📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 আবদুল্লাহ যুলবিজাদাইনের ইন্তেকাল

📄 আবদুল্লাহ যুলবিজাদাইনের ইন্তেকাল


আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, মাঝ রাতে আমি জেগে উঠলাম, তখন আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে তাবুক অভিযানে ছিলাম। দেখলাম, বাহিনীর এক প্রান্তে একটি আগুনের শিখা জ্বলছে। সেটা কী তা দেখার জন্য আমি সেদিকে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম সেখানে রয়েছেন রসূলুল্লাহ সা., আবু বকর রা. ও ওমর রা.। আরও দেখলাম, যুলবিজাদাইন (দুই কম্বলওয়ালা) আব্দুল্লাহ ইনতিকাল করেছেন এবং তারা তার জন্য কবর খনন করেছেন। রসূলুল্লাহ সা. কবরের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন আর আবু বকর ও ওমর রা. লাশ তার দিকে এগিয়ে দিচ্ছেন। তিনি তখন বলছিলেন, 'তোমাদের ভাইকে আমার কাছে এগিয়ে দাও।' তারা দু'জন লাশ কবরে নামিয়ে দিলেন। তাকে কিবলামুখী করে শুইয়ে দিয়ে রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'ইয়া আল্লাহ! আমি এ যাবত তার উপর সন্তুষ্ট ছিলাম। আপনিও তার ওপর সন্তুষ্ট হোন।' বর্ণনাকারী বলেন, বর্ণনার এ পর্যায়ে ইবনে মাসউদ রা. তার মনোবাঞ্চা প্রকাশ করে বলতেন, হায় আমি যদি এ কবরের বাসিন্দা হতাম!

ইবনে হিশাম রহ. বলেন, 'যুলবিজাদাইন' নামকরণের কারণ হল ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি হিজরত করতে মনস্থ করলে তার গোত্র তাকে বাধা দেয়। পরে তিনি এক সুযোগে গোপনে বেরিয়ে পড়েন। তখন তার গায়ে একটি মোটা কম্বল ছাড়া আর কোন বস্ত্র ছিল না। তিনি সেটিকে দুই ভাগ করে এক অংশ দিয়ে লুঙ্গি বানিয়ে পরেন এবং অপর অংশ চাদর বানিয়ে গায়ে দেন। এভাবে রসূলুল্লাহ সা.-এর খিদমতে হাযির হলে তার নাম হয়ে যায় যুল বিজাদাইন বা দুই কম্বলধারী。

