📄 স্ত্রীরা দেখা শেষে চলে যাবার সময় নিজে এগিয়ে দিতেন
সাফিয়্যা বিনতে হুওয়াই রাযি. থেকে বর্ণিত, "নবীজি ﷺ ইতিকাফে (ইবাদাতের জন্য বাইরের দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে মসজিদে অবস্থান করা) ছিলেন এবং আমি রাতে তাঁর সাথে দেখা করতে গেলাম। তাঁর সাথে কথা বলে আমি উঠে এলাম। তিনি ﷺ আমার সঙ্গে উঠে এসে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে এলেন। দুজন আনসারী আমাদের পাশ দিয়ে গেল। নবীজিকে ﷺ দেখে তারা যাওয়ার গতি বাড়াল। নবীজি ﷺ বলে উঠলেন, 'থামো, সে সাফিয়্যা বিনতে হুওয়াই (আমার স্ত্রী)।' তারা বললেন, 'সুবহানাল্লাহ, আল্লাহর রাসূল (আমরা আপনার সম্পর্কে কোনো সন্দেহ করি না!)' এ-কথা শুনে নবীজি ﷺ বললেন, 'শয়তান মানুষের রক্তের মধ্যে দিয়ে চলে। আমার আশঙ্কা হলো, সে হয়তো সে তোমাদের অন্তরে (সন্দেহ) ওয়াসওয়াসা দেবে।” ৩৭
আল্লাহর রাসূল ﷺ ইবাদাতে (ইতিকাফ) বিঘ্ন ঘটিয়েও পথে রক্ষার জন্য স্ত্রীকে বাড়ি পর্যন্ত দিয়ে এলেন—যদিও ইতিকাফ অবস্থায় কোনো বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া নিয়ত করার পর মসজিদ থেকে বের হওয়া উচিত না।
টিকাঃ
৩৭. বুখারী (২০৩৮) ও মুসলিম (২১৭৫)।
📄 নবীজি ﷺ স্ত্রীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ জীবন কাটিয়েছেন
আল্লাহর রাসূল কার্যতভাবেই আল্লাহর কথার বাস্তবায়ন নিজের পারিবারিক জীবনে করেছেন, "তাদের সাথে দয়ার্দ্র জীবন যাপন করো।"; (আল কুরআন, ৪: ১৯) তাই আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, “মুমিনদের মধ্যে ঈমানে সর্বোৎकृष्ट তারাই, যারা ব্যবহারে সর্বোত্তম; আর তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তারাই, যারা স্ত্রীদের সাথে ব্যবহারে সর্বোত্তম।” ৩৮
টিকাঃ
৩৮. তিরমিযী (১০৮২)।
📄 কখনোই স্ত্রীদের মারেননি বা সমালোচনা করেননি
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ আল্লাহর পথে (জিহাদে) ছাড়া কখনোই কোনো খাদেম বা মহিলাকে আঘাত করেননি।” ৩৯
বর্তমান সময়ে এমন অনেক লোক পাওয়া যাবে, যারা তুচ্ছ থেকে তুচ্ছ কারণে স্ত্রীকে পিটায়, চেহারা ও মাথায় আঘাত করে। মারতে গিয়ে লাঠি, জুতা এবং হাতের কাছে যা পায়, সেটাই কাজে লাগায়।
আইয়্যাস ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল বলেন, “নারীদের আঘাত কোরো না।"
উমার রাযি. আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে বললেন, 'নারীরা তাদের স্বামীদের সাথে অনেক উদ্ধত হয়ে উঠেছে।' তখন তিনি তাদের সামান্যভাবে আঘাতের অনুমতি দিলেন। এরপর অনেক মহিলা রাসূলুল্লাহর স্ত্রীদের কাছে এসে (স্বামীদের প্রহারের ব্যাপারে) অভিযোগ করতে লাগল। তিনি শুনে বললেন, “অনেক মহিলা মুহাম্মাদের স্ত্রীদের কাছে তাদের স্বামীদের প্রহারের ব্যাপারে অভিযোগ করেছে। যারা (স্ত্রীদের আঘাত) করে, তারা তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নয়।” ৪০
আসিম আবাদী রাহ. বলেন, “'যারা (স্ত্রীদের আঘাত) করে, তারা তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নয়' কথার অর্থ হলো, যারা স্ত্রীদের প্রহার করে তারা উত্তম নয়, বরং যারা ধৈর্যসহকারে স্ত্রীদের খারাপ বা ভুল আচরণ সহ্য করে এবং তাদের প্রহার করা থেকে বিরত থাকে, তারাই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।” ৪২
