📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 গাযওয়ায়ে তাবুকে মুনাফেকদের অবস্থান

📄 গাযওয়ায়ে তাবুকে মুনাফেকদের অবস্থান


নবীজির যুদ্ধপ্রস্তুতির ঘোষণা শুনে মুনাফেকরা একে অপরকে বললো, এত প্রচন্ড গরমে তোমরা সফরে যেও না। তারা এভাবে জিহাদ থেকে দূরে থাকতে সচেষ্ট ছিল ও সত্যের ব্যাপারে মানুষের মনে দ্বিধা-সংশয় সৃষ্টির কাজে লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে নাযিল করলেন :
فَرِحَ الْمُخَلَّفُونَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلَافَ رَسُولِ اللَّهِ وَكَرِهُوا أَنْ يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَالُوا لَا تَنْفِرُوا فِي الْحَرِّ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا لَوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ فَلْيَضْحَكُوا قَلِيلًا وَلْيَبْكُوا كَثِيرًا جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
(তাবুক অভিযানে) যারা পিছনে থেকে গিয়েছিল তারা রসূলের বিরোধিতায় বসে থাকাতেই আনন্দ প্রকাশ করেছিল আর তারা অপছন্দ করলো তাদের মাল ও জান দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করতে এবং তারা বললো, 'তোমরা গরমের মধ্যে অভিযানে বেরিও না'। বল, 'জাহান্নামের আগুনই তাপে প্রচন্ডতম'। তারা যদি বুঝতো! অতএব তারা অল্প হাসুক, আর বেশি কাঁদুক, তারা যা অর্জন করেছে তার বিনিময়ে。

এই প্রস্তুতি চলাকালে একদিন রসূলুল্লাহ সা. বনু সালামা গোত্রের জাদ্দ ইবনে কায়েসকে বললেন, 'হে জাদ্দ, এ বছর রোমানদের সাথে লড়তে তুমি কি প্রস্তুত?' সে বললো, হে রসূলুল্লাহ, আমাকে (পাপের) ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করার চাইতে আমাকে বাড়িতে থাকবার অনুমতি দেবেন কি? আল্লাহর কসম, আমার গোত্রের লোকেরা জানে যে, আমি নারীদের প্রতি যতখানি দুর্বল, অতটা খুব কম লোকই আছে। রোমান মেয়েদের দেখে আমি নিজেকে সামলাতে পারবো না বলে আমার আশংকা। রসূলুল্লাহ সা. তার ব্যাপারে আর মাথা ঘামালেন না। তিনি বললেন, 'তোমাকে অনুমতি দিলাম।' জাদ্দ ইবনে কায়েস সম্পর্কে এই আয়াত নাযিল হয় :
وَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ ائْذَنْ لِي وَلَا تَفْتِنِّي أَلَا فِي الْفِتْنَةِ سَقَطُوا وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمُحِيطَةٌ بِالْكَافِرِينَ
তাদের মাঝে এমন লোক আছে যারা বলে, 'আমাকে অব্যাহতি দিন, আমাকে পরীক্ষায় ফেলবেন না।' জেনে রেখো, তারা তো ফেতনাতে পড়েই আছে। বস্তুতঃ জাহান্নাম কাফেরদেরকে চারদিক থেকে ঘিরেই রেখেছে।

মুনাফেকদের মধ্য থেকে অনেকে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে বিভিন্ন মিথ্যা বাহানা দেখিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার অনুমতি চায়। রসূল সা. তাদের অনুমতি দেন। কিন্তু পরে আল্লাহ তাআলা এই ধরনের অনুমতি প্রদানের কারণে রসূল সা.-কে সতর্ক করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
عَفَا اللَّهُ عَنْكَ لِمَ أَذِنْتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ
আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন (কিন্তু) তুমি তাদেরকে কেন অনুমতি দিলে যে পর্যন্ত না সত্যবাদী লোকেরা তোমার কাছে প্রকাশ হয়ে যেত এবং তুমি মিথ্যাবাদীদেরকে জেনে নিতে?

রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে খবর আসে, কিছু লোক ইহুদি সুয়াইলিমের ঘরে সমবেত হয়ে मुसलमानोंকে মানসিকভাবে দুর্বল ও বিভ্রান্তিতে ফেলার চক্রান্ত করছে। খবর পেয়ে নবীজি সা. তার ঘরটি ধ্বংস করে দেওয়ার নির্দেশ দেন。

এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সে সময় মুসলমানরা মুনাফেক ও ইহুদিদের কর্মকাণ্ডে গভীর দৃষ্টি রাখতো। তাদের গোপন চক্রান্ত ও গতিবিধি মুসলিম গোয়েন্দারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতো। مسلمانوں যুদ্ধ থেকে ফিরিয়ে রাখতে তারা যে ফন্দি আটছিল, তার খবর চলে আসে मुसलमानों কাছে। এ প্রেক্ষিতে নবীজি সা. অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। যে ঘরে বসে তারা চক্রান্তে লিপ্ত ছিল, তিনি সেটা ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। সাহাবারা তা জ্বালিয়ে দেন।

সুতরাং বোঝা যায়, কঠোরতা ও কোমলতা স্থান-কাল-পাত্রভেদে প্রয়োগ করতে হবে। রসূলুল্লাহ সা. এমনটাই করতেন। কেননা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও ইসলামবিদ্বেষী কর্মতৎপরতা চালানোর কেন্দ্রসমূহের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে কোনো ধরনের গড়িমসি করলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটে。

গাযওয়ায়ে তাবুকে মুনাফেকদের পূর্বাপর যাবতীয় ভূমিকা তুলে ধরেছে পবিত্র কুরআন। কুরআন জানিয়েছে, এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার জন্য মুনাফেকরা কেন অনুমতি চেয়েছিল। এছাড়া আবদুল্লাহ ইবনে উবাই কেন গাযওয়ায়ে তাবুকের দিকে যাত্রা করেও মাঝপথ থেকে ফিরে এসেছিল তারও বিবরণ দিয়েছে কুরআনুল কারীম। এ মর্মে ইরশাদ হচ্ছে:
لَوْ كَانَ عَرَضًا قَرِيبًا وَسَفَرًا قَاصِدًا لَا تَّبَعُوكَ وَلَكِنْ بَعُدَتْ عَلَيْهِمُ الشِّقَّةُ وَسَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَوِ اسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنْفُسَهُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
দুনিয়াবী কোনো স্বার্থ থাকলে আর যাত্রা সহজ হলে তারা অবশ্যই তোমার সাথে যেতো। কিন্তু পথ তাদের কাছে দীর্ঘ ও ভারী মনে হয়েছে। অচিরেই তারা আল্লাহর নামে হলফ করে বলবে, 'আমরা যদি পারতাম তাহলে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে বের হতাম।' আসলে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করছে, আর আল্লাহ জানেন যে, তারা অবশ্যই মিথ্যেবাদী。

এখানে বলা হয়েছে, যেহেতু তাবুক রণাঙ্গন ছিল মদীনা থেকে বহু দূরে, আবহাওয়া ছিল ভীষণ গরম, তাই মুনাফেকরা এসব বাহানায় তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। পক্ষান্তরে নবীজি সা. যদি তাদেরকে জাগতিক সম্পদের দিকে ডাকতেন বা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া সহজসাধ্য হতো, তাহলে সে ক্ষেত্রে তারা তার কথা মনতো। উপরোক্ত আয়াতে প্রথমে গাযওয়ায়ে তাবুকে মুনাফেকরা কেন যেতে আগ্রহী হচ্ছে না, সে ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়েছে। এরপর মুমিনরা যুদ্ধের পর মদীনায় ফিরে এলে তাদের সামনে মুনাফেকরা যেসব বাহানা দেখাবে, তারও বিবরণ দিয়েছে পবিত্র কুরআন।

سَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَوِ اسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنْفُسَهُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
আল্লাহর নামে হলফ করে বলবে, 'আমরা যদি পারতাম তাহলে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে বের হতাম।' আসলে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করছে, আর আল্লাহ জানেন যে, তারা অবশ্যই মিথ্যেবাদী।

