📘 নবীজির সংসার > 📄 জায়েজ কবিতা শোনার ব্যাপারে স্ত্রীদের নিষেধ করেননি

📄 জায়েজ কবিতা শোনার ব্যাপারে স্ত্রীদের নিষেধ করেননি


আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ ﷺ (আমার ঘরে) এসে দেখলেন, দুই বালিকা বুয়াসের যুদ্ধে আনসারদের দুই গোত্রের (আউস ও খাযরাজ) কবিতা আবৃত্তি করছে। তিনি ﷺ বিছানায় অন্যদিকে মুখ ঘুরে শুয়ে পড়লেন। তারপর আবু বাকর এসে আমাকে বকা দিতে লাগলেন, “রাসূলুল্লাহর ঘরে শয়তানের যন্ত্র (কবিতা)! আল্লাহর রাসূল ﷺ তার দিকে ফিরে বললেন, “ওদের ছেড়ে দাও।” এরপর তিনি আমাদের থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিলেন। আমি তাদেরকে ইশারায় চলে যেতে বললাম। আর এটা ঘটেছিল ঈদের দিনে।” ৮৮
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “এই রেওয়ায়েত প্রমাণ করে যে, ঈদের দিনে পরিবারের আনন্দের ব্যবস্থা করা (নিষিদ্ধ নয় এমন কিছু দিয়ে) এবং (রমাদানের সিয়াম ও দীর্ঘ রজনীর কিয়ামের) ইবাদাতের পর আরাম করা উত্তম। এ থেকে এটিও শেখা যায়, স্ত্রীদের ব্যাপারে নরম থাকা এবং তার ভালোবাসা অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।" ইবনে রজব রাহ. আরও বলেন, “রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদ ও বিয়ে উপলক্ষ্যে তাঁর স্ত্রীদের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার না করে কবিতা আবৃত্তি করে আনন্দ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তবে দফ নামক বাদ্যযন্ত্রে ছাড় রয়েছে।” ৯০

টিকাঃ
৮৮. বুখারী (৯৫০) ও মুসলিম (৮৯২)।
৮৯. ফাতহুল বারী (৪৪৩/২)।
৯০. দফের আওয়াজ স্পষ্ট ও চিকন নয় এবং সুরেলা ও আনন্দদায়কও নয়। ফলে দফ বলে পরিচিত কোন যন্ত্রের আওয়াজ যদি চিকন ও আকর্ষণীয় হয় তখন তা আর দফ থাকবে না; বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হবে। আওনুল বারী ২/৩৫৭ আর দফের মধ্যে যদি বাদ্যযন্ত্রের বৈশিষ্ট্য এসে পড়ে তবে সেটি আর জায়িজ থাকবে না, সর্বসম্মতিক্রমে নাজায়িজ বলে পরিগণিত হবে। - মিরকাত ৬/২১০ অর্থাৎ দফ বলে পরিচয় দেয়া কোন যন্ত্রতে বাদ্যযন্ত্রের কোন ধরনের বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেলেই একে আর দফ বলা যাবে না। তাই কেউ যেকোন যন্ত্রকে দফ বলে পরিচয় দিয়ে বাদ্যকে হালাল করার অপচেষ্টা করলে তা শরীয়ত বহির্ভূত কাজ বলেই গণ্য হবে এবং সুস্পষ্ট হারাম হবে। তবে প্রকৃত দফ হল ভিন্ন কথা। আল্লাহ শয়তানের যাবতীয় সূক্ষ্ম ধোকা থেকে আমাদের হিফাজত করুক। - সম্পাদক

📘 নবীজির সংসার > 📄 অল্পবয়সী মেয়েদের সাথে আয়িশাকে রাযি. খেলার অনুমতি দিয়েছিলেন

