📄 আবু যার গিফারী রা.-এর ঘটনা
ইবনে ইসহাক রহ. বর্ণনা করেন, যাত্রাপথে মাঝে মাঝে দুই একজন মুসলিম বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন। মুসলমানরা এ ধরনের কোনো লোকের ফিরে যাওয়ার কথা জানালে রসূলুল্লাহ সা. বলতেন, 'যেতে দাও। যদি তার মধ্যে সত্যপ্রীতি থেকে থাকে তাহলে আল্লাহ আবার তাকে তোমাদের কাছে ফিরিয়ে আনবেন। অন্যথায় আল্লাহ তার সাহচর্য থেকে তোমাদেরকে অব্যাহতি দিলেন; ভালোই হলো।'
এক সময় বলা হলো, ইয়া রসূলাল্লাহ, আবু যরও পিছিয়ে গেছে। তাঁর উট তাকে পিছিয়ে দিয়েছে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'পিছিয়ে যায় তো যাক। যদি তার মধ্যে কল্যাণ থেকে থাকে তাহলে আল্লাহ তাকে তোমাদের মধ্যে ফিরিয়ে আনবেন। আর যদি তা না হয় তাহলে মনে করবে আল্লাহ তোমাদেরকে তার হাত থেকে রেহাই দিয়েছেন।'
আবু যর রা. তাঁর উটকে দ্রুত চালানোর অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হলো না। অগত্যা তিনি নিজের সাজ-সরঞ্জাম ও রসদপত্র ঘাড়ে করে রসূলুল্লাহ সা.-এর পদানুসরণ করে হাঁটতে শুরু করলেন। রসূলুল্লাহ সা. এক জায়গায় এসে যাত্রাবিরতি করলে তিনি তাঁর সাথে এসে মিলিত হলেন।
রসূলুল্লাহ সা. তাঁকে একাকী হেঁটে আসতে দেখে বললেন, 'আল্লাহ আবু যরের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। সে একাই চলবে, একাই মারা যাবে এবং একাই আল্লাহর সামনে হাজির হবে।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, ওসমান রা. তার খেলাফাতকালে যখন আবু যর রা.-কে রাবযাতে থাকতে বলেন, তখন সেখানে তার কাছে তার স্ত্রী ও ভৃত্য ছাড়া আর কেউ ছিল না। তিনি তাদেরকে این বলে অসিয়ত করেন, 'আমি মারা গেলে তোমরা আমাকে গোসল ও কাফন দিয়ে রাস্তার ওপর রেখে দিও। অতঃপর সর্বপ্রথম যে কাফেলা তোমাদের কাছ দিয়ে যাবে, তাকে বলবে, এই লোকটি রসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবী আবু যর। তাঁকে দাফন করতে তোমরা আমাদের সাহায্য কর।'
মৃত্যুর পর স্ত্রী ও ভৃত্য অসিয়ত মতে কাজ করলেন এবং তাঁর লাশ রাস্তার ওপর রেখে দিলেন। এই সময় ইরাক থেকে একদল উমরা পালনকারী কাফেলার সাথে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. যাচ্ছিলেন। দলটি রাস্তার ওপর পড়ে থাকা লাশটি দেখে থমকে দাঁড়ালো। অল্পের জন্য তা উটের পাদতলে পিষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়। ভৃত্য তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, 'তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবী আবু যর রা.। তাঁকে দাফন করতে আমাদেরকে সাহায্য করুন।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ কাঁদতে লাগলেন। বললেন, 'রসূলুল্লাহ সা. সত্যই বলেছেন, তুমি একাই চলবে, একাই মরবে এবং একাই পুনরুজ্জীবিত হবে।' অতঃপর তিনি ও তাঁর সহযাত্রীরা নেমে তাঁকে দাফন করলেন。
আবু যর রা.-এর ঘটনার মাধ্যমে আমরা যেসব বিষয় শিখতে পারি, তা হচ্ছে:
১. রসূলুল্লাহ সা.-এর মহান এই সাহাবী যুদ্ধে যাত্রার সময়কার কঠিন ও করুণ অবস্থা অত্যন্ত ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সাথে মুকাবিলা করেন। চরম কষ্ট শিকার করে পায়ে হেঁটে রসূল সা.-এর সাথে যুদ্ধযাত্রায় অংশ নেন। জিহাদে যাবার আগ্রহ সাহাবাদের মাঝে এমনই জাগরূক ছিল।
