারণে দূরে থাকাই তাঁর জন্য উত্তম করণীয় ছিল।”
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি উমার ইবনে খাত্তাবকে রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, “আমীরুল মুমিনীন, যদি তোমরা উভয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা কর (তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম)। কারণ, তোমাদের উভয়ের অন্তর বাঁকা হয়েছে”- এই আয়াতে বর্ণিত নবীজির দুই স্ত্রী কারা? তিনি বললেন, “তোমার প্রশ্নে অবাক হলাম, ইবনে আব্বাস! এ-আয়াতে বর্ণিত দুই মহিলা হলো আয়িশা এবং হাফসা।”
এরপর উমার রাযি. পুরো ঘটনা বলতে শুরু করলেন—“আমি ও আমার এক আনসারী প্রতিবেশী মদীনার অদূরে বনূ উমাইয়া ইবনু যায়দের মহল্লায় বসবাস করতাম। আমরা দু'জন পালাক্রমে নবীজির কাছে যেতাম। একদিন তিনি যেতেন, আরেকদিন আমি যেতাম; আমি যে-দিন যেতাম, সে-দিনের খবর (ওহী) ইত্যাদি বিষয় তাঁকে অবহিত করতাম। আর তিনি যে-দিন যেতেন, তিনিও অনুরূপ করতেন।
আমরা কুরাইশ গোত্রের লোকেরা মহিলাদের উপর কর্তৃত্ব করতাম। কিন্তু আমরা যখন মদীনায় আনসারদের কাছে এলাম, তখন তাদেরকে এমন পেলাম যে, নারীরা তাদের উপর কর্তৃত্ব করে। ধীরে ধীরে আমাদের মহিলারাও আনসারী মহিলাদের রীতিনীতি গ্রহণ করতে লাগল। একদিন আমি আমার স্ত্রীকে ধমক দিলাম। সে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিউত্তর করল। আর এই প্রতিউত্তর আমার পছন্দ হল না। তখন সে আমাকে বলল, 'আমার প্রতিউত্তরে আপনি অসন্তুষ্ট হচ্ছেন কেন? আল্লাহর কসম, নবীজির স্ত্রীরাও তো তাঁর কথার প্রতিউত্তর করে থাকেন এবং তাঁর কোনো কোনো স্ত্রী রাত পর্যন্ত পুরো দিন তাঁর কাছ হতে আলাদা থাকেন।'
এ-কথা শুনে আমি ঘাবড়ে গেলাম। বললাম, 'যিনি এ-রূপ করেছেন, তিনি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।' তারপর আমি জামা-কাপড় পরে (আমার মেয়ে) হাফসার রাযি. কাছে গিয়ে বললাম, 'হাফসা, তোমাদের কেউ কেউ নাকি রাত পর্যন্ত পুরো দিন রাসূলুল্লাহকে অসন্তুষ্ট রাখে?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' আমি বললাম, 'তবে তো সে বরবাদ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তোমার কি ভয় হয় না যে, রাসূলুল্লাহ অসন্তুষ্ট হলে আল্লাহও অসন্তুষ্ট হবেন! এর ফলে তুমি বরবাদ হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহর সঙ্গে বাড়াবাড়ি কোরো না এবং তাঁর কোনো কথার প্রতিউত্তর দিয়ো না এবং তাঁর হতে আলাদা থেকো না। তোমার কোনো কিছুর দরকার হয়ে থাকলে, আমাকে বলবে। আর তোমার প্রতিবেশী তোমার চেয়ে অধিক সুন্দরী এবং রাসূলুল্লাহর অধিক প্রিয়—এ যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে।' তিনি উদ্দেশ্য করেছেন আয়িশাকে রাযি.।
সে-সময় আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল যে, গাস্সানের লোকেরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ঘোড়া প্রস্তুত করছে। একদিন আমার সাথি তার পালার দিন নবীজির কাছে গেলেন এবং ইশার সময় এসে আমার দরজায় খুব জোরে করাঘাত করে বললেন, 'তিনি (উমার রাযি.) কি ঘুমিয়েছেন?' তখন আমি ঘাবড়ে গিয়ে তাঁর কাছে এলাম। তিনি বললেন, 'সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে।' আমি বললাম, 'কী ঘটেছে? গাস্সানের লোকেরা কি এসে গেছে?' তিনি বললেন, 'না, বরং তার চেয়েও বড় ঘটনা ও বিরাট ব্যাপার! রাসূলুল্লাহ তাঁর সহধর্মিণীদের তালাক দিয়েছেন।'
