📄 সফরে রাতেরবেলা স্ত্রীর সাথে গল্প করতেন
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “নবীজি ﷺ কোনো যাত্রায় বের হওয়ার আগে স্ত্রীদের মাঝে লটারি করতেন। একবার লটারিতে আমার ও হাফসার নাম এল। আমরা দুজনে তাঁর সাথে বের হলাম। নবীজি (উটের পিঠে) সারা দিন ভ্রমণে থাকতেন আর রাত হলে আমার সাথে হাঁটতেন আর গল্প করতেন। এক রাতে হাফসা আমাকে বলল, 'তুমি কি আজ রাতে আমার উটে থাকবে আর আমাকে তোমার উটের উপর থাকতে দেবে? তা হলে তুমি দেখবে (যা সচরাচর তুমি দেখ না) এবং আমিও দেখতে পাব (যা সচরাচর আমি দেখি না)?' আমি বললাম, 'আচ্ছা।' তাই আমি হাফসার উটে চড়লাম আর হাফসা আমার উটে চড়ল। আল্লাহর রাসূল আমার উটের কাছে গেলেন যেটিতে হাফসা ছিল। তিনি ওই উটের কাছে গিয়ে সালাম দিলেন এবং তার সাথে উঠে বসলেন। নামার আগ পর্যন্ত সে উটেই থাকলেন। যখন রাসূল তার সাথে উটে বসলেন, আমি ঈর্ষা অনুভব করলাম। আমি ঘাসে পা রেখে বলতে লাগলাম, 'আল্লাহ, কোনো বিছা বা সাপ আমাকে যেন কামড় দেয়! রাসূলের ব্যাপারে আমি তো কিছুই বলতে পারব না, কারণ তিনি তো আপনার রাসূল।”
আয়িশা রাযি. চরম ঈর্ষা কারণে এই কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন, আর নারীরা ঈর্ষার কারণে যা বলে, তা উপেক্ষা করা যায়。
আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল ﷺ এক সফরে ছিলেন। তাঁর সাথে আনজাশা নামে এক হাবশি গোলাম ছিল, সে বেশ দ্রুত উট চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল (উটে মহিলারা ছিল)। আল্লাহর রাসূল তাকে বলে উঠলেন, “আনজাশা, কাঁচপাত্রগুলো (নারীরা) আছে, আস্তে যাও!”
আলিমগণ বলেন, নবীজি নারীদের কাঁচপাত্রের সাথে তুলনা করেছেন, কারণ, তারা সহজেই প্রভাবিত হয়, (সচরাচর) কষ্ট সহ্য করতে পারে না। তারা কাঁচের পাত্রের মতোই দুর্বল—অনেক ভঙ্গুর, বেশি চাপ সহ্য করতে পারে না, বরং সহজেই ভেঙে যায়।
নববী রাহ. বলেন, “ধীরে ধীরে উট চালাতে বলার কারণ হলো, দ্রুতগতি উটের বাহক মহিলাদের ক্লান্ত করে তুলবে। এতে করে তারা পড়ে গিয়ে আঘাত পেতে পারে। এ-কারণে তিনি তাকে আস্তে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।” ৯৮
টিকাঃ
[১৫] বুখারী (৫২১১) ও মুসলিম (২৪৪৫)।
[১৬] হিংসা ও ঈর্ষা এই দুটোর মধ্যে ঈষৎ পার্থক্য রয়েছে। মানুষের মধ্যে হিংসার আবির্ভাব হয় কলুষিত প্রবৃত্তি থেকে। পক্ষান্তরে ঈর্ষা বলা হয় নেক কাজের আকাঙ্ক্ষাকে। নিজ স্বামীর কাছে অধিক ভালোবাসার উপযুক্ত হতে চাওয়াটা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত নেককাজ এবং প্রশংসনীয়ও বটে। রাসূলের স্ত্রীদের মধ্যে এই নেক কাজের চমৎকার প্রতিযোগিতা আমরা দেখতে পাই। যা নারীমনের মানবীয় প্রকৃতিরও বহিঃপ্রকাশ। তাই এসব ঘটনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা এবং নেককাজের প্রতিযোগিতা করার উৎসাহ হিসেবে নেয়া উচিত। -সম্পাদক
[১৭] বুখারী (২৩২৩) ও মুসলিম (৬১৬১)।
📄 স্ত্রীদের একসাথে মজা করতে দেখে হাসতেন
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “সাওদা বিনতে যামআ (নবীজির স্ত্রী) একদিন আমাদের ঘরে আসলেন। আল্লাহর রাসূল আমার ও তার মাঝে বসে এক পা আমার কোলে আর অপর পা তার কোলের ওপর রাখলেন। আমি সাওদার জন্য হারিনা (মসুর, ছোলা এবং ধনে দিয়ে বানানো একধরনের স্যুপ) রান্না করেছিলাম। আমি তাকে বললাম, 'খান।' কিন্তু তিনি খেতে চাইলেন না। তখন আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম, আপনি খাবেন, নাহলে আমি আপনার মুখে ঢেলে