📄 গাযওয়ায়ে হুনাইন সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআলা বলেন : لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُدْبِرِينَ ثُمَّ أَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَنْزَلَ جُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَعَذَّبَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ ثُمَّ يَتُوبُ اللَّهُ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
বস্তুতঃ আল্লাহ তোমাদেরকে বহু যুদ্ধ ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন আর হুনাইনের যুদ্ধের দিন, তোমাদের সংখ্যার আধিক্য তোমাদেরকে গর্বে মাতোয়ারা করে দিয়েছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি, জমি সুপ্রশস্ত হওয়া সত্বেও তা তোমাদের নিকট সংকীর্ণই হয়ে গিয়েছিল, আর তোমরা পিছন ফিরে পালিয়ে গিয়েছিলে। তারপর আল্লাহ তার রসূলের ওপর, আর মুমিনদের উপর তার প্রশান্তির অমিয়ধারা বর্ষণ করলেন, আর পাঠালেন এমন এক সেনাবাহিনী যা তোমরা দেখতে পাওনি, আর তিনি কাফেরদেরকে শাস্তি প্রদান করলেন। এভাবেই আল্লাহ কাফেরদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকেন। এরপরও আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছে করবেন তাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন, আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু。
সব যুগের সব মুসলমানদের জন্য পবিত্র কুরআনে বর্ণিত গাযওয়ায়ে হুনাইনের আলোচনায় অসংখ্য শিক্ষা রয়েছে। মহান আল্লাহর প্রজ্ঞাময় বর্ণনা পদ্ধতি থেকে যেসব বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য তা হলো :
• পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, মুসলমানরা সংখ্যাধিক্যের কারণে আত্মঅহমিকার শিকার হয়েছে। তিনি বলেছেন : وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ 'তোমাদের সংখ্যার আধিক্য তোমাদেরকে গর্বে মাতোয়ারা করে দিয়েছিল'। অতঃপর বলা হয়েছে, এই সংখ্যাধিক্য উপকারে আসেনি। এ মর্মে তিনি বলেছেন : فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا ‘কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি।'
• পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, মুসলমানদের প্রাথমিক পরাজয় এবং রসূল সা. ও মুষ্টিমেয় কয়েকজন সাহাবী ব্যতীত অন্যান্যরা পিছু হটে। তিনি বলেছেন : ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُدْبِرِينَ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ‘জমি সুপ্রশস্ত হওয়া সত্বেও তা তোমাদের নিকট সংকীর্ণই হয়ে গিয়েছিল, আর তোমরা পিছন ফিরে পালিয়ে গিয়েছিলে।'
• পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, এ যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা সাহায্য করেছেন। মুসলমানদের ওপর প্রশান্তি বর্ষণ করেছেন। আল্লাহ বলেন : ثُمَّ أَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ ‘তারপর আল্লাহ তার রসূলের ওপর, আর মুমিনদের ওপর তার প্রশান্তির অমিয়ধারা বর্ষণ করলেন।'
• পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ফেরেশতাগণের মাধ্যমে এ যুদ্ধে সহযোগিতা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন : وَأَنْزَلَ جُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَعَذَّبَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ ‘যা তোমরা দেখতে পাওনি, আর তিনি কাফেরদেরকে শাস্তি প্রদান করলেন। এভাবেই আল্লাহ কাফেরদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকেন।'
• আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, তিনি তার বান্দাদের তাওবা গ্রহণ করেন। যাকে ইচ্ছা তাকে তাওবা করার সুযোগ দেন। তিনি বলেন, ثُمَّ يَتُوبُ اللَّهُ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ যার জন্য ইচ্ছে করবেন তাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন, আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু।'
টিকাঃ
১৩৬৬. সুরা তাওবাহ: আয়াত ২৫-২৭।
১৩৬৭. হাদীসুল কুরআনিল কারীম: ২/৬০২-৬০৩।
📄 গাযওয়ায়ে হুনাইনে জয়-পরাজয়ের নেপথ্যে
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 প্রাথমিক পরাজয়ের কারণসমূহ
গাযওয়ায়ে হুনাইনে প্রথম দিকে মুসলমানরা যেসব কারণে পরাজয়ের মুখে পড়ে, তা হলো:
