📄 নারী ও পুরুষ সাহাবীদের অনন্য কৃতিত্ব
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 আনাস ইবনে আবু মারসাদ গানাবি-এর পাহারাদারি
হুনাইনের যুদ্ধের পূর্বে রসূলুল্লাহ সা. বলেছিলেন, আজ রাতে কে আমাদের পাহারা দেবে? আনাস ইবনে আবু মারসাদ আল গানাবী রা. বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি। তিনি বললেন, তাহলে ঘোড়ায় চড়ো। তিনি তার একটি ঘোড়ায় চড়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি এই গিরিপথের দিকে খেয়াল রাখবে এবং এর শেষ চূড়ায় গিয়ে পাহারা দেবে। সাবধান! 'আমরা যেন তোমার অসতর্কতার কারণে ধোঁকায় না পড়ি।
অতঃপর ভোর হলে রসূলুল্লাহ সা. নামাযের জন্য বেরিয়ে এসে দু'রাকআত (সুন্নাত) সালাত আদায় করে বললেন, তোমাদের অশ্বারোহীর কী খবর? সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! তার খবর জানি না। নামাযের ইকামাত দেয়া হলে রসূলুল্লাহ সা. নামায পড়ালেন। নামাযে দাঁড়িয়ে তিনি বার বার গিরিপথের দিকে তাকাচ্ছিলেন। নামায শেষে সালাম ফিরিয়ে তিনি বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো, তোমাদের অশ্বারোহী এসে গেছে। সাহাবীরা বললেন, আমরা গাছের ফাঁক দিয়ে গিরিপথের দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি আসছেন। তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে এসে তাঁকে সালাম দিয়ে বললেন, আমি আপনার নির্দেশ অনুযায়ী গিরিপথের শেষ প্রান্তে গিয়েছি এবং ভোর বেলায় উভয় পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছি, কিন্তু কোনো শত্রু দেখতে পাইনি। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বললেন, তুমি কি রাতে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমেছিলে? তিনি বললেন, সালাত ও প্রাকৃতিক প্রয়োজন ছাড়া নামিনি। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বললেন, তোমার জন্য জান্নাত অবধারিত করেছো, এরপর তোমার কোনো (নফল) নেক কাজ না করলেও চলবে。
উপরোক্ত ঘটনা থেকে বোঝা যায়, রসূলুল্লাহ সা. তার প্রতিটি সঙ্গীকে গুরুত্ব দিতেন। নামায শুরু করার সময়ও তিনি তার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
নামাযের পর তার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। ইসলামী সমাজে প্রতিটি ব্যক্তিকেই এ রকম গুরুত্ব দেওয়া হতো। সেখানে ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি শুধুমাত্র তাদের সংখ্যাবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে হতো না। শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় কাজের মাধ্যম হিসেবে তাদের ব্যবহার করা হতো না। ইসলামী সমাজে প্রতিটি ব্যক্তিকে এ ধরনের গুরুত্ব প্রদান মূলত আল্লাহ তাআলার নির্দেশনারই বাস্তবায়ন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিস্ক। আর আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি。
এখানে আরেকটি বিষয় বোঝা যায়, আর তা হলো, শত্রুপক্ষের যাবতীয় অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হওয়া, সর্তকতা অবলম্বন করা ও তাদের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ সম্পর্কে অনুসন্ধান চালানো জরুরি। তাদের সংখ্যা, শক্তি, সামরিক সামর্থ্য ও রণকৌশল সম্পর্কে অবহিত হওয়া উচিত। এই শিক্ষা ইসলামের পথে জিহাদ করার ক্ষেত্রে মুসলিম শাসকদের মনে রাখা দরকার。
