📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মদীনার আশেপাশে বসবাসরত মুনাফেক

📄 মদীনার আশেপাশে বসবাসরত মুনাফেক


মদীনার কাছাকাছি অবস্থানরত গ্রাম্য মুনাফেকদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَجَاءَ الْمُعَذِّرُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ لِيُؤْذَنَ لَهُمْ وَقَعَدَ الَّذِينَ كَذَبُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ سَيُصِيبُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
আর গ্রামবাসীদের থেকে ওযর পেশকারীরা এলো, যেন তাদের অনুমতি দেয়া হয় এবং (জিহাদ না করে) বসে থাকলো তারা, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে মিথ্যা বলেছিল। তাদের মধ্য থেকে যারা কুফরী করেছে, তাদেরকে অচিরেই যন্ত্রণাদায়ক আযাব আক্রান্ত করবে।

টিকাঃ
১৫২৮. সুরা তাওবা ৯০।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মদীনায় অবস্থানরত মুনাফেক

📄 মদীনায় অবস্থানরত মুনাফেক


তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَرِحَ الْمُخَلَّفُونَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلَافَ رَسُولِ اللَّهِ وَكَرِهُوا أَنْ يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَالُوا لَا تَنْفِرُوا فِي الْحَرِّ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا لَوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ فَلْيَضْحَكُوا قَلِيلًا وَلْيَبْكُوا كَثِيرًا جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ فَإِنْ رَجَعَكَ اللَّهُ إِلَى طَائِفَةٍ مِنْهُمْ فَاسْتَأْذَنُوكَ لِلْخُرُوجِ فَقُلْ لَنْ تَخْرُجُوا مَعِيَ أَبَدًا وَلَنْ تُقَاتِلُوا مَعِيَ عَدُوًّا إِنَّكُمْ رَضِيتُمْ بِالْقُعُودِ أَوَّلَ مَرَّةٍ فَاقْعُدُوا مَعَ الْخَالِفِينَ
পেছনে থাকা লোকগুলো আল্লাহর রসূলের বিপক্ষে বসে থাকতে পেরে খুশি হলো, আর তারা অপছন্দ করলো তাদের মাল ও জান নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে এবং তারা বললো, 'তোমরা গরমের মধ্যে বের হয়ো না'। বলো, 'জাহান্নামের আগুন অধিকতর গরম, যদি তারা বুঝতো'। অতএব তারা অল্প হাসুক, আর বেশি কাঁদুক, তারা যা অর্জন করেছে তার বিনিময়ে। অতএব যদি আল্লাহ তোমাকে তাদের কোনো দলের কাছে ফিরিয়ে আনেন এবং তারা তোমার কাছে বের হওয়ার অনুমতি চায়, তবে তুমি বলো, 'তোমরা আমার সাথে কখনো বের হবে না এবং আমার সাথে কোনো দুশমনের বিরুদ্ধে কখনও লড়াই করবে না। নিশ্চয় তোমরা প্রথমবার বসে থাকাই পছন্দ করেছো, সুতরাং তোমরা বসে থাকো পেছনে (বসে) থাকা লোকদের সাথে।
ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের অপরাধের জন্য এমনই করে থাকেন। সুতরাং যেসব মুমিন বান্দাদের তিনি ভালোবাসেন, সামান্য ভুলের জন্যও ধরে ফেলেন, যাতে তারা সবসময় সাবধান থাকে。

টিকাঃ
১৫২৯. সুরা তাওবা ৮১-৮৩।
১৫৩০. যাদুল মাআদ: ৩/৫৭৮।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মসজিদে যিরার

📄 মসজিদে যিরার


রসূলুল্লাহ সা. তাবুক থেকে মদীনায় ফেরার সময় আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন :
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لِمَنْ حَارَبَ اللهَ وَرَسُولَهُ مِنْ قَبْلُ وَلَيَحْلِفُنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ
আর যারা মসজিদ বানিয়েছে ক্ষতিসাধন, কুফরী ও মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ইতোপূর্বে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যে লড়াই করেছে তার ঘাঁটি হিসেবে। আর তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, 'আমরা কেবল ভালো চেয়েছি'। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। তুমি ওর ভিতরে কক্ষনো দাঁড়াবে না। প্রথম দিন থেকেই যে মসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত, তোমার দাঁড়ানোর জন্য সেটাই অধিক উপযুক্ত, সেখানে এমন সব লোক আছে যারা পবিত্রতা লাভ করতে ভালবাসে, আর আল্লাহ পবিত্রতা লাভকারীদের ভালোবাসেন।
এই আয়াতগুলোর শানে নুযূল অর্থাৎ অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এই যে, রসূলুল্লাহ সা.-এর মদীনায় আগমনের পূর্বে সেখানে খাযরাজ গোত্রের একটি লোক বাস করতো যার নাম ছিল আবু আমির রাহিব। অজ্ঞতার যুগে সে খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং আহলে কিতাবের জ্ঞান লাভ করেছিল। জাহিলিয়াতের যুগে সে বড় আবেদ লোক ছিল। নিজের গোত্রের মধ্যে সে খুব মর্যাদা লাভ করেছিল। নবী সা. যখন হিজরত করে মদীনায় আসেন, মুসলিমরা তাঁর কাছে একত্রিত হতে শুরু করে, ইসলামের উন্নতি সাধিত হয় এবং বদরের যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে জয়যুক্ত করেন, তখন এটা আবু আমিরের ভালো লাগেনি। সে খোলাখুলিভাবে ইসলামের প্রতি শত্রুতা প্রকাশ করতে শুরু করে এবং মদীনা হতে পলায়ন করে মক্কার কাফের ও মুশরিক কুরায়েশদের সাথে মিলিত হয়। তাদেরকে সে রসূলুল্লাহ সা.-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে আরবের সমস্ত গোত্র একত্রিত হয় এবং উহুদ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। অবশেষে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং মুসলিমরা বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এই যুদ্ধে মুসলিমদেরকে পরীক্ষা করেন। তবে পরিণাম ফল তো আল্লাহভীরুদের জন্যেই।
এ পাপাচারী (আবূ আমির) উভয় দিকের সারির মাঝে কয়েকটি গর্ত খনন করে রেখেছিল। একটি গর্তে রসূলুল্লাহ সা. পড়ে যান এবং আঘাতপ্রাপ্ত হন। তার চেহারা মুবারক যখম হয়ে যায় এবং নীচের দিকের সামনের চারটি দাঁত ভেঙ্গে যায়। তার পবিত্র মস্তকও আহত হয়। যুদ্ধের শুরুতে আবু আমির তার কওম আনসারদের দিকে অগ্রসর হয়ে তাদেরকে সম্বোধন করে তাকে সাহায্য সহযোগিতার জন্যে দাওয়াত দেয়। আনসারগণ বললেন, 'ওরে নরাধম ও পাপাচারী! ওরে আল্লাহর শত্রু! আল্লাহ তোকে ধ্বংস করুন!' এভাবে তারা তাকে গালি দেন ও অপমান করেন। তখন সে বলে, 'আমার অনুপস্থিতিতে কওম আরো বিগড়ে গেছে।'
