📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 চতুর্থ পরিচ্ছেদ: অংশ না নেওয়া তিনজনের ঘটনা

📄 চতুর্থ পরিচ্ছেদ: অংশ না নেওয়া তিনজনের ঘটনা


যে তিন ব্যক্তি তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, তাদের ঘটনা হাদীস, তাফসির ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলিতে বিবৃত হয়েছে। ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন কাআব ইবনে মালেক রা.। আমরা বুখারী রহ.-এর সূত্রে তার বর্ণনাটি উল্লেখ করছি:
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সা. যতগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তার মধ্যে তাবুক ও বদর যুদ্ধ ছাড়া সবগুলো যুদ্ধেই আমি অংশগ্রহণ করেছি। বদরে অংশ না নেওয়ার কারণে কাউকে ভৎর্সনা করা হয়নি। কারণ রসূলুল্লাহ সা. কেবল কুরায়েশের ব্যবসায়ী দলের সন্ধানে বের হয়েছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের এবং তাদের শত্রুবাহিনীর মধ্যে অঘোষিত যুদ্ধ সংঘটিত করেন। আর আকাবার রাতে যখন রসূলুল্লাহ সা. আমাদের থেকে ইসলামের ওপর অঙ্গীকার গ্রহণ করেন, আমি তখন তার সঙ্গে ছিলাম। বদরপ্রান্তরে উপস্থিত হওয়াকে আমি আকাবার উপস্থিতির চেয়ে উত্তম মনে করি না; যদিও আকাবার ঘটনা অপেক্ষা লোকেদের মধ্যে বদরের ঘটনা বেশি প্রসিদ্ধ ছিল।
আমি তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি। যদিও আমি তখন পুরোপুরি সুস্থ ও শক্তিশালী ছিলাম। আমার পক্ষে ইতোপূর্বে কোনো যুদ্ধে একই সঙ্গে দুটো যানবাহন জোগাড় করা সম্ভব হয়নি; যা আমি এ যুদ্ধের সময় জোগাড় করেছিলাম। আর রসূলুল্লাহ সা. যে অভিযান পরিচালনার সংকল্প গ্রহণ করতেন, তিনি কৌশলে সে স্থানের কথা আগে বলতেন না। এ যুদ্ধ ছিল তীব্র গরমের মৌসুমে, পথ ছিল বহু দূরের, বিশাল মরুভূমি পাড়ি দিয়ে বহু শত্রুসেনার মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে হচ্ছিলো। অতএব রসূলুল্লাহ সা. এ অভিযানের সার্বিক পরিস্থিতি এবং কোন এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনা করতে যাবেন তা-ও মুসলিমদের কাছে প্রকাশ করে দেন; যাতে তারা যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সামান জোগাড় করতে পারেন। এদিকে রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে مسلمانوں সংখ্যা ছিল অগণিত।
কাব রা. বলেন, যার ফলে যে কোনো লোক যুদ্ধাভিযান থেকে বিরত থাকতে চাইলে তা সহজেই থেকে যেতে পারতো এবং ওহি মারফত এ খবর না-জানানো পর্যন্ত তা গোপন থাকবে বলে সে ধারণা করতো। রসূলুল্লাহ সা. এ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এমন সময়, যখন ফল পাকার ও গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়ার মৌসুম ছিল। রসূলুল্লাহ সা. ও মুসলিম বাহিনী অভিযানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে ফেলেন। আমিও প্রতিদিন সকালে তাদের সঙ্গে রওয়ানা হওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকি। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌছতে পারছি না। মনে মনে ধারণা করতে থাকি, আমি তো যখন ইচ্ছা যেতে পারবো। এই দোটানায় ভেবে আমার সময় কেটে যেতে লাগলো।
এদিকে অন্য লোকেরা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ফেললো। ইতোমধ্যে রসূলুল্লাহ সা. এবং তার সাথী মুসলিমগণ রওয়ানা করলেন অথচ আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। আমি মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা ঠিক আছে, এক-দুদিনের মধ্যে আমি প্রস্তুত হয়ে পরে তাদের সঙ্গে গিয়ে যুক্ত হবো। এভাবে আমি প্রতিদিন বাড়ি হতে প্রস্তুতি নেওয়ার উদ্দেশে বের হই, কিন্তু কিছু না করে ফিরে আসি। আবার বের হই, আবার কিছু না করেই ঘরে ফিরে আসি। এ দিকে বাহিনী অগ্রসর হয়ে অনেক দূর চলে যায়। আর আমি রওয়ানা করে তাদের সঙ্গে রাস্তায় মিলিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতে লাগলাম। আফসোস! যদি আমি তাই করতাম! কিন্তু তা আর করা হয়ে ওঠেনি। রসূলুল্লাহ সা. রওয়ানা হওয়ার পর যখন আমি মদীনার পথে বের হতাম, তখন চারদিকে মুনাফেক, দুর্বল ও অক্ষম লোক ব্যতীত অন্য কাউকে দেখতে পেতাম না। এটা আমার মনকে পীড়া দিতো। এদিকে রসূলুল্লাহ সা. তাবুক পৌঁছার আগ পর্যন্ত আমার ব্যাপারে আলোচনা করেননি। তাবুকে পৌঁছার পর তিনি লোকেদের জিজ্ঞেস করলেন, কাআব কী করলো?
বনু সালামাহ গোত্রের এক লোক বললো, হে আল্লাহর রসূল! তার ধনসম্পদ ও অহঙ্কার তাকে আসতে দেয়নি। এ কথা শুনে মুআয ইবনে জাবাল রা. বললেন, তুমি যা বললে তা ঠিক নয়। হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কসম! আমরা তাকে উত্তম ব্যক্তি বলে জানি। তখন নবীজি নীরব রইলেন। কাআব ইবনে মালেক রা. বলেন, আমি যখন জানতে পারলাম যে, রসূলুল্লাহ সা. মদীনা মুনাওয়ারায় ফিরে আসছেন, তখন আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম এবং মিথ্যা অজুহাত খুঁজতে থাকলাম। চিন্তা করতে থাকলাম কী বলে আগামীকাল রসূলুল্লাহ সা.-এর ক্রোধকে ঠান্ডা করতে পারবো। এ সম্পর্কে আমার পরিবারের জ্ঞানীগুণীদের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতে লাগলাম। এরপর যখন সবাই বলাবলি করছিল যে, রসূলুল্লাহ সা. মদীনায় এসে পৌছে যাচ্ছেন, তখন আমার অন্তর থেকে মিথ্যা দূর হয়ে গেলো। আর মনে দৃঢ় প্রত্যয় হলো যে, এমন কোনো উপায়ে আমি তাকে কখনো ক্রোধমুক্ত করতে সক্ষম হব না, যাতে মিথ্যার লেশ থাকে। অতএব সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমি সত্য কথাই বলবো।
রসূলুল্লাহ সা. সকালবেলায় মদীনায় প্রবেশ করলেন। তিনি সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করে প্রথমে মসজিদে গিয়ে দুরাকাত সালাত আদায় করেন, তারপর লোকদের সামনে বসেন। নবীজি সালাত শেষ করে বসার পর যারা মদীনায় রয়ে গিয়েছিলেন, তারা তার কাছে গিয়ে শপথ করে করে অপারগতা পেশ করতে লাগলেন। এরা সংখ্যায় আশির অধিক ছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. বাহ্যত তাদের ওজর গ্রহণ করলেন, তাদের বায়াত করলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। প্রকৃত অবস্থা অন্য রকম হলে তার বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলেন।
(কাব রা. বলেন) আমিও এরপর রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে হাজির হলাম। আমি যখন তাকে সালাম দিলাম তখন তিনি রাগান্বিত চেহারায় মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, এসো। আমি এগিয়ে গিয়ে একেবারে তার সম্মুখে বসে গেলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী কারণে তুমি অংশগ্রহণ করলে না? তুমি কি যানবাহন ক্রয় করোনি? তখন আমি বললাম, হ্যাঁ, করেছি।
আল্লাহর কসম! আমি যদি আপনি ব্যতীত দুনিয়ার অন্য কোনো ব্যক্তির সামনে বসতাম, তাহলে আমি ওজর-আপত্তির মাধ্যমে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতাম। আমি কথায় পটু। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি জানি আজ যদি মিথ্যা কথা বলে আপনাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করি, তাহলে শীঘ্রই আল্লাহ তাআলা আপনাকে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দিতে পারেন। যদি আপনার কাছে সত্য প্রকাশ করি, যাতে আপনি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন; তবুও আমি এতে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার আশা করি। না, আল্লাহর কসম! আমার কোনো সমস্যা ছিল না। আল্লাহর কসম! আপনারা যখন যুদ্ধে যাচ্ছিলেন, তখন আমি সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবানদের একজন ছিলাম।
তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, সে সত্য কথাই বলেছে। তুমি এখন চলে যাও, যত দিন না তোমার সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ফয়সালা করে দেন। তাই আমি উঠে চলে এলাম। তখন বনু সালামার কতিপয় লোক আমার অনুসরণ করলো। তারা আমাকে বললো, আল্লাহর কসম! তুমি ইতোপূর্বে কোনো পাপ করেছো বলে আমাদের জানা নেই; তুমি কি অন্যান্যদের মতো রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে একটি ওজর পেশ করে দিতে পারতে না? আর তোমার এ অপরাধের কারণে তোমার জন্য রসূলুল্লাহ সা.-এর ক্ষমাপ্রার্থনাই তো যথেষ্ট ছিল। তারা আমাকে বার বার কঠিনভাবে ভৎর্সনা করতে থাকে। ফলে আমি পূর্ব স্বীকারোক্তি থেকে ফিরে গিয়ে মিথ্যা বলার বিষয়ে মনে মনে চিন্তা করতে থাকি।
আমি তাদের বললাম, আমার মতো এ কাজ আর কেউ করেছে কি? তারা জওয়াব দিল, হ্যাঁ, আরও দুজন তোমার মতো বলেছে এবং তাদের ব্যাপারেও তোমার মতো একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তারা কে কে? তারা বললো, একজন মুরারা ইবনে রবি অপরজন হিলাল ইবনে উমাইয়া ওয়াকিফি।
এরপর তারা আমাকে জানালো, তারা উভয়ে উত্তম মানুষ এবং তারা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। সেজন্য দুজনেই আদর্শস্থানীয়। যখন তারা তাদের নাম উল্লেখ করলো, তখন আমি পূর্ব মতের ওপর অটল রইলাম। রসূলুল্লাহ সা. আমাদের তিনজনের সঙ্গে কথা বলতে মুসলিমদের নিষেধ করে দিলেন। মুসলিমরা আমাদের এড়িয়ে চলতে লাগলো। আমাদের প্রতি তাদের আচরণ বদলে গেলো। মদীনা আমাদের কাছে অপরিচিত মতে হতে লাগলো।
এ অবস্থায় আমরা ৫০ রাত অতিবাহিত করলাম। আমার অপর দুজন সাথী নিজেদের ঘরেই থাকতেন। ঘরে বসে বসে কাঁদতেন। আমি যেহেতু অধিকতর যুবক ও শক্তিশালী ছিলাম, তাই বাইরে বের হতাম, জামাআতে নামায আদায় করতাম, বাজারে চলাফেরা করতাম; কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলতো না।
যখন তিনি সালাত শেষে মজলিসে বসতেন, তখন আমি তাকে সালাম দিতাম আর ভালো করে লক্ষ্য করতাম, তিনি আমার সালামের জবাবে তার ঠোঁটদ্বয় নেড়েছেন কি না। আমি তার কাছাকাছি জায়গায় সালাত আদায় করতাম এবং গোপনে তাকে দেখতাম, আমি যখন সালাতে মগ্ন হতাম তখন তিনি আমার দিকে তাকাতেন আর যখন আমি তার দিকে তাকাতাম, তখন তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে আমার প্রতি মানুষদের কঠোরতা ও এড়িয়ে চলা দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকে। একবার আমি আমার চাচাত ভাই ও প্রিয় বন্ধু আবু কাতাদাহ রা.-এর বাগানের প্রাচীর টপকে ঢুকে পড়ে তাকে সালাম দিই। কিন্তু আল্লাহর কসম! তিনি আমার সালামের জওয়াব দিলেন না। আমি তখন বললাম, হে আবু কাতাদাহ, আপনাকে আমি আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, আপনি কি জানেন, আমি আল্লাহ ও তার রসূলুল্লাহ সা.-কে ভালোবাসি? তিনি নীরব রইলেন। আমি পুনরায় তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি এবারও কোনো জবাব দিলেন না। আমি আবারও তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ ও তার রসূলুল্লাহ সা.-ই ভালো জানেন। তখন আমার চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু ঝরতে লাগলো। আমি আবার প্রাচীর টপকে ফিরে এলাম। কাআব রা. বলেন, একবার আমি মদীনার বাজারে হাঁটছিলাম, তখন দেখলাম সিরিয়ার এক বণিক, যে মদীনার বাজারে খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করার উদ্দেশ্যে এসেছিল; সে বলছে, আমাকে কাআব ইবনে মালেকের সাথে কেউ পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন কি? তখন লোকেরা আমার দিকে ইশারা করে দেখিয়ে দিলো। বণিক এসে গাস্সানি বাদশার একটি পত্র আমাকে দিলো। তাতে লেখা ছিল: "পর সমাচার এই, আমি জানতে পারলাম যে, আপনার সাথী আপনার প্রতি জুলুম করেছে। আর আল্লাহ আপনাকে মর্যাদাহীন ও নিরাশ্রয় সৃষ্টি করেননি। আপনি আমাদের দেশে চলে আসুন, আমরা আপনার সাহায্য করবো।"