আয়াতটি গাযওয়ায়ে তাবুক থেকে ফিরে আসার পূর্বে অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তাআলা এ আয়াতের মাধ্যমে জানিয়ে দেন, মুনাফেকরা আল্লাহ তাআলার নামে মিথ্যা শপথ করে বলবে, 'আমরা যদি পারতাম তাহলে অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে বের হতাম।' আল্লাহ বলেন:
يُهْلِكُونَ أَنْفُسَهُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
আসলে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করছে, আর আল্লাহ জানেন যে, তারা অবশ্যই মিথ্যেবাদী।

এর ব্যাখ্যায় ইবনে আশূর বলেন, তারা এ ক্ষেত্রে শপথের মাধ্যমে নিজেদেরই জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের বিপদ ডেকে এনেছে। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইচ্ছাকৃত মিথ্যা কসম দ্বারা মানুষ ধ্বংসের কবলে পতিত হয়। আল্লাহ তাআলা পরের আয়াতে নবীজিকে সতর্ক করে বলেন,
عَفَا اللَّهُ عَنْكَ لِمَ أَذِنْتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ
আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন (কিন্তু) তুমি তাদেরকে কেন অনুমতি দিলে যে পর্যন্ত না সত্যবাদী লোকেরা তোমার কাছে প্রকাশ হয়ে যেতো এবং তুমি মিথ্যাবাদীদেরকে জেনে নিতে?

মুজাহিদ বলেন, এ আয়াতে এমন ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করা হয়েছে যারা বলতো, তোমরা রসূলের কাছ থেকে যুদ্ধে না যাওয়ার অনুমতি নাও। তিনি তোমাদের না যাওয়ার অনুমতি দিলে তোমরা যাবে না, যাওয়ার জন্য বাধ্য করলেও যাবে না। এরা ছিল মুনাফেক। উনত্রিশ জনের এই মুনাফেক দল বিভিন্ন মিথ্যা বাহানায় যুদ্ধে না যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই, জাদ্দ ইবনে কায়েস ও রিফায়া ইবনে তাবুতও ছিল এই দলে।

উক্ত আয়াতে নবীজিকে সূক্ষ্মভাবে সতর্ক করা হয়েছে। তাদের কু মনোবৃত্তি সম্পর্কে না জেনেই তাদের না যাওয়ার অনুমতি দেওয়াটা আল্লাহ তাআলার পছন্দ হয়নি। তাই তিনি নবীজিকে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তাআলা এরপর বলেন:
لَا يَسْتَأْذِنُكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالْمُتَّقِينَ إِنَّمَا يَسْتَأْذِنُكَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَارْتَابَتْ قُلُوبُهُمْ فَهُمْ فِي رَيْبِهِمْ يَتَرَدَّدُونَ
যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, তারা তোমার কাছে তাদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করা থেকে বিরত থাকার অনুমতি চায় না, আর আল্লাহ মুত্তাকীদের সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত। একমাত্র সেসব লোক অনুমতি চায় যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে না, আর তাদের অন্তরসমূহ সংশয়গ্রস্ত হয়ে গেছে। সুতরাং তারা তাদের সংশয়েই ঘুরপাক খেতে থাকে。

জিহাদের ময়দানে মুনাফেক ও মুমিনদের পার্থক্য বোঝাতে এ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করেছেন, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, তারা তোমার কাছে তাদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করা থেকে বিরত থাকার অনুমতি চায় না। যারা আল্লাহর অবতীর্ণ কুরআনের ব্যাপারে এখনো সন্দিহান, তারা এক পা দীনের দিকে অগ্রসর হতে চাইলে আবার আরেক পা দীন থেকে পেছনে চলে যায়। অর্থাৎ ধর্মের সাথে তাদের সুদৃঢ় কোনো বন্ধন নেই। এরাই মুনাফেক। বিনা কারণে জিহাদ থেকে বিরত থাকার অনুমতি চাওয়া মুনাফেকদের কাজ。

গাযওয়ায়ে তাবুকের শুরুর দিকে ফুটে ওঠে মুমিন ও মুনাফেকদের পার্থক্য। মুনাফেকদের নোংরা মানসিকতা প্রকাশ পাওয়ার পর তা লুকানোর সুযোগ ছিল না। এ সময় তাদের দুষ্কৃতি ও চক্রান্তের মুখোশ উম্মোচন করারও প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়。

