📄 হারাম না হলে স্ত্রীদের অনুরোধ মানার চেষ্টা করতেন
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. হজ্বের সময় আয়িশার রাযি. মাসিক হওয়ার ঘটনা এবং এতে তার কান্নায় ভেঙে পড়ার বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “আল্লাহর রাসূল মানুষের সাথে ব্যবহারে অনেক সহজ-সরল ছিলেন এবং তাঁর স্ত্রী কোনো কিছু করতে চাইলে তিনি তাতে অনুমতি দিতেন।” ৮৪
আরেক ঘটনা সম্পর্কে আয়িশা রাযি. বলেন, “একদিন আল্লাহর রাসূল আমার সঙ্গে বসেছিলেন, এমন সময় বেশ কিছু উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ শুনতে পেয়ে দেখতে গেলেন, কী হচ্ছে। তিনি দেখলেন, কিছু আবেসিনীয় বালক বল্লম নিয়ে খেলা করছে। তিনি আমাকে বলেন, "আয়িশা, তুমি আসবে তাদের খেলা দেখতে?" আমি উঠে গিয়ে তার কাঁধে থুতনি রেখে খেলা দেখতে লাগলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার (দেখা) শেষ হলো?' তাঁর কাছে আমার অবস্থান দেখার জন্য (কতক্ষণ এভাবে থাকেন) প্রত্যেকবার আমি 'না' বলতে লাগলাম।” ৮৫
ইবনে বাত্তাল রাহ. বলেন, “নবীজি কতটা মহান চরিত্রের ছিলেন, তা এ ঘটনা প্রমাণ করে এবং প্রত্যেকের উচিত হারাম না হলে স্ত্রীর খুশিকে নিজের জন্য কষ্টকর হলেও প্রাধান্য দেওয়া।” ৮৬
অন্য এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, “আমি তাদের খেলা দেখছিলাম এবং আমিই শেষে খেলা দেখা বন্ধ করে সরে এলাম।” ৮৭
টিকাঃ
৮৪. মুসলিম (১২১৩)।
৮৫. তিরমিযী (৩৬৯১)। মূল হাদিস বুখারী (৪৫৫) ও মুসলিম (৮৯২)।
৮৬. ইবনে বাত্তালের বুখারীর ব্যাখ্যা (৫৪৮/২)।
৮৭. মুসলিম (৮৯২)।
📄 জায়েজ কবিতা শোনার ব্যাপারে স্ত্রীদের নিষেধ করেননি
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ ﷺ (আমার ঘরে) এসে দেখলেন, দুই বালিকা বুয়াসের যুদ্ধে আনসারদের দুই গোত্রের (আউস ও খাযরাজ) কবিতা আবৃত্তি করছে। তিনি ﷺ বিছানায় অন্যদিকে মুখ ঘুরে শুয়ে পড়লেন। তারপর আবু বাকর এসে আমাকে বকা দিতে লাগলেন, “রাসূলুল্লাহর ঘরে শয়তানের যন্ত্র (কবিতা)! আল্লাহর রাসূল ﷺ তার দিকে ফিরে বললেন, “ওদের ছেড়ে দাও।” এরপর তিনি আমাদের থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিলেন। আমি তাদেরকে ইশারায় চলে যেতে বললাম। আর এটা ঘটেছিল ঈদের দিনে।” ৮৮
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “এই রেওয়ায়েত প্রমাণ করে যে, ঈদের দিনে পরিবারের আনন্দের ব্যবস্থা করা (নিষিদ্ধ নয় এমন কিছু দিয়ে) এবং (রমাদানের সিয়াম ও দীর্ঘ রজনীর কিয়ামের) ইবাদাতের পর আরাম করা উত্তম। এ থেকে এটিও শেখা যায়, স্ত্রীদের ব্যাপারে নরম থাকা এবং তার ভালোবাসা অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।" ইবনে রজব রাহ. আরও বলেন, “রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদ ও বিয়ে উপলক্ষ্যে তাঁর স্ত্রীদের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার না করে কবিতা আবৃত্তি করে আনন্দ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তবে দফ নামক বাদ্যযন্ত্রে ছাড় রয়েছে।” ৯০
টিকাঃ
৮৮. বুখারী (৯৫০) ও মুসলিম (৮৯২)।
৮৯. ফাতহুল বারী (৪৪৩/২)।
৯০. দফের আওয়াজ স্পষ্ট ও চিকন নয় এবং সুরেলা ও আনন্দদায়কও নয়। ফলে দফ বলে পরিচিত কোন যন্ত্রের আওয়াজ যদি চিকন ও আকর্ষণীয় হয় তখন তা আর দফ থাকবে না; বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হবে। আওনুল বারী ২/৩৫৭ আর দফের মধ্যে যদি বাদ্যযন্ত্রের বৈশিষ্ট্য এসে পড়ে তবে সেটি আর জায়িজ থাকবে না, সর্বসম্মতিক্রমে নাজায়িজ বলে পরিগণিত হবে। - মিরকাত ৬/২১০ অর্থাৎ দফ বলে পরিচয় দেয়া কোন যন্ত্রতে বাদ্যযন্ত্রের কোন ধরনের বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেলেই একে আর দফ বলা যাবে না। তাই কেউ যেকোন যন্ত্রকে দফ বলে পরিচয় দিয়ে বাদ্যকে হালাল করার অপচেষ্টা করলে তা শরীয়ত বহির্ভূত কাজ বলেই গণ্য হবে এবং সুস্পষ্ট হারাম হবে। তবে প্রকৃত দফ হল ভিন্ন কথা। আল্লাহ শয়তানের যাবতীয় সূক্ষ্ম ধোকা থেকে আমাদের হিফাজত করুক। - সম্পাদক