আমি যখন এ পত্র পড়লাম তখন আমি বুঝলাম, এটাও আরও একটি পরীক্ষা। তখন আমি চুলা খুঁজে তার মধ্যে পত্রটি নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দিলাম। এ সময় ৫০ দিনের ৪০ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় রসূলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ থেকে এক সংবাদবাহক আমার কাছে এসে বললো, রসূলুল্লাহ সা. নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি আপনার স্ত্রী হতে পৃথক থাকবেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দেবো, না অন্য কিছু করবো? তিনি উত্তর দিলেন, তালাক দিতে হবে না; বরং তার থেকে পৃথক থাকুন এবং তার নিকটবর্তী হবেন না। আমার অপর দুজন সঙ্গীকেও একই আদেশ দেওয়া হলো। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি তোমার পিত্রালয়ে চলে যাও। আমার সম্পর্কে আল্লাহর ফয়সালা না-হওয়া পর্যন্ত তুমি সেখানে থাকো। কাআব রা. বলেন, আমার সঙ্গী হিলাল ইবনে উমাইয়্যার স্ত্রী রসূলুল্লাহ সা.-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রসূল! হিলাল ইবনে উমাইয়‍্যা অতি বৃদ্ধ; তার কোনো খাদেম নেই। আমি যদি তার খেদমত করি, এটা কি আপনি অপছন্দ করবেন? রসূলুল্লাহ সা. বললেন, না, তবে সে তোমার বিছানায় আসতে পারবে না। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এরকম কোনো অনুভূতিই তার নেই। তিনি এ নির্দেশ পাওয়ার পর থেকে সর্বদা কান্নাকাটি করছেন। (কাব রা. বলেন) আমার পরিবারের কেউ আমাকে পরামর্শ দিলো যে, আপনিও যদি আপনার স্ত্রীর ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে অনুমতি চাইতেন যেমন রসূলুল্লাহ সা. হিলাল ইবনে উমায়‍্যার স্ত্রীকে তার স্বামীর খেদমাত করার অনুমতি দিয়েছেন। আমি বললাম, আমি কখনো এ ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে অনুমতি চাইবো না। আমি তো নিজেই আমার খেদমত করতে সক্ষম। এরপর আরও ১০ রাত কাটালাম। এভাবে নবী সা. যখন থেকে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেন তখন থেকে ৫০ রাত পূর্ণ হলো।
৫০ তম রাত শেষে ফজরের সালাত আদায়ের পর আমাদের এক ঘরের ছাদে এমন অবস্থায় বসে ছিলাম, যে অবস্থার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বর্ণনা করেছেন। আমার জান-প্রাণ দুর্বিষহ এবং গোটা জগৎটা যেন আমার জন্য প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বে সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় শুনতে পেলাম এক ঘোষকের চিৎকার। সে সালা পর্বতের ওপর চড়ে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করছে, হে কাআব ইবনে মালেক, সুসংবাদ গ্রহণ করুন!
কাব রা. বলেন, এ শব্দ আমার কানে পৌঁছামাত্র আমি সেজদায় পড়ে গেলাম। আমি বুঝলাম, আমার সুদিন এসেছে। রসূলুল্লাহ সা. ফজরের সালাত আদায়ের পর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে আমাদের তওবা কবুল হওয়ার সুসংবাদ প্রকাশ করেন। একজন অশ্বারোহী আমার কাছে ছুটে আসছিল এ সুসংবাদ দিতে। আসলাম গোত্রের অপর এক ব্যক্তি দ্রুত পর্বতের ওপর আরোহণ করে চীৎকার করতে থাকে। তার চীৎকারের শব্দ ঘোড়ার আগে পৌছে যায়। সে যখন আমার কাছে পৌছলো, তখন তাকে সুসংবাদ প্রদান করার শুকরিয়াস্বরূপ আমার নিজের পরনের কাপড়দুটো খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম। আল্লাহর শপথ! সে সময় ওই দুটো কাপড় ব্যতীত আমার কাছে আর কোনো কাপড় ছিল না। ফলে আমি দুটো কাপড় ধার করে পরিধান করলাম এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে রওয়ানা হলাম। লোকেরা দলে দলে আমাকে ধন্যবাদ জানাতে আসতে লাগলো। তারা তওবা কবুলের মুবারকবাদ জানাচ্ছিলো। তারা বলছিল, তোমাকে মুবারাকবাদ, আল্লাহ তাআলা তোমার তওবা কবুল করেছেন।
কাআব রা. বলেন, অবশেষে আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন রসূলুল্লাহ সা. সেখানে বসা ছিলেন এবং তার চারদিকে জনতার সমাবেশ ছিল। তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. দ্রুত উঠে এসে আমার সঙ্গে মুসাফাহা করলেন ও মুবারকবাদ জানালেন। তিনি ব্যতীত আর কোনো মুহাজির আমার জন্য দাঁড়াননি। আমি তালহার আচরণ ভুলতে পারবো না।
কাআব রা. বলেন, এরপর আমি যখন রসূলুল্লাহ সা.-কে সালাম জানালাম, তখন তার চেহারা আনন্দের আতিশয্যে ঝকঝক করছিল। তিনি আমাকে বললেন, তোমার মাতা তোমাকে জন্ম দেওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত যতদিন তোমার ওপর অতিবাহিত হয়েছে তার মধ্যে উৎকৃষ্ট ও উত্তম দিনের সুসংবাদ গ্রহণ করো।
কাআব বলেন, আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রসূল! এটা কি আপনার পক্ষ থেকে না আল্লাহর পক্ষ থেকে? তিনি বললেন, আমার পক্ষ থেকে নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে। রসূলুল্লাহ সা. যখন খুশি হতেন তখন তার চেহারা এতো উজ্জ্বল ও ঝলমলে দেখাতো যেন পূর্ণিমার চাঁদের ফালি। এতে আমরা তার সন্তুষ্টি বুঝতে পারতাম। আমি তার সম্মুখে বসে নিবেদন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমার তওবা কবুলের শুকরীয়াস্বরূপ আমার ধনসম্পদ আল্লাহ ও তার রসূলুল্লাহ সা.-এর পথে দান করতে চাই। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, কিছু মাল নিজের কাছে রেখে দেওয়াই ভালো হবে। আমি বললাম, খায়বারে অবস্থিত আমার অংশটি আমার জন্য রাখলাম। আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ তাআলা সত্য বলার কারণে আমাকে রক্ষা করেছেন, তাই বাকি জীবনে আমি সত্যই বলবো। আল্লাহর কসম! যখন থেকে আমি এ সত্য বলার কথা রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে জানিয়েছি, তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমার জানা মতে কোনো মুসলমানকে সত্য কথার বিনিময়ে এরূপ নেয়ামত আল্লাহ দান করেননি; যে নেয়ামত আমাকে দান করেছেন। (কাব রা. বলেন) যেদিন রসূলুল্লাহ সা.- এর সম্মুখে সত্য কথা বলেছি সেদিন হতে আজ পর্যন্ত অন্তরে মিথ্যা বলার ইচ্ছাও করিনি। আমি আশা পোষণ করি যে, বাকি জীবনও আল্লাহ তাআলা আমাকে মিথ্যা থেকে রক্ষা করবেন। এরপর আল্লাহ তাআলা রসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর এই আয়াত অবতীর্ণ করেন:
لَقَدْ تَابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَad يَزِيعُ قُلُوبُ فَرِيقٍ مِنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَحِيمٌ وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
আল্লাহ দয়াশীল নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা কঠিন মুহূর্তে নবীর সঙ্গে ছিল যখন তাদের একদলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি দয়াপরবশ হন তাদের প্রতি। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুনাময়। এবং অপর তিনজনকে যাদেরকে পেছনে রাখা হয়েছিল। যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গেলো এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলো আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াময়, করুণাশীল। হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো ও সত্যবাদীদের সাথে থাকো।'
কাআব রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! ইসলাম গ্রহণের তওফিক দেওয়ার পর রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে আমার সত্য বলার তওফিকই আমার ওপর আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত। যদি মিথ্যা বলতাম তবে মিথ্যাচারীদের মতো আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম। সেই মিথ্যাচারীদের সম্পর্কে যখন ওহি অবতীর্ণ হয়েছে, তখন জঘন্য অন্তরের সেই লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
سَيَحْلِفُوْنَ بِاللهِ لَكُمْ إِذَا انْقَلَبْتُمْ إِلَيْهِمْ لِتُعْرِضُوا عَنْهُمْ فَأَعْرِضُوا عَنْهُمْ إِنَّهُمْ رِجْسٌ وَ مَاوُنَهُمْ جَهَنَّمُ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ يَحْلِفُوْنَ لَكُمْ لِتَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنْ تَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَسِقِينَ
তোমরা তাদের কাছে ফিরে আসলে তারা তোমাদের নিকট আল্লাহর নামে শপথ করবে যাতে তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর। কাজেই তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর, তারা অপবিত্র, তাদের বাসস্থান জাহান্নাম, তারা যা করেছে এটাই তার ন্যায্য প্রাপ্য। তারা তোমাদের কাছে শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের উপর খুশি হয়ে যাও, কিন্তু তোমরা তাদের উপর খুশি হলেও, আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়ের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না।
কাআব রা. বলেন, যারা তার কাছে ওযর পেশ করে শপথ করেছে, তিনি তাদের বায়াত গ্রহণ করেছেন এবং তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন। আমাদের বিষয়টি আল্লাহর ফয়সালা না-হওয়া পর্যন্ত রসূলুল্লাহ সা. স্থগিত রেখেছেন। এর প্রেক্ষাপটে আল্লাহ বলেন, 'এবং অপর তিনজনকে যাদেরকে পেছনে রাখা হয়েছিল। যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গেলো এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলো আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াময়, করুণাময়। ' কুরআনের এই আয়াতে তাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়নি, যারা তাবুক যুদ্ধ থেকে পেছনে ছিল এবং মিথ্যা কসম করে ওজর পেশ করেছিল, বরং এই আয়াতে ইশারা করা হয়েছে আমাদের দিকে; যারা পেছনে ছিলাম এবং যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল。