📄 অল্পবয়সী মেয়েদের সাথে আয়িশাকে রাযি. খেলার অনুমতি দিয়েছিলেন


আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “আমি নবীজি ﷺ উপস্থিতিতে পুতুল খেলতাম এবং অনেক সময় আমার বান্ধবীরাও আমার সাথে খেলত। আল্লাহর রাসূল (আমার ঘরে) ঢুকলে তারা লুকিয়ে পড়ত। আল্লাহর রাসূল তাদেরকে আমার সাথে খেলা করার জন্য ডাক দিতেন।” ৯১
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “তাবুক বা খাইবার (রাবী এ-ব্যাপারে অনিশ্চিত) অভিযানের পর আল্লাহর রাসূল বাসায় পৌঁছলেন। এমন সময় গুদামঘরের পর্দা বাতাসে সরে গেল এবং আমার কিছু খেলনা দেখা গেল। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, “এগুলো কী?” আমি জবাব দিলাম, 'আমার পুতুল।' সেগুলোর মধ্যে নবীজি একটি কাপড়ের তৈরি ডানাওয়ালা ঘোড়া দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'এটি আমি কী দেখছি?' বললাম, 'ঘোড়া।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'এটির ওপর এগুলো কী?' বললাম, 'ডানা।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'দুই ডানাওয়ালা ঘোড়া?' আমি বললাম, 'আপনি শোনেননি সুলায়মানের (আলাইহিস সালাম) ঘোড়ারও ডানা ছিল?' এ-কথা শুনে তিনি ﷺ এতটাই হাসলেন যে, আমি তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখতে পেলাম।”
আল্লাহর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আনন্দ, খেলাধুলা, মজা করা তাদের সম্পর্কে সৌহার্দ্য আর ভালোবাসার জোয়ার আনে। এতে বৈবাহিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং তাদের মধ্যে একে অপরের জন্য গভীর মমতা কাজ করে।

টিকাঃ
৯১. বুখারী (৬১৩০) ও মুসলিম (২৪৪০)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 স্ত্রীর সঙ্গে নবীজি ﷺ দৌড়-প্রতিযোগিতা করতেন

📄 স্ত্রীর সঙ্গে নবীজি ﷺ দৌড়-প্রতিযোগিতা করতেন


কাসিমী রাহ. বলেন, “কৌতুক আর মজা করলে নারীরা অনেক আমোদিত হয়।” ৯২ দাইনূরী রাহ. বলেন, “উমার কত দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন! তিনিও পর্যন্ত বলেছেন, 'স্ত্রীর সাথে শিশুর মতো (কৌতুকপূর্ণ) আচরণ করো; আর যখন তার প্রয়োজন দেখা দেবে, তখন সত্যিকার পুরুষের মতো এগিয়ে আসো।” ৯৩
অনেকে বন্ধুদের সাথে ঠিকই হাসি-তামাশা করে, কিন্তু বাসায় ঢুকতেই তাদের হাসি অদৃশ্য হয়ে যায়, বরং ভ্রু-কুঁচকে ঘরে চলাফেরা করে। এটি অবশ্যই নবীজির সুন্নাতের পরিপন্থী কাজ。
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “আমি রাসূলুল্লাহর সাথে এক সফরে ছিলাম। তখনো আমার শরীরে ভারত্ব আসেনি। নবীজি অন্যদের বললেন, 'এগিয়ে যাও', তারা তা-ই করল। তারপর তিনি আমাকে বলেন, 'আসো, দৌড়-প্রতিযোগিতা করি।' দৌড়ে আমি তাঁকে হারিয়ে দিলাম। বেশ কিছু সময় পরের কথা। আমার শরীরে মাংস লেগেছে অর্থাৎ শারীরিক ভারত্ব এসেছে, সেই দৌড়ের কথাও ভুলে গিয়েছি। একদিন তাঁর সাথে আবার সফরে ছিলাম। নবীজি অন্যদের বললেন, 'এগিয়ে যাও', তারা তা-ই করল। তারপর তিনি আমাকে বলেন, 'আসো, দৌড়-প্রতিযোগিতা করি।' এবার দৌড়ে তিনি আমাকে হারিয়ে দিলেন। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, 'এটা সেটার বদলা।” ৯৪
চিন্তা করুন, সফরের গুরুদায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও নবীজি স্ত্রীর জন্য সময় বের করে তার আনন্দের খোরাক জুগিয়েছেন। কিন্তু আজকাল অনেক মানুষই তাদের স্ত্রীদের সাথে এরকম আনন্দ করতে বিব্রত বোধ করে, এমনকি তারা খোলা মরুভূমিতে একা থাকা সত্ত্বেও এরকম আনন্দে এগিয়ে আসে না।

টিকাঃ
৯২. মাওইযাত আল-মুমিনীন (পৃষ্ঠা ১৬৮)।
৯৩. আল-মুজালাসাহ ওয়া জাওয়াহির আল-ইলম (৪৩০/৩)।
৯৪. আহমদ (২৫৭৪৫), আবু দাউদ (২৫৭৮) ও ইবনে মাজাহ (১৯৭৯)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 সফরে রাতেরবেলা স্ত্রীর সাথে গল্প করতেন