এ কথা বলে সে ফিরে যায়। রসূলুল্লাহ সা. তাকে তার মদীনা হতে পলায়নের পূর্বে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং কুরআন শুনিয়েছিলেন। কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এবং ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করে। তখন রসূলুল্লাহ সা. তার জন্য বদ দোআ করেন যে, সে যেন নির্বাসিত হয় এবং বিদেশেই যেন সে মৃত্যুবরণ করে। এই বদ দোআ কবুল হয়ে যায় এবং যখন উহুদ যুদ্ধ শেষ হলো এবং সে লক্ষ্য করলো যে, ইসলাম দিন দিন উন্নতির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সে রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে গমন করলো এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর বিরুদ্ধে তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করলো। সম্রাট তাকে সাহায্য করার অঙ্গীকার করলো। সে তার আশা পূর্ণ হতে দেখে হিরাক্লিয়াসের কাছেই অবস্থান করতে লাগলো। সে তার কওম আনসারদের মধ্যকার মুনাফেকদেরকে লিখলো যে, 'আমি সেনাবাহিনী নিয়ে আসছি। রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে বড় যুদ্ধ সংঘটিত হবে। আমরা তার উপর জয়যুক্ত হবো এবং ইসলামের পূর্বে তাঁর অবস্থা যেমন ছিল তিনি ওই অবস্থাতেই ফিরে যাবেন।'
সে ওই মুনাফেকদের পরামর্শ দিলো, তারা যেন তার জন্যে একটা আশ্রয়স্থান নির্মাণ করে রাখে। আর যেসব দূত তার নির্দেশনামা নিয়ে যাবে তাদের জন্যেও যেন নিরাপদ জায়গা বানানো হয়, যাতে সে নিজেও যখন যাবে তখন সেটা তার গুপ্ত আস্তানা হতে পারে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ওই মুনাফেকরা মসজিদে কুবার নিকটেই আর একটি পাকা মসজিদ বানায়। রসূলুল্লাহ সা.-এর তাবুক অভিমুখে বের হওয়ার পূর্বেই। তারা মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ করে ফেলে। অতঃপর তারা রসূলুল্লাহ সা.- এর কাছে এসে আবেদন করে, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাদের ওখানে চলুন এবং আমাদের মসজিদে নামায পড়ুন, যাতে সবাই বুঝতে পারে, এই মসজিদটি ওই জায়গায় থাকতে পারে এবং এতে আপনার সমর্থন রয়েছে। নবীজির সামনে তারা বলে, দুর্বল লোকদের জন্যেই তারা এই মসজিদটি নির্মাণ করেছে এবং ঠাণ্ডার রাত্রিতে যেসব রোগগ্রস্ত লোক দূরের মসজিদে যেতে অক্ষম, তাদের জন্য এই মসজিদে আসা সহজ হবে।
কিন্তু আল্লাহ তাআলা চাননি নবী সা. ওই মসজিদে নামায আদায় করুন। সুতরাং রসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে বললেন, 'এখন তো আমরা সফরে বের হওয়ার জন্যে ব্যস্ত রয়েছি, ফিরে আসার পর আল্লাহ চান তো দেখা যাবে।'
তাবুক থেকে ফেরার পথে যখন মদীনায় পৌঁছতে একদিনের পথ বা তার চেয়েও কম দূরত্ব বাকী ছিল, তখন জিবরাঈল আ. মসজিদে যিরারের খবর নিয়ে নবীজির কাছে হাযির হন এবং মুনাফেকদের গোপন তথ্য প্রকাশ করে দেন, মসজিদে কুবার নিকটে আর একটি মসজিদ নির্মাণ করে মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করাই হচ্ছে ওই কাফের ও মুনাফেকদের আসল উদ্দেশ্য। মসজিদে কুবা হচ্ছে এমন এক মসজিদ যার ভিত্তি তাকওয়ার উপর স্থাপিত হয়েছে।
এটা জানার পর রসূলুল্লাহ সা. মদীনা পৌঁছার পূর্বেই কিছু লোককে মসজিদে যিরার ধ্বংস করার জন্য পাঠিয়ে দেন। এই হচ্ছে ইবনে কাসীর রহ. বর্ণিত উপরোক্ত আয়াতের শানে নুযূল। এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা মুনাফেকদের মসজিদ নির্মাণের চারটি উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন:
