📄 নবীজির ﷺ বৈবাহিক জীবন থেকে উদাহরণ
নবীজির এগারোজন স্ত্রী ছিলেন-খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ, আয়িশা বিনতে আবু বাকর, হাফসা বিনতে উমার, সাওদা বিনতে যামআ আল-আমিরিয়্যাহ, যায়নাব বিনতে জাহশ আল-আসাদিয়্যা, যায়নাব বিনতে খুযায়মা আল-হিলালিয়্যা, উম্মে সালামা হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া আল-মাখযুমিয়্যা, উম্মে হাবীবা রামলা বিনতে আবু সুফিয়ান আল-আমাউইয়্যা, মায়মুনা বিনতে আল-হারিস আল-হিলালিয়্যা, জুওয়াইরিয়্যা বিনতে আল-হারিস আল-মুস্তালিকিয়্যা এবং সাফিয়্যা বিনতে হুওয়াই আন-নাযিরিয়্যা রাযি.।
তাঁর মৃত্যুকালে নয়জন স্ত্রীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ তাঁর আগেই মারা যান। নবীজি তাঁর স্ত্রীদের সাথে সুখী জীবন কাটিয়েছেন, যা আল্লাহর বাণীতে উঠে এসেছে- “তাদের সাথে দয়ার্দ্র জীবন যাপন করো।” (আল কুরআন, ৪:১৯) 'দয়া' এখানে একটি ব্যাপকার্থক শব্দ, এর মাঝে সব কথা ও মহান আচরণ অন্তর্ভুক্ত। নবীজি স্ত্রীদের সাথে ব্যবহারে সবার মাঝে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। আর কেনই বা তা হবে না! তিনি নিজেই বলেছেন- “তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম সে-ই, যে তার স্ত্রীর সাথে ব্যবহারে সর্বোত্তম। নিশ্চয়ই আমি আমার স্ত্রীদের সাথে আচরণে সর্বোত্তম।” ১
নবীজি স্ত্রীদের সাথে আচরণে মহান-হৃদয় ছিলেন—তাঁর জীবনীতে এর প্রচুর প্রমাণ দেখা যায়। আজ মানুষ যদি তাঁর পথ অনুসরণ করে তাঁর মতো স্ত্রীদের সাথে আচরণ করত, তা হলে অনেক বৈবাহিক সমস্যারই সমাধান হয়ে যেত। বর্তমানে বৈবাহিক সমস্যার কারণে বিবাহবিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সমাধানের লক্ষ্যে আমরা আল্লাহর নবীজির বৈবাহিক জীবনের দিকে তাকাব এবং দেখব কীভাবে তিনি স্ত্রীদের সাথে মধুর আনন্দদায়ক জীবন কাটিয়েছেন। কীভাবে তিনি তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে আচরণ করতেন? কীভাবে নবীজি তাদের ভুল উপেক্ষা করতেন? আমরাও তাঁর পথ অনুসরণ করে সেভাবেই আচরণ করব—কেননা তিনি অনুসরণীয় শ্রেষ্ঠ আদর্শ।
টিকাঃ
১. তিরমিযী (৩৮৯৫)
📄 নবীজি ﷺ তাঁর স্ত্রীদের প্রতিদিন সময় দিতেন
ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, “আল্লাহর রাসূল ফজরের সালাত শেষে তাঁর জায়গায় বসে থাকতেন এবং সূর্য ওঠা পর্যন্ত লোকেরা তাকে ঘিরে থাকত। (সূর্য উঠলে) তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে একে একে গিয়ে সালাম দিয়ে দুআ করতেন। এরপর তিনি, সে-দিন যে স্ত্রীর ঘরে থাকার পালা থাকত, তার ঘরে গিয়ে থাকতেন।” ২
খেয়াল করে দেখুন, তিনি প্রতিদিন সকালে এমনটা করতেন এবং সকালে এটিই থাকত তাঁর প্রথম কাজ। তাঁর স্ত্রীগণ তাঁকে সব সময় কাছেই পেতেন, প্রতিদিনই তাঁর দেখা পেতেন তারা। এর সাথে তুলনা করুন তাদের, যারা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, অনেকে তো মাসের পর মাস স্ত্রীদের সাথে দেখা করে না। কিছু মানুষ প্রতিদিন তার বন্ধুদের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাত পর্যন্ত সময় কাটায়; এরপর যখন সে ঘরে ফেরে, তখন তার পরিবারের সবাই হয়তো ঘুমিয়ে গিয়েছে; সেও ক্লান্ত অবস্থায় বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ে। কল্পনা করুন, তো কেমন হবে তার স্ত্রীর সাথে তার সম্পর্ক?
