📄 কখনো স্ত্রীর ব্যাপারে মন্দ ধারণা রাখতেন না, বরং ছাড় দিতেন
আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি রাতে সফর থেকে ফিরলে তাঁর স্ত্রীদের সাথে দেখা করতেন না। এ-ক্ষেত্রে সকাল কিংবা সূর্যাস্তের পরই শুধু তিনি ঘরে ঢুকতেন। ১৪৭
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, “নবীজি নিষেধ করেছেন যে, কেউ যেন গোপনে বাসায় ফিরে না আসে, সন্দেহ না করে এবং তারা কী করছে, তা যেন লুকিয়ে না দেখে। তাদের দোষ যেন খুঁজে না বেড়ায়।” ১৪৮
দীর্ঘ সফর শেষে হঠাৎ না জানিয়ে গোপনে বাসায় ঢোকা অনুচিত। তবে বাইরে কম সময়ের জন্য থাকলে এবং আগে থেকেই তার ফেরার সময় জানা থাকলে রাতে ঘরে ফিরতে সমস্যা নেই。
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “এই হাদীস স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সহানুভূতি ও ভালোবাসার উদ্রেক করে। যদিও তারা একে অপরের খুঁটিনাটি দোষগুণ সম্পর্কে বেশ ভালোভাবে জানে, তারপরও আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন স্বামী যেন গোপনে রাতে বাসায় না ফেরে। নাহলে হয়তো সে স্ত্রীকে এমন কোনো অবস্থায় দেখে ফেলতে পারে, যা তার পছন্দ নাও হতে পারে।” ১৪৯
আগে থেকে জানিয়ে ঘরে ফিরে এলে স্ত্রীও স্বামীর জন্য সাজগোজ করে স্বামীকে বরণ করার সময় পায়। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ রাতে (সফর থেকে) ফিরে এলে সাথে সাথেই স্ত্রীর সাথে যেন দেখা না করে, বরং তাকে যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার সুযোগ দেয় এবং এলোমেলো চুল সাজানোর সময় দেয়।” ১৫০
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “যে-লোক সকালে কাজ করতে বেরিয়ে যায় এবং রাতে বাসায় ফিরে আসে, তার অবস্থা নিশ্চয়ই তার থেকে আলাদা, যে লম্বা সফরে বের হয় এবং হঠাৎ ফিরে আসে। প্রথম ক্ষেত্রে স্ত্রী জানে অমুক সময়ে সে ফিরে আসবে, কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে স্ত্রীর কাছে, তা অজানা। হাদীসে দ্বিতীয় পরিস্থিতির কথা বলা হচ্ছে। এভাবে হঠাৎ ফিরে এলে স্ত্রীকে অপরিচ্ছন্ন ও অগোছালোভাবে দেখে স্বামীর ভালো নাও লাগতে পারে, যা তাদের মাঝে বিরক্ত ও অসন্তোষের উদ্রেক করবে।” ১৫১
অবশ্য সফর থেকে কবে-কখন ফিরবে, তা আগেই স্ত্রীকে জানায়ে রাখলে সে- ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই।
টিকাঃ
১৪৭. বুখারী (১৮০০) ও মুসলিম (১৯২৮)।
১৪৮. বুখারী (১৮০১) ও মুসলিম (৭১৫)।
১৪৯. ফাতহুল বারী (৩৪১/৯)
১৫০. বুখারী (৫২৪৬) ও মুসলিম (৭১৫)।
১৫১. ফাতহুল বারী (৩৪০/৯)।
📄 প্রজ্ঞার সাথে স্ত্রীদের ঈর্ষার ব্যাপারগুলো সামলাতেন
আল্লাহ প্রকৃতিগতভাবেই মহিলাদের মাঝে ঈর্ষা তৈরি করে রেখেছেন। নবীজি বলেন, “আল্লাহ নারীদের তাকদীরে ঈর্ষা লিখে রেখেছেন।” ১৫২
নবীজির স্ত্রীরাও এ-ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নন। তারা তাঁর ব্যাপারে ঈর্ষা করতেন। নিচের ঘটনাটি আয়িশার রাযি. ঈর্ষার উদাহরণ।
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “এক রাতে আমার সাথে রাসূলের থাকার পালা ছিল। তিনি এসে তার চাদর রেখে দিলেন, জুতা খুলে পায়ের কাছে রাখলেন। এরপর নিজ তহবন্দের (লুঙ্গি) একদিক বিছানায় বিছিয়ে কাত হয়ে শুয়ে পড়লেন। কিছু সময় পার হলে তাঁর ধারণা হলো, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। তখন তিনি উঠে ধীরে ধীরে তাঁর চাদর নিলেন এবং জুতা পরলেন। তারপর আস্তে করে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লেন। ১৫৩ আমি আমার মাথা ঢেকে, পর্দা গায়ে দিলাম এবং কোমরবন্ধনি শক্ত করে পরলাম। তারপর তাঁর পেছনে রওয়ানা হলাম। যেতে যেতে তিনি বাকীতে (কবরস্থানে) পৌছলেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলেন। অতঃপর তিনি তিনবার হাত উঠিয়ে দুআ করলেন। এবার গৃহের দিকে ফিরে রওয়ানা দিলে আমিও রওয়ানা হলাম। তিনি দ্রুত হাঁটতে লাগলেন, আমিও হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। এরপর তিনি দৌড়াতে আরম্ভ করলে আমিও দৌড়াতে লাগলাম এবং তার আগেই ঘরে ঢুকে পড়লাম এবং দেরি না করে শুয়ে পড়লাম。
