📘 নবীজির সংসার > 📄 নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন

📄 নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন


আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “নারীদের ব্যাপারে আমার নির্দেশ মেনে চলো। নারীদের সাথে দয়ার সাথে আচরণ করো।” ৪৩

নববী রাহ. বলেন, “এই রেওয়ায়েত নারীদের দয়া করা এবং তাদের ভুল আচরণ সহ্য করে প্রতিদানে কোমল ব্যবহার করার প্রতি উৎসাহ দেয়।” ৪৪

আল্লাহর রাসূল আরও বলেন, “নারীদের পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা একে সোজা করতে গেলে ভেঙে ফেলবে। তাই তার ব্যবহার সহ্য করে চলো, তার সাথে সুখে বসবাস করতে পারবে।” ৪৫

নারীদের সাথে ভালো ব্যবহার করার ব্যাপারে নবীজি বারবার পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন। বিদায় হজ্বের ভাষণে তিনি বিশেষভাবে বলেছেন, “নারীদের সাথে কোমল আচরণ করো; কেননা, তারা তোমাদের কাছে বন্দির মতো।” ৪৬

আল্লাহর রাসূল নারীদের ব্যাপারে এ-কথাগুলো বহুবার বলেছেন। কারণ, তিনি জানতেন, প্রকৃতিগতভাবেই নারীদের দ্বারা স্বামীরা কষ্ট পাবে এবং খুব কম মানুষই সবরের সাথে তা সহ্য করবে। বরং অনেকেই তাদের ব্যবহারে রেগে যাবে এবং তা বিচ্ছেদ ও পরিবার-ভাঙনের দিকে নিয়ে যাবে। আল্লাহর রাসূল তাই পারিবারিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখার কৌশল পুরুষদের শিখিয়ে দিয়েছেন। আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “একজন মুমিন কখনোই যেন একজন মুমিন নারীকে (তার স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার কোনো কিছু অপছন্দ করে, তবে তার এমন গুণও তো রয়েছে যা সে পছন্দ করে।” ৪৭

নববী রাহ. বলেন, “এর অর্থ হলো, তার ঘৃণা করা অনুচিত; কারণ, স্ত্রীর মাঝে যেমন তার অপছন্দনীয় বিষয় আছে, তেমনি এমন অনেক গুণও আছে, যা তার পছন্দনীয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন মহিলা হয়তো অনেক রূঢ়ভাষী, কিন্তু একই সাথে সে অনেক দ্বীনদার, সতী-সাধ্বী।” ৪৮

নবীজি সব সময় তাঁর স্ত্রীদের সাথে নম্র আচরণ করতেন। তাঁর সংসারজীবনও সে-কারণে ছিল অনেক আনন্দঘন। নবীজি তাদের খুশিতে রাখার চেষ্টা করতেন, তাদের সঙ্গে বসতেন, মজা করতেন, পরামর্শ করতেন, তাদের কথা শুনতেন এবং তাদের ভুল-ত্রুটিগুলো উপেক্ষা করতেন।

শুধু তা-ই নয়, অন্যদের তিনি স্ত্রীদের আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দিতেন। আবু যর রাযি. থেকে বর্ণিত, “আল্লাহর রাসূল বলেন, “খুব শীঘ্রই আপনি মিশর জয় লাভ করবেন। এটি এমন এক দেশ, যা কিরাতের ৪৯ দেশ নামে পরিচিত। আপনি যখন এ-দেশ বিজয় করবেন, তখন এর অধিবাসীদের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন। কারণ, তাদের সাথে আমাদের রক্তসম্পর্কীয় দায়িত্ব যেমন আছে, তেমনি বৈবাহিক সম্পর্কগত দায়িত্ব রয়েছে।” ৫০

নববী রাহ. বলেন, “রক্তসম্পর্কীয় দায়িত্ব'-এর অর্থ হলো, তাদের দেশের অধিবাসী ছিলেন হাজেরা, ইসমাইলের (আলাইহিস সালাম) মা। 'বৈবাহিক সম্পর্কের দায়িত্ব'-এর অর্থ হলো, নবীজি সে-দেশের একজন নারীকে বিয়ে করেছিলেন (তাঁর ছেলে ইবরাহীমের মা-মারিয়াম)।” ৫১

টিকাঃ
৪৩. বুখারী (৩৩৩১) ও মুসলিম (১৪৬৮)।
৪৪. মুসলিম গ্রন্থের ব্যাখ্যায় (৫৭/১০) নববী (রাহ.)।
৪৫. আহমদ (১৯৫৮৯)।
৪৬. তিরমিযী (১০৮৩) এবং ইবনে মাজাহ (১৮৫১)।
৪৭. মুসলিম (২৬৭২)।
৪৮. মুসলিম গ্রন্থের (৫৮/১০) ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)।
৪৯. সেখানে ব্যবহৃত একধরনের মুদ্রা।
৫০. মুসলিম (২৫৪৩)।
৫১. মুসলিম গ্রন্থের (৯৭/১৬) ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 স্ত্রীদের অনুভূতির ব্যাপারে মনোযোগী ছিলেন