উমার রাযি. বললেন, 'তা হলে তো হাফসার সর্বনাশ হয়েছে এবং সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার ধারণা হচ্ছিল, এমন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। আমি জামা পরে বেরিয়ে এসে নবীজির সঙ্গে ফজরের সালাত আদায় করলাম। সালাত শেষে নবীজি তাঁর কোঠায় প্রবেশ করে একাকী বসে থাকলেন। তখন আমি হাফসার রাযি. কাছে গিয়ে দেখি, সে কাঁদছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কাঁদছ কেন? আমি কি তোমাকে আগেই সতর্ক করিনি? রাসূলুল্লাহ কি তোমাদেরকে তালাক দিয়েছেন?' সে বলল, 'আমি জানি না। তিনি তাঁর ঘরে আছেন।' আমি বের হয়ে মিম্বরের কাছে এলাম; দেখি যে, লোকজন মিম্বরের চারপাশ জুড়ে বসে আছেন এবং কেউ কেউ কাঁদছেন। আমি তাঁদের সঙ্গে কিছুক্ষণ বসলাম। আমার আশঙ্কা বেড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ যে- ঘরে ছিলেন, আমি সে-ঘরে গেলাম। আমি তাঁর এক কালো গোলামকে বললাম, 'উমারের জন্য অনুমতি গ্রহণ কর।' সে প্রবেশ করে নবীজির সাথে আলাপ করে বেরিয়ে এসে বলল, 'আমি আপনার কথা তাঁর কাছে উল্লেখ করেছি, কিন্তু তিনি নীরব রইলেন।' আমি ফিরে এলাম এবং মিম্বরের পাশে-বসা লোকদের কাছে গিয়ে বসে পড়লাম।
কিছুক্ষণ পর আমার আবার আশঙ্কা প্রবল হল। তাই আমি আবার এসে গোলামকে বললাম (উমারের জন্য অনুমতি গ্রহণ কর), এবারও সে আগের মতোই বলল। তারপর যখন আমি ফিরে আসছিলাম, গোলাম আমাকে ডেকে বলল, 'রাসূলুল্লাহ ﷺ আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন।' তখন আমি তাঁর কাছে গিয়ে দেখি, তিনি খেজুরের পাতায় তৈরি ছোবড়া-ভর্তি একটি চামড়ার বালিশে হেলান দিয়ে খালি চাটাইয়ের উপর কাত হয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর শরীর ও চাটাই এর মাঝখানে কোন ফরাশ (বিছানা) ছিলো না। ফলে তাঁর শরীরের পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের দাগ পড়ে গেছে。
আমি তাঁকে সালাম করলাম এবং দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি কি আপনার সহধর্মিণীদেরকে তালাক দিয়েছেন?' তখন তিনি আমার দিকে চোখ তুলে তাকালেন এবং বললেন, 'না।' তারপর আমি (থমথমে ভাব কাটিয়ে) অনুকূল ভাব সৃষ্টির জন্য দাঁড়িয়ে থেকেই বললাম, 'আল্লাহর রাসূল ﷺ, দেখুন, আমরা কুরাইশ গোত্রের লোকেরা নারীদের উপর কর্তৃত্ব করতাম। তারপর আমরা এমন এক সম্প্রদায়ে এলাম, যাদের উপর তাদের নারীরা কর্তৃত্ব করছে।' তিনি এ-ব্যাপারে আলোচনায় মুচকি হাসলেন।
তারপর আমি বললাম, 'আপনি হয়তো লক্ষ করছেন যে, আমি হাফসার ঘরে গিয়েছি এবং তাকে বলেছি, তোমাকে এ-কথা যেন ধোঁকায় না ফেলে যে, তোমার প্রতিবেশিনী (সতীন) তোমার চেয়ে অধিক আকর্ষণীয় এবং নবীজির অধিক প্রিয়' (এ-কথা দ্বারা তিনি আয়িশাকে রাযি. বুঝিয়েছেন।)। নবীজি আবার মুচকি হাসলেন।