একটু পরে তিনি ঘরে ঢুকে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আয়িশা, তুমি কেন হাপাচ্ছ?' আয়িশা রাযি. বলেন, আমি জবাব দিলাম, 'না, তেমন কিছু না।' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'হয় তুমি আমাকে ব্যাপারটা খুলে বলবে নতুবা মহান আল্লাহ আমাকে তা জানিয়ে দেবেন।' আমি বললাম, 'আল্লাহর রাসূল, আপনার ওপর আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক।...' এরপর তাঁকে পুরো ব্যাপার খুলে বললাম। তিনি বললেন, 'তুমিই তা হলে সেই কালো ছায়া, যা আমি আমার সামনে দেখছিলাম।' আমি বললাম, 'হ্যাঁ।' তিনি আমার বুকে বাড়ি মারলেন, তাতে আমি ব্যথা পেলাম। তারপর বললেন, 'তুমি কি ধারণা করেছ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার ওপর অবিচার করবেন?' ১৫৪
রাসূলুল্লাহ বললেন, 'যখন তুমি আমাকে দেখেছ, সে-সময় আমার কাছে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) এসে আমাকে ডাকছিলেন। অবশ্য তা তোমার কাছে গোপন রাখা হয়েছে। আর আমিও তা গোপন রাখা বাঞ্ছনীয় মনে করে তোমার নিকট গোপন রেখেছিলাম। যেহেতু তুমি তোমার কাপড় রেখে দিয়েছ, তাই তিনি তোমার কাছে আসেননি। আমি ভেবেছিলাম, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ, তাই তোমাকে জাগানো ঠিক হবে না, ভাবলাম। আর আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, তুমি ভয় পেয়ে যেতে পার。
এরপর জিবরীল (আ) বললেন, 'আপনার প্রভু আপনার প্রতি আদেশ করছেন বাকীর কবরবাসীদের কাছে গিয়ে তাদের জন্য দুআ-ইসতিগফার করতে।' আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'জিবরীল, আমি তাদের জন্য কীভাবে দুআ ও ক্ষমা প্রার্থনা করব?' তিনি বললেন, 'আপনি বলবেন,
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ، وَأَتَاكُمْ مَا تُوعَدُونَ غَدًا، مُؤَجَّلُونَ، وَإِنَّا، إِنْ شَاءَ اللَّهُ، بِكُمْ لَاحِقُونَ
“এ-বাসস্থানের অধিবাসী ঈমানদার মুসলিমদের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। আমাদের মধ্য থেকে যারা আগে বিদায় গ্রহণ করেছে, আর যারা পিছনে বিদায় নিয়েছে, সবার প্রতি আল্লাহ দয়া করুন। আল্লাহ চান তো আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হব।” ১৫৫
রাসূলের কাছে অন্য বিবিদের তুলনায় আয়িশার রাযি. এর বিশেষ মর্যাদা ছিল, যা তিনি ভালোভাবেই জানতেন। তারপরও আয়িশা রাযি. তাঁর অন্য স্ত্রীদের ব্যাপারে ঈর্ষান্বিত ছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর মৃত স্ত্রীর ব্যাপারেও ঈর্ষাবোধ করতেন এবং বলতেন, “আমি কাউকেই এতটা ঈর্ষা করতাম না, যতটা খাদিজাকে করতাম।” ১৫৬
আল্লাহর রাসূল স্ত্রীদের ঈর্ষার ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দেখাতেন না। বর্তমানে তো অনেক পুরুষ তাদের স্ত্রীর এমন আচরণে প্রচণ্ড বিরক্তি প্রকাশ করে। তারা কী করে না করে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে স্ত্রীকে নিষেধ করে। এতে করে স্ত্রীর অন্তরে ঈর্ষা তো কমেই না, বরং আরও বাড়ে।
আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, “নবীজি এক স্ত্রীর (আয়িশা) ঘরে ছিলেন; তখন অন্য এক উম্মুল মুমিনীন (স্ত্রী) ১৫৭ এক পাত্রে করে তাঁর জন্য খাবার পাঠালেন। যে স্ত্রীর ঘরে নবীজি ছিলেন, তিনি (ঈর্ষাবশত) তার হাত দাসের হাতে ধাক্কা দিলেন, এতে পাত্র পড়ে ভেঙে গেল। নবীজি ভাঙা টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিয়ে তাতে পড়ে-যাওয়া খাবারগুলো তুলতে লাগলেন। আর হাসতে হাসতে বললেন, “তোমাদের মা (আমার স্ত্রী) ঈর্ষা করেছে।” এরপর তিনি খাদেমকে থামালেন এবং যে-স্ত্রীর ঘরে ছিলেন তার থেকে আরেকটি পাত্র নিয়ে যে-স্ত্রীর পাত্র ভেঙে গিয়েছে, তাকে (ফেরত) দেওয়ার জন্য দিলেন। ভাঙা পাত্রের অংশগুলো সে-বাসাতেই রেখে দিলেন।” ১৫৮
এই ঘটনা স্ত্রীদের প্রতি নবীজির উদারতা ও সহনশীলতার অনুপম উদাহরণ। তিনি পাত্র ভেঙে ফেলার কারণে তাকে বকা দিলেন না বা রেগেও গেলেন না। তিনি তার ঈর্ষার ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলেন। আবার অপর স্ত্রীর অধিকারও যেন ক্ষুন্ন না হয়, সেজন্য আরেকটি পাত্র পাঠিয়ে দিলেন।
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “এই ঘটনা মহিলাদের ঈর্ষার ব্যাপারে আমাদের ক্ষমা করার শিক্ষা দেয়। কারণ, তারা ঈর্ষার কারণে রেগে গিয়ে এরকম কাজ করে বসে।” ১৫৯
আয়িশা বলেন, “আমি নবীজিকে বললাম, সাফিয়্যার অমুক অমুক ব্যাপারগুলোই তো আপনার জন্য যথেষ্ট (তিনি বোঝাতে চাচ্ছিলেন সাফিয়্যা উচ্চতায় খাট ছিলেন)। তিনি শুনে বললেন, “তুমি যে-কথাগুলো বললে, সেগুলো সমুদ্রে মিশিয়ে দেওয়া গেলে সারা সমুদ্র দূষিত হয়ে যেত।” ১৬০
মুবারাকপুরী রাহ. বলেন, “এর অর্থ হলো, তার গিবতের এই কথাগুলো সমুদ্রের জলে মিশিয়ে দেওয়া গেলে পরিমাণে প্রচুর হওয়া সত্ত্বেও পুরো সমুদ্রের জলকে দূষিত করে ফেলত। এত প্রচুর জিনিসকে যদি এত ছোট কাজ দূষিত করে দিতে পারে, তা হলে সমুদ্রের পানির চেয়ে পরিমাণে অনেক কম মানুষের আমলে এ-ধরনের কাজ কতটা ভয়ংকর প্রভাব ফেলতে পারে!” ১৬১
টিকাঃ
১৫২. তাবারানী (১০০৪০)।
১৫৩. আল্লাহর রসূল দরজা আস্তে লাগালেন এই সাবধানতায়-হয়তো আয়িশা (রা) জেগে উঠবেন অথবা তার ঘুম পাতলা হয়ে যাবে এবং রাতে অন্ধকারে নিজেকে ঘরে একা দেখে ভয় পেয়ে যাবেন।
১৫৪. এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার কারণ হলো, তার পালা রেখে অন্য কোনো স্ত্রীর কাছে রাতে যাওয়া রাসূলের জন্য অन्याয় করা হয়ে যাবে।
১৫৫. মুসলিম (৯৭৪)
১৫৬. বুখারী (৩৮১৬) ও মুসলিম (২৪৩৫)
১৫৭. কিছু হাদিস অনুসারে এটি উম্মু সালামা ছিলেন। কিছু হাদিস অনুসারে এটি যাইনাব বিনতে জাহশ ছিলেন。
১৫৮. বুখারী (৫২৩৫)
১৫৯. ফাতহুল বারী (৩২৫/৯)
১৬০. আবু দাউদ (৪৮৭৫) এবং তিরমিযী (২৫০২)
১৬১. তুহফাতুল আওযায়ী (১৭৭/৭)।
📄 যেভাবে নবীজি ﷺ বৈবাহিক সমস্যার সমাধান করতেন
আল্লাহর রাসূল তাঁর স্ত্রীদের পারিবারিক জীবনে আক্ষরিক অর্থেই আল্লাহর এই কথাগুলো বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন- “তাদের সাথে দয়ার্দ্র জীবন যাপন করো।” (আল কুরআন, ৪: ১৯)
কোনো ঘরই সমস্যা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। এমনকি নবীজির ঘরে হঠাৎ কোনো কোনো দিন সমস্যা হতো। যেহেতু নবীজি আমাদের অনুসরণীয় আদর্শ, তাই তাঁর সমস্যা ও সমাধানগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
প্রত্যেক স্বামীর জন্য এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ পারিবারিক সমস্যা আসলে কোনো বিপদ নয়; বরং আসল বিপদ হলো, সমস্যা তৈরি হলে তার সমাধান করতে ব্যর্থ হওয়া। ফলে সম্পর্কে দূরত্ব বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে বিচ্ছেদের পথে দম্পতিরা পা বাড়ায়।