উপরোক্ত ঘটনায় আমরা যেসব শিক্ষা পাই, তা হলো:

ক. উচ্চ সাহিত্য মানসম্পন্ন বর্ণনা

উপরোক্ত হাদীসটি প্রাঞ্জল ও আবেগপূর্ণ ভাষায় বিবৃত হয়েছে। কাআব ইবনে মালেক-এর এ বক্তব্যটি লক্ষ করা যেতে পারে; যেখানে কত সুন্দর করে বলা হয়েছে, 'এরপর যখন প্রচারিত হলো যে, রসূলুল্লাহ সা. মদীনায় পৌছে যাচ্ছেন, তখন আমার অন্তর থেকে মিথ্যা দূর হয়ে গেলো। আর মনে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মালো যে, মিথ্যা-মিশ্রিত কোনো উপায়ে আমি তাকে ক্রোধমুক্ত করতে পারবো না। তাই আমি সত্য বলার সিদ্ধান্ত নিই।

খ. সত্যই মুক্তির বাহন

মিথ্যা কত নিকৃষ্ট, সেটা কাআব, হিলাল ও মুরারাহ রা. উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তারা অনেক কষ্ট-ক্লেশ ভোগ করলেও সত্য বলার পথ বেছে নেন। আল্লাহ তাআলার প্রতি তাদের ছিল অপরিসীম বিশ্বাস। ফলে তিনি তাদের তওবা কবুল করেছেন। এভাবে তারা পুনরায় ইসলামী সমাজের অংশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পান। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
يٰٓاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَ كُوْنُوْا مَعَ الصّٰدِقِيْنَ
হে বিশ্বাসীরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যপন্থীদের অর্ন্তভুক্ত হও।