আলোচ্য ঘটনার মাধ্যমে আমরা যেসব বিষয় শিখতে পারি, তা হচ্ছে:
ক. সর্বাবস্থায় মুজাহিদদের প্রতি নবীজির সম্মান
মুজাহিদদের প্রতি রসূল সা. কতোটা সম্মান পোষণ করতেন, আলোচ্য ঘটনায় আমরা তা দেখতে পাই। জীবতাবস্থায় এমনকি তাদের মৃত্যুর পরও সম্মানদানে একটুও কমতি ছিল না। এর কারণ হচ্ছে, নবীজি সা. জনতেন, এরা নিজেদের সর্বস্ব বিলীন করে আল্লাহর পথে জিহাদে এসেছে। এরা পৃথিবীর সর্বোচ্চ সম্মানিত মানুষ। এমতাবস্থায় তিনি তাদের মৃতদেহ পশুপাখির আহারের জন্য পথে-প্রান্তরে রেখে যাননি। বরং তাদের প্রতি সম্মানের সর্বোচ্চটুকু দেখিয়েছেন। যাতে উম্মত জিহাদের ময়দানে সাহসিকতার সাথে এগিয়ে যেতে পারে।
স্মর্তব্য, বর্তমান যুগে মৃত সৈনিকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের রীতি থাকলেও অতীতে এমনটি ছিল না। সুতরাং বোঝা যায়, মুসলিম সৈনিকদের প্রতি তাদের নেতা কর্তৃক এ ধরনের সম্মান প্রদর্শনের নীতি রণশাস্ত্রে অভূতপূর্ব ছিল। সাধারণ সদস্যদের প্রতি সর্বোচ্চ নেতার এমন সম্মানজনক আচরণ পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো নেতা দেখাতে পারেনি। কোনো নেতা অন্তিম মুহূর্তে পাশে থেকে বলেননি, 'ইয়া আল্লাহ! আমি এ যাবত তার উপর সন্তুষ্ট ছিলাম, আপনিও তার উপর সন্তুষ্ট হোন। '
খ. রাতের বেলা দাফনের বিধান
রসূলুল্লাহ সা. যুলবিজাদাইনকে রাতের বেলা দাফন করেছিলেন। এর দ্বারা রাতের বেলা দাফনের বৈধতা পাওয়া যায়। মৃতদেহ দ্রুত দাফন করা সুন্নত। এমনিভাবে কারো মর্যাদা বা উত্তম আমল দেখে ঈর্ষা করা বৈধ, তবে হিংসা অবৈধ। এই হিংসা নিঃসন্দেহে সকল অনিষ্টের মূল。
আমরা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর উক্তিটির দিকে লক্ষ করতে পারি। যখন তিনি শুনেছিলেন যে, আল্লাহর রসূল সা. মৃত সাহাবীর ব্যাপারে বলছেন, 'ইয়া আল্লাহ! আমি এ যাবত তার উপর সন্তুষ্ট ছিলাম। আপনিও তার উপর সন্তুষ্ট হোন।' তখন মাসউদ রা.-এর মনে আকাঙ্খা জেগেছিল, হায় আমি যদি এ কবরের বাসিন্দা হতাম! আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী প্রতিটি মুমিনেরই এমন আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠা স্বাভাবিক。

টিকাঃ
১৪৮৮. সহীহ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ৫৯৮।
১৪৮৯. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/২৫০।
১৪৯০. সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মদীনা: ৪৭২।
১৪৯১. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ১৬৩-১৬৪।
১৪৯২. সহীহ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ৫৯৮।
১৪৯৩. মুইনুস সিরাত: ৪৫২।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 গাযওয়ায়ে তাবুকে প্রকাশিত নবীজির মুজিযা

📄 গাযওয়ায়ে তাবুকে প্রকাশিত নবীজির মুজিযা


ক. নবীজির দোআয় পানিসংকট নিরসন

সামুদ জাতির অভিশপ্ত এলাকা অতিক্রমকালে কাফেলায় কারো কাছে এক ফোটা পানিও ছিল না। রসূলুল্লাহ সা.-কে তা জানানো হলে তিনি আল্লাহর কাছে দোআ করলেন। আল্লাহ একখন্ড মেঘ পাঠিয়ে বৃষ্টি বর্ষণ করলেন। তাতে সকলের প্রয়োজন পূর্ণ হলো। সবাই পানি পান করলেন এবং পরবর্তী সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করে রাখলেন।

নিঃসন্দেহে এটা রসূলুল্লাহ সা.-এর একটি মুজিযা। এতে মুমিনরা কৃতজ্ঞ হয়, আর মুনাফেকরা মন্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। ইবনে ইসহাক রহ. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি মাহমুদ ইবনে লাদীদকে জিজ্ঞাসা করেছিল, মুসলমানরা কি তখন সব মুনাফেকদের চিনতো? তিনি তখন বলেন, সামুদ সম্প্রদায়ের কঙ্করবিশিষ্ট এলাকা অতিক্রম করার পর নবীজির উপরোক্ত মুজিযা প্রকাশ পায়। এর মাধ্যমে সবাই পরিতৃপ্ত হয়ে পানি পান করেছিল। তখন আমরা মুনাফেকদের উদ্দেশে বললাম, এরপরেও কি তোমাদের কোনো সন্দেহ রয়েছে? তারা জবাব দিলো, এ তো একখানা চলন্ত মেঘের কাণ্ড!