নবীজির পরিবার বিভিন্ন কঠিন সময় পার করেছে। ইফকের ঘটনা, নবীজির স্ত্রীদের খরচ বাড়ানোর দাবির ঘটনা, মারিয়ার ঘটনা এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে আমরা এখন আলোচনা করব।
📄 ইফকের ঘটনা
আয়িশার রাযি. জন্য বেশ কঠিন পরীক্ষা ছিল এই ঘটনা। বেশ কিছু ঘটনার পরি- ক্রমা শেষে আল্লাহ সাত আসমানের ওপর থেকে তার পবিত্রতা প্রমাণ করেছেন। আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ সফরে বের হবার ইচ্ছা করলে স্ত্রীদের মধ্যে লটারি করে সফর-সঙ্গিনী নির্বাচন করতেন। তাঁদের মধ্যে যার নাম বেরিয়ে আসত, তাকেই তিনি নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এক যুদ্ধে যাবার সময় তিনি আমাদের মধ্যে লটারি করলেন, তাতে আমার নাম এলো। তাই আমি তাঁর সঙ্গে (সফরে) বের হলাম। এটি পর্দার নির্দেশ নাযিল হবার পরের ঘটনা। আমাকে হাওদার ১৬২ ভেতরে সাওয়ারিতে উঠানো হত, আবার হাওদায় থাকা অবস্থায় নামানো হত। এভাবেই আমরা সফর করতে থাকলাম।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ঐ যুদ্ধ শেষ করে (বাহিনী নিয়ে) ফিরে আসতে লাগলেন। আমরা মদীনার কাছাকাছি পৌছেছি, এমন এক রাতে তিনি স্থান ত্যাগ করার ঘোষণা দিলেন। ঘোষণা শুনে আমি উঠে সেনাদলকে অতিক্রম করে গেলাম এবং নিজের প্রয়োজন সেরে হাওদায় ফিরে এলাম। তখন বুকে হাত দিয়ে দেখি আমার আযফার দেশীয় সাদা ও কালো পাথরের তৈরি মালাটা ছিঁড়ে পড়ে গেছে। তখন আমি আমার মালার সন্ধানে ফিরে গেলাম, খুঁজতে গিয়ে দেরি করে ফেললাম।
ওদিকে যারা আমার হাওদা উঠিয়ে দিত, তারা তা উঠিয়ে যে উটে আমি সওয়ার হতাম তার পিঠে রেখে দিল। তাদের ধারণা ছিল যে, আমি হাওদাতেই আছি। তখনকার মেয়েরা হালকা-পাতলা ছিল, তেমন মোটাসোটা হতো না। কারণ, তারা খুব সামান্য খাবার খেতে পেত। তাই হাওদা উঠাতে গিয়ে ভার তাদের নিকট অস্বাভাবিক মনে হয়নি; উপরন্তু সে-সময় আমি অল্প বয়স্কা কিশোরী ছিলাম। তারা হাওদা উঠিয়ে উট হাঁকিয়ে রওনা হয়ে গেল।
এদিকে সেনাদল চলে যাবার পর আমি আমার মালা পেয়ে গেলাম। কিন্তু তাদের জায়গায় ফিরে এসে দেখি, সেখানে কেউ নেই। তখন আমি আমার জায়গায় এসে বসে থাকলাম। আমার ধারণা ছিল যে, আমাকে না পেয়ে আবার এখানে তারা ফিরে আসবে। বসে থাকা অবস্থায় আমার দু চোখে ঘুম আসায় ঘুমিয়ে পড়লাম।
সাফওয়ান ইবনে মুআত্তাল, যিনি প্রথমে সুলামী এবং পরে যাকওয়ানী হিসাবে পরিচিত ছিলেন, সেনাদলের পিছনে (পরিদর্শক হিসাবে) রয়ে গিয়েছিলেন। সকালের দিকে আমার অবস্থানস্থলের কাছাকাছি এসে পৌঁছলেন এবং একজন ঘুমন্ত মানুষের শরীর দেখতে পেয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন。
পর্দার বিধান নাযিলের আগে তিনি আমাকে দেখেছিলেন। তিনি উটে বসেছিলেন, আমি তার 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' শব্দে জেগে উঠলাম। তিনি উটের সামনে পা চেপে ধরলে আমি তাতে সওয়ার হলাম। আর তিনি আমাকে নিয়ে সাওয়ারি হাঁকিয়ে চললেন। সেনাদল ঠিক দুপুরে যখন বিশ্রাম করছিল, তখন আমরা সেনাদলে পৌঁছলাম।
যারা আমার ব্যাপারে সন্দেহ করছিল তারা ধ্বংস হোক। অপবাদ রটনায় নেতৃত্ব দিয়েছিল আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল। আমরা মদিনায় উপস্থিত হলাম। এসেই আমি একমাস অসুস্থ ছিলাম। এদিকে কিছু লোক অপবাদ রটনাকারীদের রটনা ছড়াতে থাকল। আমার অসুস্থতার সময় আমার সন্দেহ হলো, নবীজি আমাকে সেরকম স্নেহ করছেন না, যেমনটা আমার অসুস্থতার সময় সচরাচর আমি অনুভব করতাম। তিনি শুধু ঘরে প্রবেশ করে সালাম দিয়ে বলতেন, 'কেমন আছ?'
