📄 খাদিজার রাযি. বান্ধবীদের উপহার পাঠাতেন
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ খাদিজার কথা ঘন ঘন উল্লেখ করতেন। যখনই নবীজি কোনো ভেড়া কুরবানি করতেন, মাংস কেটে টুকরো করার পর কিছু অংশ তার বান্ধবীদের কাছেও পাঠাতেন।” ১১
অন্য এক বর্ণনায় আছে, “যখনই নবীজি কোনো ভেড়া কুরবানি করতেন, তিনি তার বান্ধবীদের খোঁজ নিতেন এবং তাদের জন্য উপহারস্বরূপ মাংস পাঠাতেন।” ১২
আল-মুবারাকপুরী রাহ. বলেন, “খাদিজার বান্ধবীদের উপহার দেওয়া তার প্রতি নবীজির ভালোবাসার প্রতিফলন; তার দয়ার কথা স্মরণ করে এমনটা করতেন তিনি।” ১৩
নববী রাহ. বলেন, “এ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, নবীজি স্ত্রীদের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন এবং তাদের জীবদ্দশায় ও তাদের মৃত্যুর পরেও উদারতার সাথে আচরণ করতেন। তাদের বান্ধবী ও আত্মীয়দের প্রতিও তিনি ছিলেন উদার।” ১৪
আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, “যখনই আল্লাহর রাসূল ﷺ কোনো উপহার পেতেন, তিনি বলতেন, 'এটি অমুকের কাছে নিয়ে যাও, কেননা সে খাদিজার বান্ধবী। এর কিছু তমুকের বাসায় নিয়ে যাও, কারণ সে খাদিজাকে ভালোবাসে।” ১৫
টিকাঃ
১১. বুখারী (৩৫৩৪) ও মুসলিম (২৪৩৫)
১২. তিরমিযী (১৯৪০)
১৩. তুহফাতুল আওযায়ী (১৩৪/৬)
১৪. মুসলিম (২০২/১৫) এর ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)
১৫. আদাবুল মুফরাদ (২৩২)
📄 স্ত্রীদের সাথে উদার আচরণ করতেন
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “নবীজি ﷺ আমার ঘরে ছিলেন এমন একদিন এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা তাঁর কাছে এল। তিনি ﷺ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কে?' জবাব দিল, “আমি জাশশামা আল-মুযানিয়্যা।' তিনি ﷺ বললেন, “বরং আপনি তো হুসসানা। কেমন আছেন? আপনার সম্প্রদায়ের লোকেরা কেমন আছে? আপনি কী করছেন এখন? আপনাকে শেষবার দেখার পর আপনার দিনকাল কেমন কেটেছে?' সে চলে গেলে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি তার সাথে এত বন্ধুত্বপূর্ণ ও দয়ালু ব্যবহার করলেন কেন?' নবীজি ﷺ জবাব দিলেন, “আয়িশা, খাদিজা বেঁচে থাকতে সে আমাদের বাসায় আসত। আর পুরনো বন্ধুদের প্রতি দয়ার্দ্র আচরণ করা তো ভালো ঈমানের লক্ষণ।” ১৬
লক্ষণীয় যে, এই মহিলা বৃদ্ধা ছিলেন, কিন্তু তারপরও নবীজি ﷺ তার নাম পরিবর্তন করে একটি সুন্দর নাম দিলেন। জাশশামা অর্থ অলস ব্যক্তি—যে পরিশ্রম করতে চায় না, আর হুসসানাহ অর্থ মঙ্গল ও সৌন্দর্য। এভাবে মানুষের মন্দ নামগুলোকে বদলে নবীজি ﷺ সুন্দর নাম দিতেন।
মানুষের প্রতি বিশ্বস্ত ও দয়ালু আচরণ করা ভালো ঈমানের লক্ষণ। নবীজি ﷺ এ-বৃদ্ধাকে স্বাগত জানালেন, দয়ার সাথে খাতির করলেন। এটি ছিল তার বিগতা স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার চিহ্ন—যিনি দুঃসময়ে তাঁর পাশে ছিলেন এবং সাহস জুগিয়েছিলেন।
বর্তমান যুগে এমন অনেক পুরুষ আছে, যারা তাদের স্ত্রীদের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়— যেখানে তাদের স্ত্রী কঠিন সময়ে তাদের পাশে থেকে সাহায্য করে এবং ধৈর্যের সাথে তাদের প্রতিষ্ঠা-লাভে এগিয়ে আসে। নবীজি তাঁর স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন এবং এর যথার্থ প্রতিফলন দেখিয়েছেন তাঁর আচরণে।
টিকাঃ
১৬. হাকিম নাসাঈ (১৭/১)
📄 স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে কুণ্ঠাবোধ করতেন না
আল্লাহর রাসূল খাদিজা রাযি. সম্পর্কে বলেন, “তার প্রতি ভালোবাসা আল্লাহ নিজেই আমার হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছেন।” ১৭
নববী রাহ. বলেন, “এ-হাদীস এটিই ইঙ্গিত করে আল্লাহর এ-অনুমোদন খাদিজার (নবীজির প্রতি) ভালোবাসাপূর্ণ আচরণের কারণেই সম্ভব হয়েছে।” ১৮