তাঁকে একা দেখে আমি বসে পড়লাম। তারপর আমি তাঁর ঘরের ভিতর এদিক-সেদিক দেখলাম। কিন্তু তাঁর ঘরে তিনটি কাঁচা চামড়া ছাড়া দেখার মতো আর কিছুই পেলাম না; তখন আমি আরয করলাম, 'আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করুন, তিনি যেন আপনার উম্মাতকে পার্থিব সচ্ছলতা দান করেন। কেননা, পারস্য ও রোমের অধিবাসীদেরকে সচ্ছলতা দান করা হয়েছে এবং তাদেরকে পার্থিব অনেক প্রাচুর্য দেওয়া হয়েছে, অথচ তারা আল্লাহর ইবাদত করে না।' তিনি তখন হেলান দিয়ে ছিলেন। তিনি বললেন, 'ইবনে খাত্তাব, তোমার কি এতে সন্দেহ রয়েছে যে, তারা তো এমন এক জাতি, যাদেরকে তাদের ভালো কাজের প্রতিদান দুনিয়ার জীবনেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে!' আমি আরয করলাম, 'আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য ক্ষমার দুআ করুন।' হাফসা রাযি. আয়িশার রাযি.-এর কাছে এ-কথা প্রকাশ করার কারণেই নবীজি সহধর্মিণীদের হতে আলাদা হয়েছিলেন। রাসূল ﷺ এক মাস তাদের কাছে না যাওয়ার শপথ করেছিলেন। আল্লাহ তাঁকে এ থেকে বিরত হতে বলার পর তিনি শেষে এ-শপথ থেকে ফিরে এলেন।” ১৭১
আনাস ইবনে মালিক রাযি. বলেন, “রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের ব্যাপারে শপথ (ইলা) নিলেন এবং উনত্রিশ দিন তাদের থেকে দূরে এক ঘরে থাকলেন। তারপর তাঁর স্ত্রীদের কাছে ফিরে গেলেন। কেউ একজন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ আপনি এক মাসের শপথ নিয়েছিলেন।’ তিনি ﷺ জবাব দিলেন, “এক মাস ঊনত্রিশ দিনেও হয়ে থাকে।” ১৭২
স্ত্রীকে ছেড়ে পৃথক থাকা স্ত্রীর জন্য বেশ বড় মানসিক শাস্তি। তবে এ-পৃথক থাকার বিভিন্ন পর্যায় থাকে। এটি হতে পারে, একই বিছানায় দুজনেই ঘুমাচ্ছে, কিন্তু স্বামী শারীরিক মিলন থেকে দূরে থাকছে, যা স্ত্রীর জন্য কষ্টকর; আবার হতে পারে, স্বামী বাড়ি ছেড়েই আলাদা থাকছে।
উপরোক্ত হাদীসের কিছু শিক্ষণীয় দিক—
* স্ত্রীর সাথে প্রত্যেকের ধৈর্য ধারণ করা উচিত। আল্লাহর অধিকার সম্পর্কিত কোনো বিষয় না হলে সে-ক্ষেত্রে তাদের কথার রূঢ়তা বা আচরণের ভুল ক্ষমা করা উচিত。
* নারীদের অত্যধিক চাপে রাখা নিন্দনীয় বিষয়। নবীজি ﷺ স্ত্রীদের জন্য নিজের গোত্রের আচরণ ত্যাগ করে আনসারদের আচরণকে মেনে নিয়েছিলেন।
* কোনো ব্যক্তি তার বন্ধুকে মানসিক অশান্তিতে পেলে তার মন ভালো করতে চেষ্টা করা উচিত। যেমন উমার রাযি. রাসূলের ﷺ ক্ষেত্রে বলেছিলেন, “আমি এমন কিছু বলব, যা শুনে নবীজি হাসবেন।” ১৭৩

টিকাঃ
১৭১. বুখারী (২৪৬৮) ও মুসলিম (১৪৭৯)।
১৭২. বুখারী (১৯১১)।
১৭৩. ফাতহুল বারী (৯/২৯১)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


নবীজি ﷺ এবং তাঁর স্ত্রীগণ পরিবারে একে অপরের সাথে সর্বোত্তম আচরণ বজায় রাখতেন। পরিবারে তাদের সবার আচরণ এবং নৈতিকতা উম্মাহর জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। নবীজি ﷺ সব সময় চেষ্টা করতেন তাঁর প্রতিটি ভূমিকায় ন্যায়ানুগ আচরণ করার। এমনকি পারিবারিক জটিলতার মুহূর্তগুলোতেও তিনি যথাযথভাবে একজন আদর্শ স্বামীর ভূমিকা পালন করেছেন।
প্রতিটি মুসলিমের উচিত রাসূলকে অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা। স্ত্রীর সাথে কথা বলায় ও আচরণে ধৈর্য, শ্রদ্ধা, সম্মান, ভালোবাসা ও সহনশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাঁকে অনুসরণ করা। এ-ক্ষেত্রে আমাদের সফলতা বা ব্যর্থতা আমাদের আখলাক ও ঈমানের প্রকৃত অবস্থাকেই তুলে ধরবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00