আমি সে-বিষয়ের (ইফকের) কিছুই জানতাম না। আমার স্বাস্থ্য একটু ভালো হলে (একরাতে) আমি ও উম্মে মিসতাহ বাইরে বের হলাম। ইত্যবসরে সে তার চাদরে পা জড়িয়ে হোঁচট খেল এবং বলল, “মিসতাহর জন্য দুর্ভোগ।” আমি তাকে বললাম, “তোমার কথার জন্য দুর্ভোগ হোক। বদর যুদ্ধে শরিক হয়েছে এমন এক ব্যক্তিকে তুমি অভিশাপ দিচ্ছ!” সে বলল, "সরলমনা মেয়ে! যে-সব কথা তারা রটিয়েছে, তা তুমি শোনোনি?” এরপর অপবাদ রটনাকারীদের সব রটনা সম্পর্কে সে আমাকে বলল। সে-সব শুনে আমার অসুস্থতা বেড়ে গেল।
আমি ঘরে ফিরে আসার পর রাসূলুল্লাহ আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, 'কেমন আছ?' আমি বললাম, 'আমাকে আমার পিতা-মাতার কাছে যাবার অনুমতি দিন।' তিনি (আয়িশা রাযি.) বলেন, 'আমি তখন তাদের (পিতা-মাতার) নিকট হতে এ-সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম। রাসূলুল্লাহ আমাকে অনুমতি দিলেন।
আমি আমার পিতা-মাতার কাছে গেলাম। আমি আমার মাকে বললাম, 'লোকেরা কী বলাবলি করছে?' তিনি বললেন, 'মেয়ে আমার, ব্যাপারটি নিজের জন্য সহজভাবে নাও। আল্লাহর শপথ, এমন সুন্দরী রমণী খুব কমই আছে, যাকে তার স্বামী ভালোবাসে আর তার একাধিক সতীনও আছে; অথচ ওরা তাকে উত্যক্ত করে না।' আমি বললাম, 'সুবহানাল্লাহ! লোকেরা সত্যি তবে এ-সব কথা রটিয়েছে?”
তিনি (আয়িশা) বলেন, 'ভোর পর্যন্ত সে-রাত আমার এমনভাবে কেটে গেল যে, চোখের পানি আমার বন্ধ হল না, ঘুমের একটু পরশও আমি পেলাম না-এভাবে ভোর হলো। পরে রাসূলুল্লাহ ওহীর বিলম্ব দেখে আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগের ব্যাপারে আলী ইবনে আবু তালিব ও উসামা ইবনে যায়দকে ডেকে পাঠালেন। পরিবারের জন্য তাঁর ভালোবাসার প্রতি লক্ষ করে উসামা পরামর্শ দিয়ে বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কসম (তার সম্পর্কে) ভালো ব্যতীত অন্য কিছু আমরা জানি না।'
আলী ইবনে আবু তালিব রাযি. বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, কিছুতেই আল্লাহ আপনার পথ সংকীর্ণ করেননি। সে ছাড়াও আরও অনেক নারী আছে। আপনি নাহয় দাসীকে জিজ্ঞেস করুন, সে আপনাকে সত্য কথা বলবে।' রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন (দাসী) বারীরাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, 'বারীরা, তুমি কি তার মধ্যে সন্দেহজনক কিছু দেখতে পেয়েছ?' বরীরা বলল, 'আপনাকে যিনি সত্যসহ পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম করে বলছি, না, তেমন কিছু দেখিনি। শুধু একটি অবস্থাতেই দেখেছি যে, তিনি অল্পবয়স্কা কিশোরী—তাই আটা খামির করতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সেই ফাঁকে বকরি এসে তা খেয়ে ফেলে।”
সে-দিনই রাসূলুল্লাহ ভাষণ দিতে দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ ইবনে 'উবাই ইবনে সালুলের ষড়যন্ত্র হতে বাঁচার উপায় জিজ্ঞেস করলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে-ব্যক্তি আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মোকাবেলায় কে প্রতিকার করবে? আল্লাহর কসম, আমি তো আমার স্ত্রী সম্পর্কে ভালো ব্যতীত অন্য কিছু জানি না। আর এমন ব্যক্তিকে জড়িয়ে তারা কথা তুলেছে, যার সম্পর্কে ভালো ব্যতীত অন্য কিছু জানি না আর সে তো আমার সঙ্গে ব্যতীত আমার ঘরে কখনো প্রবেশ করত না।"
