📄 গণিমতের সম্পদ যেখানতে নিয়েছো
গাযওয়ায়ে হুনাইне রসূলুল্লাহ সা. গণিমতের উটের পার্শ্বে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং উটের ঘাড়ের ওপর থেকে একটা পশম হাতে নিয়ে তা দেখিয়ে বললেন 'হে মুসলিম জনতা, আল্লাহর কসম, তোমাদের ফাই থেকে-এমনকি এই পশম থেকেও আমার প্রাপ্য এক পঞ্চমাংশের বেশী নয়। অথচ সেই এক পঞ্চমাংশও আমি তোমাদেরকেই দিয়ে দিয়েছি। সুতরাং যদি কেউ এই সম্পদ থেকে একটা সুই-সুতাও নিয়ে থাকো, তবে তা ফিরিয়ে দাও। মনে রেখো, যে ব্যক্তি খেয়ানত করবে, কেয়ামতের দিন ওই খেয়ানত তার জন্য আগুনের রূপ নেবে এবং চরম অপমান ও লাঞ্ছনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
জনৈক আনসারী সাহাবী তার উটের হাওদার ছিঁড়ে যাওয়া অংশ সেলাই করার জন্য কিছু পশমের সুতা নিয়েছিলেন তিনি তা ফেরত দিলেন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'এটা আমার প্রাপ্য অংশ থেকে তোমাকে দিলাম।' তিনি বললেন, আপনি খেয়ানত সম্পর্কে যে কথা বলেছেন, তাতে আমার এ জিনিসের মোটেই প্রয়োজন নেই। অতঃপর তা ফেরত দিলেন。
আকিল ইবনে আবী তালিব গাযওয়ায়ে হুনাইন যুদ্ধ শেষে নিজের স্ত্রীর কাছে যান। সেসময় তার তরবারি ছিল রক্তাক্ত। তখন তিনি তাকে একটি সুঁই দিয়ে বললেন, এই সুইটি দিয়ে তুমি পোশাক সেলাই করতে পারবে। কিন্তু যখন তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর ঘোষককে একথা বলতে শুনলেন, 'তোমাদের মধ্যে যে যা কিছু গণিমতের সম্পদ থেকে নিয়েছে; তা যেন ফিরিয়ে দেয়। এমনকি সুঁই-সুতা নিয়ে থাকলেও যেন ফিরিয়ে দেয়।' ঘোষণা শুনে আকিল পুনরায় ঘরে ফিরে এসে স্ত্রীর কাছ থেকে সেই সুইটি নিয়ে গণিমতের সম্পদে জমা করে দেন。
খেয়ানতের ব্যাপারে এতোটাই কঠোরতা অবলম্বন করা হয়। কোথাও সামান্য কিছু পড়ে থাকলেও সাহাবায়ে কেরাম রা. সেদিকে ফিরেও তাকাতেন না। রসূল সা. তাদের এভাবেই গড়ে তুলেছিলেন। কেননা খেয়ানত মানুষের মারাত্মক বদ অভ্যাস। এর দ্বারা ইসলামী সমাজ কলুষিত হয়ে পড়ে。
টিকাঃ
১৩৮০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩৫৩।
১৩৮১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩৩।
১৩৮২. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/১৪৫।
১৩৮৩. সাদিক আরজুন প্রণীত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৪/৩৮৭, ৩৮৮।
📄 জাহেলী যুগে করা মানত পূরণ
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, হুনাইন যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় ওমর রা. রসূল সা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি জাহেলি যুগে এতেকাফ করার মানত করেছিলাম, সেটি কি পালন করতে হবে? রসূল সা. তাকে তা পালনের আদেশ দেন。
টিকাঃ
১৩৮৪. সহীহ বুখারী: ৪৩২০।
📄 নারী ও পুরুষ সাহাবীদের অনন্য কৃতিত্ব
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 আনাস ইবনে আবু মারসাদ গানাবি-এর পাহারাদারি
হুনাইনের যুদ্ধের পূর্বে রসূলুল্লাহ সা. বলেছিলেন, আজ রাতে কে আমাদের পাহারা দেবে? আনাস ইবনে আবু মারসাদ আল গানাবী রা. বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি। তিনি বললেন, তাহলে ঘোড়ায় চড়ো। তিনি তার একটি ঘোড়ায় চড়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি এই গিরিপথের দিকে খেয়াল রাখবে এবং এর শেষ চূড়ায় গিয়ে পাহারা দেবে। সাবধান! 'আমরা যেন তোমার অসতর্কতার কারণে ধোঁকায় না পড়ি।
