📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 সংখ্যধিক্যের গৌরব আল্লাহর সাহায্য দূরে সরিয়ে দেয়

📄 সংখ্যধিক্যের গৌরব আল্লাহর সাহায্য দূরে সরিয়ে দেয়


নিজেদের সংখ্যাধিক্যের ওপর আস্থা ও গৌরব থাকলে আল্লাহর সাহায্য দূরে সরে যায়। ইতোপূর্বের আলোচনায় আমরা দেখে এসেছি, যুদ্ধের শুরুতে কতক মুসলমানের মাঝে কিছুটা আত্ম-অহমিকা দেখা যায়। ফলে আল্লাহর সাহায্য দূরে সরে যায়। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন: لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُدْبِرِينَ
বস্তুত আল্লাহ তোমাদেরকে বহু যুদ্ধ ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন আর হুনাইনের যুদ্ধের দিন, তোমাদের সংখ্যার আধিক্য তোমাদেরকে গর্বে মাতোয়ারা করে দিয়েছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি, যমীন সুপ্রশস্ত হওয়া সত্বেও তা তোমাদের নিকট সংকীর্ণই হয়ে গিয়েছিল, আর তোমরা পিছন ফিরে পালিয়ে গিয়েছিলে।

প্রিয়নবী সা. এ ব্যাপারে বলেছিলেন, 'হে আল্লাহ! তুমি ব্যতীত উত্তম কাজ করার কোনো সামর্থ্য আমাদের নেই এবং তোমার সাহায্য ব্যতীত মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার কোনো সামর্থ্য নেই আমাদের।' তিনি আরও বলেছিলেন, 'হে আল্লাহ! আমি তোমার সাহায্যে আসা-যাওয়া করি এবং তোমার সাহায্যে হামলা করি এবং তোমার সাহায্যে যুদ্ধ করি।'

রণাঙ্গনে এভাবেই নবীজি সাহাবীদের শেখাতেন। হুনাইন যুদ্ধে मुसलमानों একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখী হতে হয়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে তারা পরাজয়ের মুখে পড়। বহুসংখ্যক মুসলমান রণাঙ্গন থেকে পিছু হটেছিলেন। তবুও আল্লাহর রসূল সা. পিছু হটা লোকদের কোনো ধরনের তিরস্কার করেননি। মুসলমানদের কেউ কেউ নবীজিকে বলেন, নওমুসলিম ও গ্রাম্য ব্যক্তিদের যুদ্ধে পলায়ন করার কারণে হত্যার অনুমতি দেওয়া হোক। কিন্তু দয়ার নবী তাদের আবেদনে সাড়া দেননি。

টিকাঃ
১৩৪১. সুরা তাওবা: ২৫
১৩৪২. মুসনাদে আহমদ: ৪/৩৩৩।
১৩৪৩. আল মুজতামা আল ইসলামী লিলউমরী: ১৯৯।
১৩৪৪. আল মুজতামা আল ইসলামী লিলউমরী: ২০৪-২০৫।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মন জয়ের লক্ষ্যে গণিমত প্রদান

📄 মন জয়ের লক্ষ্যে গণিমত প্রদান


রসূলুল্লাহ সা. মক্কা বিজয়ের পর গণিমতের সম্পদ প্রদানের মাধ্যমে নওমুসলিমদের মন জয় করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, বেশিদিন হয়নি; তাই রসূল সা. কুরায়েশের সরদার, গাতফান ও তামীম গোত্রের লোকদের বিপুল পরিমাণ উপহার সামগ্রী দেন। একেকজনকে উপহার হিসেবে দেন একশ করে উট। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, সুহাইল ইবনে আমর, হাকিম ইবনে হিযাম, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যা, উয়াইনা ইবনে হাসান ফাজারী, আকরা ইবনে হাবেস, মুআবিয়া, ইয়াযীদ ইবনে আবু সুফিয়ান ও কায়েস ইবনে আদি প্রমুখ。

এসব উপহার প্রদানের মাধ্যমে মূলত তাদের জাগতিক লোভ-লালসা থেকে মুক্ত করে ইসলামের প্রতি আগ্রহী করে তোলাই ছিল উদ্দেশ্য। আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, কিছু লোক শুধু জাগতিক লালসায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামের শিক্ষা ও সৌন্দর্য তাদের এতটাই পরিবর্তন করে দিয়েছিল যে, জগতের সবকিছুর চাইতে ইসলামই তাদের কাছে হয়ে ওঠে সবচেয়ে প্রিয়。