তখন সাদ (ইবনে মুআয) রাযি. দাঁড়িয়ে বললেন, “আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কসম, আমি তার প্রতিকার করব। যদি সে আউস গোত্রের কেউ হয়ে থাকে, তা হলে তার গর্দান উড়িয়ে দেব; আর যদি সে আমাদের খাযরাজ গোত্রীয় ভাইদের কেউ হয়, তা হলে আপনি তার ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ দেবেন, আমরা আপনার নির্দেশ পালন করব।"
খাযরাজ গোত্রপতি সাদ ইবনে উবাদা রাযি. তখন দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি উত্তম ব্যক্তিই ছিলেন। কিন্তু গোত্রপ্রীতি তাকে পেয়ে বসল। তিনি বললেন, “তুমি মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম, তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না, সে শক্তি তোমার নেই।” তখন উসায়িদ ইবনে হুযাইর রাযি. দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, “তুমিই মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম, আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করে ছাড়ব। আসলে তুমি একজন মুনাফিক। তাই মুনাফিকদের পক্ষ নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছ।"
এরপর আউস ও খাযরাজ উভয় গোত্রই উত্তেজিত হয়ে উঠল। এমনকি রাসূলুল্লাহ মিম্বারে থাকা অবস্থাতেই তারা (লড়াইয়ে) উদ্যত হল। তখন তিনি নেমে তাদের চুপ করালেন। সবাই শান্ত হলো আর তিনিও নীরবতা অবলম্বন করলেন।
আয়িশা রাযি. বলেন, সে-দিন সারাক্ষণ আমি কাঁদলাম, চোখের পানি আমার শুকাল না এবং ঘুমের সামান্য পরশও পেলাম না। আমার পিতা-মাতা আমার পাশে পাশেই থাকলেন। পুরো রাত-দিন আমি কেঁদেই কাটালাম। আমার মনে হলো, কান্না বুঝি আমার কলিজা বিদীর্ণ করে দেবে। তিনি (আয়িশা) বলেন, তারা (পিতা-মাতা) উভয়ে আমার কাছেই বসে ছিলেন, আর আমি কাঁদছিলাম। ইতিমধ্যে এক আনসারী মহিলা ভেতরে আসার অনুমতি চাইল। আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সেও আমার সঙ্গে বসে কাঁদতে শুরু করল। আমরা এ অবস্থায় থাকতেই রাসূলুল্লাহ প্রবেশ করে বসলেন, অথচ যে-দিন হতে আমার সম্পর্কে অপবাদ রটানো হয়েছে সে-দিন হতে তিনি আমার কাছে বসেননি—এর মধ্যে এক মাস কেটে গিয়েছিল, অথচ আমার সম্পর্কে তাঁর নিকট কোনো ওহী নাযিল হলো না।
আয়িশা রাযি. বলেন, “হামদ ও সানা পাঠ করে তিনি বললেন, “আয়িশা, তোমার সম্পর্কে এ-ধরনের কথা আমার নিকট পৌঁছেছে। তুমি নির্দোষ হলে আল্লাহ অবশ্যই তোমার নির্দোষিতা ঘোষণা করবেন। আর যদি তুমি কোনো গুনাহে জড়িয়ে গিয়ে থাক, তা হলে আল্লাহর নিকট তাওবা ও ইসতিগফার কর। কেননা, বান্দা নিজের পাপ স্বীকার করে তাওবা করলে আল্লাহ তাওবা কবুল করেন।” তাঁর কথা শেষ হওয়ামাত্র আমার কান্না বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি এক ফোঁটা জলও এলো না।
আমার পিতাকে বললাম, “রাসূলুল্লাহকে আমার পক্ষ হতে জবাব দিন।” তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি বুঝছি না, রাসূলুল্লাহকে কী বলব?” তখন আমার মাকে বললাম, “আমার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহর কথার জবাব দিন।” তিনিও বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি বুঝছি না, রাসূলুল্লাহ -কে কী বলব?” আমি তখন অল্পবয়স্কা কিশোরী। কুরআনও খুব বেশি মুখস্থ হয়নি। তবুও আমি বললাম, “আল্লাহর কসম, আমার জানতে বাকি নেই, লোকেরা কী রটাচ্ছে; তা আপনারা শুনতে পেয়েছেন এবং আপনাদের মনে তা বসে গেছে—ফলে আপনারা তা বিশ্বাস করে নিয়েছেন। এখন যদি আমি আপনাদের বলি যে, আমি নিষ্পাপ; আর আল্লাহ জানেন, আমি অবশ্যই নিষ্পাপ—তবু আপনারা আমার সে-কথা বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আপনাদের নিকট কোনো বিষয় আমি স্বীকার করি, অথচ আল্লাহ জানেন, আমি নিষ্পাপ, তা হলে অবশ্যই আপনারা আমাকে বিশ্বাস করে নেবেন। আল্লাহর কসম, ইউসুফের (আ) পিতার ঘটনা ব্যতীত আমি আপনাদের জন্য কোনো দৃষ্টান্ত খুঁজে পাচ্ছি না। যখন তিনি বলেছিলেন, “পূর্ণ ধৈর্যধারণই আমার জন্য উত্তম। আর তোমরা যা বলছ, সে-বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যকারী।” (আল কুরআন, ১২:১৮)