📄 স্ত্রীদের অনুভূতির ব্যাপারে মনোযোগী ছিলেন


নবীজি স্ত্রীদের মন ভালো কিংবা খারাপ আছে কি না খেয়াল রাখতেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি আয়িশাকে রাযি. বললেন, “আমি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারি, কখন তুমি আমার উপর খুশি থাক, আর কখন মন খারাপ করে থাক।” আয়িশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, "কীভাবে বুঝতে পারেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “যখন তুমি সন্তুষ্ট থাক, তখন শপথের সময় বল, 'মুহাম্মাদের রবের কসম', আর যখন মন খারাপ কর, তখন বলো, 'ইবরাহীমের রবের কসম।” আয়িশা রাযি. বললেন, “হ্যাঁ, (আপনি ঠিক ধরেছেন) আল্লাহর রাসূল, সে ক্ষেত্রে শুধু আপনার নাম উচ্চারণ করা থেকেই বিরত থাকি।” ৫২
আল্লাহর রাসূলকে রাষ্ট্র দেখাশোনা, যুদ্ধ, সৈন্যবহরের প্রস্ততি, আল্লাহর বাণী পৌঁছানো, বিভিন্ন দেশে দূত পাঠানোসহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো। এত-শত ভারী ভারী দায়িত্বের চাপে থেকেও তিনি স্ত্রীদের খোঁজ নিতে ভুলতেন না, তাদের অনুভূতিগুলোর ব্যাপারে সচেতন থাকতেন。
স্ত্রীদের অনুভূতির ব্যাপারে তাঁর যত্নের আরেকটি ঘটনা। তাঁর দুই স্ত্রীর মাঝে একবার মনোমালিন্য হলো। হাফসা রাযি. সাফিয়্যাকে রাযি. ইহুদীকন্যা বলায় সাফিয়্যা কষ্ট পেলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে নবীজির কাছে অভিযোগ জানালেন। নবীজি তার পক্ষ নিয়ে তাঁকে সান্ত্বনা জানালেন এবং তাঁর কথা শুনে সাফিয়্যা খুশি হয়ে গেলেন।
নবীজির ভালোবাসার আরেকটি উদাহরণ সাফিয়্যার রাযি.। উটের ঘটনা। সাফিয়্যা রাযি. থেকে বর্ণিত, “নবীজি একবার হজ্বের সফরে তাঁর স্ত্রীদের নিয়ে বের হলেন। সফরের একপর্যায়ে চালক উটের গতি বাড়িয়ে দিল। নবীজি তাকে বললেন, “ভঙ্গুর পাত্রগুলো (নারীরা) আছে, সাবধান!” একবার আমার উট (অসুস্থতার কারণে) থেমে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। আমি কাঁদতে লাগলাম। এ-সংবাদ পেয়ে রাসূল চলে এলেন। আমার চোখের পানি তাঁর হাত দিয়ে মুছে দিলেন।” ৫৩
স্ত্রীর চোখের পানি নিজের হাতে মুছে দেওয়ার মাধ্যমে তার প্রতি ভালোবাসার এক নির্মল বহিঃপ্রকাশ করা সম্ভব। সাফিয়্যার রাযি. কান্নার কারণ তেমন কোনো বড় কিছু ছিল না, রাসূল এ-তুচ্ছ ব্যাপারকেও তুচ্ছ হিসেবে দেখেননি, বরং তার চেহারায় তাঁর হাতের মমতার পরশ বুলিয়ে দিয়েছেন। ভালোবাসা প্রকাশের এ-সামান্য সুযোগকেও তিনি হাতছাড়া করেননি।

টিকাঃ
৫২. বুখারী (৫২২৮) ও মুসলিম (২৪৩৯)।
৫৩. আহমাদ (২৬৩২৫)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 অসুস্থ অবস্থায় স্ত্রীদের সান্ত্বনা দিতেন