খ. নবীজির হারিয়ে যাওয়া বাহনের সংবাদ
তাবুক যাওয়ার পথে একদিন রসূলুল্লাহ সা.-এর উট হারিয়ে গেলো। সাহাবীরা উট খুঁজতে বেরুলেন। এই সময় রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট উমারা ইবনে হাযম নামে আকাবার বাইয়াতে ও বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জনৈক সাহাবী ছিলেন। তিনি ছিলেন বনু আমের গোত্রের বিশিষ্ট প্রবীণ ব্যক্তি। তার দলে যায়েদ ইবনে লুসাইত নামক বনু কায়নুকা গোত্রের জনৈক মুনাফেক ছিল। উমারা রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে উপস্থিত থাকা অবস্থায় তার দলবলের কাছে বসে উক্ত যায়েদ ইবনে লুসাইত বললো, আচ্ছা, মুহাম্মাদ তো দাবি করেন যে, তিনি নবী এবং তিনি তোমাদেরকে আকাশের খবর জানান। অথচ তিনি এতটুকু জানেন না যে, তার উট কোথায়? ঠিক সেই মুহূর্তেই রসূলুল্লাহ সা. উমারা রা.-কে বললেন, 'একজন লোক বলছে, মুহাম্মাদ নিজেকে নবী বলে দাবি করে থাকেন এবং তোমাদেরকে আসমানের খবরা জানান, তিনি কেন তার উট কোথায় তা জানেন না? আল্লাহর কসম, আল্লাহ যেটুকু আমাকে জানিয়েছেন সেইটুকু ছাড়া আমি কিছুই জানি না। আল্লাহ আমাকে উটের সন্ধান দিয়েছেন। উটটি উপত্যকার ভেতরেই অমুক জায়গায় রয়েছে। একটি গাছের সাথে তার লাগাম আটকে গেছে। তোমরা গিয়ে উটটি নিয়ে এসো।'

সাহাবীরা গিয়ে উটটিকে ধরে নিয়ে এলেন। অতঃপর উমারা রা. তাঁর দলবলের কাছে ফিরে গেলেন। গিয়ে বললেন, রসূলুল্লাহ সা. এইমাত্র আমাদের কাছে এক বিস্ময়কর খবর জানালেন। আমাদের বাহিনীর মধ্যে কে নাকি এরূপ কথা বলেছে এবং আল্লাহ তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেন। এই বলে তিনি যায়েদ ইবনে লুসাইত যে কথা বলেছে তা ব্যক্ত করলেন। তখন উমারা রা.-এর দলের একজন বললেন, আল্লাহর কসম, যায়েদই এ কথা বলেছে।

তখন উমারা রা. যায়েদের কাছে এগিয়ে গিয়ে তার ঘাড়ে আঘাত করে বললেন, হে আল্লাহর বান্দা, আমার কাছে এসো। আমার কাফেলায় একটা সাপ লুকিয়ে আছে, আমি তা জানতেও পারিনি। হে আল্লাহর দুশমন, আমার কাফেলা থেকে বেরিয়ে যাও।

বর্ণিত আছে যে, এরপর যায়েদ তাওবাহ করেছিল। আবার কেউ কেউ বলেন, মৃত্যুকাল পর্যন্তই যায়েদ মুনাফেকী অব্যাহত রাখার দায়ে অভিযুক্ত ছিল।

গ. তাবুকে ঝড়ের পূর্বাভাস ও সতর্ক থাকার নির্দেশ
তাবুক প্রান্তরে একদিন রসূলুল্লাহ সা. সাহাবীদেরকে প্রচণ্ড ঝড়ের পূর্বাভাস দেন। তিনি বলেন, ঝড়ের সময় নিজেরা ঘর হতে বের হবে না। পশু বেঁধে রাখবে। তার পূর্বাভাস অনুযায়ী একটু পর তীব্র বায়ু প্রবাহিত হতে শুরু করে এবং যারা বাইরে অবস্থান করছিল তারা অনেক দূরে ছিটকে পড়ে।