নবীজির ব্যাপারে সাফওয়ান ইবনে ওমাইয়া বলেন, রসূল সা. আমাকে বহু সম্পদ দান করেছেন। এক সময় তিনি ছিলেন আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত লোক। কিন্তু অপরিসীম বদান্যতার ফলে তিনি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি হয়ে যান。

রসূলুল্লাহ সা. কুরায়েশ ও অন্যান্য আরব গোত্রের নেতাদের প্রতি এরূপ বদান্যতা প্রদর্শন করায় এবং আনসারগণকে কিছুই না দেয়ায় তাদের কেউ কেউ মানবিক প্রবৃত্তির কারণে খুবই অসন্তুষ্ট হন এবং কেউ কেউ আপত্তিকর কথাবার্তা বলা শুরু করেন। এমনকি কেউ কেউ বলেন, রসূলুল্লাহ সা. তাঁর আপনজনদেরকে খুশি করেছেন। এ সময় সাআদ ইবনে উবাদা রা. রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে দেখা করে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, আপনি গনীমতের সম্পদ যেভাবে বিলিবন্টন করলেন তাতে আনসারগণ ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছে। আপনি এসব সম্পদ নিজের গোত্র কুরায়েশ ও অন্যান্যদের মধ্যে বন্টন করলেন, অথচ আনসারদের কিছুই দিলেন না। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'হে সাআদ! তোমার নিজের মনোভাব কি?' তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, আমি আমার গোত্রের একজন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'তাহলে তোমার গোত্রকে এখানে হাজির করো।'

সাআদ আনসারদেরকে সেখানে ডেকে আনলেন। কিছুসংখ্যক মুহাজিরও সেখানে এসে হাজির হলে রসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে থাকার অনুমতি দিলেন। এরপর আবার কিছুসংখ্যক মুহাজির আসতে চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন। এরপর আবার কিছুসংখ্যক মুহাজির আসতে চাইলে তিনি আর অনুমতি দিলেন না।

প্রথমে তিনি যথাযথভাবে আল্লাহর প্রশংসা করলেন। অতঃপর বললেন, 'হে আনসারগণ, তোমাদের পক্ষ থেকে কিছু আপত্তিকর কথা উচ্চারিত হতে শুনেছি এবং আমার ওপর তোমরা ক্ষুব্ধ ও ক্রুব্ধ হয়েছো বলে জানতে পেরেছি। বলতো আমি যখন তোমাদের কাছে আসি তখন কি তোমরা পথভ্রষ্ট ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ কি তোমদেরকে হেদায়াত দান করেননি? তোমরা কি দরিদ্র ছিলে না অতঃপর আল্লাহ কি তোমাদের সচ্ছল করেননি? তোমরা কি পরস্পরের শত্রু ছিলে না। অতঃপর আল্লাহ কি তোমাদেরকে পরস্পরের কাছে প্রিয় করে দেননি?' তারা বললেন, হ্যাঁ। আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলই আমাদের ওপর সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ করেছেন।

তিনি আরো বললেন, 'হে আনসারগণ, তোমরা জবাব দাও না কেন?' তারা বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল, আমরা আপনাকে কী জবাব দেবো? আল্লাহর রসূলই আমাদের ওপর সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ করেছেন।

রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'তোমরা বলতে পারো, তুমি আমাদের কাছে এসেছিলে এমন অবস্থায়, যখন কেউ তোমার প্রতি ঈমান আনেনি, আমরাই কেবল ঈমান এনছিলাম। সবাই তোমাকে নির্যাতন করেছিল শুধু আমরাই তোমাকে সাহায্য করেছিলাম, তোমাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল আমরাই তোমাকে আশ্রয় দিয়েছিলাম, তুমি অসহায় অবস্থায় আমাদের কাছে এসেছিলে আমরা তোমাকে আপনজন করে নিয়েছিলাম। এ কথাগুলো যদি তোমরা বলো, তাহলে তা মোটেও মিথ্যা হবে না। সবাই তার সত্যতা স্বীকার করবে। হে আনসারগণ! দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী সম্পদের জন্য তোমরা আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে গেলে? যার দ্বারা আমি মানুষদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছি যেন তারা মুসলমান হয়ে যায়। আর তোমরা যেহেতু আগে থেকেই মুসলমান আছো তাই আমি তোমাদের ব্যাপারে আশ্বস্ত রয়েছি। হে আনসারগণ! তোমরা কি এতে খুশি নও যে, লোকেরা উট ও বকরী নিয়ে চলে যাক, আর তোমরা তার বদলে আল্লাহর রসূলকে নিয়ে যাবে? যে আল্লাহর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, তাঁর শপথ করে বলছি, আমাকে যদি হিজরত করে আসতে না হতো, তাহলে আমি তোমাদেরই মতো একজন আনসার হতাম। সবাই যদি একপথে চলে আর আনসাররা যদি ভিন্ন পথে চলে আমি আনসারদের পথ ধরেই চলবো। হে আল্লাহ! তুমি আনসারদের প্রতি রহমত বর্ষণ করো, তাদের সন্তানদের ওপর এবং সন্তানদের বংশধরদের ওপরও রহমত বর্ষণ করো।'

রসূলুল্লাহ সা.-এর এ ভাষণে আনসার সাহাবীরা এতো কাঁদলেন যে, তাদের দাড়ি ভিজে গেলো। তারা সমস্বরে বলে উঠলেন, আমরা আমাদের ভাগে আল্লাহর রসূল সা.-কে পেয়েই সন্তুষ্ট এবং তাতেই গৌরবান্বিত। অতঃপর রসূলুল্লাহ সা. চলে গেলেন। অন্যরাও যে যার কাজে চলে গেলো。

আরেক বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহর রসূল সা. সে বক্তব্যে বলেছিলেন, আমার পর বিভিন্ন লোকদের তোমাদের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রেও তোমরা হাউজে কাউসার-এ আমার সাথে মিলিত হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করবে。

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, উপরোক্ত মনোভাব সকল আনসারী সাহাবী থেকে প্রকাশ পায়নি; বরং অল্পবয়স্ক কয়েকজন সাহাবীর মধ্যে এ ধরনের মানসিকতা দেখা গিয়েছিল। এ ব্যাপারে সহীহাইনে এসেছে: আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, হুনাইন যুদ্ধের দিন আল্লাহ নবীজিকে হাওয়াযিন গোত্রের যে সম্পদ দান করলেন তা থেকে রসূলুল্লাহ সা. কুরায়েশদের কিছু লোককে একশত উট উপহার দেন। আনসারদের কেউ কেউ তখন বলতে লাগলেন, আল্লাহ তার রসূলকে ক্ষমা করুন। তিনি কুরায়েশদের দিচ্ছেন, আর আমাদেরকে বাদ দিচ্ছেন। অথচ আমাদের তরবারি থেকে এখনো তাদের রক্ত ঝরছে।

আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, তাদের এ কথাটি রসূলুল্লাহ সা.-এর কানে গেলে তিনি আনসারদের ডেকে পাঠালেন এবং তাদেরকে চামড়ার একটি তাঁবুর মধ্যে সমবেত করলেন। তারা সকলে সমবেত হলে রসূলুল্লাহ সা. তাদের কাছে আসলেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি তোমাদের একটা কথা শুনেছি, সেটা কী? তখন আনসারদের মধ্য থেকে প্রাজ্ঞ ও জ্ঞানীরা রসূল সা.-কে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, আমাদের জ্ঞানী লেকেরা কিছুই বলেনি। অবশ্য আমাদের মধ্যে কিছু অল্প বয়সী তরুণ বলেছে, আল্লাহ তার রসূলকে ক্ষমা করুন। তিনি কুরায়েশদের দান করছেন আর আমাদের বাদ দিচ্ছেন। অথচ তাদের রক্ত এখনো আমাদের তরবারি থেকে ঝরছে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, যারা সবেমাত্র কুফুরি বর্জন করে ইসলাম গ্রহণ করেছে, এমন কিছু লোককে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য আমি উপহার দিয়েছি。

উপরোক্ত ঘটনায় ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রহ. প্রমাণ করেন, কখনো ইসলামের শত্রুদের ইসলামমুখী করার জন্য বা مسلمانوںকে তাদের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করার জন্য তাদের মনতুষ্টি করা শাসকের জন্য আবশ্যক হয়ে পড়ে।