টিকাঃ
১৪৩৪. সুরা তাওবা: ৮১-৮২।
১৪৩৫. সুরা তাওবা: ৪৯।
১৪৩৬. সুরা তাওবা: ৪৩।
১৪৩৭. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়‍্যাহ : ৬১৮।
১৪৩৮. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ৮৩।
১৪৩৯. সুরা তাওবা: ৪২।
১৪৪০. তাফসীরুত তাহরিরে ওয়াততানবির: ১০/২০৯।
১৪৪১. সুরা তাওবা: ৪৩।
১৪৪২. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/৩৬০।
১৪৪৩. সুরা তাওবা ৪৪-৪৫।
১৪৪৪. তাফসীরুল মুরাগি ৪/১২৭।
১৪৪৫. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/৩৬১।
১৪৪৬. নাযরাতুন নায়ীম: ১/৩৮৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 সমরযাত্রার ঘোষণা ও সেনানিবাস

📄 সমরযাত্রার ঘোষণা ও সেনানিবাস


গাযওয়ায়ে তাবুকে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণের জন্য مسلمانوںকে আহ্বান জানানো হয়। রসূলুল্লাহ Sa.-এর সাথে ত্রিশ হাজার মুজাহিদ বের হয়। যারা এ যুদ্ধে নাম লেখাতে কিছুটা দ্বিধায় ছিল, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَا لَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انْفِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ انَّا قَلْتُمْ إِلَى الْأَرْضِ أَرَضِيتُمْ بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا مِنَ الْآخِرَةِ فَمَا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا قَلِيلٌ إِلَّا تَنفِرُوا۟ يُعَذِّبْكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا وَيَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيْـًٔا ۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ
হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কী হলো, যখন তোমাদের বলা হয়, আল্লাহর রাস্তায় (যুদ্ধে) বের হও, তখন তোমরা জমিনের প্রতি প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়? তবে কি তোমরা আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে সন্তুষ্ট হলে? অথচ দুনিয়ার জীবনের ভোগ-সামগ্রী আখেরাতের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। তোমরা যদি যুদ্ধাভিযানে বের না হও, তাহলে তোমাদেরকে ভয়াবহ শাস্তি দেয়া হবে, আর তোমাদের স্থলে অন্য সম্প্রদায়কে আনা হবে এবং তোমরা তার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান。

ধনী-দরিদ্র, যুবক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাইকে এ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
তোমরা হালকা ও ভারি উভয় অবস্থায় যুদ্ধে বের হও এবং তোমাদের মাল ও জান নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর। এটা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে。

নবীজি Sa. মুহাজির-আনসার ও অন্যান্য আরব গোষ্ঠী থেকে প্রায় ত্রিশ হাজার সেনা সমবেত করেন। অধিকাংশ অভিযানে যাওয়ার আগে রসূলুল্লাহ Sa. গন্তব্যস্থল সম্পর্কে বিস্তারিত বলতেন না। কিন্তু তাবুক অভিযানের বেলায় সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম ব্যাপার ঘটলো। এক্ষেত্রে গন্তব্যস্থলের কথা সবাইকে জানিয়ে দিলেন। যেন শত্রুর সংখ্যাধিক্য ও শক্তি অনুযায়ী সবাই প্রস্তুতি নিতে পারে。

তাই উলামায়ে কেরাম ক্ষতির সম্ভাবনা না থাকলে রণাঙ্গন সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানিয়ে দেওয়াকে বৈধ বলেছেন। তাবুক যুদ্ধের গন্তব্যস্থল যুদ্ধযাত্রার আগেই বিস্তারিত জানানোর কিছু কারণ :

১. গন্তব্য ছিল অনেক দূরের। নবীজি Sa. আগেই বুঝতে পেরেছিলেন এই তাবুকের রাস্তা পাড়ি দেওয়া কষ্টসাধ্য হবে। পথে পানিস্বল্পতা ও খাদ্যসংকটে ভুগতে হতে পারে। লোকেরা যাতে অভিযানের জন্য যথোপযুক্তভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে সেজন্য আগেভাগে তিনি সবকিছুই জানিয়ে দেন।