২. রসূলুল্লাহ সা. তাকে একাকী হেঁটে আসতে দেখে বললেন, 'আল্লাহ আবু যরের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। সে একাই চলবে, একাই মরবে এবং একাই আল্লাহর সামনে হাজির হবে।' এ বাক্যটি নবীজির নবুওয়াতের স্পষ্ট প্রমাণ। কেননা, এরকম ভবিষ্যদ্বাণী করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব না।
৩. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. কী পরিমাণ জ্ঞান রাখতেন, কতোটা তীক্ষ্ণ ছিল তার স্মৃতিশক্তি ও দূরদর্শিতা তা আমরা এ ঘটনা থেকে আঁচ করতে পারি। তিনি বহুকাল পরও আবু যর রা. সংক্রান্ত নবীজির ওই ভবিষ্যদ্বাণী মনে রেখেছেন。
টিকাঃ
১৪৬৩. আল ইকতিফা বিমা তাযাম্মানাহু মিন মাগাযী রাসূলিল্লাহি ওয়াছছালাছাতিল খুলাফা: ২/২৭৬।
১৪৬৪. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/১৭৮।
১৪৬৫. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ১২৯।
১৪৬৬. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ১২৯।
১৪৬৭. আত তারীখুল ইসলামী: ৮/১১৪।
📄 আবু খায়সামা রা.-এর ঘটনা
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী তাবুক অভিযানে রওনা হয়ে যাওয়ার বেশ কিছুদিন পর আবু খায়সামা রা. তাঁর পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে এলেন। দেখলেন, তাঁর দুই স্ত্রী বাগানের ভেতরে নিজ নিজ তাঁবুতে অবস্থান করছে। উভয়ে নিজ নিজ তাঁবু পানি ছিটিয়ে ঠান্ডা করে রেখেছে।
তিনি এসে তাঁবুর দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে ভেতরে তার দুই স্ত্রীর প্রতি নজর দিলেন এবং তার আরাম-আয়েশের জন্য তারা যে ব্যবস্থা করে রেখেছে তাও দেখলেন। তখন তার অন্তর বলে উঠলো, রসূলুল্লাহ সা. রোদ, বাতাস ও গরমে কষ্ট পাচ্ছেন আর আবু খায়সামা কিনা ঠান্ডা ছায়ায় সুন্দরী নারীর সাহচর্যে নিজ ভূমি ও সহায়-সম্পদের ভেতরে বসে খাবার খাবে? এটা কখনো ঠিক হবে না। আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের কারো তাঁবুতে ঢুকবো না। আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে যাবো। তোমরা আমাকে জিহাদী সাজে সজ্জিত করে দাও।
তারা তার সাজ-সরঞ্জাম গুছিয়ে দিলেন। অতঃপর তার উট এগিয়ে দেয়া হলো। আবু খায়সামা রওয়ানা হলেন এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর সন্ধানে ছুটলেন। পথিমধ্যে অপর এক সাহাবা উমায়ের ইবনে ওয়াহাব জুমাহী আবু খায়সামার সঙ্গী হলেন। তিনিও রসূলুল্লাহ সা.-এর অভিযানে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছিলেন। তাঁরা উভয়ে যখন তাবুকের কাছাকাছি পৌছলেন, তখন আবু খায়সামা উমায়েরকে বললেন, আমি একটা গুনাহ করে ফেলেছি। কাজেই তুমি আমার পেছনে পড়লে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। আমাকে আগে রসূলুল্লাহ সা.- এর কাছে পৌছতে দাও।
তাবুকে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছাকাছি পৌঁছলে সাহাবীগণ তাকে দেখে বললেন, একজন উটচালক এদিকে এগিয়ে আসছে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'সম্ভবতঃ আবু খায়সামা।' সাহাবীগণ বললেন, 'ইয়া রসূলাল্লাহ, আবু খায়সামাই তো!'