এরপর আমি বিছানায় অন্য কাত হলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, অবশ্যই আল্লাহ আমাকে নির্দোষ ঘোষণা করবেন। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি ভাবিনি যে, আমার ব্যাপারে কোনো ওহী নাযিল হবে। কুরআনে আমার ব্যাপারে কোনো কথা বলা হবে, এ-বিষয়ে আমি নিজেকে উপযুক্ত মনে করি না। তবে আমি আশা করছিলাম যে, নিদ্রায় আল্লাহর রাসূল এমন কোনো স্বপ্ন দেখবেন, যা আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করবে। কিন্তু আল্লাহর কসম, তিনি তাঁর আসন ছেড়ে তখনও উঠে যাননি এবং ঘরের কেউ বেরিয়েও যায়নি, এরই মধ্যে তাঁর উপর ওহী নাযিল হওয়া শুরু হয়ে গেল এবং (ওহী নাযিলের সময়) তিনি যে-রকম কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতেন, সে-রকম অবস্থার সম্মুখীন হলেন। এমনকি সে-মুহূর্তে-শীতের দিনেও তাঁর শরীর হতে মুক্তার মতো ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়তে লাগল।
যখন রাসূলুল্লাহর ওহীর অবস্থা কেটে গেল, তিনি হাসতে লাগলেন। আর প্রথম যে বাক্যটি তিনি উচ্চারণ করলেন—তা হলো, আমাকে বললেন, “আয়িশা, আল্লাহর প্রশংসা করো। তিনি তোমাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন।” আমার মা তখন আমাকে বললেন, “রাসূলুল্লাহর কাছে যাও (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর)।” আমি বললাম, “না। আল্লাহর কসম, আমি তাঁর কাছে যাব না এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও প্রশংসাও করব না।” আল্লাহ নাযিল করলেন, “নিশ্চয়ই অপবাদ আরোপকারীরা তোমাদের মধ্য থেকেই কিছু মানুষ;” (আল কুরআন, ২৪:১১-২০) এবং আরও দশটি আয়াত। ১৬৩
ইফকের ঘটনায় রাসূল যেভাবে তাঁর স্ত্রীর সাথে ব্যবহার করেছেন, তা থেকে আমরা কিছু শিক্ষা পাই—
১। যাচাই করার দূরদর্শিতা : নবীজি ﷺ তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ মেনে নেওয়ার আগে সে-ব্যাপারে তদন্ত করেছেন। তিনি তড়িৎগতিতে কোনো সিদ্ধান্তে যাননি। পুরো এক মাস ধরে সময় নিয়ে তিনি অপেক্ষা করেছেন, তদন্ত করেছেন এবং সবশেষে সে-ব্যাপারে আয়িশার রাযি.-এর সাথে কথা বলেছেন।
২। আচরণে পরিবর্তন আনা : নবীজি আয়িশার রাযি. সাথে ব্যবহারে পরিবর্তন এনেছিলেন। তিনি কম কম দেখা করতেন, কম কম খোঁজ নিতেন। তবে যেহেতু তখনো তার দোষ প্রমাণিত হয়নি—তাই একেবারেই তাকে ছেড়ে যাননি, বরং মাঝে মাঝে খোঁজখবরও নিতেন। আবার পুরো ভালোবাসাও দেখাননি এটা বোঝাতে যে, কিছু একটা সমস্যা হয়েছে।
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “এ-ঘটনা থেকে আমরা শিখতে পারি, স্বামীর উচিত স্ত্রীর সাথে কোমলভাবে আচরণ করা এবং নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছা। আবার তার উচিত স্ত্রীকে ইঙ্গিতে বোঝানো যে, কিছু একটা সমস্যা হয়েছে, যেন স্ত্রী তার সমস্যা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এবং দোষ বুঝতে পেরে স্বীকার করে।” ১৬৪