দেব।' এরপরও তিনি খেতে চাইলেন না। আমি তখন তার মুখে এর কিছুটা ঢেলে দিলাম। আল্লাহর রাসূল হাসতে শুরু করলেন এবং উরু দিয়ে সাওদাকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে করতে তাকে বললেন, 'ওর মুখেও ঢেলে দাও।' তিনি তা-ই করলেন। তিনি আবার হাসতে শুরু করলেন। হঠাৎ আমরা (বাইরে) উমারকে রাযি. বলতে শুনলাম, আবদুল্লাহ ইবনে উমার! আবদুল্লাহ ইবনে উমার!' আল্লাহর রাসূল তখন আমাদের বললেন, 'ওঠো, ওঠো! তোমাদের মুখ পরিষ্কার করো। আমার মনে হয়, উমার এখন আসবে।” ৯৯
এই রেওয়ায়েত স্ত্রীদের সাথে নবীজির আনন্দঘন মুহূর্তের এক অনুপম বর্ণনা। স্ত্রীদের মাঝে আয়িশাকে রাযি. তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসলেও অন্যদের সাথে তিনি কখনো অবিচার করেননি। তিনি আয়িশার রাযি. পক্ষ নিয়ে অন্য স্ত্রীর সাথে অন্যায় করেননি, বরং অপরজনকে সাহায্য করেছিলেন। তিনি অত্যন্ত সফলভাবে পারিবারিক বন্ধনকে আনন্দঘন করে তুলতেন।
টিকাঃ
৯৮. মুসলিম গ্রন্থের (৮১/১৫) ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)।
৯৯. সুনান আল-কুবরা গ্রন্থে নাসাঈ (৮৯১৭) এবং ফাওয়াইদ গ্রন্থে আবু বকর আশ-শাফীঈ (১১২)।
📄 স্ত্রীর ধাঁধা শুনতেন
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “আমি রাসূলুল্লাহকে বললাম, 'আল্লাহর রাসূল ধরুন, আপনি একটি উপত্যকায় এসে দেখলেন একটি গাছের কিছু পাতা খাওয়া হয়েছে, আর অন্য গাছগুলোর পাতা খাওয়া হয়নি। কোন গাছ থেকে আপনার উটকে খাওয়াবেন?' তিনি বললেন, 'যে গাছ থেকে কোনো পাতা খাওয়া হয়নি।” (এখানে আয়িশা রাযি. বোঝাতে চেয়েছেন, তাকে ছাড়া আর কাউকে তিনি কুমারী হিসেবে বিয়ে করেননি।) ১০০
টিকাঃ
১০০. বুখারী (৫০৭৭)।
📄 উপসংহার
নবীজির পারিবারিক জীবন ছিল পুরোপুরি ইসলামী নীতির ছাঁচে গড়া। তিনি ইসলামকে নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন, অন্যদের জন্যও ইসলাম মানার দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। তাঁর বৈবাহিক জীবনের অগণিত ঘটনা মুসলিমদের জন্য আদর্শ। খাদিজার রাযি. সাথে তাঁর পারিবারিক জীবন যেমন আমাদের এক-স্ত্রী পরিবার সম্পর্কে ধারণা দেয়, তেমনি পরবর্তীতে তাঁর একাধিক স্ত্রীর সাথে পারিবারিক জীবন আমাদের ধারণা দেয় প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন সত্তা হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তিনি প্রত্যেকের উপযোগী আচরণ করতেন; স্ত্রীদের আনুগত্য ও ভালোবাসার বিনিময়ে তিনি তাদের অধিকারকে সর্বোত্তম উপায়ে রক্ষা করতেন। একইভাবে নবীজির স্ত্রীগণও স্বামী হিসেবে তাঁর অধিকার রক্ষায় তৎপর ছিলেন। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পারিবারিক জীবনে সুখ-শান্তি আনার ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এর সর্বোত্তম উদাহরণ নবীজির জীবন। এজন্যই তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেরা তারাই, যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে আচরণে সেরা।” ১০১
অপর এক হাদীসে তিনি বলেন, “কোনো ঈমানদার पुरुष যেন ঈমানদার নারীকে (তার স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। তার কোনো বৈশিষ্ট্য তার অপছন্দনীয় হবে, আবার তার এমন গুণও আছে, যাতে সে সন্তুষ্ট হবে।” ১০২
নবীজি আরও বলেন, “নারীদের ব্যাপারে আমার পরামর্শ মাথায় রেখো—নারীর সাথে দয়ার্দ্র আচরণ করো।” ১০৩
টিকাঃ
১০১. তিরমিযী (১০৮২)।
১০২. মুসলিম (২৬৭২)।
১০৩. বুখারী (৩৩৩১) ও মুসলিম (১৪৬৮)।