কাছে এসে উট থেকে নেমে আবু খায়সামা রসূলুল্লাহ সা.-কে সালাম জানিয়ে তাঁর কাছে গেলেন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'হে আবু খায়সামা, তুমি উপযুক্ত কাজই করেছো।' অতঃপর তিনি রসূলুল্লাহ সা.-কে তাঁর সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। রসূলুল্লাহ সা. তাকে মোবারকবাদ দিলেন ও তাঁর জন্য দোআ করলেন。
ইবনে হিশাম রহ. বলেন, আবু খায়সামার নাম ছিল মালেক ইবনে কায়স। এ প্রসঙ্গে স্বরচিত কবিতায় বলেছেন:
لَمَّا رَأَيْتُ النَّاسَ فِي الدِّيْنِ نَافَقُوا أَتَيْتُ الَّتِي كَانَتْ أَعَفَّ وَأَكْرَمَا وَبَايَعْتُ بِالْيُمْنَى يَدِي لِمُحَمَّدٍ فَلَمْ أَكْتَسِبْ إِثْمًا وَلَمْ أَغْشَ مُحَرَّمَا تَرَكْتُ خَضِيْبًا فِي الْعَرِيْشِ وَصَرْمَةٌ صَفَايَا كِرَامًا بِسِرِّهَا قَدْ تَصَرَّمَا وَكُنْتُ إِذَا شَكٌّ الْمُنَافِقُ أَسْمَحَتْ إِلَى الدِّيْنِ نَفْسِيْ شَطْرَهُ حَيْثُ يُمِّمُ
যখন দেখলাম, লোকেরা দীনের ব্যাপারে কপটতার পথ ধরেছে, আমি সেই কাজটি করলাম, যা ছিল অধিকতর পরিশুদ্ধতা ও মহত্বসম্পন্ন।
আমার ডান হাত মুহাম্মাদ সা.-এর দু'হাতে রেখে বাইআত করেছিলাম, তারপর কোনো পাপ করিনি, আর কোনো হারাম ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইনি।
ঘরে রেখে এসেছি মেহেদীরাঙা বধূ আর বাগানভরা কর্তনযোগ্য সুপক্ক টুকটুকে লাল খেজুরের কাঁদি; যা খুবই উন্নত মানের।
আর আমার স্বভাব হলো, যখন মুনাফেকরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগে, তখন আমার মন দীনের পথে ধাবিত হয়, তা যে কোনো দিকেই থাকুক না কেন。
আবু খায়সামা রা.-এর ঘটনার মাধ্যমে আমরা যেসব বিষয় শিখতে পারি, তা হচ্ছে:
১. মুসলমান জীবন্ত হৃদয়ের অধিকারী হয়
আবু খায়সামা রা. যখন দেখলেন, তাঁর দুই স্ত্রী বাগানের ভেতরে নিজ নিজ তাঁবুতে অবস্থান করছে, উভয়ে নিজ নিজ তাঁবুতে পানি ছিটিয়ে ঠান্ডা করে আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করে রেখেছে, তখনই নবীজির কথা তার মনে পড়ে যায় যে, রসূলুল্লাহ সা. রোদ ও গরমে কষ্ট পাচ্ছেন। এই চিন্তা মনে আসতেই তৎক্ষণাত তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, যুদ্ধে যাবেন। দীর্ঘ মরুপ্রান্তর পাড়ি দিতে গিয়ে যাত্রাপথে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায় উমায়ের ইবনে ওয়াহাব জুমাহী রা.-এর সাথে হয়তো তিনি মক্কা থেকে যাচ্ছিলেন। একজন সত্যিকার ঈমানদার এমনই হয়ে থাকে। নিজের মধ্যে যখনই দুর্বলতা দেখতে পান, পরক্ষণেই মনের লাগাম টেনে ধরেন। ঈমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রাণপন চেষ্টা করেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُونَ
যারা তাকওয়া অবলম্বন করে শয়তানের স্পর্শে তাদের মনে কুমন্ত্রণা জাগলে তারা আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন তাদের ঈমান-চক্ষু খুলে যায়。
আবু খায়সামা রা. যুদ্ধযাত্রায় বিলম্বের জন্য মনে অনুতাপ নিয়ে তাবুক প্রান্তরে নবীজির সাথে সাক্ষাৎ করেন। ফলে নবীজি সা. তার জন্য দোআ করেন。
২. সাহাবীদের চেনা ও মূল্যায়নে নবীজির ভূমিকা