১. সাধারণ মুসলমানদের ক্ষতিসাধন।
২. আল্লাহর সাথে কুফরি করা ও ইসলামী শক্তির ক্ষতিসাধন করা। কেননা, তারা উক্ত মসজিদটি মূলত মুনাফেকদের শক্তি বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিল।
৩. মুমিনদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা। তারা মসজিদে কুবায় নামাযের উদ্দেশ্যে যাবে না, ফলে মসজিদে মুসলমানদের উপস্থিতির সংখ্যা হ্রাস পাবে-এই ছিল তাদের এই মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্য।
৪. আল্লাহ ও রসূলের শত্রুদের আশ্রয়স্থল হিসেবে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
আল্লাহ তাআলা নবীজিকে মসজিদটি নির্মাণের রহস্য জানিয়ে দেন এবং সেটা ধ্বংস করে দিতে বলেন। এভাবেই মুখ থুবড়ে পড়ে মুনাফেকদের যাবতীয় পরিকল্পনা। আল্লাহ বলেন: 'তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, আমরা কেবল ভাল চেয়েছি।' এখানে তাদের মিথ্যা শপথগুলোর নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহ নিজেই এ কথার সাক্ষ্য দেন এভাবে: 'আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।'
ওই মসজিদে নামায পড়তে নিষেধ করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা নবীজি ও মুমিনদের বলেন: 'তুমি ওই মসজিদের ভেতরে কক্ষনো দাঁড়াবে না। প্রথম দিন থেকেই যে মসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত, তোমাদের দাঁড়ানোর জন্য সেটাই অধিক উপযুক্ত, সেখানে এমন সব লোক আছে যারা পবিত্রতা লাভ করতে ভালবাসে, আর আল্লাহ পবিত্রতা লাভকারীদের ভালোবাসেন। '
ইবনে আশূর বলেন, আল্লাহর বাণী: 'তুমি ওর ভিতরে কক্ষনো দাঁড়াবে না।'-এর দ্বারা মূলত নামায পড়তে নিষেধ করা হয়। কেননা নামাযের প্রথম রুকন 'কিয়াম' তথা দাঁড়ানো। আল্লাহ রসূলকে ওই মসজিদে নামায পড়তে নিষেধ করেছিলেন যেন ওই মসজিদ নির্মানে রসূল সা.-এর সম্মতি আছে এরকম বোঝা না যায়। কেননা, এমনটি হলে মসজিদে কুবার আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য থাকতো না। আর এ কারণেই রসূল সা. আম্মার ইবনে ইয়াসির ও মালেক ইবনে দুখশুম রা.-এর সঙ্গে আরও কয়েকজন সাহাবীকে ওই মসজিদের দিকে পাঠান। তিনি তাদের নির্দেশ দেন, 'তোমরা দুষ্কৃতিকারী ও ইসলামবিদ্বেষীদের নির্মিত মসজিদে গিয়ে তা ধ্বংস করে দাও। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দাও। সাহাবীরা নবীজির নির্দেশ পালন করেন।
পবিত্র কুরআনে মুনাফেকদের মসজিদে নামায পড়ার বিপরীতে মসজিদে নববী বা মসজিদে কুবায় নামায আদায়ের আদেশ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, যে মসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত, তোমাদের দাঁড়ানোর জন্য সেটাই অধিক উপযুক্ত, সেখানে এমন সব লোক আছে যারা পবিত্রতা লাভ করতে ভালোবাসে, আর আল্লাহ পবিত্রতা লাভকারীদের ভালোবাসেন।
ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন, উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হলে রসূল সা. আনসারী সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের পবিত্রতা অর্জন পদ্ধতির প্রশংসা করেছেন। তোমরা কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করো? জবাবে তারা বললেন, আমরা নামাযের জন্য অজু করি এবং গোসল আবশ্যক হলে গোসল করি এবং (ইসতিনজায়) পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করি। রসূল সা. বললেন, এ জন্যই তোমরা প্রশংসিত হয়েছো। এটি চালু রেখো।