১. অধিক সংখ্যক হওয়ার কারণে মুসলমানরা প্রথম দিকে আত্মঅহমিকায় ভুগছিল। তারা ভেবেছিল, আজ সংখ্যাস্বল্পতার কারণে পরাজিত হতে হবেনা। নবীজি সা. কথাটি পছন্দ করেননি। এটা ছিল পরাজয়ের একটা হেতু।
২. অল্পবয়সি এমন কিছু যুবক মুসলিম বাহিনীতে ছিল, যাদের কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। কিন্তু তাদের মধ্যে ছিল আবেগ ও দ্রুততা।
৩. এ যুদ্ধে শত্রুজোটের সৈন্যসংখ্যা ছিল مسلمانوں দ্বিগুণের অধিক।
৪. কাফের জোটের নেতা মালেক ইবনে আউফ مسلمانوں আগমনের আগেই রণাঙ্গনে অবস্থান নেয়। পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে সেখানে অবস্থান করার পাশাপাশি مسلمانوں বিরুদ্ধে গেরিলাবাহিনীও প্রস্তুত রাখে। এছাড়া مسلمانوں নিম্নভূমিতে অবস্থান করতে বাধ্য করার ফলে তারা অবস্থানগত কিছু সুবিধা নিতে পেরেছিল। مسلمانوں ওপর তারা অতর্কিতে আক্রমণ চালায়।
৫. শত্রুজোট পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে শৃঙ্খলার সাথে মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলা করছিল। ইতোপূর্বে মুশরিক বাহিনীকে কখনো এভাবে মোকাবিলা করতে দেখা যায়নি। বাহিনীকে পর্যায়ক্রমে অশ্বারোহী সেনা, পদাতিক সেনা, নারী ও গবাদি পশু দিয়ে সাজানো হয়েছিল।
৬. যেসব মুসলমান মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করে, তারাও এ যুদ্ধে উপস্থিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে مسلمانوں পিছু হটার নেপথ্যে এটাও ছিল একটা কারণ। তারা পিছু হটার চেষ্টা করায় পেছন দিকের মানুষদের সাথে তাদের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়; এতে তারা দিশেহারা হয়ে যায়。
টিকাঃ
১৩৬৮. আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন: ২/৪০৯।
📄 বিজয়ের কারণসমূহ
খ. ১. নবীজির দৃঢ়তা ও অবিচলতায় এবং তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে পেছনে সরে যাওয়া সবাই ফিরে এসে যুদ্ধের ময়দান নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে আসে।
২. মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন স্বয়ং রসূলুল্লাহ সা.। তিনি কেবল নিজেই অবিচল ছিলেন না; বরং নিজের বাহন নিয়ে দ্রুত গতিতে শত্রুবাহিনীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। অধিকাংশ মুজাহিদ যখন পেছনে চলে যাচ্ছিলেন, রসূল সা. তখন শত্রুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় আব্বাস রা. রসূল Sa.-এর বাহনকে লাগাম টেনে ধরে থামিয়ে রাখারও চেষ্টা করেন।
৩. রসূলুল্লাহ Sa.-এর সাথে ছিলেন সাহসী সাহাবীরা। তাদের এ সাহসিকতা দেখে যারা পেছনে চলে যাচ্ছিলো তারা ফিরে আসেন ও সাহসিকতার সাথে লড়াই চালিয়ে যান।
৪. পলায়নরত মুজাহিদরা দ্রুত ফিরে এসে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন।
৫. অধিকাংশ মুজাহিদ যখন পিছু হটছিলেন, শত্রুপক্ষ তখন তাদের পিছু ধাওয়া করেনি। এটা শত্রুদের একটি মারাত্মক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছিল। ফলে মুজাহিদ বাহিনী আবার নিজেদের অবস্থানে ফিরে আসার সুযোগ পায়। শত্রুপক্ষকে তাদের এ ভুলের মাশুল দিতে হয়েছিল। রসূলুল্লাহ Sa.-এর নেতৃত্বে মুসলমানরা দ্বিতীয়বার ময়দানে এসে যুদ্ধের পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।
৬. রসূলুল্লাহ Sa. এক মুষ্টি কঙ্কর হাতে নিয়েছিলেন এবং কাফেরদের দিকে তা নিক্ষেপ করেছিলেন। তখন তিনি এ কথা বলছিলেন, মুহাম্মাদের রবের শপথ! তারা নিঃসন্দেহে পরাজিত হয়েছে।
৭. আল্লাহর সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করে রসূলুল্লাহ Sa. যুদ্ধের শুরু থেকে বিজয়ের জন্য দোআ করছিলেন।
৮. রণাঙ্গনে ফেরেশতাদের অবতরণ ও তাদের অংশগ্রহণও ছিল যুদ্ধজয়ের হেতু। সূরা তাওবায় আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, وَأَنْزَلَ جُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَعَذَبَ الَّذِينَ كَفَرُوا ‘আর পাঠালেন এমন এক সেনাবাহিনী যা তোমরা দেখতে পাওনি, আর তিনি কাফেরদেরকে শাস্তি প্রদান করলেন। এভাবেই আল্লাহ কাফেরদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকেন।'
টিকাঃ
১৩৬৯. শরহুন নববী আলা সহীহ মুসলিম: ১২/১১৬।
১৩৭০. আবু ফারিস প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ৪২৩।