ইমাম মুসলিম রহ. নিজ সূত্রে আবু হুমাইদ থেকে বর্ণনা করেন, আমরা তাবুক প্রান্তরে পৌঁছলাম। নবীজি সা. বললেন, রাতে ভয়ঙ্কর তুফান আসবে। রাতে কেউ একাকী বের হয়ো না। যাদের সাথে পশু রয়েছে, তারা যেন তা ভালোভাবে বেঁধে রাখে। বাস্তবেই দেখা গেলো রাতে ভয়ংকর তুফান এলো এবং এক ব্যক্তি বাইরে অবস্থান করছিল, সে প্রবল বাতাসে উড়ে গিয়ে 'তাই' পর্বতে গিয়ে পড়লো।

ইমাম নববী রহ. বলেন, এ হাদীসটিতে রসূলুল্লাহ সা.-এর স্পষ্ট মুজিযার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ হাদীস দ্বারা তুফান চলাকালে বাইরে অবস্থানের ক্ষতির বিষয়টিও বোঝা যায়।

ঘ. কূপের পানি বৃদ্ধি ও শস্যশ্যামল পরিবেশের ভবিষ্যদ্বাণী
মুআয ইবনে জাবাল রা. বলেন, তাবুকে পৌঁছার আগের দিন রসূলুল্লাহ সা. বললেন 'আমরা আগামীকাল তাবুক প্রান্তরে পৌছবো। আগে যারা ওই উপত্যকায় পৌঁছবে, তারা যেন আমরা না আসা পর্যন্ত পানি পান না করে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে।'

আমরা তাবুকে পৌছে দেখলাম, আমাদের আগেই দুজন ব্যক্তি তাবুকে পৌছেছে এবং তাবুকের ঝর্ণায় সামান্য পরিমাণ পানি প্রবাহিত হচ্ছে। রসূল সা. তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কি পানি স্পর্শ করেছো?' তারা বললো, 'হ্যাঁ'। রসূল সা. বললেন, 'আমি তো নিষেধ করেছিলাম আমি এসে পৌছার আগে কাউকে পানি পান করতে।' তারপর ঝর্ণা থেকে আঁজলা ভরে পানি নিয়ে নিয়ে একটি পাত্রে জমা করলেন এবং তাতে নিজের হাত ও চেহারা ধৌত করলেন। তারপর সেই পানি ঝর্ণায় ঢেলে দিলেন। তৎক্ষনাৎ ঝর্ণায় যেন পানির জোয়ার উঠলো। সবাই পানি পান করে তৃপ্ত হলেন।

রসূলুল্লাহ সা. মুআয ইবনে জাবাল রা.-কে বলেন, তুমি যদি দীর্ঘ আয়ু পাও তাহলে ভবিষ্যতে এই উপত্যকার খ্যাতি শুনতে পাবে এবং এই পানি উপত্যকার আশপাশের এলাকাকে উর্বর করে তুলবে।

তাবুক ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকা সে সময় পানিশূন্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু রসূলুল্লাহ সা.-এর বরকতে সেখানকার পানিস্বল্পতা বিদূরিত হয়ে যায়। রসূল সা.-এর মুজিযার সেই বরকত শুধু সেনাবাহিনীর প্রয়োজন মিটানোর জন্যই ছিল না, বরং রসূল সা. জানিয়ে দিয়েছিলেন, তার বরকতে এই উপত্যকার সুনাম বাড়বে এবং এই পানি উপত্যকার আশপাশের এলাকাকে উর্বর করে তুলবে।
কিছুদিনের মধ্যেই রসূলুল্লাহ সা.-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত শস্যশ্যামল খেজুর বাগান ও ব্যাপক পরিমাণ ফলসমৃদ্ধ তাবুক যেন এখনো নবীজির নবুওয়াতের সত্যতার ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে। তাবুকের ফলে পূর্ণ বাগানগুলো যেন এখনো পৃথিবীবাসীকে এ কথা জানান দিচ্ছে যে, রসূলুল্লাহ সা. কখনো মিথ্যা বলেননি। তার সংবাদ সত্য এবং তিনি সত্যবাদী ছিলেন।