মসজিদে যিরারের ঘটনা থেকে আমরা যেসব শিক্ষা পাই, তা হলো :
ক. কাফিরেরা একই গোষ্ঠীভুক্ত
আবু আমেরের ঘটনায় আমরা দেখতে পাই, গাযওয়ায়ে বদরে মুশরিক বাহিনী পরাজিত হলে সে নবীজির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে শত্রুতার ঘোষণা দিয়ে বসে। এ লক্ষ্যে সে মদীনা থেকে ছুটে যায় মক্কায়। সেখানে গিয়ে কাফেরদের ক্ষিপ্ত করে তোলে مسلمانوں বিরুদ্ধে। উহুদ যুদ্ধে ইসলামের বিরুদ্ধে শুধু যুদ্ধই করেনি, সে مسلمانوں মধ্যে এসেও ফাটল ধরানোর চেষ্টা চালিয়েছে। যার বর্ণনা আল্লাহ তাআলা দিচ্ছে এভাবে :
وَالَّذِينَ كَفَرُوا بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ إِلَّا تَفْعَلُوْهُ تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَ فَسَادٌ كَبِيرٌه
• আর যারা কুফরী করে, তারা একে অপরের বন্ধু। যদি তোমরা তা না কর, তাহলে জমিনে ফেতনা ও বড় ফাসাদ হবে।
খ. مسلمانوں বিভ্রান্ত করার কুমতলব
মুনাফেকরা চেয়েছিল, তাদের নির্মিত মসজিদটি مسلمانوں মসজিদ হিসেবে স্বীকৃতি পাক। যাতে তারা নিজেদের চক্রান্ত জোরদার করতে পারে। এ লক্ষ্যে তারা নবীজিকে এই মসজিদে নামায আদায়ের অনুরোধ জানায়। যাতে সবাই মনে করে, এটা রসূল সা.-এর বরকতময় মসজিদ। এটা ছিল তাদের চক্রান্তের পথ সহজ করার চিন্তা। মুনাফেক ও ইসলামবিরোধী জোট যুগে যুগে এভাবেই مسلمانوں বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে।
গ. আল্লাহই উত্তম নিরাপত্তাদানকারী ও করুণার আধার
রসূলুল্লাহ সা.-কে আল্লাহ তাআলা কতোটা উঁচু পর্যায়ের নিরাপত্তা ও দয়ার চাদরে ঢেকে রাখতেন, সেটা ভাবতে গেলে যে কোনো গবেষক চমকে উঠবেন। আল্লাহ তাআলা নবীজিকে মুনাফেকদের গোপন পরিকল্পনা ও মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্য জানিয়ে দেন। অন্যথায় রসূল Sa. মুনাফেকদের মনোবাসনা জানতেন পারতেন না। তিনি তাদের নির্মিত মসজিদে নামায পড়তে যেতেন। ফলে মসজিদটি مسلمانوں মসজিদ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতো। রসূল Sa. নামায পড়লে অন্যান্য মুসলমানরাও সেখানে নামায পড়তে যেতো। এভাবে মুনাফেক ও দুর্বলমনা مسلمانوں মধ্যে পারস্পরিক কথোপকথন ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে মুনাফেকদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতো।
ঘ. সংক্রমণ রোধে নববী প্রতিষেধক
মুনাফেকদের মসজিদে যিরার ধ্বংসের ব্যাপারে রসূল Sa. খুবই দূরদর্শী ভূমিকা পালন করেন। তিনি এ ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা মুসলিম নেতাদের জন্য শিক্ষণীয়। যারা মুসলমান ও ইসলামের মধ্যে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, তাদের বিরুদ্ধে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তার দিকনির্দেশনা আছে উপরোক্ত ঘটনায়।