৩। মতামত ও পরামর্শ লাভের পদ্ধতি : আল্লাহর রাসূল আয়িশা রাযি. যেন জানতে না পান সে-রকম গোপনীয়তা অবলম্বন করে তার ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি এজন্য আলী ইবনে আবু তালিব, যায়নাব বিনতে জাহশ এবং আয়িশার রাযি. দাসীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তার ব্যাপারে। এদের প্রত্যেককেই জিজ্ঞেস করার পেছনে কারণ ছিল। যেমন আলি ও উসামা রাযি. খুব কাছ থেকে রাসূলের সাথে ওঠাবসা করতেন।
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “তিনি এ-ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসা করার পেছনে কারণ ছিল। আলী রাযি. ছোট থেকে তাঁর বাসায় বড় হয়েছেন এবং পরে ফাতিমার সাথে বিয়ের পর তাঁর পরিবারের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। উসামা রাযি.-ও নবীজির খুব কাছ থেকে মিশতেন এবং তাঁর অন্যতম প্রিয় সাহাবী ছিলেন। এ-ছাড়াও তারা দুজনে তরুণ সাহাবী ছিলেন। তাই তারা সঠিক কথা বলার ব্যাপারেও বেশি তৎপর থাকবেন, এমনটিই স্বাভাবিক—এটি বয়স্কদের ক্ষেত্রে হয় না; কারণ, তারা কথা বলার আগে অনেক ভাবনাচিন্তা করেন এবং তারা যা জানেন তা নাও বলতে পারেন।” ১৬৫
নারীদের মধ্যে নবীজি দুজনকে জিজ্ঞেস করেছেন—নবীজির স্ত্রী যায়নাবকে এবং ঘরের খাদেমাকে—যে আয়িশাকে রাযি. অনেক ঘনিষ্ঠভাবে কাছ থেকে দেখত। তদন্ত-কাজে ব্যক্তি নির্বাচনে এবং একইসাথে আয়িশার রাযি. সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে নবীজির পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ।
তদন্ত-শেষে রাসূল ﷺ তাঁর সিদ্ধান্তে এলেন এবং এ-ঘটনায় দোষীদের—বিশেষত আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে—শাস্তিদানের ইচ্ছা তিনি মিম্বারে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন। এরপর তিনি তাঁর স্ত্রীর পক্ষ নিয়ে বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি আমার স্ত্রীর সম্পর্কে ভালো ছাড়া খারাপ কিছু জানি না।” তিনি তাঁর স্ত্রীর নির্দোষিতার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন, কিন্তু এ-ব্যাপারে ওহীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
ওহী পাঠাতে বিলম্ব করার মাধ্যমে আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন, এরকম ভঙ্গুর মুহূর্তে আমাদের কীভাবে আগানো উচিত, যেন পারিবারিক বন্ধন ভেঙে না গিয়ে বরং অটুট থাকে।
৪। আয়িশাকে রাযি. যেভাবে তিনি সামলালেন : নবীজি উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যেন সত্য উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।
৫। সত্য প্রকাশ পাবার পর আয়িশার রাযি. প্রতিক্রিয়া : তার মা যখন তাকে বললেন, “রাসূলুল্লাহর কাছে যাও (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর)।” তখন তিনি উত্তর দিলেন, “না। আল্লাহর কসম, আমি তাঁর নিকট যাব না এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও প্রশংসাও করব না।”
নববী রাহ. বলেন, “ইফকের ঘটনা থেকে আয়িশা রাযি.-এর পবিত্রতা কুরআন দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং অধিকাংশ আলিমের ঐকমত্য অনুসারে কেউ তার পবিত্রতার ব্যাপারে সন্দেহ করলে অবিশ্বাসী ও মুরতাদ হয়ে যাবে।” ১৬৬
টিকাঃ
১৬২. হাওদা হল উটের পিঠে বসার আসনবিশেষ।
১৬৩. বুখারী (২৬৬১) ও মুসলিম (২৭৭০)।
১৬৪. ফাতহুল বারী (৪৭৯/২)।
১৬৫. ফাতহুল বারী (৪৬৯/৮)।
১৬৬. মুসলিম (১১৭/১৭) গ্রন্থের ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)।