ঙ. খাদ্যদ্রব্য বৃদ্ধি পাওয়া
আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, তাবুক অভিযান কালে তীব্র ক্ষুৎপিপাসা লোকদের পর্যুদস্ত করলে তারা বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! আপনি আমাদের অনুমতি দিলে আমরা আমাদের পানিবাহী উটগুলো জবাই করে খেতে পারি এবং আমাদের পায়ে সেগুলোর চর্বি মালেক করতে পারি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তাই করো। তখন ওমর রা. এসে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! এমন করা হলে তো বাহনের স্বল্পতা দেখা দেবে। তার চাইতে বরং আপনি লোকদের কাছে বিদ্যমান যৎসামান্য পাথেয় এক স্থানে জমা করতে বলুন এবং তাদের জন্য বরকতের দোআ করে দিন। আল্লাহর কাছে আমাদের আশা তিনি তাতে বরকত দেবেন।

রসূলুল্লাহ সা. বললেন, হ্যাঁ, তাই করো। তিনি চামড়ার একটি দস্তরখান আনিয়ে তা বিছিয়ে দিলেন। তারপর লোকদের কাছে থাকা অবশিষ্ট পাথেয় নিয়ে আসতে বললেন। সবাই যার কাছে যা ছিল তা নিয়ে আসতে লাগলো। কেউ এক মুঠো ভুট্টা নিয়ে এলেন, কেউ আনলেন এক মুঠো খেজুর, আবার কেউ কেউ নিয়ে এলেন রুটির টুকরো। এভাবে বিছানো চামড়ার উপরে সামান্য পরিমাণ খাবার জমা হয়ে গেলে রসূলুল্লাহ সা. তাতে বরকতের দোআ করলেন। তারপর তাদের বললেন, 'তোমরা তোমাদের পাত্রগুলোতে তুলে নিতে থাকো।'

সবাই পাত্র ভরে নিতে থাকলেন। এমনকি বাহিনীর কাছে বিদ্যমান সব পাত্রই তারা ভরে ফেললেন। তারা তৃপ্তির সাথে খাওয়ার পরও কিছু অবশিষ্ট রইলো। তখন রসূলুল্লাহ সা, বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দেই যে, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই; এবং আমি অবশ্যই আল্লাহর রসূল। যে ব্যক্তি এ বিশ্বাসে অটল থেকে আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, তাকে জান্নাতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হবে না।

তাবুক প্রান্তরে প্রকাশিত এসব ঘটনা ছিল রসূলুল্লাহ সা.-এর মুজিযা। এগুলো তার নবুওয়াত ও রিসালাতের সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত সম্মান।

টিকাঃ
১৫০২. সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মদীনা: ৪৭৩।
১৫০৩. সহীহ মুসলিম: ২৭।
১৫০৪. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ৮৩।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মুনাফেকদের ভূমিকা সম্পর্কে কুরআনের ভাষ্য

📄 মুনাফেকদের ভূমিকা সম্পর্কে কুরআনের ভাষ্য


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর বর্ণনা

📄 আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর বর্ণনা


গাযওয়ায়ে তাবুকের সময় এক ব্যক্তি কোনো এক বৈঠকে বললো, কুরআন তেলাওয়াতকারীগণই খাবার-দাবারে অত্যধিক লোভী, কথাবার্তায় মিথ্যুক ও যুদ্ধক্ষেত্রে কাপুরুষ। সেখানে উপস্থিত জনৈক ব্যক্তি তার জবাবে বললেন, নিঃসন্দেহে তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি একজন মুনাফেক। আমি অবশ্যই কথাটি নবীজির কাছে পেশ করবো। নবীজির কাছে এ সংবাদ পৌঁছানো হলে তার ওপর কুরআন অবতীর্ণ হলো। আবদুল্লাহ রা. বলেন, আমি দেখছিলাম, সে রসূল সা.-এর উটের রশির সাথে বাঁধা অবস্থায় পাথরের আঘাত খেতে খেতে বলছিল, হে আল্লাহর রসূল! আমরা তো সামান্য হাস্য-রসিকতা করছিলাম। রসূল সা. বললেন, আল্লাহ তাআলা, তার নিদর্শনাবলি ও তার রসূলের ব্যাপারে তোমরা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করো?

