📄 মুনাফেকদের ভূমিকা সম্পর্কে কুরআনের ভাষ্য
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর বর্ণনা
গাযওয়ায়ে তাবুকের সময় এক ব্যক্তি কোনো এক বৈঠকে বললো, কুরআন তেলাওয়াতকারীগণই খাবার-দাবারে অত্যধিক লোভী, কথাবার্তায় মিথ্যুক ও যুদ্ধক্ষেত্রে কাপুরুষ। সেখানে উপস্থিত জনৈক ব্যক্তি তার জবাবে বললেন, নিঃসন্দেহে তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি একজন মুনাফেক। আমি অবশ্যই কথাটি নবীজির কাছে পেশ করবো। নবীজির কাছে এ সংবাদ পৌঁছানো হলে তার ওপর কুরআন অবতীর্ণ হলো। আবদুল্লাহ রা. বলেন, আমি দেখছিলাম, সে রসূল সা.-এর উটের রশির সাথে বাঁধা অবস্থায় পাথরের আঘাত খেতে খেতে বলছিল, হে আল্লাহর রসূল! আমরা তো সামান্য হাস্য-রসিকতা করছিলাম। রসূল সা. বললেন, আল্লাহ তাআলা, তার নিদর্শনাবলি ও তার রসূলের ব্যাপারে তোমরা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করো?
কাতাদা রা.-এর বর্ণনায় এসেছে: রসূলুল্লাহ সা. তাবুকে অবস্থানকালে একদিন তার আশেপাশে কিছু মুনাফেক বলাবলি করছিল, এই ব্যক্তি তোমাদের সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ ও দুর্গসমূহ বিজয় করার সুসংবাদ দেয় অথচ সেটা সম্পূর্ণ অসম্ভব। রসূল সা.-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে এসব কথোপকথনের সংবাদ দেওয়া হলে তিনি তাদেরকে বাহনের সাথে বেঁধে রাখার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি তাদের সামনে এসে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি আমার ব্যাপারে এই ধরনের মন্তব্য করেছো? জবাবে তারা বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমরা তো সামান্য হাস্য-রসিকতা করছিলাম। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَحْذَرُ الْمُنَافِقُونَ أَنْ تُنَزَّلَ عَلَيْهِمْ سُورَةٌ تُنَبِّئُهُمْ بِمَا فِي قُلُوبِهِمْ قُلِ اسْتَهْزِئُوا إِنَّ اللَّهَ مُخْرِجٌ مَا تَحْذَرُونَ وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
মুনাফেকরা ভয় পায় তাদের মনের কথা প্রকাশ করে তাদের ব্যাপারে কোন সূরাহ নাযিল হয়ে যায় নাকি। বলো, 'ঠাট্টা করতে থাকো, তোমরা যে ব্যাপারে ভয় পাও, আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিবেন'। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা জোর দিয়েই বলবে, 'আমরা হাস্য রস আর খেল-তামাশা করছিলাম।' বলো, 'আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রসূলকে নিয়ে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে? '
পবিত্র কুরআনে 'আল্লাহ, তার আয়াত ও তার রসূলকে নিয়ে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে?' এই প্রশ্নবোধক বাক্য দ্বারা তাদের কর্মকাণ্ডকে নেতিবাচকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, হে মুহাম্মাদ, আপনি তাদের তিরস্কার ও নিন্দা করতে গিয়ে তাদের বলুন, তোমরা কি তোমাদের ঠাট্টা ও বিদ্রূপ করার জন্য অন্য কোনো বিষয় পাচ্ছিলে না? কেন তোমরা আল্লাহর বিধিবিধান, আল্লাহর নিদর্শন ও তার রসূল সা. যিনি তোমাদের জন্য হেদায়াত নিয়ে এসেছেন এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পথপ্রদর্শন করতে এসেছেন, তা নিয়ে হাস্য-রসিকতা করছো? এরপর আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, এমন হাস্য-রসিকতা মূলত মানুষকে কুফরির দিকে নিয়ে যায়।
لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِنْ نَعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةٌ بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ
অজুহাত পেশ করার চেষ্টা করো না, ঈমান আনার পর তোমরা কুফরী করেছো। তোমাদের মধ্যকার কোনো দলকে ক্ষমা করলেও অন্যদেরকে শাস্তি দেবো, কারণ তারা অপরাধী。
এর দ্বারা বোঝা যায়, এদের মতো অন্যায়ের অজুহাত পেশ করা অন্যায় কাজে লিপ্ত হওয়ার চেয়েও মারাত্মক। আল্লাহ তাআলার বাণী: 'তোমাদের মধ্যকার কোনো দলকে ক্ষমা করলেও অন্যদেরকে শাস্তি দেবো, কারণ তারা অপরাধী।' অর্থাৎ এসব অপরাধে অপরাধীদের কাউকে যদিও তাওবা ও অনুশোচনার কারণে ক্ষমা করে দিই, অন্যদের অবশ্যই এর শাস্তি ভোগ করতে হবে। যেমন, তাদের মধ্য হতে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিল মুখশিন ইবনে হুমাইরকে。
টিকাঃ
১০০০. আদদুররুল মানছুর: ৪/২৩০।
১৫০৬. সূরা তাওবাহ: আয়াত ৬৪-৬৫।
১৫০৭. সূরা তাওবাহ: আয়াত ৬৬।
১৫০৮. তাফসীরুল মুরাগি: ৪/১৫৩।
১০০৯. তাফসীরুল মুরাগি: ৪/১৫৩।
📄 নবীজির ওপর অতর্কিত আক্রমণের পরিকল্পনা
এসব মুনাফেকের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন : يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ وَهَمُّوا بِمَا لَمْ يَنَالُوا وَمَا نَقَمُوا إِلَّا أَنْ أَغْنَاهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ مِنْ فَضْلِهِ فَإِنْ يَتُوبُوا يَكُ خَيْرًا لَهُمْ وَإِنْ يَتَوَلَّوْا يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ عَذَابًا أَلِيمًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُمْ فِي الْأَرْضِ مِنْ وَلِيَّ وَلَا نَصِيرِه
তারা আল্লাহর কসম করে যে, তারা বলেনি, অথচ তারা কুফরী বাক্য বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর কুফরী করেছে। আর মনস্থ করেছে এমন কিছুর যা তারা পায়নি। আর তারা একমাত্র এ কারণেই দোষারোপ করেছিল যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূল তাঁর স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করেছেন। এরপর যদি তারা তাওবা করে, তবে তা হবে তাদের জন্য উত্তম, আর যদি তারা বিমুখ হয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে বেদনাদায়ক আযাব দেবেন, আর তাদের জন্য জমিনে নেই কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী。
ইবনে কাসীর রহ. যাহহাকের সূত্রে বর্ণনা করেন, মুনাফেকদের একটি দল তাবুক যুদ্ধের কোনো এক রাতে ভ্রমণকালে রসূল সা.-এর ওপর অতর্কিতে হামলা করার পরিকল্পনা করেছিল। দশ জনের বেশি মুনাফেক এ পরিকল্পনায় অংশ নিয়েছিল। তাদের ব্যাপারে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়。
ওয়াহেদীর বর্ণনায় যাহহাকের সূত্রে বিবৃত হয়েছে, কতক মুনাফেক রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে গাযওয়ায়ে তাবুকে অংশ নেয়। তারা নিজেরা পরস্পর একাকী হলে রসূল সা. ও তার সাহাবীদের এবং দীনি বিষয়াদি নিয়ে কটুক্তি করতো। হুযায়ফা রা. তাদের কিছু কথা রসূল সা.-এর কাছে তুলে ধরলে রসূল সা. তাদের বলেন, হে মুনাফেক সম্প্রদায়! তোমাদের ব্যাপারে আমি এ কী শুনছি? তারা তখন শপথ করলো যে, তারা এ ধরনের কোনো কথা বলেনি। অতঃপর তাদের শপথকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াত নাযিল করেন。
এ আয়াতের সারমর্ম হচ্ছে, তারা এ ধরনের কোনো মন্তব্য করেনি মর্মে আল্লাহর নামে শপথ করে। কিন্তু আল্লাহ তাদের মিথ্যাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কুরআনে কারীম অবশ্য তাদের বলা বক্তব্য উল্লেখ করেনি। কেননা তা উল্লেখ করা জরুরি নয়。
টিকাঃ
১৫১০. হাদীসুল কুরআনিল কারীম : ২/৬৬৫।