অতঃপর ভোর হলে রসূলুল্লাহ সা. নামাযের জন্য বেরিয়ে এসে দু'রাকআত (সুন্নাত) সালাত আদায় করে বললেন, তোমাদের অশ্বারোহীর কী খবর? সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! তার খবর জানি না। নামাযের ইকামাত দেয়া হলে রসূলুল্লাহ সা. নামায পড়ালেন। নামাযে দাঁড়িয়ে তিনি বার বার গিরিপথের দিকে তাকাচ্ছিলেন। নামায শেষে সালাম ফিরিয়ে তিনি বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো, তোমাদের অশ্বারোহী এসে গেছে। সাহাবীরা বললেন, আমরা গাছের ফাঁক দিয়ে গিরিপথের দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি আসছেন। তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর সামনে এসে তাঁকে সালাম দিয়ে বললেন, আমি আপনার নির্দেশ অনুযায়ী গিরিপথের শেষ প্রান্তে গিয়েছি এবং ভোর বেলায় উভয় পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছি, কিন্তু কোনো শত্রু দেখতে পাইনি। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বললেন, তুমি কি রাতে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমেছিলে? তিনি বললেন, সালাত ও প্রাকৃতিক প্রয়োজন ছাড়া নামিনি। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বললেন, তোমার জন্য জান্নাত অবধারিত করেছো, এরপর তোমার কোনো (নফল) নেক কাজ না করলেও চলবে。
উপরোক্ত ঘটনা থেকে বোঝা যায়, রসূলুল্লাহ সা. তার প্রতিটি সঙ্গীকে গুরুত্ব দিতেন। নামায শুরু করার সময়ও তিনি তার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
নামাযের পর তার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। ইসলামী সমাজে প্রতিটি ব্যক্তিকেই এ রকম গুরুত্ব দেওয়া হতো। সেখানে ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি শুধুমাত্র তাদের সংখ্যাবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে হতো না। শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় কাজের মাধ্যম হিসেবে তাদের ব্যবহার করা হতো না। ইসলামী সমাজে প্রতিটি ব্যক্তিকে এ ধরনের গুরুত্ব প্রদান মূলত আল্লাহ তাআলার নির্দেশনারই বাস্তবায়ন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিস্ক। আর আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি。
এখানে আরেকটি বিষয় বোঝা যায়, আর তা হলো, শত্রুপক্ষের যাবতীয় অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হওয়া, সর্তকতা অবলম্বন করা ও তাদের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ সম্পর্কে অনুসন্ধান চালানো জরুরি। তাদের সংখ্যা, শক্তি, সামরিক সামর্থ্য ও রণকৌশল সম্পর্কে অবহিত হওয়া উচিত। এই শিক্ষা ইসলামের পথে জিহাদ করার ক্ষেত্রে মুসলিম শাসকদের মনে রাখা দরকার。
উল্লেখ্য, এখানে রসূলুল্লাহ সা. আনাস ইবনে আবু মারসাদ রা.-কে ভবিষ্যতে কোনো আমলের প্রয়োজনীয়তা না থাকার যে কথা বলেছিলেন, তা মূলত নফল ইবাদাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ এমন বিধানসমূহ যার মাধ্যমে সাধারণত গুনাহ মাফ হয় এবং মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ সে রাতে তার আন্তরিকতাপূর্ণ ইবাদতের কারণে তার এতটাই মর্যাদাবৃদ্ধি হয়েছে যে, ভবিষ্যতে মর্যাদাবৃদ্ধি করার জন্য আর কোনো কাজের প্রয়োজন হবে না। কেবল ফরজ- ওয়াজিব কাজ সম্পাদন করলেই যথেষ্ট হবে。
টিকাঃ
১০০৮. সুনানে আবু দাউদ: ২৫০১।
১৩৮৬. মুইনুস সিরাত: ৪২৯।
১৩৮৭. সুরা বনি ইসরাইল: ৭০।
১৩৮৮. সাদিক উরজুন প্রণীত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ: ৪/৩৬৬।
১৩৮৯. আত তারীখুল ইসলামী: ৮/১৪।