টিকাঃ
৩৯. মুসলিম (২৩২৮)।
৪০. আবু দাউদ (২১৪৬) এবং ইবনে মাজাহ (১৯৮৫)।
৪১. যখন স্ত্রীর মধ্যে শরীয়তবহির্ভূত কাজ দেখা যাবে এবং স্বামীর অবাধ্যতা শুরু করবে এরকম মুহুর্তে স্বামীর করণীয় হিসেবে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুর আনের সূরা নিসার ৩৪ নাম্বার আয়াতে সমাধান হিসেবে বলেনঃ
وَ الَّتِي تَخَافُوْنَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَ اضْرِبُوهُنَّ | অর্থাৎঃ আর স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশংকা কর তাদেরকে সদুপদেশ দাও, তারপর তাদের শয্যা বর্জন কর এবং তাদেরকে প্রহার কর।
মুফাসসীর কিরাম এই অংশের ব্যাখ্যাতে বলেন, স্ত্রীদের পক্ষ থেকে যদি নাফরমানী সংঘটিত হয় কিংবা এমন আশংকা দেখা দেয়, তবে পর্যায়ক্রমে তিনটি পর্যায়ে সংশোধন করার চেষ্টা করতে হবে।
প্রথম পর্যায়ে নরমভাবে বোঝাবে। যদি এতে সংশোধন না হয়, তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে তাদের বিছানা নিজের থেকে পৃথক করে দেবে। যাতে এই পৃথকতার দরুন সে স্বামীর অসন্তুষ্টি উপলব্ধি করে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে পারে। এতেও যদি সংশোধন না হয়, তবে তৃতীয় পর্যায়ে এসে মৃদুভাবে মারবে। আর তার সীমা হল এই যে, শরীরে যেন সে মারধরের প্রতিক্রিয়া কিংবা যখম না হয়। কিন্তু এই পর্যায়ের শাস্তি দানকেও রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করেননি, বরং তিনি বলেছেনঃ 'ভাল লোক এমন করে না'। [ইবন হিব্বান: ৯/৪৯৯, নং- ৪১৮৯, আবু দাউদ: ২১৪৬, ইবন মাজাহ: ১৯৮৫]
বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য তাফসীর ইবনু কাসীর এ অত্র আয়াতের ব্যাখ্যা দেখুন。
তবে স্বামীদের স্মরণে থাকা উচিত, মহব্বত তরবারির চেয়ে কার্যকর। তাই মহব্বতে যদি কাজ না হয় প্রহারে সংশোধন হওয়ার নিশ্চয়তা ক্ষীণ। মূলত নারী মন খুবই নরম আর ভালোবাসা প্রিয়। স্বামী থেকে যদি সুন্দরভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করা হয় এবং স্ত্রীকে সুন্দরভাবে বোঝানো হয়, এতেই সংশোধন হয়ে যাওয়ার কথা। মূলত আমাদের সমাজে প্রথম দুই পর্যায়ের সংশোধন পদ্ধতি অনুসরণ না করে শুরুতেই তৃতীয় পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। আর এর ফলাফলও বিপরীত হয়। কিন্তু স্বামী যদি ন্যায়পথে থাকে ও স্ত্রী যদি সবগুলো পর্যায় প্রয়োগের পরেও সংশোধিত না হয় তবে সেখানে স্ত্রীকে ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি আছে, আর না হয় স্বামী অন্য স্ত্রী গ্রহন করবে।
আল্লাহ আমাদের কুরআনি পদ্ধতিতে সকল সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হওয়ার তাউফিক দান করুক। – সম্পাদক
৪২. 'আওন আল-মা'বুদ (১৩০/৬)।
📄 নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “নারীদের ব্যাপারে আমার নির্দেশ মেনে চলো। নারীদের সাথে দয়ার সাথে আচরণ করো।” ৪৩
নববী রাহ. বলেন, “এই রেওয়ায়েত নারীদের দয়া করা এবং তাদের ভুল আচরণ সহ্য করে প্রতিদানে কোমল ব্যবহার করার প্রতি উৎসাহ দেয়।” ৪৪