গ. শিক্ষার লক্ষ্যে কাউকে এড়িয়ে চলা এবং সমাজে তার প্রভাব

কাউকে কোনো বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে শাস্তিস্বরূপ একঘরে করে রাখার মধ্যে অনেক উপকারিতা পাওয়া যায়। এতে তাদের পদচ্যুতি রোধ সম্ভব হয়। মানুষ যখন সামাজিক বয়কটের কথা বিবেচনায় রাখে, তখন সে অন্যায় কাজ করতে ভয় পায়। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এমন বিধিবিধান আরোপ করতে হবে এমন জায়গায়, যেখানে ইসলামী রাষ্ট্রের যথার্থ ক্ষমতা থাকবে। শাস্তিপ্রাপ্ত লোকটি মুরতাদ হয়ে যাওয়া বা অন্য কোনো বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা না থাকলেই এমন শাস্তি প্রয়োগ করা যাবে।
দুনিয়াবি কারণে বয়কট করা আর শরীয়তের কোনো আদেশ লঙ্ঘনের কারণে বয়কট করার মাঝে অবশ্যই পার্থক্য থাকতে হবে। আখেরাতের উদ্দেশ্যে যখন কাউকে বয়কট করে রাখা হবে, তখন যারা বয়কট করে রাখবে, তারা আল্লাহর পক্ষ হতে সাওয়াবপ্রাপ্ত হবে। পক্ষান্তরে দুনিয়াবি কারণে কোনো মুসলমানের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। এমন সম্পর্কচ্ছেদ তিনদিনের অধিক হলে তা হবে হারাম।

রসূলুল্লাহ সা. বলেন, মুসলমান ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখা কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ নয়। দুইজন মুসলমানের মধ্যে মনোমালিন্য হলে উত্তম ওই ব্যক্তি, যে আগে সালাম দেবে। আরেক হাদীসে এসেছে: রসূলুল্লাহ সা. বলেন, যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের সাথে এক বছর সম্পর্ক ছিন্ন রাখলো, সে যেন তার রক্ত ঝরালো。

ঘ. মুসলিম সমাজে নেতার নির্দেশ কার্যকরের গুরুত্ব

সাহাবায়ে কেরাম রা. রসূলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ থেকে বয়কট ও সম্পর্কচ্ছেদের নির্দেশ অকপটে মেনে নেন এবং কার্যকর করেন। কাআব ইবনে মালেক রা. নিজেদের অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, অতঃপর মানুষেরা আমাদের এড়িয়ে যেতে থাকে এবং আমাদের সাথে বিরূপ আচরণ করতে থাকে। আমাদের নিজেদের ভূমি যেন আমাদের জন্য অপরিচিত হয়ে উঠেছিল। আমার অপর দুজন সাথী নিজেদের ঘরেই থাকতেন। আর আমি যেহেতু যুবক ও শক্তিশালী ছিলাম, তাই বাইরে বের হতাম, জামাআতে নামায আদায় করতাম, বাজারে চলাফেরা করতাম। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলতো না。

কাআব তার চাচাতো ভাই আবু কাতাদা রা.-কে সালাম করলে তিনি তার সালামের উত্তর দেননি। তখন তিনি তাকে বারংবার আল্লাহর শপথ দিয়ে এ কথা জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি একথা জানো না যে, আমি আল্লাহ ও তার রসূলকে ভালোবাসি? জবাবে তিনি নিরবতা পালন করেন। অথচ তিনি ছিলেন তার সবচাইতে প্রিয় একজন মানুষ। আবু কাতাদা রা. এ ক্ষেত্রে একটি কঠিন পরীক্ষায় পতিত হয়েছিলেন। একদিকে তার সবচাইতে প্রিয় মানুষটির আহ্বানে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন ছিল, অন্যদিকে রসূল সা. তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের যে শাস্তি ঘোষণা করেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করাও প্রয়োজন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তিনি ঈমানি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রসূলের নির্দেশই পালন করেন。

এ বয়কট তখন সর্বোচ্চ মাত্রা পায়, যখন রসূল সা. তাদেরকে নিজের স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকতে বলেন। তাদের প্রত্যেকেই রসূল সা.-এর এই আদেশ পালন করেন। তন্মধ্যে হিলাল ইবনে উমাইয়্যা ছিলেন অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ। তাই তার স্ত্রী রসূল সা.-এর কাছে শুধু সেবার জন্য তার কাছে থাকার অনুমতি চাইলে রসূল সা. তাকে অনুমতি দেন। তবে তার সাথে অন্তরঙ্গ হতে নিষেধ করেন。

ঙ. পূর্ণ হৃদ্যতা কেবল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্য

মুসলমানদের ভেতরে অন্তর্দ্বন্ধ তৈরি করে ইসলামী সমাজের ভিত্তিমূলে আঘাত করার কাজে সবসময় সচেষ্ট ছিল খ্রিষ্টানরা। গাস্সানের বাদশা যখন শুনতে পেলো, মুসলমানরা কাআব ইবনে মালেক-এর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছে, তখন সে কাআবের কাছে তার চিঠিসম্বলিত বিশেষ দূত পাঠায়। চিঠিটি ছিল উস্কানিমূলক। চিঠিতে সে লিখেছিল, আপনার সঙ্গী আপনার সাথে অন্যায় আচরণ করছে মর্মে আমার কাছে সংবাদ এসেছে। আল্লাহ আপনাকে মর্যাদাহীন ও নিরাশ্রয় বানাননি। আপনি আমাদের দেশে চলে আসুন, আমরা আপনার সাহায্য করবো।

চিঠিটি পাওয়ার পর কাআব মন্তব্য করেছিলেন, এটা আমার জন্য নতুন বিপদ। নিশ্চয়ই আমার দ্বারা এমন কোনো অপরাধ হয়েছে, যার জন্য আমার দিকে কাফের সম্প্রদায় হাত বাড়াচ্ছে। সাথে সাথে তিনি তার চিঠিটি আগুনে নিক্ষেপ করেন。

চ. তাওবা কবুল করা আল্লাহর নেয়ামত

উপরোক্ত তিনজনের তাওবা কবুল সংক্রান্ত আয়াত অবতীর্ণ হলে আনন্দে রসূল সা.-এর চেহারা চাঁদের মতো উজ্জ্বল হয়ে যায়। খুব খুশি হন সাহাবায়ে কেরামও। তারা দলে দলে কাআব ও তার দুই সঙ্গীকে তাদের তওবা কবুলের সুসংবাদ জানান। কাআব রসূল সা.-এর সামনে উপস্থিত হলে তিনি তাকে বলছিলেন, তোমার জন্ম থেকে এ পর্যন্ত জীবনের সবচেয়ে উত্তম সুসংবাদ গ্রহণ করো। তাওবা কবুল হওয়াই ছিল কাআব ইবনে মালেক-এর জন্য সবচেয়ে খুশির সংবাদ। তিনি তার পরনের কাপড়জোড়া সুসংবাদদাতাকে দান করে দিয়েছিলেন। এমনিভাবে তার দুই সঙ্গীর আনন্দও ছিল অনুরূপ。

ওয়াকেদী বর্ণনা করেন, সাঈদ ইবনে যায়েদ রহ. হিলাল ইবনে উমাইয়্যা রা.-কে তার তাওবা কবুলের সুসংবাদ দিলে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো আত্মা বের হওয়া পর্যন্তই তিনি সেজদাবনত থাকবেন。

টিকাঃ
১৫৫১. সুরা তাওবা: আয়াত ১১৭-১১৯।
১৫৫২. সুরা তাওবা: আয়াত ৯/৯৫-৯৬।
১৫৫০. সুরা তাওবা: আয়াত ১১৮।
১৫৫৪. সহীহ বুখারী: ৪৪১৮।
১৫৫৫. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৮/১৩৭।
১৫৫৬. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৮/১৩৮।
১৫৫৭. সুরা তাওবা: আয়াত ১১৯।
১৫৫৮. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৮/১৩৮।
১৫৫৯. সহীহ মুসলিম: ২৫৬০।
১৫৬০. মুসনাদে আহমদ: ৪/২২০।
১৫৬১. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ১৯৫।
১৫৬২. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী:: ৮/১৪০।
১৫৬৩. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ১৯৬।
১৫৬৪. সহীহ বুখারী: ৪৪১৮।
১৫৬৫. মাগাযী: ৩/১০৫১-১০৫২।
১৫৬৬. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৮/১৪১।
১৫৬৭. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৫১৮।
১৫৬৮. ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ৩/১০৫৪।