📄 সফরে রাতেরবেলা স্ত্রীর সাথে গল্প করতেন


আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “নবীজি ﷺ কোনো যাত্রায় বের হওয়ার আগে স্ত্রীদের মাঝে লটারি করতেন। একবার লটারিতে আমার ও হাফসার নাম এল। আমরা দুজনে তাঁর সাথে বের হলাম। নবীজি (উটের পিঠে) সারা দিন ভ্রমণে থাকতেন আর রাত হলে আমার সাথে হাঁটতেন আর গল্প করতেন। এক রাতে হাফসা আমাকে বলল, 'তুমি কি আজ রাতে আমার উটে থাকবে আর আমাকে তোমার উটের উপর থাকতে দেবে? তা হলে তুমি দেখবে (যা সচরাচর তুমি দেখ না) এবং আমিও দেখতে পাব (যা সচরাচর আমি দেখি না)?' আমি বললাম, 'আচ্ছা।' তাই আমি হাফসার উটে চড়লাম আর হাফসা আমার উটে চড়ল। আল্লাহর রাসূল আমার উটের কাছে গেলেন যেটিতে হাফসা ছিল। তিনি ওই উটের কাছে গিয়ে সালাম দিলেন এবং তার সাথে উঠে বসলেন। নামার আগ পর্যন্ত সে উটেই থাকলেন। যখন রাসূল তার সাথে উটে বসলেন, আমি ঈর্ষা অনুভব করলাম। আমি ঘাসে পা রেখে বলতে লাগলাম, 'আল্লাহ, কোনো বিছা বা সাপ আমাকে যেন কামড় দেয়! রাসূলের ব্যাপারে আমি তো কিছুই বলতে পারব না, কারণ তিনি তো আপনার রাসূল।”
আয়িশা রাযি. চরম ঈর্ষা কারণে এই কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন, আর নারীরা ঈর্ষার কারণে যা বলে, তা উপেক্ষা করা যায়。
আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল ﷺ এক সফরে ছিলেন। তাঁর সাথে আনজাশা নামে এক হাবশি গোলাম ছিল, সে বেশ দ্রুত উট চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল (উটে মহিলারা ছিল)। আল্লাহর রাসূল তাকে বলে উঠলেন, “আনজাশা, কাঁচপাত্রগুলো (নারীরা) আছে, আস্তে যাও!”
আলিমগণ বলেন, নবীজি নারীদের কাঁচপাত্রের সাথে তুলনা করেছেন, কারণ, তারা সহজেই প্রভাবিত হয়, (সচরাচর) কষ্ট সহ্য করতে পারে না। তারা কাঁচের পাত্রের মতোই দুর্বল—অনেক ভঙ্গুর, বেশি চাপ সহ্য করতে পারে না, বরং সহজেই ভেঙে যায়।
নববী রাহ. বলেন, “ধীরে ধীরে উট চালাতে বলার কারণ হলো, দ্রুতগতি উটের বাহক মহিলাদের ক্লান্ত করে তুলবে। এতে করে তারা পড়ে গিয়ে আঘাত পেতে পারে। এ-কারণে তিনি তাকে আস্তে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।” ৯৮

টিকাঃ
[১৫] বুখারী (৫২১১) ও মুসলিম (২৪৪৫)।
[১৬] হিংসা ও ঈর্ষা এই দুটোর মধ্যে ঈষৎ পার্থক্য রয়েছে। মানুষের মধ্যে হিংসার আবির্ভাব হয় কলুষিত প্রবৃত্তি থেকে। পক্ষান্তরে ঈর্ষা বলা হয় নেক কাজের আকাঙ্ক্ষাকে। নিজ স্বামীর কাছে অধিক ভালোবাসার উপযুক্ত হতে চাওয়াটা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত নেককাজ এবং প্রশংসনীয়ও বটে। রাসূলের স্ত্রীদের মধ্যে এই নেক কাজের চমৎকার প্রতিযোগিতা আমরা দেখতে পাই। যা নারীমনের মানবীয় প্রকৃতিরও বহিঃপ্রকাশ। তাই এসব ঘটনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা এবং নেককাজের প্রতিযোগিতা করার উৎসাহ হিসেবে নেয়া উচিত। -সম্পাদক
[১৭] বুখারী (২৩২৩) ও মুসলিম (৬১৬১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00