নবীজির নির্দেশ মুসলমানরা যেভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন, তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মুনাফেকদের নোংরা চক্রান্তের বিরুদ্ধে রসূল Sa. যে পন্থা অবলম্বন করেছিলেন সেটা ছিল সর্বোত্তম পন্থা। আর এ পন্থা অবলম্বন করে ইসলামী সমাজ থেকে ইসলামবিদ্বেষী শক্তির মুলোৎপাটন সম্ভব। কারণ, রসূল Sa. ও সাহাবায়ে কেরামের গৃহীত পদক্ষেপের কারণে ধীরে ধীরে মুনাফেকদের শক্তি এতটাই হ্রাস পেয়েছিল যে, নবীজি যখন ইন্তেকাল করেন তখন মদীনায় গুটিকয়েক মুনাফেক অবশিষ্ট ছিল। তাদের নির্মিত মসজিদে যিরারের ব্যাপারে এ ধরনের শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে পরবর্তীতে তারা এ ধরনের কোনো মসজিদ নির্মাণের চিন্তাও করতে পারেনি।
ঙ. যেসব মসজিদ মসজিদে যিরারের বিধানের আওতাভুক্ত
তাফসীরকারকদের ভাষ্য মতে, যেসব মসজিদ মসজিদে যিরারের বিধানের আওতাভুক্ত, তা হলো:
১. আল্লামা যামাখশারী রহ. বলেন, যেসব মসজিদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে অথবা অবৈধ সম্পদ দ্বারা নির্মান করা হয়েছে, ওই সব মসজিদ মসজিদে যিরারের বিধানের আওতাভুক্ত।
ড. আবদুল করিম যায়দান আল্লামা যামাখশারী রহ.-এর এই ভাষ্যের টীকায় বলেন, এ ধরনের মসজিদগুলো মসজিদে যিরারের অনুরূপ হলেও মদীনায় নির্মিত মসজিদে যিরার যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল, এ ধরনের মসজিদগুলোকে সেভাবে ধ্বংস করা হবে না। বরং এ ধরনের মসজিদগুলো মসজিদে যিরারের সাথে শুধু এ দৃষ্টিকোণ থেকে সাদৃশ্য রাখবে যে, এ ধরনের মসজিদ তাকওয়ার ভিত্তিতে নির্মিত হয়নি।
২. ইমাম কুরতুবী রহ.-এর বক্তব্য: আমাদের উলামায়ে কেরাম বলেন, যেসব মসজিদ অনিষ্টের জন্যে বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয় তা মসজিদে যিরার হিসেবে গণ্য হবে এবং তাতে নামায আদায় করা জায়েয হবে না।
৩. সাইয়েদ কুতুব শহীদ রহ. তার তাফসীর গ্রন্থে বলেন, মসজিদে যিরারের মতো মসজিদগুলো বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। বাহ্যিকভাবে ইসলামের ইবাদতের জায়গা হলেও অভ্যন্তরীণভাবে ইসলাম ও मुसलमानों বিভ্রান্ত করার জন্য এগুলো নির্মাণ করা হয়। এগুলোতে অনেক ইসলামবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। ধর্মকে কেবল ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মীয় বিভিন্ন সংগঠন, বিভিন্ন সেমিনার ও পুস্তিকার মাধ্যমে ইসলামবিরোধী বক্তব্য প্রচার করা হয়।
চ. মসজিদে যিরারের মতো মসজিদ চেনার উপায়
ড. আবদুল করিম যায়দান বলেন, যেসব মসজিদ বাহ্যত শরীয়তসম্মতভাবে নির্মিত, কিন্তু মূলত উদ্দেশ্য হয় ইসলামের বিরোধিতা, সেসব মসজিদের ক্ষেত্রে মসজিদে যিরারের বিধান আরোপিত হবে। কেননা, প্রতিষ্ঠাগত উদ্দেশ্য হিসেবে তা মসজিদে যিরারের মতো। অন্যভাবে বলতে গেলে, যেসব প্রতিষ্ঠান শরীয়তসমর্থিত কাজের জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও মূলত मुसलमानों ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে নির্মিত, তাতে মসজিদে যিরারের বিধান আরোপিত হবে।
এই মূলনীতির আলোকে যেখানে স্পষ্টভাবে শিরকি কর্মকাণ্ড বা মাদকদ্রব্য সরবরাহসহ অন্যান্য শরীয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়, সেখানে মসজিদে যিরারের বিধান আরোপ হবে না। কেননা, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বাহ্যিকভাবেই শরীয়তবিরোধী। এক্ষেত্রে প্রকাশ্যে-গোপনে শরীয়তবিরোধী হওয়ার কারণে মসজিদে যিরারের মতো এ ধরনের প্রতিষ্ঠানও উপড়ে ফেলতে হবে।