২. তিনি জেনেছিলেন, বাইজান্টাইনরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যক সৈন্য একত্র করেছে। তাই मुसलमानोंও বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। এর আগে মুসলমানরা এতো দক্ষ ও শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেনি。

৩. সময়টা ছিল অত্যন্ত নাজুক। তাই স্পষ্টভাবে গন্তব্যের অবগতি থাকলে প্রত্যেকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারবে। পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও করে যেতে পারবে。

৪. গাযওয়ায়ে তাবুকের গন্তব্য ও প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনী কারা তা গোপন রাখার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কেননা, তৎকালীন আরবভূমিতে এমন কোনো শক্তি ছিল না যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সক্ষম। বাইজান্টাইন, আরবের তাবুক ও দাওমাতুল জান্দাল সীমান্তবর্তী খ্রিষ্টান বাহিনী ছাড়া কারও এমন স্পর্ধা দেখাবার সাহস ছিল না。

রসূল Sa. কখনও রণাঙ্গন সম্পর্কে পূর্ব থেকে অবগত করেছেন, কখনও করেননি। এটা পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। গাযওয়ায়ে তাবুকের রণাঙ্গন সম্পর্কে মুসলমানরা নিশ্চিত হয়ে দ্রুত রণপ্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। নবীজি Sa. সমরসামগ্রীর ব্যয় নির্বাহে দানের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে বলেন, যে ব্যক্তি গাযওয়ায়ে তাবুকের জন্য ব্যয় করবে তার জন্য রয়েছে জান্নাত。

প্রস্তুতি শেষে রসূলুল্লাহ Sa. মদীনার গভর্নর হিসেবে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা.-কে নিয়োগ দেন। আলী ইবনে আবী তালিব রা.-কে তাঁর পরিবার-পরিজনের তত্ত্বাবধানের জন্য রেখে যান। তাঁকে তিনি পরিবার-পরিজনের সাথে থাকতে বলেন। মুনাফেকরা তাঁকে কেন্দ্র করে নানা রকমের অপবাদ রটনা করে। তারা বলে আলীকে অলস মনে করেই রসূলুল্লাহ Sa. তাকে রেখে গিয়েছেন। মুনাফেকদের এইসব কথা শুনে আলী রা. অস্ত্রসজ্জিত হয়ে রসূলুল্লাহ Sa.-এর কাছে যান। তিনি তখন মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে জুরফ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। আলী রা. বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, মুনাফেকরা মনে করেছে যে, আপনি আমাকে অলস মনে করে আমাকে রেখে এসেছেন। রসূলুল্লাহ Sa. বললেন, 'তারা মিথ্যা বলেছে। আমি তোমাকে আমার ও তোমার পরিবার-পরিজনের দেখাশুুনার জন্য রেখে এসেছি। হে আলী! মূসা আ. হারুন আ.-কে যে পর্যায়ে রেখেছিলেন তোমাকে যদি আমি সেই পর্যায়ে রাখি এতে তুমি কি খুশি নও? কেননা আমার পরে আর কেউ নবী হবে না।' একথা শোনার পর আলী রা. মদীনায় ফিরে গেলেন। আর রসূলুল্লাহ Sa. অভিযানে রওনা হয়ে গেলেন。

যেহেতু আলী রা. রসূল Sa.-এর আত্মীয় ও জামাই ছিলেন, তাই তিনি নিজের পরিজনদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলী রা.-কে মদীনায় রেখে যান। ঘরোয়া বিভিন্ন প্রয়োজনাদি পূরণ করা ছিল তার দায়িত্ব। আর সার্বিক রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রসূলুল্লাহ Sa.-এর স্থলাভিষিক্ত ছিলেন। সুতরাং যারা বলেন এই ঘটনায় আল্লাহর রসূল Sa.-এর পর আলী রা.-এর খেলাফত প্রাপ্তির ইঙ্গিত রয়েছে, তাদের বক্তব্য যথার্থ নয়। কেননা, রসূল Sa. তাকে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য রেখে যাননি। বরং তার দায়িত্ব ছিল রসূল Sa.-এর পরিবার-পরিজনদের দেখভাল করা。