📄 অল্পবয়সী মেয়েদের সাথে আয়িশাকে রাযি. খেলার অনুমতি দিয়েছিলেন
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “আমি নবীজি ﷺ উপস্থিতিতে পুতুল খেলতাম এবং অনেক সময় আমার বান্ধবীরাও আমার সাথে খেলত। আল্লাহর রাসূল (আমার ঘরে) ঢুকলে তারা লুকিয়ে পড়ত। আল্লাহর রাসূল তাদেরকে আমার সাথে খেলা করার জন্য ডাক দিতেন।” ৯১
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “তাবুক বা খাইবার (রাবী এ-ব্যাপারে অনিশ্চিত) অভিযানের পর আল্লাহর রাসূল বাসায় পৌঁছলেন। এমন সময় গুদামঘরের পর্দা বাতাসে সরে গেল এবং আমার কিছু খেলনা দেখা গেল। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, “এগুলো কী?” আমি জবাব দিলাম, 'আমার পুতুল।' সেগুলোর মধ্যে নবীজি একটি কাপড়ের তৈরি ডানাওয়ালা ঘোড়া দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'এটি আমি কী দেখছি?' বললাম, 'ঘোড়া।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'এটির ওপর এগুলো কী?' বললাম, 'ডানা।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'দুই ডানাওয়ালা ঘোড়া?' আমি বললাম, 'আপনি শোনেননি সুলায়মানের (আলাইহিস সালাম) ঘোড়ারও ডানা ছিল?' এ-কথা শুনে তিনি ﷺ এতটাই হাসলেন যে, আমি তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখতে পেলাম।”
আল্লাহর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আনন্দ, খেলাধুলা, মজা করা তাদের সম্পর্কে সৌহার্দ্য আর ভালোবাসার জোয়ার আনে। এতে বৈবাহিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং তাদের মধ্যে একে অপরের জন্য গভীর মমতা কাজ করে।
টিকাঃ
৯১. বুখারী (৬১৩০) ও মুসলিম (২৪৪০)।
📄 স্ত্রীর সঙ্গে নবীজি ﷺ দৌড়-প্রতিযোগিতা করতেন
কাসিমী রাহ. বলেন, “কৌতুক আর মজা করলে নারীরা অনেক আমোদিত হয়।” ৯২ দাইনূরী রাহ. বলেন, “উমার কত দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন! তিনিও পর্যন্ত বলেছেন, 'স্ত্রীর সাথে শিশুর মতো (কৌতুকপূর্ণ) আচরণ করো; আর যখন তার প্রয়োজন দেখা দেবে, তখন সত্যিকার পুরুষের মতো এগিয়ে আসো।” ৯৩
অনেকে বন্ধুদের সাথে ঠিকই হাসি-তামাশা করে, কিন্তু বাসায় ঢুকতেই তাদের হাসি অদৃশ্য হয়ে যায়, বরং ভ্রু-কুঁচকে ঘরে চলাফেরা করে। এটি অবশ্যই নবীজির সুন্নাতের পরিপন্থী কাজ。
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “আমি রাসূলুল্লাহর সাথে এক সফরে ছিলাম। তখনো আমার শরীরে ভারত্ব আসেনি। নবীজি অন্যদের বললেন, 'এগিয়ে যাও', তারা তা-ই করল। তারপর তিনি আমাকে বলেন, 'আসো, দৌড়-প্রতিযোগিতা করি।' দৌড়ে আমি তাঁকে হারিয়ে দিলাম। বেশ কিছু সময় পরের কথা। আমার শরীরে মাংস লেগেছে অর্থাৎ শারীরিক ভারত্ব এসেছে, সেই দৌড়ের কথাও ভুলে গিয়েছি। একদিন তাঁর সাথে আবার সফরে ছিলাম। নবীজি অন্যদের বললেন, 'এগিয়ে যাও', তারা তা-ই করল। তারপর তিনি আমাকে বলেন, 'আসো, দৌড়-প্রতিযোগিতা করি।' এবার দৌড়ে তিনি আমাকে হারিয়ে দিলেন। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, 'এটা সেটার বদলা।” ৯৪
চিন্তা করুন, সফরের গুরুদায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও নবীজি স্ত্রীর জন্য সময় বের করে তার আনন্দের খোরাক জুগিয়েছেন। কিন্তু আজকাল অনেক মানুষই তাদের স্ত্রীদের সাথে এরকম আনন্দ করতে বিব্রত বোধ করে, এমনকি তারা খোলা মরুভূমিতে একা থাকা সত্ত্বেও এরকম আনন্দে এগিয়ে আসে না।
টিকাঃ
৯২. মাওইযাত আল-মুমিনীন (পৃষ্ঠা ১৬৮)।
৯৩. আল-মুজালাসাহ ওয়া জাওয়াহির আল-ইলম (৪৩০/৩)।
৯৪. আহমদ (২৫৭৪৫), আবু দাউদ (২৫৭৮) ও ইবনে মাজাহ (১৯৭৯)।