ছ. মুসলিম দেশগুলোতে মসজিদে যিরার
ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রু মুনাফেক, নাস্তিক ও পশ্চিমা হানাদার শক্তিগুলো ইসলামের অসম্মান, مسلمانوں ধর্মবিশ্বাস ও ইবাদতে সন্দেহের বীজ বপন করার লক্ষ্যে ইবাদতের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করছে। ধর্মীয় শিক্ষার নামে তারা এমন প্রতিষ্ঠান বানিয়েছে, যার মাধ্যমে তারা তাদের ইসলামবিরোধী বিষাক্ত পরিকল্পনা মুসলমান শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে। مسلمانوں অন্তর থেকে সঠিক ধর্মবিশ্বাস ও ইসলামী চেতনা বিনাশের লক্ষ্যে তারা সভ্যতা ও ঐতিহ্যের নামে বিভিন্ন সংস্থা দাঁড় করাচ্ছে। অসুস্থ ও দুঃস্থ মানুষদের সেবার নামে ধর্মবিমুখ করার উদ্দেশ্যে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা ও সমাজসেবার নামে হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ করছে। দরিদ্র ও ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ অঞ্চলে বিশেষতঃ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে তারা এমনটি করে যাচ্ছে। জ্ঞান, শরীয়ত ও আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার সুযোগ নিচ্ছে তারা।
মসজিদে যিরারের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এমন নয় যে, এটা ইসলামের শুরু যুগে ঘটেছিল, আর ঘটবে না। বরং এমন ঘটনা চলমান। সূক্ষ্মভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে অহরহ এমন পরিকল্পনা ও চক্রান্ত চলছে। মানুষ যেন দীন ছেড়ে দেয়, পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করা ছেড়ে দেয়-এটাই তাদের লক্ষ্য। আর তাদের চক্রান্তের জালে পা দিয়ে দুনিয়া-আখেরাত খোয়াচ্ছে অসংখ্য মানুষ।

টিকাঃ
১৫৩১. সুরা তাওবা ১০৭-১০৮।
১৫৩২. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/৩৮৮।
১৫৩৩. তাফসীরে শাওকানী: ২/৪০৩।
১৫৩৪. সুরা তাওবা: ১০৮।
১৫৩৫. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/১৮৪।
১৫৩৬. সুনানে ইবনে মাজাহ: ১/১২৭।
১৫৩৭. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ১৭৯।
১৫৩৮. সুরা আনফাল ৭৩।
১৫৩৯. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ১৮১।
১৫৪০. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ১৮১।
১৫৪১. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৮/১৩০।
১৫৪২. তাফসীরে যমখশরী: ২/৩১০।
১৫৪৩. আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন: ৩/৫০৪।
১৫৪৪. তাফসীরে কুরতুবী: ৮/২৫৪।
১৫৪৫. ফি যিলালিল কুরআন: ৩/১৭১০-১৭১১।
১৫৪৬. আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন: ২/৫০৬।
১৫৪৭. প্রাগুক্ত: ২/৫০৪।
১৫৪৮. প্রাগুক্ত: ২/৫০৭।
১৫৪৯. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নাবাবিয়াহ; ২/৫০৮।
১৫৫০. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ৮৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00