তাবুকে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছাকাছি পৌঁছলে সাহাবীগণ তাকে দেখে বললেন, একজন উটচালক এদিকে এগিয়ে আসছে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'সম্ভবতঃ আবু খায়সামা।' সাহাবীগণ বললেন, 'ইয়া রসূলাল্লাহ, আবু খায়সামাই তো!' এই মন্তব্য দ্বারা বোঝা যায়, নবীজি সা. তার সাথিদের ভালোভাবে চিনতেন। তিনি জানতেন কে তার ডাকে সঠিকভাবে সাড়া দেবে। কে নিজের অপরাধবোধ থেকে অনুতপ্ত হয়ে অতি দ্রুত আল্লাহর পথে ফিরে আসবে। এটা নবীজির দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার প্রমাণ。
৩. আবু খায়সামা রা.-এর সহিষ্ণুতা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা
আবু খায়সামা রা. একাই রসূল সা.-এর সাথে মিলিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ লক্ষ্যে তিনি দুর্গম মরুপথ পাড়ি দেন। আগেই বলা হয়েছে, এটা ছিল প্রচণ্ড তাপদাহের সময়। পথে পানির অভাবও ছিল প্রকট। তবুও তিনি দৃঢ়তার সাথে আপন লক্ষ্য বাস্তবায়ন করেন। এটা তার ঈমানী তেজ ও অদম্য আগ্রহের প্রমাণ বহন করে。
৮. সেনাধ্যক্ষ কর্তৃক অধীনস্থ সৈন্যকে নিজ কৃতকর্মের জন্য ধমক
আবু খায়সামা রা. অনুতাপ নিয়ে নবীজির কাছে আসেন। রসূলুল্লাহ সা.-কে সালাম দেওয়ার পর তিনি তাকে মৃদু ভাষায় তিরস্কার করেন। নবীজি সা. তাকে বললেন, 'হে আবু খায়সামা! তুমি তোমাকে ধ্বংসের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলে।'
এ মন্তব্যে ছিল মৃদু ধমকের সুর। নিঃসন্দেহে এ ধরনের বাক্য আবু খায়সামা রা.-কে তার অপরাধের গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করেছিল। আর এটিই নববী তরিকা। শিষ্টের লালনের পাশাপাশি তিনি দুষ্টের দমনেও পিছপা হতেন না। কারণ, এ ধরনের ক্ষেত্রে নিশ্চুপ থাকা মানে অপরাধীর ক্ষতি ডেকে আনা। নবীজির এই আদর্শ সাহাবীরাও গ্রহণ করেছিলেন。
টিকাঃ
১৪৬৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৮/৫।
১৪৬৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৮/৫।
১৪৭০. সুরা আরাফ: ২০১।
১৪৭১. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৮/১১১,১১২।
১৪৭২. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ১৩৩।
১৪৭৩. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ১৩৩।
১৪৭৪. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ১৩৪।
📄 তাবুক পৌঁছা
রসূলুল্লাহ সা. তাবুক প্রান্তরে এসে দেখেন, সেখানে বাইজান্টাইন বা আরবের কোনো সেনাবাহিনী নেই। তবুও তিনি সেখানে বিশ রাত অবস্থান করেন। বাইজান্টাইন সেনারা সে সময় مسلمانوں সাথে যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী ছিল না। এমনকি আরবের খ্রিষ্টান গোত্রগুলোও রসূল সা.-এর সাথে যুদ্ধে জড়াতে চায়নি। অন্যদিকে সিরিয়ার সীমান্তের শাসকরা যুদ্ধের পরিবর্তে সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে জিযিয়া কর আদায় করতে রাজি হয়। রসূল সা.-এর কাছে ইলার শাসক উপহারসামগ্রী হিসেবে একটি সাদা খচ্চর ও পোশাক পাঠান। ইলার শাসক ইউহান্না ইবনে রোবা নবীজির কাছে হাজির হয়ে জিযিয়া দিয়ে সন্ধি করেন।
এরপর রসূল সা. খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-কে চারশো বিশজন অশ্বারোহীর নেতৃত্ব দিয়ে দাওমাতুল জান্দাল এলাকায় পাঠান। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. সেখান থেকে কিন্দা গোত্রের নেতা উকায়দর ইবনে আবদুল মালেক কিনদীকে শিকাররত অবস্থায় বন্দী করে রসূল সা.-এর কাছে নিয়ে আসেন। তিনিও জিযিয়া দিতে সম্মত হয়ে সন্ধি করেন। উকায়দরের পরনের চাদর দেখে মুসলমানরা আশ্চর্য হয়ে যায়। নবীজি সা. তখন বললেন, তোমরা তার চাদর দেখে আশ্চর্য হচ্ছো। অথচ সাআদ ইবনে মুআয জান্নাতে যে চাদর পরিধান করবে, সেটা এরচেয়ে অনেক উন্নত।
খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. আটশত যুদ্ধবন্দী, এক হাজার উষ্ট্রি, চারশো বর্ম ও চারশো বর্শা উকায়দর থেকে গণিমতের সম্পদ হিসেবে লাভ করেন।
তাবুক প্রান্তরে বসেই রসূল সা. জারবা, আজরাহ ও মাকনাবাসীর সঙ্গে কৃত সন্ধিচুক্তি লিপিবদ্ধ করেন। চুক্তি অনুযায়ী তারা প্রতি বছর জিযিয়া আদায় করতে সম্মত হয় এবং ইসলামী রাষ্ট্রের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। এভাবে রসূল Sa. আরবভূখণ্ডের উত্তরাঞ্চলের সাথে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হন। ফলে শত্রুমুক্ত হয় ইসলামী রাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চল।
এসব সন্ধিচুক্তির ফলে বাইজান্টাইন সম্রাটদের ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। কারণ, এর আগে এ অঞ্চল ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন। এখানকার অধিবাসীরা ছিল খ্রিষ্টান। কোনো একটি গোত্র রসূল সা.-এর সাথে জিযিয়া দেওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার অর্থ ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের একটি করে পালক খসে পড়া। এসব চুক্তির মাধ্যমে এই এলাকাগুলো বাইজান্টাইনদের আধিপত্য থেকে মুক্তি পায়।
তারা কিছু শর্তাবলি পালন এবং অনুগত থেকে জিযিয়া-কর আদায় করার শর্তে যুদ্ধ থেকে নিস্তার পায়। ইসলামী রাষ্ট্রকে নিরাপদ করতে এটা ছিল রসূলুল্লাহ Sa.-এর কর্মকৌশল। এভাবে বিভিন্ন জতিগোষ্ঠি সত্য দীনের সন্ধান পায়। নবীজি Sa. তার প্রজ্ঞাদীপ্ত দূরদর্শিতার ফলে মুসলমান ও বাইজান্টাইনদের মধ্যে একটি করদ রাজ্য তৈরি করতে সক্ষম হন। এভাবে খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে মুসলমানদের বিজয় অভিযানের দ্বার উন্মুক্ত হয়। উত্তরাঞ্চলে ক্রমান্বয়ে বেড়ে যায় মুসলমানদের প্রভাব। দৃঢ় হয় ইসলামের ভীত。
টিকাঃ
১৪৭৫. আল ইসাবাহ: ১/৪১২-৪১৩।
১৪৭৬. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/১৮০।
১৪৭৭. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/১৮০।
১৪৭৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৫/১৭।
১৪৭৯. আল ওছায়েকুস সিয়াসিয়াহ ফি আহদিন নবুওয়াতি ওয়াল খিলাফাতির রাশেদা: ১১৯-১২২।
১৪৮০. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ২১৭।
১৪৮১. মুহাম্মদ সাদিক উরজুন: ৪/৪৭৯।
১৪৮২. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ২২১।
📄 মুজাহিদদের প্রতি নবীজির নির্দেশনা
আবু কাবশা আনসারী রা. বলেন, তাবুক যুদ্ধে অবস্থানকালে মুসলমান-বাহিনীর কেউ কেউ সামুদ গোত্রের এলাকার পাথরে নির্মিত ঘরে প্রবেশ করেন। রসূলুল্লাহ সা.-কে বিষয়টি জানানো হলে তিনি সবাইকে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন।। আবু কাবশা রা. বলেন, আমি নবীজির কাছে এসে দেখলাম, তার হাতে উটের লাগাম। তিনি বলছিলেন, তোমরা কেন এমন গোত্রের বাসস্থানে প্রবেশ করেছো যাদের ওপর আল্লাহ তাআলা অসন্তুষ্ট ছিলেন? তাদের মধ্যে কেউ একজন বললেন, আমরা তাদের বিস্ময়কর ঘরবাড়ি দেখতে গিয়েছি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, আমি যে তোমাদের সতর্ক করছি, তা কি এর চাইতে বিস্ময়কর নয়? তোমাদেরই একজন মানুষ, যে তোমাদের পূর্ববর্তী ঘটনাবলির সংবাদ দেয় এবং ভবিষ্যতের ঘটনাসমূহের ভবিষ্যদ্বাণী দেয়, তা কি এর চাইতে বিস্ময়কর নয়? তোমরা সঠিক পথ অবলম্বন করো ও দীনের পথে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদের অপরাধের শাস্তি দিতে কারও পরোয়া করবেন না।