আয়িশার জন্য আল্লাহর রাসূলের ভালোবাসা অনেক সুস্পষ্ট ও সুবিদিত ছিল। নবীজি কাউকে তার মতো ভালোবাসেননি এবং কেবল তাকেই তিনি কুমারী হিসাবে বিয়ে করেছিলেন। আল্লাহর রাসূল তার জন্য তার ভালোবাসা কখনোই লুকাতেন না।
আমর ইবনে আল-আস রাযি. আল্লাহর রাসূলকে জিজ্ঞাস করলেন, ""মানুষের মধ্যে কে আপনার সবচেয়ে প্রিয়?' নবীজি বললেন, 'আয়িশা।' তিনি (আমর) তখন জিজ্ঞেস করলেন, 'পুরুষদের মধ্যে কে?' তিনি বললেন, 'তার বাবা।” ১৯
নবীজির সুন্নাতের বাইরে গিয়ে অনেক ব্যক্তি স্ত্রীর প্রতি বছরের পর বছর ভালোবাসার কথা জানায় না। অনেকে তো স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশকে বেমানান ও অপুরুষোচিত মনে করে। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ব্যক্ত করা এমন এক কাজ, যার মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক মমতাপূর্ণ ও শক্তিশালী হয় এবং সুখী পারিবারিক জীবন লাভ করা সম্ভব হয়। স্বামী স্ত্রীকে ভালোবাসায় সিক্ত রাখবে এবং মাঝে মাঝেই তাঁকে ভালোবাসার কথা জানাবে—এমনটি মেয়েরা খুব পছন্দ করে। দুর্ভাগ্যবশত কিছু নারী কেবলমাত্র মিষ্টি মিষ্টি কথার কারণেই অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, যা তারা কখনোই তাদের স্বামীর কাছ থেকে পায় না।
টিকাঃ
১৭. মুসলিম (২৪৩৫)
১৮. মুসলিম (২০১/১৫) গ্রন্থের ব্যাখ্যা, নববী (রাহ.)
১৯. বুখারী (৩৬৬২) ও মুসলিম (২৩৮৪)
📄 বাসা থেকে বের হবার সময় স্ত্রীকে চুমো দিতেন
উরওয়া রাযি. তার খালা আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, “আয়িশা রাযি. বলেন, 'নবীজি তাঁর স্ত্রীদের চুমো দিয়ে উযু না করেই জামাআতের সাথে সালাতের জন্য বেরিয়ে যেতেন।' আমি বললাম, 'এটি নিশ্চয়ই আপনার ক্ষেত্রে হতো।' তিনি শুনে হেসে উঠলেন।” ২০
নবীজি সাওম রেখেও তাঁর স্ত্রীদের চুমো দিতেন। ” আয়িশা রাযি. বলেন, “নবীজি * সাওম রেখে তাঁর স্ত্রীদের চুমো দিতেন এবং আলিঙ্গন করতেন। আর তোমাদের মধ্যে প্রবৃত্তির উপর সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ তাঁরই ছিল।” ২২
টিকাঃ
২০. তিরমিযী (৭৯), আবু দাউদ (১৭৮), নাসাঈ (১৭০) ও ইবনে মাজাহ (৫০২)
২১. উত্তেজনা ব্যতিরেক নিজ স্ত্রীকে সিয়ামরত অবস্থায় চুমু দেয়া জায়িজ। এতে সিয়ামের কোন সমস্যা হয় না। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন-
يقبل وهو صائم ويباشر وهو صائم ، وكان املككم لإربه অর্থাৎ - রাসূলুল্লাহ সিয়ামরত অবস্থায় চুমু খেতেন এবং সিয়ামরত অবস্থায় আলিঙ্গন করতেন। তবে নিজ আবেগ উত্তেজনার উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল তোমাদের সকলের চেয়ে বেশি। [বুখারী-১৯২৭] তবে যুবকদের এটা থেকে নিরাপদ থাকাই শ্রেয়। কেননা হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত-
أن رجلا سأل النبي ﷺ عن المباشرة للصائم فرخص له وأتاه آخر فسأله فنهاه فإذا الذي رخص له شيخ والذي نهاه شاب ২৫ অর্থাৎ - জনৈক ব্যক্তি নবী কে সিয়ামরত অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বনের ব্যপারে প্রশ্ন করলে তিনি অনুমতি দেন। ইত্যবসরে অপর একজন এরূপ প্রশ্ন করলে তাকে নিষেধ করেন। তখন আমরা দেখলাম যে, যাকে অনুমতি দিলেন তিনি ছিলেন বৃদ্ধ আর যাকে নিষেধ করেন তিনি ছিলেন যুবক। [আবু দাউদ-২৩৮৭] অনেক মুহাক্কিক উলামায়ে কিরাম বলেন, মূলত এখানে বয়সের চেয়ে কারো উত্তেজিত হওয়ার সম্ভাব্যতা দেখে হুকুম নির্ধারণ হবে। সাধারণত বৃদ্ধ লোকের উত্তেজিত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় তাকে অনুমতি দেয়া হয়েছে আর যুবককে নিষেধ করা হয়েছে; যেহেতু যুবকদের শারীরিক উত্তেজনা প্রবল থাকে। তবে কেউ যদি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণের ব্যপারে আত্মবিশ্বাস রাখে তবে তার জন্য জায়িজ। সম্পাদক
২২. বুখারী (১৯২৭) ও মুসলিম (১১০৬)