যে তিন ব্যক্তি তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, তাদের ঘটনা হাদীস, তাফসির ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলিতে বিবৃত হয়েছে। ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন কাআব ইবনে মালেক রা.। আমরা বুখারী রহ.-এর সূত্রে তার বর্ণনাটি উল্লেখ করছি:
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সা. যতগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তার মধ্যে তাবুক ও বদর যুদ্ধ ছাড়া সবগুলো যুদ্ধেই আমি অংশগ্রহণ করেছি। বদরে অংশ না নেওয়ার কারণে কাউকে ভৎর্সনা করা হয়নি। কারণ রসূলুল্লাহ সা. কেবল কুরায়েশের ব্যবসায়ী দলের সন্ধানে বের হয়েছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের এবং তাদের শত্রুবাহিনীর মধ্যে অঘোষিত যুদ্ধ সংঘটিত করেন। আর আকাবার রাতে যখন রসূলুল্লাহ সা. আমাদের থেকে ইসলামের ওপর অঙ্গীকার গ্রহণ করেন, আমি তখন তার সঙ্গে ছিলাম। বদরপ্রান্তরে উপস্থিত হওয়াকে আমি আকাবার উপস্থিতির চেয়ে উত্তম মনে করি না; যদিও আকাবার ঘটনা অপেক্ষা লোকেদের মধ্যে বদরের ঘটনা বেশি প্রসিদ্ধ ছিল।
আমি তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি। যদিও আমি তখন পুরোপুরি সুস্থ ও শক্তিশালী ছিলাম। আমার পক্ষে ইতোপূর্বে কোনো যুদ্ধে একই সঙ্গে দুটো যানবাহন জোগাড় করা সম্ভব হয়নি; যা আমি এ যুদ্ধের সময় জোগাড় করেছিলাম। আর রসূলুল্লাহ সা. যে অভিযান পরিচালনার সংকল্প গ্রহণ করতেন, তিনি কৌশলে সে স্থানের কথা আগে বলতেন না। এ যুদ্ধ ছিল তীব্র গরমের মৌসুমে, পথ ছিল বহু দূরের, বিশাল মরুভূমি পাড়ি দিয়ে বহু শত্রুসেনার মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে হচ্ছিলো। অতএব রসূলুল্লাহ সা. এ অভিযানের সার্বিক পরিস্থিতি এবং কোন এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনা করতে যাবেন তা-ও মুসলিমদের কাছে প্রকাশ করে দেন; যাতে তারা যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সামান জোগাড় করতে পারেন। এদিকে রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে مسلمانوں সংখ্যা ছিল অগণিত।
কাব রা. বলেন, যার ফলে যে কোনো লোক যুদ্ধাভিযান থেকে বিরত থাকতে চাইলে তা সহজেই থেকে যেতে পারতো এবং ওহি মারফত এ খবর না-জানানো পর্যন্ত তা গোপন থাকবে বলে সে ধারণা করতো। রসূলুল্লাহ সা. এ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এমন সময়, যখন ফল পাকার ও গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়ার মৌসুম ছিল। রসূলুল্লাহ সা. ও মুসলিম বাহিনী অভিযানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে ফেলেন। আমিও প্রতিদিন সকালে তাদের সঙ্গে রওয়ানা হওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকি। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌছতে পারছি না। মনে মনে ধারণা করতে থাকি, আমি তো যখন ইচ্ছা যেতে পারবো। এই দোটানায় ভেবে আমার সময় কেটে যেতে লাগলো।
এদিকে অন্য লোকেরা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ফেললো। ইতোমধ্যে রসূলুল্লাহ সা. এবং তার সাথী মুসলিমগণ রওয়ানা করলেন অথচ আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। আমি মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা ঠিক আছে, এক-দুদিনের মধ্যে আমি প্রস্তুত হয়ে পরে তাদের সঙ্গে গিয়ে যুক্ত হবো। এভাবে আমি প্রতিদিন বাড়ি হতে প্রস্তুতি নেওয়ার উদ্দেশে বের হই, কিন্তু কিছু না করে ফিরে আসি। আবার বের হই, আবার কিছু না করেই ঘরে ফিরে আসি। এ দিকে বাহিনী অগ্রসর হয়ে অনেক দূর চলে যায়। আর আমি রওয়ানা করে তাদের সঙ্গে রাস্তায় মিলিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতে লাগলাম। আফসোস! যদি আমি তাই করতাম! কিন্তু তা আর করা হয়ে ওঠেনি। রসূলুল্লাহ সা. রওয়ানা হওয়ার পর যখন আমি মদীনার পথে বের হতাম, তখন চারদিকে মুনাফেক, দুর্বল ও অক্ষম লোক ব্যতীত অন্য কাউকে দেখতে পেতাম না। এটা আমার মনকে পীড়া দিতো। এদিকে রসূলুল্লাহ সা. তাবুক পৌঁছার আগ পর্যন্ত আমার ব্যাপারে আলোচনা করেননি। তাবুকে পৌঁছার পর তিনি লোকেদের জিজ্ঞেস করলেন, কাআব কী করলো?
বনু সালামাহ গোত্রের এক লোক বললো, হে আল্লাহর রসূল! তার ধনসম্পদ ও অহঙ্কার তাকে আসতে দেয়নি। এ কথা শুনে মুআয ইবনে জাবাল রা. বললেন, তুমি যা বললে তা ঠিক নয়। হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কসম! আমরা তাকে উত্তম ব্যক্তি বলে জানি। তখন নবীজি নীরব রইলেন। কাআব ইবনে মালেক রা. বলেন, আমি যখন জানতে পারলাম যে, রসূলুল্লাহ সা. মদীনা মুনাওয়ারায় ফিরে আসছেন, তখন আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম এবং মিথ্যা অজুহাত খুঁজতে থাকলাম। চিন্তা করতে থাকলাম কী বলে আগামীকাল রসূলুল্লাহ সা.-এর ক্রোধকে ঠান্ডা করতে পারবো। এ সম্পর্কে আমার পরিবারের জ্ঞানীগুণীদের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতে লাগলাম। এরপর যখন সবাই বলাবলি করছিল যে, রসূলুল্লাহ সা. মদীনায় এসে পৌছে যাচ্ছেন, তখন আমার অন্তর থেকে মিথ্যা দূর হয়ে গেলো। আর মনে দৃঢ় প্রত্যয় হলো যে, এমন কোনো উপায়ে আমি তাকে কখনো ক্রোধমুক্ত করতে সক্ষম হব না, যাতে মিথ্যার লেশ থাকে। অতএব সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমি সত্য কথাই বলবো।
রসূলুল্লাহ সা. সকালবেলায় মদীনায় প্রবেশ করলেন। তিনি সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করে প্রথমে মসজিদে গিয়ে দুরাকাত সালাত আদায় করেন, তারপর লোকদের সামনে বসেন। নবীজি সালাত শেষ করে বসার পর যারা মদীনায় রয়ে গিয়েছিলেন, তারা তার কাছে গিয়ে শপথ করে করে অপারগতা পেশ করতে লাগলেন। এরা সংখ্যায় আশির অধিক ছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. বাহ্যত তাদের ওজর গ্রহণ করলেন, তাদের বায়াত করলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। প্রকৃত অবস্থা অন্য রকম হলে তার বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলেন।
(কাব রা. বলেন) আমিও এরপর রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে হাজির হলাম। আমি যখন তাকে সালাম দিলাম তখন তিনি রাগান্বিত চেহারায় মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, এসো। আমি এগিয়ে গিয়ে একেবারে তার সম্মুখে বসে গেলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী কারণে তুমি অংশগ্রহণ করলে না? তুমি কি যানবাহন ক্রয় করোনি? তখন আমি বললাম, হ্যাঁ, করেছি।
আল্লাহর কসম! আমি যদি আপনি ব্যতীত দুনিয়ার অন্য কোনো ব্যক্তির সামনে বসতাম, তাহলে আমি ওজর-আপত্তির মাধ্যমে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতাম। আমি কথায় পটু। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি জানি আজ যদি মিথ্যা কথা বলে আপনাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করি, তাহলে শীঘ্রই আল্লাহ তাআলা আপনাকে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দিতে পারেন। যদি আপনার কাছে সত্য প্রকাশ করি, যাতে আপনি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন; তবুও আমি এতে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার আশা করি। না, আল্লাহর কসম! আমার কোনো সমস্যা ছিল না। আল্লাহর কসম! আপনারা যখন যুদ্ধে যাচ্ছিলেন, তখন আমি সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবানদের একজন ছিলাম।
তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, সে সত্য কথাই বলেছে। তুমি এখন চলে যাও, যত দিন না তোমার সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ফয়সালা করে দেন। তাই আমি উঠে চলে এলাম। তখন বনু সালামার কতিপয় লোক আমার অনুসরণ করলো। তারা আমাকে বললো, আল্লাহর কসম! তুমি ইতোপূর্বে কোনো পাপ করেছো বলে আমাদের জানা নেই; তুমি কি অন্যান্যদের মতো রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে একটি ওজর পেশ করে দিতে পারতে না? আর তোমার এ অপরাধের কারণে তোমার জন্য রসূলুল্লাহ সা.-এর ক্ষমাপ্রার্থনাই তো যথেষ্ট ছিল। তারা আমাকে বার বার কঠিনভাবে ভৎর্সনা করতে থাকে। ফলে আমি পূর্ব স্বীকারোক্তি থেকে ফিরে গিয়ে মিথ্যা বলার বিষয়ে মনে মনে চিন্তা করতে থাকি।
আমি তাদের বললাম, আমার মতো এ কাজ আর কেউ করেছে কি? তারা জওয়াব দিল, হ্যাঁ, আরও দুজন তোমার মতো বলেছে এবং তাদের ব্যাপারেও তোমার মতো একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তারা কে কে? তারা বললো, একজন মুরারা ইবনে রবি অপরজন হিলাল ইবনে উমাইয়া ওয়াকিফি।
এরপর তারা আমাকে জানালো, তারা উভয়ে উত্তম মানুষ এবং তারা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। সেজন্য দুজনেই আদর্শস্থানীয়। যখন তারা তাদের নাম উল্লেখ করলো, তখন আমি পূর্ব মতের ওপর অটল রইলাম। রসূলুল্লাহ সা. আমাদের তিনজনের সঙ্গে কথা বলতে মুসলিমদের নিষেধ করে দিলেন। মুসলিমরা আমাদের এড়িয়ে চলতে লাগলো। আমাদের প্রতি তাদের আচরণ বদলে গেলো। মদীনা আমাদের কাছে অপরিচিত মতে হতে লাগলো।
এ অবস্থায় আমরা ৫০ রাত অতিবাহিত করলাম। আমার অপর দুজন সাথী নিজেদের ঘরেই থাকতেন। ঘরে বসে বসে কাঁদতেন। আমি যেহেতু অধিকতর যুবক ও শক্তিশালী ছিলাম, তাই বাইরে বের হতাম, জামাআতে নামায আদায় করতাম, বাজারে চলাফেরা করতাম; কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলতো না।
যখন তিনি সালাত শেষে মজলিসে বসতেন, তখন আমি তাকে সালাম দিতাম আর ভালো করে লক্ষ্য করতাম, তিনি আমার সালামের জবাবে তার ঠোঁটদ্বয় নেড়েছেন কি না। আমি তার কাছাকাছি জায়গায় সালাত আদায় করতাম এবং গোপনে তাকে দেখতাম, আমি যখন সালাতে মগ্ন হতাম তখন তিনি আমার দিকে তাকাতেন আর যখন আমি তার দিকে তাকাতাম, তখন তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে আমার প্রতি মানুষদের কঠোরতা ও এড়িয়ে চলা দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকে। একবার আমি আমার চাচাত ভাই ও প্রিয় বন্ধু আবু কাতাদাহ রা.-এর বাগানের প্রাচীর টপকে ঢুকে পড়ে তাকে সালাম দিই। কিন্তু আল্লাহর কসম! তিনি আমার সালামের জওয়াব দিলেন না। আমি তখন বললাম, হে আবু কাতাদাহ, আপনাকে আমি আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, আপনি কি জানেন, আমি আল্লাহ ও তার রসূলুল্লাহ সা.-কে ভালোবাসি? তিনি নীরব রইলেন। আমি পুনরায় তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি এবারও কোনো জবাব দিলেন না। আমি আবারও তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ ও তার রসূলুল্লাহ সা.-ই ভালো জানেন। তখন আমার চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু ঝরতে লাগলো। আমি আবার প্রাচীর টপকে ফিরে এলাম। কাআব রা. বলেন, একবার আমি মদীনার বাজারে হাঁটছিলাম, তখন দেখলাম সিরিয়ার এক বণিক, যে মদীনার বাজারে খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করার উদ্দেশ্যে এসেছিল; সে বলছে, আমাকে কাআব ইবনে মালেকের সাথে কেউ পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন কি? তখন লোকেরা আমার দিকে ইশারা করে দেখিয়ে দিলো। বণিক এসে গাস্সানি বাদশার একটি পত্র আমাকে দিলো। তাতে লেখা ছিল: "পর সমাচার এই, আমি জানতে পারলাম যে, আপনার সাথী আপনার প্রতি জুলুম করেছে। আর আল্লাহ আপনাকে মর্যাদাহীন ও নিরাশ্রয় সৃষ্টি করেননি। আপনি আমাদের দেশে চলে আসুন, আমরা আপনার সাহায্য করবো।"