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, সাহাবীরা রসূলুল্লাহ সা.-এর সঙ্গে সামুদ জাতির আবাসস্থল 'হিজর' নামক স্থানে অবতরণ করে সেখানকার কূপের পানি মশকে ভরে রাখেন। এ পানি দ্বারা আটা খামির করেন। রসূলুল্লাহ সা. তাদের বললেন, এখানকার পানি কেউ পান করো না এবং তা দিয়ে অযু করো না। এখানকার পানি দিয়ে কেউ আটা খামির করে থাকলে তা ঘোড়াকে খেতে দাও, তোমরা খেয়ো না। তিনি তাদের আরো বললেন, যেখান থেকে সালিহ আ.-এর উটনীটি পানি পান করতো তারা যেন ওই কূপ থেকে মশক ভরে।
নবীজি সা. বলেন, 'যারা নিজেদের ওপর জুলুম-অনাচার করেছিল, তাদের বাসস্থানে তোমরা কান্নারত অবস্থা ব্যতিরেকে প্রবেশ করো না। যে দুর্দশা তাদেরকে পেয়ে বসেছিল, তা তোমাদেরকেও যেন পেয়ে না বসে।' এরপর তিনি দ্রুত বাহন চালিয়ে সেখান থেকে দূরে সরে যান।
সামুদ জাতির এলাকার ব্যাপারে এই ছিল সাহাবায়ে কেরামের প্রতি নবীজির নির্দেশনা। তিনি তাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন এমন সম্প্রদায়ের কথা যাদের ওপর আল্লাহ তাআলা তাদের অবাধ্যতার কারণে রাগান্বিত হয়েছিলেন। যেন সাহাবায়ে কেরام এ ধরনের শিক্ষণীয় জায়গা থেকে উপদেশ গ্রহণ করেন। তিনি তাদের এ ধরনের অভিশপ্ত ভূখণ্ডের কোনো সামগ্রী এমনকি পানি পর্যন্ত ব্যবহার করতে নিষেধ করেছিলেন যেন এমন জায়গায় আসলে তাদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়। এ উদ্দেশ্যেই তিনি বলেছিলেন, 'তাদের বাসস্থানে তোমরা কান্নারত অবস্থা ব্যতিরেকে প্রবেশ করো না।'
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, পূর্ববর্তী বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষের পাশ দিয়ে আমরা যেভাবে চলে যাই, তারা এভাবে গেলে হয়তো আল্লাহ তাআলার ক্রোধের মুখে পড়তেন। পূর্ববর্তী উম্মতেরা নবীদের মুজিযাসমূহ ও আল্লাহর নিদর্শনসমূহ দেখার পরও তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গিয়েছিল। তারা এটাকে মামুলি ব্যাপার মনে করেছিল। ফলে তাদের ওপর আল্লাহর গজব পতিত হয়। এটা ছিল তাদের কৃতকর্মেল ফল।
আল্লাহ তাআলা উপদেশ গ্রহণের লক্ষ্যে আমাদের সামনে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ঘটনা পেশ করেছেন। যখন আমরা তাদের অভিশপ্ত ভূমি প্রত্যক্ষ করবো, তখন উপদেশ গ্রহণ করা আমাদের জন্য আবশ্যক। যাতে আল্লাহ তাআলার শাস্তির ভয় মনে জাগ্রত থাকে। তাই আমরা দেখতে পাই, নবীজি সা. এই ধরনের কোনো অভিশপ্ত ভূমি অতিক্রমকালে কাপড় দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রাখতেন। এমনকি নিজের বাহনকে দ্রুতবেগে সেখান থেকে সরিয়ে নিতেন। এবং তার সহচরদের বলতেন, 'যারা নিজেদের ওপর জুলুম-অনাচার করেছিল, তাদের বাসস্থানে তোমরা কান্নারত অবস্থা ব্যতিরেকে প্রবেশ করো না, যে দুর্দশা তাদেরকে পেয়ে বসেছিল, তা তোমাদেরকেও যেন পেয়ে না বসে।'
টিকাঃ
১৪৮৩. 'আল ফাতহুর রাব্বানী: ২১/১৯৫।
১৪৮৪. সহীহ বুখারী: ৩৩৭৯।
১৪৮৫. সহীহ বুখারী: ৩৩৮১।
১৪৮৬. সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মদীনা: ৪৮০।
১৪৮৭. সহীহ বুখারী: ৩৩৮১।