কাতাদা রা.-এর বর্ণনায় এসেছে: রসূলুল্লাহ সা. তাবুকে অবস্থানকালে একদিন তার আশেপাশে কিছু মুনাফেক বলাবলি করছিল, এই ব্যক্তি তোমাদের সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ ও দুর্গসমূহ বিজয় করার সুসংবাদ দেয় অথচ সেটা সম্পূর্ণ অসম্ভব। রসূল সা.-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে এসব কথোপকথনের সংবাদ দেওয়া হলে তিনি তাদেরকে বাহনের সাথে বেঁধে রাখার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি তাদের সামনে এসে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি আমার ব্যাপারে এই ধরনের মন্তব্য করেছো? জবাবে তারা বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমরা তো সামান্য হাস্য-রসিকতা করছিলাম। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَحْذَرُ الْمُنَافِقُونَ أَنْ تُنَزَّلَ عَلَيْهِمْ سُورَةٌ تُنَبِّئُهُمْ بِمَا فِي قُلُوبِهِمْ قُلِ اسْتَهْزِئُوا إِنَّ اللَّهَ مُخْرِجٌ مَا تَحْذَرُونَ وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
মুনাফেকরা ভয় পায় তাদের মনের কথা প্রকাশ করে তাদের ব্যাপারে কোন সূরাহ নাযিল হয়ে যায় নাকি। বলো, 'ঠাট্টা করতে থাকো, তোমরা যে ব্যাপারে ভয় পাও, আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিবেন'। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা জোর দিয়েই বলবে, 'আমরা হাস্য রস আর খেল-তামাশা করছিলাম।' বলো, 'আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রসূলকে নিয়ে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে? '

পবিত্র কুরআনে 'আল্লাহ, তার আয়াত ও তার রসূলকে নিয়ে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে?' এই প্রশ্নবোধক বাক্য দ্বারা তাদের কর্মকাণ্ডকে নেতিবাচকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, হে মুহাম্মাদ, আপনি তাদের তিরস্কার ও নিন্দা করতে গিয়ে তাদের বলুন, তোমরা কি তোমাদের ঠাট্টা ও বিদ্রূপ করার জন্য অন্য কোনো বিষয় পাচ্ছিলে না? কেন তোমরা আল্লাহর বিধিবিধান, আল্লাহর নিদর্শন ও তার রসূল সা. যিনি তোমাদের জন্য হেদায়াত নিয়ে এসেছেন এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পথপ্রদর্শন করতে এসেছেন, তা নিয়ে হাস্য-রসিকতা করছো? এরপর আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, এমন হাস্য-রসিকতা মূলত মানুষকে কুফরির দিকে নিয়ে যায়।
لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِنْ نَعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةٌ بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ
অজুহাত পেশ করার চেষ্টা করো না, ঈমান আনার পর তোমরা কুফরী করেছো। তোমাদের মধ্যকার কোনো দলকে ক্ষমা করলেও অন্যদেরকে শাস্তি দেবো, কারণ তারা অপরাধী。

এর দ্বারা বোঝা যায়, এদের মতো অন্যায়ের অজুহাত পেশ করা অন্যায় কাজে লিপ্ত হওয়ার চেয়েও মারাত্মক। আল্লাহ তাআলার বাণী: 'তোমাদের মধ্যকার কোনো দলকে ক্ষমা করলেও অন্যদেরকে শাস্তি দেবো, কারণ তারা অপরাধী।' অর্থাৎ এসব অপরাধে অপরাধীদের কাউকে যদিও তাওবা ও অনুশোচনার কারণে ক্ষমা করে দিই, অন্যদের অবশ্যই এর শাস্তি ভোগ করতে হবে। যেমন, তাদের মধ্য হতে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিল মুখশিন ইবনে হুমাইরকে。

টিকাঃ
১০০০. আদদুররুল মানছুর: ৪/২৩০।
১৫০৬. সূরা তাওবাহ: আয়াত ৬৪-৬৫।
১৫০৭. সূরা তাওবাহ: আয়াত ৬৬।
১৫০৮. তাফসীরুল মুরাগি: ৪/১৫৩।
১০০৯. তাফসীরুল মুরাগি: ৪/১৫৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00