📄 খাদিজার রাযি. কথা মনে পড়লে খুশি হয়ে উঠতেন
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “একবার খাদিজার বোন হালা বিনতে খুওয়াইলিদ আল্লাহর রাসূলের ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলেন। তার গলার স্বর খাদিজার কণ্ঠের অনুরূপ ছিল। এতে রাসূলর খাদিজার রাযি. কথা মনে পড়ল। তিনি খুশিতে বলে উঠলেন, 'হে আল্লাহ, এটা যেন হালা (খাদিজার বোন) হয়!' আমি ঈর্ষা অনুভব করলাম; বললাম, 'আপনি কুরাইশের সেই বৃদ্ধা মহিলার কথা এখনো বলেন, যার কিনা দাঁত পড়ে গিয়েছিল (বৃদ্ধ বয়সে কারণে); অনেক আগেই যে কিনা মারা গিয়েছে আর আল্লাহ আপনার জন্য উত্তম আরেকজন দিয়ে তাকে প্রতিস্থাপন করেছেন।' তাঁর মুখের অভিব্যক্তি অন্ধাকারচ্ছন্ন হয়ে উঠল, যা আমি তাঁর মধ্যে কেবলমাত্র আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হলে দেখতে পেতাম (পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মতো আযাবের ভয়ে) কিংবা তাঁর ওপর যখন ওহী আসত। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ আমাকে তার চেয়ে উত্তম কাউকে দিয়ে প্রতিস্থাপন করেননি। সে আমার ওপর বিশ্বাস করেছিল, যখন লোকেরা আমাকে অবিশ্বাস করত। সে আমাকে তার সম্পদ দিয়ে শক্তি যুগিয়েছিল, যখন লোকেরা আমাকে পরিত্যাগ করেছিল। তার মাধ্যমেই আল্লাহ আমাকে সন্তান দিয়েছেন।' এ-কথা শুনে আয়িশা রাযি. তাঁকে বললেন, 'যিনি আপনাকে সত্য বাণীসহ পাঠিয়েছেন, আমি তাঁর কসম করে বলছি, আজকের পর আমি তার প্রশংসা ছাড়া আর কোনো কথা বলব না।” ৯
ইবনে হাজর বলেন, “এ-হাদীস প্রমাণ করে যে, যখন কেউ কাউকে ভালোবাসে, তখন সে সে-সব বিষয়কেও ভালোবাসে, যা মাশুক (প্রেমাস্পদ) ভালোবাসে। মাশুকের সাথে সম্পর্কিত, এমনকি তার সাথে চেহারায় মিল আছে, এমন ব্যক্তিদেরকেও সে ভালোবাসে।” ১০
টিকাঃ
৯. আহমাদ (২৪৩৪৩) এবং আত-তাবারানী (১৪/২৩)
১০. ফাতহুল বারী (১৪০/৭)
📄 খাদিজার রাযি. বান্ধবীদের উপহার পাঠাতেন
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ খাদিজার কথা ঘন ঘন উল্লেখ করতেন। যখনই নবীজি কোনো ভেড়া কুরবানি করতেন, মাংস কেটে টুকরো করার পর কিছু অংশ তার বান্ধবীদের কাছেও পাঠাতেন।” ১১
অন্য এক বর্ণনায় আছে, “যখনই নবীজি কোনো ভেড়া কুরবানি করতেন, তিনি তার বান্ধবীদের খোঁজ নিতেন এবং তাদের জন্য উপহারস্বরূপ মাংস পাঠাতেন।” ১২
আল-মুবারাকপুরী রাহ. বলেন, “খাদিজার বান্ধবীদের উপহার দেওয়া তার প্রতি নবীজির ভালোবাসার প্রতিফলন; তার দয়ার কথা স্মরণ করে এমনটা করতেন তিনি।” ১৩
নববী রাহ. বলেন, “এ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, নবীজি স্ত্রীদের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন এবং তাদের জীবদ্দশায় ও তাদের মৃত্যুর পরেও উদারতার সাথে আচরণ করতেন। তাদের বান্ধবী ও আত্মীয়দের প্রতিও তিনি ছিলেন উদার।” ১৪
আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, “যখনই আল্লাহর রাসূল ﷺ কোনো উপহার পেতেন, তিনি বলতেন, 'এটি অমুকের কাছে নিয়ে যাও, কেননা সে খাদিজার বান্ধবী। এর কিছু তমুকের বাসায় নিয়ে যাও, কারণ সে খাদিজাকে ভালোবাসে।” ১৫
টিকাঃ
১১. বুখারী (৩৫৩৪) ও মুসলিম (২৪৩৫)
১২. তিরমিযী (১৯৪০)
১৩. তুহফাতুল আওযায়ী (১৩৪/৬)
১৪. মুসলিম (২০২/১৫) এর ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)
১৫. আদাবুল মুফরাদ (২৩২)
📄 স্ত্রীদের সাথে উদার আচরণ করতেন