উল্লেখ্য, এখানে রসূলুল্লাহ সা. আনাস ইবনে আবু মারসাদ রা.-কে ভবিষ্যতে কোনো আমলের প্রয়োজনীয়তা না থাকার যে কথা বলেছিলেন, তা মূলত নফল ইবাদাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ এমন বিধানসমূহ যার মাধ্যমে সাধারণত গুনাহ মাফ হয় এবং মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ সে রাতে তার আন্তরিকতাপূর্ণ ইবাদতের কারণে তার এতটাই মর্যাদাবৃদ্ধি হয়েছে যে, ভবিষ্যতে মর্যাদাবৃদ্ধি করার জন্য আর কোনো কাজের প্রয়োজন হবে না। কেবল ফরজ- ওয়াজিব কাজ সম্পাদন করলেই যথেষ্ট হবে。
টিকাঃ
১০০৮. সুনানে আবু দাউদ: ২৫০১।
১৩৮৬. মুইনুস সিরাত: ৪২৯।
১৩৮৭. সুরা বনি ইসরাইল: ৭০।
১৩৮৮. সাদিক উরজুন প্রণীত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৪/৩৬৬।
১৩৮৯. আত তারীখুল ইসলামী: ৮/১৪।
📄 উম্মে সুলাইমের বীরত্ব
আনাস রা. বলেন, হুনাইন যুদ্ধের দিন উম্মে সুলাইমের কাছে একটি খঞ্জর ছিল। আবু তালহা আনসারী তা দেখতে পেয়ে রসূল সা.-কে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! উম্মে সুলাইমের কাছে একটি খঞ্জর আছে। রসূল সা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই খঞ্জর কেন বহন করছো? উম্মে সুলাইম রা. বললেন, যদি কোনো মুশরিক আমাদের নিকটবর্তী হয়ে যায়, তাহলে আমি তার পেট বিদীর্ণ করে দেবো। একথা শুনে রসূল সা. হাসলেন। উম্মে সুলাইম তখন বলেছিলেন, হে আল্লাহর রসূল, আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, আপনি যেভাবে হামলাকারী শত্রুদেরকে হত্যা করেছেন, যারা আপনাকে ছেড়ে পালিয়ে যায় তাদেরকেও সেভাবে হত্যা করুন। কেননা তারা হত্যার যোগ্য। রসূলুল্লাহ সা. বললেন,, 'হে উম্মে সুলাইম। এ জন্য কি আল্লাহই যথেষ্ট নন?'
টিকাঃ
১৩৯০. সহীহ মুসলিম: ১৮০৯। সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ : ৫৬৩।
📄 নবীজির দুধবোন শায়মা বিনতে হারেস
মুসলমানদের হাতে যেসব যুদ্ধবন্দী এসেছিল তাদের মধ্যে একজন ছিলেন হালিমা-এর মেয়ে এবং রসূল সা.-এর দুধবোন শায়মা বিনতে হারেস। পথিমধ্যে তার সাথে কিছু রূঢ় ব্যবহার করা হয়। তখন সে বললো, ইয়া রসূলাল্লাহ, আমি আপনার দুধবোন। তিনি বললেন, 'তার প্রমাণ কি?' সে বললো, যখন আমি আপনাকে আমার উরুর ওপর তুলেছিলাম তখন আপনি আমার পিঠে কামড় দিয়েছিলেন। সেই চিহ্ন টি এখনো আছে। রসূলুল্লাহ সা. কামড়ের চিহ্নটি দেখে চিনতে পারলেন। তিনি নিজের চাদর বিছিয়ে তাকে সসম্মানে বসতে দিলেন এবং বললেন, তুমি যদি আমার কাছে থাকা পছন্দ করো তাহলে সম্মানের সাথে থাকতে পারো। আর যদি পছন্দ করো যে, কিছু উপঢৌকন নিয়ে তুমি নিজ গোত্রে ফিরে যাবে তাহলে তাও করতে পারো।' সে বললো, আমি আমার গোত্রের কাছে ফিরে যেতে চাই। রসূলুল্লাহ সা. তাকে অনেক উপহার সামগ্রী দিয়ে তার কওমের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রসূল সা. তাকে তিনজন দাস-দাসী এবং কিছু উট ও ছাগল উপহার দিয়েছিলেন。
টিকাঃ
১৩৯১. আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ : ২/৫০৬। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/৩৬৩।
১৩৯২. আস সীরাতুন নববিয়্যাহ লিননদবী : ৩৫৮।