আমি যখন এ পত্র পড়লাম তখন আমি বুঝলাম, এটাও আরও একটি পরীক্ষা। তখন আমি চুলা খুঁজে তার মধ্যে পত্রটি নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দিলাম। এ সময় ৫০ দিনের ৪০ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় রসূলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ থেকে এক সংবাদবাহক আমার কাছে এসে বললো, রসূলুল্লাহ সা. নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি আপনার স্ত্রী হতে পৃথক থাকবেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দেবো, না অন্য কিছু করবো? তিনি উত্তর দিলেন, তালাক দিতে হবে না; বরং তার থেকে পৃথক থাকুন এবং তার নিকটবর্তী হবেন না। আমার অপর দুজন সঙ্গীকেও একই আদেশ দেওয়া হলো। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি তোমার পিত্রালয়ে চলে যাও। আমার সম্পর্কে আল্লাহর ফয়সালা না-হওয়া পর্যন্ত তুমি সেখানে থাকো। কাআব রা. বলেন, আমার সঙ্গী হিলাল ইবনে উমাইয়্যার স্ত্রী রসূলুল্লাহ সা.-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রসূল! হিলাল ইবনে উমাইয়‍্যা অতি বৃদ্ধ; তার কোনো খাদেম নেই। আমি যদি তার খেদমত করি, এটা কি আপনি অপছন্দ করবেন? রসূলুল্লাহ সা. বললেন, না, তবে সে তোমার বিছানায় আসতে পারবে না। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এরকম কোনো অনুভূতিই তার নেই। তিনি এ নির্দেশ পাওয়ার পর থেকে সর্বদা কান্নাকাটি করছেন। (কাব রা. বলেন) আমার পরিবারের কেউ আমাকে পরামর্শ দিলো যে, আপনিও যদি আপনার স্ত্রীর ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে অনুমতি চাইতেন যেমন রসূলুল্লাহ সা. হিলাল ইবনে উমায়‍্যার স্ত্রীকে তার স্বামীর খেদমাত করার অনুমতি দিয়েছেন। আমি বললাম, আমি কখনো এ ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে অনুমতি চাইবো না। আমি তো নিজেই আমার খেদমত করতে সক্ষম। এরপর আরও ১০ রাত কাটালাম। এভাবে নবী সা. যখন থেকে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেন তখন থেকে ৫০ রাত পূর্ণ হলো।
৫০ তম রাত শেষে ফজরের সালাত আদায়ের পর আমাদের এক ঘরের ছাদে এমন অবস্থায় বসে ছিলাম, যে অবস্থার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বর্ণনা করেছেন। আমার জান-প্রাণ দুর্বিষহ এবং গোটা জগৎটা যেন আমার জন্য প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বে সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় শুনতে পেলাম এক ঘোষকের চিৎকার। সে সালা পর্বতের ওপর চড়ে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করছে, হে কাআব ইবনে মালেক, সুসংবাদ গ্রহণ করুন!
কাব রা. বলেন, এ শব্দ আমার কানে পৌঁছামাত্র আমি সেজদায় পড়ে গেলাম। আমি বুঝলাম, আমার সুদিন এসেছে। রসূলুল্লাহ সা. ফজরের সালাত আদায়ের পর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে আমাদের তওবা কবুল হওয়ার সুসংবাদ প্রকাশ করেন। একজন অশ্বারোহী আমার কাছে ছুটে আসছিল এ সুসংবাদ দিতে। আসলাম গোত্রের অপর এক ব্যক্তি দ্রুত পর্বতের ওপর আরোহণ করে চীৎকার করতে থাকে। তার চীৎকারের শব্দ ঘোড়ার আগে পৌছে যায়। সে যখন আমার কাছে পৌছলো, তখন তাকে সুসংবাদ প্রদান করার শুকরিয়াস্বরূপ আমার নিজের পরনের কাপড়দুটো খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম। আল্লাহর শপথ! সে সময় ওই দুটো কাপড় ব্যতীত আমার কাছে আর কোনো কাপড় ছিল না। ফলে আমি দুটো কাপড় ধার করে পরিধান করলাম এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে রওয়ানা হলাম। লোকেরা দলে দলে আমাকে ধন্যবাদ জানাতে আসতে লাগলো। তারা তওবা কবুলের মুবারকবাদ জানাচ্ছিলো। তারা বলছিল, তোমাকে মুবারাকবাদ, আল্লাহ তাআলা তোমার তওবা কবুল করেছেন।
কাআব রা. বলেন, অবশেষে আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন রসূলুল্লাহ সা. সেখানে বসা ছিলেন এবং তার চারদিকে জনতার সমাবেশ ছিল। তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. দ্রুত উঠে এসে আমার সঙ্গে মুসাফাহা করলেন ও মুবারকবাদ জানালেন। তিনি ব্যতীত আর কোনো মুহাজির আমার জন্য দাঁড়াননি। আমি তালহার আচরণ ভুলতে পারবো না।
কাআব রা. বলেন, এরপর আমি যখন রসূলুল্লাহ সা.-কে সালাম জানালাম, তখন তার চেহারা আনন্দের আতিশয্যে ঝকঝক করছিল। তিনি আমাকে বললেন, তোমার মাতা তোমাকে জন্ম দেওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত যতদিন তোমার ওপর অতিবাহিত হয়েছে তার মধ্যে উৎকৃষ্ট ও উত্তম দিনের সুসংবাদ গ্রহণ করো।
কাআব বলেন, আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রসূল! এটা কি আপনার পক্ষ থেকে না আল্লাহর পক্ষ থেকে? তিনি বললেন, আমার পক্ষ থেকে নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে। রসূলুল্লাহ সা. যখন খুশি হতেন তখন তার চেহারা এতো উজ্জ্বল ও ঝলমলে দেখাতো যেন পূর্ণিমার চাঁদের ফালি। এতে আমরা তার সন্তুষ্টি বুঝতে পারতাম। আমি তার সম্মুখে বসে নিবেদন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমার তওবা কবুলের শুকরীয়াস্বরূপ আমার ধনসম্পদ আল্লাহ ও তার রসূলুল্লাহ সা.-এর পথে দান করতে চাই। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, কিছু মাল নিজের কাছে রেখে দেওয়াই ভালো হবে। আমি বললাম, খায়বারে অবস্থিত আমার অংশটি আমার জন্য রাখলাম। আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ তাআলা সত্য বলার কারণে আমাকে রক্ষা করেছেন, তাই বাকি জীবনে আমি সত্যই বলবো। আল্লাহর কসম! যখন থেকে আমি এ সত্য বলার কথা রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে জানিয়েছি, তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমার জানা মতে কোনো মুসলমানকে সত্য কথার বিনিময়ে এরূপ নেয়ামত আল্লাহ দান করেননি; যে নেয়ামত আমাকে দান করেছেন। (কাব রা. বলেন) যেদিন রসূলুল্লাহ সা.- এর সম্মুখে সত্য কথা বলেছি সেদিন হতে আজ পর্যন্ত অন্তরে মিথ্যা বলার ইচ্ছাও করিনি। আমি আশা পোষণ করি যে, বাকি জীবনও আল্লাহ তাআলা আমাকে মিথ্যা থেকে রক্ষা করবেন। এরপর আল্লাহ তাআলা রসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর এই আয়াত অবতীর্ণ করেন:
لَقَدْ تَابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَad يَزِيعُ قُلُوبُ فَرِيقٍ مِنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَحِيمٌ وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
আল্লাহ দয়াশীল নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা কঠিন মুহূর্তে নবীর সঙ্গে ছিল যখন তাদের একদলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি দয়াপরবশ হন তাদের প্রতি। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুনাময়। এবং অপর তিনজনকে যাদেরকে পেছনে রাখা হয়েছিল। যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গেলো এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলো আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াময়, করুণাশীল। হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো ও সত্যবাদীদের সাথে থাকো।'
কাআব রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! ইসলাম গ্রহণের তওফিক দেওয়ার পর রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে আমার সত্য বলার তওফিকই আমার ওপর আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত। যদি মিথ্যা বলতাম তবে মিথ্যাচারীদের মতো আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম। সেই মিথ্যাচারীদের সম্পর্কে যখন ওহি অবতীর্ণ হয়েছে, তখন জঘন্য অন্তরের সেই লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
سَيَحْلِفُوْنَ بِاللهِ لَكُمْ إِذَا انْقَلَبْتُمْ إِلَيْهِمْ لِتُعْرِضُوا عَنْهُمْ فَأَعْرِضُوا عَنْهُمْ إِنَّهُمْ رِجْسٌ وَ مَاوُنَهُمْ جَهَنَّمُ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ يَحْلِفُوْنَ لَكُمْ لِتَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنْ تَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَسِقِينَ
তোমরা তাদের কাছে ফিরে আসলে তারা তোমাদের নিকট আল্লাহর নামে শপথ করবে যাতে তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর। কাজেই তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর, তারা অপবিত্র, তাদের বাসস্থান জাহান্নাম, তারা যা করেছে এটাই তার ন্যায্য প্রাপ্য। তারা তোমাদের কাছে শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের উপর খুশি হয়ে যাও, কিন্তু তোমরা তাদের উপর খুশি হলেও, আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়ের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না।
কাআব রা. বলেন, যারা তার কাছে ওযর পেশ করে শপথ করেছে, তিনি তাদের বায়াত গ্রহণ করেছেন এবং তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন। আমাদের বিষয়টি আল্লাহর ফয়সালা না-হওয়া পর্যন্ত রসূলুল্লাহ সা. স্থগিত রেখেছেন। এর প্রেক্ষাপটে আল্লাহ বলেন, 'এবং অপর তিনজনকে যাদেরকে পেছনে রাখা হয়েছিল। যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গেলো এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলো আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াময়, করুণাময়। ' কুরআনের এই আয়াতে তাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়নি, যারা তাবুক যুদ্ধ থেকে পেছনে ছিল এবং মিথ্যা কসম করে ওজর পেশ করেছিল, বরং এই আয়াতে ইশারা করা হয়েছে আমাদের দিকে; যারা পেছনে ছিলাম এবং যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল。