টিকাঃ
২. আল-মুজাম আল-আওসাতে (৫২১৬) তাবারানী।
📄 প্রচুর ব্যস্ততা সত্ত্বেও স্ত্রীদের সাথে গল্প করতেন
এক রাতে আয়িশা রাযি. নবীজিকে উম্মে জারের গল্প বলছিলেন। একবার এগারোজন নারী একসাথে জড়ো হয়ে কোনো গোপনীয়তা ছাড়াই নিজ নিজ স্বামীর ব্যাপারে বলবে বলে শপথ নিল। তারপর প্রত্যেকেই তার স্বামী সম্পর্কে বলল। উন্মে জার তার স্বামীর অনুগ্রহ ও ভালোবাসার বর্ণনা দেওয়ার পর দেখা গেল, তদের মধ্যে তার স্বামীই সর্বোত্তম ছিল। আয়িশা রাযি. বলেন, “আল্লাহর রাসূল আমাকে বললেন, 'আমি তোমার কাছে তেমন, যেমনটা ছিল আবু জার উম্মে জারের কাছে।” ৩
একজন স্বামীকে অবশ্যই তার স্ত্রীর জন্য সময় বের করে তার কাছে বসে তার কথা শোনা উচিত, গল্প করা উচিত। অনেক স্ত্রী অভিযোগ করে তাদের স্বামী সারাদিন কর্মক্ষেত্রে থাকে এবং তারা বাড়ি ফিরে এসে হয় টিভি দেখতে বসে যায়, নাহয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইন্টারনেটে ব্যস্ত থাকে। আর তার স্ত্রী চেয়ে থাকে—কখন সে একটু তার দিকে মনোযোগ দেবে। কিন্তু দেখা যায়, স্বামী কাজ শেষ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় কথা বলার কোনো আগ্রহই তার মধ্যে থাকে না। একসময় মরা মানুষের মতো ঘুমিয়ে পড়ে। অনেকে তো টিভি দেখতে দেখতে রিমোট কন্ট্রোল হাতেই ঘুমিয়ে যায়। এসব আচরণের কারণে বেচারা স্ত্রী নিজেকে অবহেলিত মনে করতে থাকে।
অনেক ব্যবসায়ী বাড়িতে ফিরে এসেও ব্যবসার কাগজে ডুবে থাকে, যেন অফিসের প্রথম শিফট শেষ করে এসে বাসায় দ্বিতীয় শিফট শুরু করেছে। আর ওদিকে তার স্ত্রী তার সামান্য মনোযোগ পাবার আশায় ব্যাকুল হয়ে বসে থাকে। বর্তমানে স্বামীদের জন্য যোগাযোগের আধুনিক মাধ্যমগুলো স্ত্রীর সাথে সব সময় যোগাযোগ রাখার পথ সুগম করে দিয়েছে। চাইলেই সে এসএমএস বার্তা পাঠাতে পারে বা কল দিয়ে কথা বলে খোঁজখবর নিতে পারে। এতে এক মিনিটেরও বেশি সময় লাগে না, কিন্তু এটাই স্ত্রীর কাছে অনেক কিছু।
টিকাঃ
৩. বুখারী (৫১৮৯) ও মুসলিম (২৪৪৮)।
📄 ইবাদাতে সময় দেওয়ার পাশাপাশি স্ত্রীদেরকেও সময় দিতেন
আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, “নবীজি (ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত) সালাত পড়তেন। এরপর আমি জেগে থাকলে আমার সাথে কথা বলতেন। নাহলে জামাআতের সময় হওয়া পর্যন্ত শুয়ে থাকতেন।” ৪
টিকাঃ
৪. বুখারী (১১৬১)।