তিনি মনে করেন, দীন ও مسلمانوں স্বার্থরক্ষায় শাসক مسلمانوں প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। তাই ইসলামের স্বার্থে, ইসলামী রাষ্ট্রের হেফাজতের লক্ষ্যে ইসলামের শত্রুদের তুষ্ট করার প্রয়োজন অনুভব করলে তাদের উপহার দেওয়া শুধু বৈধই নয়; বরং ওয়াজিব। কেননা, একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত مسلمانوں এ ধরনের সম্পদ থেকে বঞ্চিত রাখা যদিও একটি মন্দ দিক; তবুও প্রভাবশালী শত্রুপক্ষকে তুষ্ট রাখা না গেলে যে বিপদের আশঙ্কা রয়েছে তা আরো ভয়াবহ। এমতাবস্থায় শরীয়তের মূলনীতি হচ্ছে: বৃহৎ স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়া যায়। আর দুটি উপকারী বিষয়ের মধ্যে যেটা বেশি প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সেটাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এ মূলনীতিটি দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় উপকারী বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

ইসলামের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে এসব পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। এতে তাদের ঈমান সুদৃঢ় হয়। এ ধরনের আচরণের দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে শায়েখ মুহাম্মাদ গাযালী একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টান্ত পেশ করে থাকেন। তিনি বলেন, তৃণভোজী প্রাণীদের ঘাস দেখিয়ে আকৃষ্ট করতে থাকলে তারা সেদিকে চলতে চলতে ধীরে ধীরে যেমন ফাঁদে চলে আসে; এ পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে যাদের লালসা দেখিয়ে সত্যের পথে, ঈমান ও ইসলামের দিকে আনা যায়। যুক্তি ও বিবেকের মাধ্যমে তা সম্ভব হয় না।

নবীজি সা. আনসারদের সামনে অত্যন্ত আবেগঘন বক্তব্য রাখেন। কিছু মানুষ আছে যারা ঈমানের আলো পেয়ে সন্তুষ্ট। আবার কিছু মানুষ আছে যাদের মনোতুষ্টির জন্য উটসহ বিভিন্ন উপহার দিতে হয়। একদিকে এমন একটি জাতির কথা রসূলুল্লাহ সা. তুলে ধরেছেন, যারা রসূলকে পেয়ে গর্বিত। অন্যদিকে এমন কিছু মানুষ রয়েছে যারা উটসহ বিভিন্ন চতুষ্পদ প্রাণী নিয়েই আহ্লাদিত।

নবীজির এমন ভাষণে আনসার সাহাবীদের চেতনায় তেজ আসে। তারা বুঝতে পারেন, তারা এমন একটি ভুল করেছেন যা তাদের করা উচিত হয়নি। রসূল সা.-এর বক্তব্য শুনে তারা কাঁদলেন। নির্দ্বিধায় নবীজির সাথে একাত্মতা পোষণ করলেন। রসূলুল্লাহ সা. নিজের প্রজ্ঞাদীপ্ত ও আবেগঘন বক্তব্যের মাধ্যমে তাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেন。

টিকাঃ
১৩৪৫. মুইনুস সিরাত: ৪২১।
১৩৪৬. সহীহ মুসলিম: ২৩১২।
১৩৪৭. সহীহ মুসলিম: ২৩১৩।
১৩৪৮. যাদুল মাআদ: ৩/৪৭৪।
১৩৪৯. সহীহ মুসলিম: ১০৬১।
১৩৫০. সহীহ বুখারী: ৪৩৩১।
১৩৫১. যাদুল মাআদ: ৩/৪৮০।
১৩৫২. ফিকহুস সীরাহ লিলগাযালী: ৪০৬।
১৩৫৩. আল মুজতামা আল মাদানী লিলউমরী: ২১৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বেদুইন ও গ্রাম্য লোকদের অপসন্দরণে ধৈর্যধারণ