সেনাবাহিনী যখন মদীনার উপকণ্ঠে অবস্থিত সানিয়াতুল ওয়াদাতে পৌছে, তখন রসূল Sa. সেনাবাহিনীর কমান্ডার ও পতাকাবাহী নির্ধারণ করেন। আবু বকর সিদ্দীক রা.-কে সর্বোচ্চ কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। জুবায়ের ইবনুল আওয়ামের হাতে অর্পণ করা হয় সর্ববৃহৎ পতাকাটি। উসাইদ ইবনে হুযাইর রা.-কে আউস গোত্রের ও আবু দুজানার হাতে খাজরাজগোত্রের ঝান্ডা দেওয়া হয়। রসূল Sa. আনসারদের প্রতিটি গোষ্ঠীকে আলাদা আলাদা নেতৃত্বের অধীনে সারিবদ্ধ হওয়ার আদেশ দেন。

তাবুকে আসার পর সেখানে পাহারাদারীর দায়িত্ব দেন আব্বাদ ইবনে বিশর রা.-কে। গোটা বাহিনীর মধ্যে ঘুরেফিরে নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতেন তিনি। আলকামা ইবনে ফাগওয়া খুযায়ী রা. তাবুক-এর রাস্তাঘাট সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। তাই তাকে পথপ্রদর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়。

কেবল ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর বর্ণনায় সেনাবাহিনীর বিন্যাস ও দায়িত্ব বণ্টনের এসব বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি যদিও হাদীসশাস্ত্রে 'মাতরূক' বর্ণনাকারী, তবুও রসূল Sa.-এর সীরাত ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে তার জানাশোনা বেশি। তাই তথ্যগুলো গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত।

ইসলামের শুরু থেকে ক্রমেই মুজাহিদ বাহিনীর সার্বিক শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। বিষয়টি ইতিহাস পর্যবেক্ষণকারীরা সহজেই বুঝতে পারবেন। আমরা জানি, গাযওয়ায়ে বদরে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন। গাযওয়ায়ে উহুদে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০০-তে। গাযওয়ায়ে আহযাবে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার। মক্কা বিজয়ের সময় বেড়ে হয় ১০ হাজার। গাযওয়ায়ে হুনাইনে ছিল ১২ হাজার। সর্বশেষ গাযওয়ায়ে তাবুকে মুজাহিদদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজারে। পাশাপাশি বাড়তে থাকে অশ্বারোহী বাহিনীর সংখ্যাও। আমরা জানি গাযওয়ায়ে বদরে অশ্বারোহী ছিল মাত্র দুইজন। গাযওয়ায়ে উহুদেও অনুরূপ। কিন্তু ৬ বছরের ব্যবধানে এসংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজারে। এর কারণ হচ্ছে, গ্রামের লোকেরা সাধারণত ঘোড়া প্রতিপালন ইত্যাদি ক্ষেত্রে শহরবাসীর চাইতে অগ্রগামী ছিল। আরবভূখণ্ডের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ইসলামের আলোকদ্যুতি ছড়িয়ে পড়ার ফলে অশ্বারোহীদের সংখ্যা বেড়ে যায়。

টিকাঃ
১৪৪৭. সুরা তাওবা: ৩৮।
১৪৪৮. সুরা তাওবা: ৪১।
১৪৪৯. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ৯৭।
১৪৫০. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ৯৭।
১৪৫১. আর রসূল আল কায়িদ: ৩৯৮।
১৪৫২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৫।
১৪৫৩. 'মুহাম্মদ আহমদ বাশমীল প্রণীত গাযওয়ায়ে তাবুক: ৫৭।
১৪৫৪. আল কিয়াদাহ ফি আহদির রসূল : ৫১০।
১৪৫৫. সহীহ বুখারী: ৪/২৪৩।
১৪৫৬. যাদুল মাআদ ৩/৫৩০।
১৪৫৭. সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মদীনা: ৪৬৬-৪৬৭।
১৪৫৮. ইবনে সাআদ প্রণীত তাবাকাতুল কুবরা ২/১৬৬।
১৪৫৯. সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ: ৫/৬৫২।
১৪৬০. শরহু মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়া ৩/৭২।
১৪৬১. আস সীরাতুন নববিয়‍্যাহ আসসহীহাহ ২/৫৩২।
১৪৬২. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ৮৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00