উপরোক্ত ঘটনায় আমরা যেসব শিক্ষা পাই, তা হলো:

ক. উচ্চ সাহিত্য মানসম্পন্ন বর্ণনা

উপরোক্ত হাদীসটি প্রাঞ্জল ও আবেগপূর্ণ ভাষায় বিবৃত হয়েছে। কাআব ইবনে মালেক-এর এ বক্তব্যটি লক্ষ করা যেতে পারে; যেখানে কত সুন্দর করে বলা হয়েছে, 'এরপর যখন প্রচারিত হলো যে, রসূলুল্লাহ সা. মদীনায় পৌছে যাচ্ছেন, তখন আমার অন্তর থেকে মিথ্যা দূর হয়ে গেলো। আর মনে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মালো যে, মিথ্যা-মিশ্রিত কোনো উপায়ে আমি তাকে ক্রোধমুক্ত করতে পারবো না। তাই আমি সত্য বলার সিদ্ধান্ত নিই।

খ. সত্যই মুক্তির বাহন

মিথ্যা কত নিকৃষ্ট, সেটা কাআব, হিলাল ও মুরারাহ রা. উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তারা অনেক কষ্ট-ক্লেশ ভোগ করলেও সত্য বলার পথ বেছে নেন। আল্লাহ তাআলার প্রতি তাদের ছিল অপরিসীম বিশ্বাস। ফলে তিনি তাদের তওবা কবুল করেছেন। এভাবে তারা পুনরায় ইসলামী সমাজের অংশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পান। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
يٰٓاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَ كُوْنُوْا مَعَ الصّٰدِقِيْنَ
হে বিশ্বাসীরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যপন্থীদের অর্ন্তভুক্ত হও।