📄 বেদুইন ও গ্রাম্য লোকদের অপসন্দরণে ধৈর্যধারণ


বেদুইন ও গ্রাম্য লোকেরা প্রতিনিয়ত অসদাচরণ করতো। যখন-তখন সম্পদ ও পদের লোভ করতো। দয়ার নবী এসব ক্ষেত্রে চরম ধৈর্য ও দূরদর্শিতা দেখাতেন। তিনি ছিলেন একজন সহিষ্ণু ও প্রজ্ঞাবান শিক্ষক। মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি ও অভ্যাস অনুপাতে তাদের সাথে আচরণ করতেন। সর্বোত্তম চরিত্রের দ্যুতি ছড়াতেন। গ্রাম্য লোকদের চাহিদা ও অভিরুচির প্রতি লক্ষ রেখে সেই অনুযায়ী ব্যবহার করতেন। দয়া ও অনুগ্রহের দৃষ্টিতে শিক্ষা দিতেন। অথচ সে সময়কার শাসকদের সামনে মানুষদের মাথা নুইয়ে প্রবেশ করতে হতো। সিজদাবনত হতে হতো। আবেদন-নিবেদন করতে হলে বিভিন্ন ধরনের উপাধি যোগ করে তোষামোদ সহকারে চাইতে হতো।

কিন্তু নবীজির ব্যাপারটি ছিল ভিন্ন। একজন সাধারণ মানুষের মতো তিনি তাদের সাথে কথা বলতেন। তাদের সাথে আনন্দ-বেদনা, রাগ-অনুরাগ প্রকাশ করতেন। তিনি কখনও তাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে ভিন্ন জায়গায় থাকতেন না। সাহাবায়ে কেরামও নবীজির সামনে ভদ্র আচরণ করতেন। তারা প্রিয়নবীর সামনে মৃদু আওয়াজে কথা বলতেন। হৃদয় উজাড় করে নবীজিকে ভালোবাসতেন। অন্যদিকে রূঢ় মানসিকতার অধিকারী বেদুইন ও গ্রাম্য ব্যক্তিরা মাঝেমধ্যে বেয়াদবি করতো। কঠোর আচরণ করতো। নবীজির সাথে উঁচু আওয়াজে অশালীন ভাষায় কথা বলতো। এমন ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে তাদেরকে সতর্কও করা হতো। এখানে আমরা এমন বেদুইন ও গ্রাম্য লোকদের সাথে রসূলুল্লাহ সা.-এর অনুপম সুন্দর আচরণের কয়েকটি দৃষ্টান্ত পেশ করবো :

টিকাঃ
১৩৫৪. আল মুজতামা আল মাদানী লিলউমরী: ২১৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 গ্রাম্য ব্যক্তির সুসংবাদ ফিরিয়ে দেওয়া

📄 গ্রাম্য ব্যক্তির সুসংবাদ ফিরিয়ে দেওয়া


ক. আবু মুসা আশআরী রা. বলেন, আমি মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী জিইরানা নামক স্থানে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে অবস্থান করছিলাম। তখন তার কাছে ছিলেন বেলাল রা.। এই সময় রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এক বেদুইন এসে বললো, আপনি আমাকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তা পূরণ করবেন না? তিনি তাকে বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ করো। সে বললো, 'সুসংবাদ গ্রহণ করো' এই কথাটি তো আপনি আমাকে অনেকবারই বলেছেন। তখন নবীজি ক্রোধ ভরে আবু মুসা ও বেলাল রা.-এর দিকে ফিরে বললেন, লোকটি সুসংবাদ ফিরিয়ে দিয়েছে। তোমরা দুজন তা গ্রহণ করো। তারা উভয়ে বললেন, আমরা তা গ্রহণ করলাম। এরপর নবীজি পানির একটি পাত্র আনতে বললেন। এর মধ্যে নিজের উভয় হাত ও মুখমণ্ডল ধুয়ে কুলি করলেন। তারপর বললেন, তোমরা উভয়ে এ থেকে পান করো এবং নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুকে ছিটিয়ে দাও আর সুসংবাদ গ্রহণ করো। তারা উভয়ে পাত্রটি তুলে নিয়ে নির্দেশ মতো কাজ করলেন। এমন সময় উম্মে সালামা রা. পর্দার আড়াল থেকে ডেকে বললেন, তোমাদের মায়ের জন্যও কিছু রাখো। তারা এ থেকে অতিরিক্ত কিছু উম্মে সালামা রা.-এর জন্য রাখলেন。

টিকাঃ
১৩৫৫. সহীহ বুখারী: ৪৩২৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00