📄 অসুস্থ অবস্থায় স্ত্রীদের সান্ত্বনা দিতেন


বিদায় হজ্বের সময় আয়িশার রাযি. মাসিক শুরু হলো। কষ্টে তার চোখে পানি চলে এল। আল্লাহর রাসূল ঘরে ঢুকে তার চোখে পানি দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কাঁদছ কেন? তোমার মাসিক শুরু হয়েছে?” আয়িশা রাযি. বললেন, “হ্যাঁ।” নবীজি জবাব দিলেন, “এটা এমন একটি ব্যাপার, যা আল্লাহ নারীদের জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন। একজন হজ্বের সময় যা করে, সব কিছুই করতে থাকো, শুধু তাওয়াফ কোরো না।"
পরে তার মাসিক শেষ হলে তিনি হজ্ব সম্পন্ন করলেন। মাসিকের কারণে তার উমরার বাদ পড়ে-যাওয়া কাজগুলো তিনি শেষ করতে চাইলেন। নবীজি (আয়িশার ভাই) আব্দুর রহমানকে তানঈম এলাকায় তাকে নিয়ে ইহরাম শেষ করানোর জন্য যেতে বললেন। ৫৪
নারীদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে পুরুষদের খেয়াল রাখা উচিত, বিশেষ করে মাসিক ও নিফাসের সময়। নারীরা বিভিন্ন ব্যথা-যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে প্রায়ই সময় কাটায়, ফলে তার মানসিক অবস্থারও দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। এ-অবস্থায় স্বামী যদি বিশেষ করে এ-সময়গুলোতে তার প্রতি সহানুভূতি দেখায়, তবে স্ত্রী তার এ-ভালোবাসার কারণে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে ওঠে।

টিকাঃ
৫৪. বুখারী (৩১৬) ও মুসলিম ১২১১)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 স্ত্রী অসুস্থ হলে রুকইয়াহ করতেন

📄 স্ত্রী অসুস্থ হলে রুকইয়াহ করতেন


আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “স্ত্রীদের কেউ অসুস্থ হলে নবীজি তাকে দেখতে যেতেন এবং তার ওপর ডান হাত রেখে রুকইয়াহ (অর্থাৎ নির্দিষ্ট দুআ ও কুরআনের আয়াত) পড়তেন। তিনি পড়তেন,
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَاسَ اشْفِهِ وَأَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
হে আল্লাহ-মানবজাতির প্রভু, এই রোগ সারিয়ে দিন এবং (তাকে) আরোগ্য দিন! আপনিই তো মহান শিফাদাতা। আপনি ছাড়া কেউ রোগ থেকে শিফা দেওয়ার যোগ্যতা রাখে না।” ৫৫
স্বামী যখন স্ত্রীকে ব্যথার জায়গা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, করুণার সঙ্গে তার হাত সে-জায়গায় রাখে এবং রুকইয়াহ করে, তখন স্ত্রীর মনে তা গভীরভাবে রেখাপাত করে। এমনকি ব্যথার উপশমে এ-সব সাহায্য না করলেও সে মনে রাখে, তার স্বামী তার দেখাশোনা করে, তার কষ্ট বোঝে এবং তার প্রতি সহানুভূতিশীল。
আয়িশা রাযি. কর্তৃক বর্ণিত উম্মে জারের গল্পে এগারোজন নারীর একজন তার স্বামীর ব্যাপারে বলেছিল “সে কখনোই আমার কষ্টে হাত বাড়ায়নি।” ৫৬
ইবনে হাজর রাহ. এর ব্যাখ্যায় বলেন, “সে তার অবিবেচক স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করছিল এবং কঠোর মনের অধিকারী হিসেবে বর্ণনা করেছিল।” ৫৭
এমন অনেক স্বামীই আছে, যারা স্ত্রীর শারীরিক-মানসিক ব্যাপারে কোনো তোয়াক্কা করে না। অনেকে তো স্ত্রীর অসুস্থতাতেও বিরক্তি প্রকাশ করে। স্ত্রীরা স্বামীদের মতোই নানা সমস্যাসঙ্কল কঠিন সময় পার করে। এ-সময়গুলোতে তার পাশে থেকে স্বামীদের উচিত শান্তির পরশ বুলিয়ে দেওয়া, নির্ভার রাখার চেষ্টা করা। ভালোবাসার সুরে কথা বলা। স্ত্রীর সাথে এমনভাবেই আচরণ করা উচিত, যেন সে বুঝতে পারে জীবনযুদ্ধে সে একা নয়, তার রয়েছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। একজন নারী বাবা, মা বা ভাইয়ের মতো খুব নিকটাত্মীয়কে হারাতে পারে—এ-সময় তার স্বান্ত্বনার অনেক প্রয়োজন পড়ে; কিন্তু এ-সামান্য ব্যাপারটিও অনেক স্বামী বুঝতে পারে না, স্ত্রীর কষ্টে তার কোনো ভাবান্তর হয় না; এমন পাষাণ-হৃদয় স্বামীও পাওয়া যাবে, যারা আরও একধাপ এগিয়ে স্ত্রীর কষ্টকে তাচ্ছিল্যের ভাষায় উড়িয়ে দেয়, এমনকি তা নিয়ে মজাও করে বসে।
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী, আমি এতিম ও মহিলা—এই দুই শ্রেণির অধিকার (এবং এর সংক্রান্ত আহকাম) সম্পর্কে মানুষকে জানিয়ে দিয়েছি।” ৫৮

টিকাঃ
৫৫. বুখারী (৫৭৪৩) ও মুসলিম (২১৯১)।
৫৬. বুখারী (৫১৮৯) ও মুসলিম (২৪৪৮)।
৫৭. ফাতহুল বারী (২৬৩/৯)।
৫৮. ইবনে মাজাহ (৩৬৭৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00