গ. শিক্ষার লক্ষ্যে কাউকে এড়িয়ে চলা এবং সমাজে তার প্রভাব

কাউকে কোনো বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে শাস্তিস্বরূপ একঘরে করে রাখার মধ্যে অনেক উপকারিতা পাওয়া যায়। এতে তাদের পদচ্যুতি রোধ সম্ভব হয়। মানুষ যখন সামাজিক বয়কটের কথা বিবেচনায় রাখে, তখন সে অন্যায় কাজ করতে ভয় পায়। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এমন বিধিবিধান আরোপ করতে হবে এমন জায়গায়, যেখানে ইসলামী রাষ্ট্রের যথার্থ ক্ষমতা থাকবে। শাস্তিপ্রাপ্ত লোকটি মুরতাদ হয়ে যাওয়া বা অন্য কোনো বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা না থাকলেই এমন শাস্তি প্রয়োগ করা যাবে।
দুনিয়াবি কারণে বয়কট করা আর শরীয়তের কোনো আদেশ লঙ্ঘনের কারণে বয়কট করার মাঝে অবশ্যই পার্থক্য থাকতে হবে। আখেরাতের উদ্দেশ্যে যখন কাউকে বয়কট করে রাখা হবে, তখন যারা বয়কট করে রাখবে, তারা আল্লাহর পক্ষ হতে সাওয়াবপ্রাপ্ত হবে। পক্ষান্তরে দুনিয়াবি কারণে কোনো মুসলমানের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। এমন সম্পর্কচ্ছেদ তিনদিনের অধিক হলে তা হবে হারাম।

রসূলুল্লাহ সা. বলেন, মুসলমান ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখা কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ নয়। দুইজন মুসলমানের মধ্যে মনোমালিন্য হলে উত্তম ওই ব্যক্তি, যে আগে সালাম দেবে। আরেক হাদীসে এসেছে: রসূলুল্লাহ সা. বলেন, যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের সাথে এক বছর সম্পর্ক ছিন্ন রাখলো, সে যেন তার রক্ত ঝরালো。

ঘ. মুসলিম সমাজে নেতার নির্দেশ কার্যকরের গুরুত্ব

সাহাবায়ে কেরাম রা. রসূলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ থেকে বয়কট ও সম্পর্কচ্ছেদের নির্দেশ অকপটে মেনে নেন এবং কার্যকর করেন। কাআব ইবনে মালেক রা. নিজেদের অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, অতঃপর মানুষেরা আমাদের এড়িয়ে যেতে থাকে এবং আমাদের সাথে বিরূপ আচরণ করতে থাকে। আমাদের নিজেদের ভূমি যেন আমাদের জন্য অপরিচিত হয়ে উঠেছিল। আমার অপর দুজন সাথী নিজেদের ঘরেই থাকতেন। আর আমি যেহেতু যুবক ও শক্তিশালী ছিলাম, তাই বাইরে বের হতাম, জামাআতে নামায আদায় করতাম, বাজারে চলাফেরা করতাম। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলতো না。

কাআব তার চাচাতো ভাই আবু কাতাদা রা.-কে সালাম করলে তিনি তার সালামের উত্তর দেননি। তখন তিনি তাকে বারংবার আল্লাহর শপথ দিয়ে এ কথা জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি একথা জানো না যে, আমি আল্লাহ ও তার রসূলকে ভালোবাসি? জবাবে তিনি নিরবতা পালন করেন। অথচ তিনি ছিলেন তার সবচাইতে প্রিয় একজন মানুষ। আবু কাতাদা রা. এ ক্ষেত্রে একটি কঠিন পরীক্ষায় পতিত হয়েছিলেন। একদিকে তার সবচাইতে প্রিয় মানুষটির আহ্বানে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন ছিল, অন্যদিকে রসূল সা. তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের যে শাস্তি ঘোষণা করেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করাও প্রয়োজন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তিনি ঈমানি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রসূলের নির্দেশই পালন করেন。

এ বয়কট তখন সর্বোচ্চ মাত্রা পায়, যখন রসূল সা. তাদেরকে নিজের স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকতে বলেন। তাদের প্রত্যেকেই রসূল সা.-এর এই আদেশ পালন করেন। তন্মধ্যে হিলাল ইবনে উমাইয়্যা ছিলেন অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ। তাই তার স্ত্রী রসূল সা.-এর কাছে শুধু সেবার জন্য তার কাছে থাকার অনুমতি চাইলে রসূল সা. তাকে অনুমতি দেন। তবে তার সাথে অন্তরঙ্গ হতে নিষেধ করেন。

ঙ. পূর্ণ হৃদ্যতা কেবল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্য

মুসলমানদের ভেতরে অন্তর্দ্বন্ধ তৈরি করে ইসলামী সমাজের ভিত্তিমূলে আঘাত করার কাজে সবসময় সচেষ্ট ছিল খ্রিষ্টানরা। গাস্সানের বাদশা যখন শুনতে পেলো, মুসলমানরা কাআব ইবনে মালেক-এর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছে, তখন সে কাআবের কাছে তার চিঠিসম্বলিত বিশেষ দূত পাঠায়। চিঠিটি ছিল উস্কানিমূলক। চিঠিতে সে লিখেছিল, আপনার সঙ্গী আপনার সাথে অন্যায় আচরণ করছে মর্মে আমার কাছে সংবাদ এসেছে। আল্লাহ আপনাকে মর্যাদাহীন ও নিরাশ্রয় বানাননি। আপনি আমাদের দেশে চলে আসুন, আমরা আপনার সাহায্য করবো।

চিঠিটি পাওয়ার পর কাআব মন্তব্য করেছিলেন, এটা আমার জন্য নতুন বিপদ। নিশ্চয়ই আমার দ্বারা এমন কোনো অপরাধ হয়েছে, যার জন্য আমার দিকে কাফের সম্প্রদায় হাত বাড়াচ্ছে। সাথে সাথে তিনি তার চিঠিটি আগুনে নিক্ষেপ করেন。

চ. তাওবা কবুল করা আল্লাহর নেয়ামত

উপরোক্ত তিনজনের তাওবা কবুল সংক্রান্ত আয়াত অবতীর্ণ হলে আনন্দে রসূল সা.-এর চেহারা চাঁদের মতো উজ্জ্বল হয়ে যায়। খুব খুশি হন সাহাবায়ে কেরামও। তারা দলে দলে কাআব ও তার দুই সঙ্গীকে তাদের তওবা কবুলের সুসংবাদ জানান। কাআব রসূল সা.-এর সামনে উপস্থিত হলে তিনি তাকে বলছিলেন, তোমার জন্ম থেকে এ পর্যন্ত জীবনের সবচেয়ে উত্তম সুসংবাদ গ্রহণ করো। তাওবা কবুল হওয়াই ছিল কাআব ইবনে মালেক-এর জন্য সবচেয়ে খুশির সংবাদ। তিনি তার পরনের কাপড়জোড়া সুসংবাদদাতাকে দান করে দিয়েছিলেন। এমনিভাবে তার দুই সঙ্গীর আনন্দও ছিল অনুরূপ。

ওয়াকেদী বর্ণনা করেন, সাঈদ ইবনে যায়েদ রহ. হিলাল ইবনে উমাইয়্যা রা.-কে তার তাওবা কবুলের সুসংবাদ দিলে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো আত্মা বের হওয়া পর্যন্তই তিনি সেজদাবনত থাকবেন。

টিকাঃ
১৫৫১. সুরা তাওবা: আয়াত ১১৭-১১৯।
১৫৫২. সুরা তাওবা: আয়াত ৯/৯৫-৯৬।
১৫৫০. সুরা তাওবা: আয়াত ১১৮।
১৫৫৪. সহীহ বুখারী: ৪৪১৮।
১৫৫৫. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৮/১৩৭।
১৫৫৬. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৮/১৩৮।
১৫৫৭. সুরা তাওবা: আয়াত ১১৯।
১৫৫৮. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৮/১৩৮।
১৫৫৯. সহীহ মুসলিম: ২৫৬০।
১৫৬০. মুসনাদে আহমদ: ৪/২২০।
১৫৬১. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ১৯৫।
১৫৬২. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী:: ৮/১৪০।
১৫৬৩. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ১৯৬।
১৫৬৪. সহীহ বুখারী: ৪৪১৮।
১৫৬৫. মাগাযী: ৩/১০৫১-১০৫২।
১৫৬৬. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৮/১৪১।
১৫৬৭. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৫১৮।
১৫৬৮. ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ৩/১০৫৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00