আল্লাহর রাসূল আরও বলেন, “নারীদের পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা একে সোজা করতে গেলে ভেঙে ফেলবে। তাই তার ব্যবহার সহ্য করে চলো, তার সাথে সুখে বসবাস করতে পারবে।” ৪৫
নারীদের সাথে ভালো ব্যবহার করার ব্যাপারে নবীজি বারবার পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন। বিদায় হজ্বের ভাষণে তিনি বিশেষভাবে বলেছেন, “নারীদের সাথে কোমল আচরণ করো; কেননা, তারা তোমাদের কাছে বন্দির মতো।” ৪৬
আল্লাহর রাসূল নারীদের ব্যাপারে এ-কথাগুলো বহুবার বলেছেন। কারণ, তিনি জানতেন, প্রকৃতিগতভাবেই নারীদের দ্বারা স্বামীরা কষ্ট পাবে এবং খুব কম মানুষই সবরের সাথে তা সহ্য করবে। বরং অনেকেই তাদের ব্যবহারে রেগে যাবে এবং তা বিচ্ছেদ ও পরিবার-ভাঙনের দিকে নিয়ে যাবে। আল্লাহর রাসূল তাই পারিবারিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখার কৌশল পুরুষদের শিখিয়ে দিয়েছেন। আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “একজন মুমিন কখনোই যেন একজন মুমিন নারীকে (তার স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার কোনো কিছু অপছন্দ করে, তবে তার এমন গুণও তো রয়েছে যা সে পছন্দ করে।” ৪৭
নববী রাহ. বলেন, “এর অর্থ হলো, তার ঘৃণা করা অনুচিত; কারণ, স্ত্রীর মাঝে যেমন তার অপছন্দনীয় বিষয় আছে, তেমনি এমন অনেক গুণও আছে, যা তার পছন্দনীয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন মহিলা হয়তো অনেক রূঢ়ভাষী, কিন্তু একই সাথে সে অনেক দ্বীনদার, সতী-সাধ্বী।” ৪৮
নবীজি সব সময় তাঁর স্ত্রীদের সাথে নম্র আচরণ করতেন। তাঁর সংসারজীবনও সে-কারণে ছিল অনেক আনন্দঘন। নবীজি তাদের খুশিতে রাখার চেষ্টা করতেন, তাদের সঙ্গে বসতেন, মজা করতেন, পরামর্শ করতেন, তাদের কথা শুনতেন এবং তাদের ভুল-ত্রুটিগুলো উপেক্ষা করতেন।
শুধু তা-ই নয়, অন্যদের তিনি স্ত্রীদের আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দিতেন। আবু যর রাযি. থেকে বর্ণিত, “আল্লাহর রাসূল বলেন, “খুব শীঘ্রই আপনি মিশর জয় লাভ করবেন। এটি এমন এক দেশ, যা কিরাতের ৪৯ দেশ নামে পরিচিত। আপনি যখন এ-দেশ বিজয় করবেন, তখন এর অধিবাসীদের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন। কারণ, তাদের সাথে আমাদের রক্তসম্পর্কীয় দায়িত্ব যেমন আছে, তেমনি বৈবাহিক সম্পর্কগত দায়িত্ব রয়েছে।” ৫০
নববী রাহ. বলেন, “রক্তসম্পর্কীয় দায়িত্ব'-এর অর্থ হলো, তাদের দেশের অধিবাসী ছিলেন হাজেরা, ইসমাইলের (আলাইহিস সালাম) মা। 'বৈবাহিক সম্পর্কের দায়িত্ব'-এর অর্থ হলো, নবীজি সে-দেশের একজন নারীকে বিয়ে করেছিলেন (তাঁর ছেলে ইবরাহীমের মা-মারিয়াম)।” ৫১
টিকাঃ
৪৩. বুখারী (৩৩৩১) ও মুসলিম (১৪৬৮)।
৪৪. মুসলিম গ্রন্থের ব্যাখ্যায় (৫৭/১০) নববী (রাহ.)।
৪৫. আহমদ (১৯৫৮৯)।
৪৬. তিরমিযী (১০৮৩) এবং ইবনে মাজাহ (১৮৫১)।
৪৭. মুসলিম (২৬৭২)।
৪৮. মুসলিম গ্রন্থের (৫৮/১০) ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)।
৪৯. সেখানে ব্যবহৃত একধরনের মুদ্রা।
৫০. মুসলিম (২৫৪৩)।
৫১. মুসলিম গ্রন্থের (৯৭/১৬) ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)।