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “নবীজি ﷺ আমার ঘরে ছিলেন এমন একদিন এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা তাঁর কাছে এল। তিনি ﷺ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কে?' জবাব দিল, “আমি জাশশামা আল-মুযানিয়্যা।' তিনি ﷺ বললেন, “বরং আপনি তো হুসসানা। কেমন আছেন? আপনার সম্প্রদায়ের লোকেরা কেমন আছে? আপনি কী করছেন এখন? আপনাকে শেষবার দেখার পর আপনার দিনকাল কেমন কেটেছে?' সে চলে গেলে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি তার সাথে এত বন্ধুত্বপূর্ণ ও দয়ালু ব্যবহার করলেন কেন?' নবীজি ﷺ জবাব দিলেন, “আয়িশা, খাদিজা বেঁচে থাকতে সে আমাদের বাসায় আসত। আর পুরনো বন্ধুদের প্রতি দয়ার্দ্র আচরণ করা তো ভালো ঈমানের লক্ষণ।” ১৬
লক্ষণীয় যে, এই মহিলা বৃদ্ধা ছিলেন, কিন্তু তারপরও নবীজি ﷺ তার নাম পরিবর্তন করে একটি সুন্দর নাম দিলেন। জাশশামা অর্থ অলস ব্যক্তি—যে পরিশ্রম করতে চায় না, আর হুসসানাহ অর্থ মঙ্গল ও সৌন্দর্য। এভাবে মানুষের মন্দ নামগুলোকে বদলে নবীজি ﷺ সুন্দর নাম দিতেন।
মানুষের প্রতি বিশ্বস্ত ও দয়ালু আচরণ করা ভালো ঈমানের লক্ষণ। নবীজি ﷺ এ-বৃদ্ধাকে স্বাগত জানালেন, দয়ার সাথে খাতির করলেন। এটি ছিল তার বিগতা স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার চিহ্ন—যিনি দুঃসময়ে তাঁর পাশে ছিলেন এবং সাহস জুগিয়েছিলেন।
বর্তমান যুগে এমন অনেক পুরুষ আছে, যারা তাদের স্ত্রীদের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়— যেখানে তাদের স্ত্রী কঠিন সময়ে তাদের পাশে থেকে সাহায্য করে এবং ধৈর্যের সাথে তাদের প্রতিষ্ঠা-লাভে এগিয়ে আসে। নবীজি তাঁর স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন এবং এর যথার্থ প্রতিফলন দেখিয়েছেন তাঁর আচরণে।
টিকাঃ
১৬. হাকিম নাসাঈ (১৭/১)
📄 স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে কুণ্ঠাবোধ করতেন না
আল্লাহর রাসূল খাদিজা রাযি. সম্পর্কে বলেন, “তার প্রতি ভালোবাসা আল্লাহ নিজেই আমার হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছেন।” ১৭
নববী রাহ. বলেন, “এ-হাদীস এটিই ইঙ্গিত করে আল্লাহর এ-অনুমোদন খাদিজার (নবীজির প্রতি) ভালোবাসাপূর্ণ আচরণের কারণেই সম্ভব হয়েছে।” ১৮
আয়িশার জন্য আল্লাহর রাসূলের ভালোবাসা অনেক সুস্পষ্ট ও সুবিদিত ছিল। নবীজি কাউকে তার মতো ভালোবাসেননি এবং কেবল তাকেই তিনি কুমারী হিসাবে বিয়ে করেছিলেন। আল্লাহর রাসূল তার জন্য তার ভালোবাসা কখনোই লুকাতেন না।
আমর ইবনে আল-আস রাযি. আল্লাহর রাসূলকে জিজ্ঞাস করলেন, ""মানুষের মধ্যে কে আপনার সবচেয়ে প্রিয়?' নবীজি বললেন, 'আয়িশা।' তিনি (আমর) তখন জিজ্ঞেস করলেন, 'পুরুষদের মধ্যে কে?' তিনি বললেন, 'তার বাবা।” ১৯
নবীজির সুন্নাতের বাইরে গিয়ে অনেক ব্যক্তি স্ত্রীর প্রতি বছরের পর বছর ভালোবাসার কথা জানায় না। অনেকে তো স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশকে বেমানান ও অপুরুষোচিত মনে করে। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ব্যক্ত করা এমন এক কাজ, যার মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক মমতাপূর্ণ ও শক্তিশালী হয় এবং সুখী পারিবারিক জীবন লাভ করা সম্ভব হয়। স্বামী স্ত্রীকে ভালোবাসায় সিক্ত রাখবে এবং মাঝে মাঝেই তাঁকে ভালোবাসার কথা জানাবে—এমনটি মেয়েরা খুব পছন্দ করে। দুর্ভাগ্যবশত কিছু নারী কেবলমাত্র মিষ্টি মিষ্টি কথার কারণেই অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, যা তারা কখনোই তাদের স্বামীর কাছ থেকে পায় না।
টিকাঃ
১৭. মুসলিম (২৪৩৫)
১৮. মুসলিম (২০১/১৫) গ্রন্থের ব্যাখ্যা, নববী (রাহ.)
১৯. বুখারী (৩৬৬২) ও মুসলিম (২৩৮৪)