📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 আওতাস ও তায়েফ অভিমুখে পলায়নকারীদের পিছু ধাওয়া

📄 আওতাস ও তায়েফ অভিমুখে পলায়নকারীদের পিছু ধাওয়া


১. আবু মূসা রা. বলেন, হুনাইন যুদ্ধের পর নবী সা. আওতাস গোত্রের বিরুদ্ধে আবু আমির রা.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠালেন। যুদ্ধে তিনি দুরাইদ ইবনে সিম্মার সঙ্গে মুকাবিলা করলে দুরাইদ নিহত হয় এবং আল্লাহ তার সঙ্গীদেরকেও পরাস্ত করেন। আবু মূসা রা. বলেন, নবী সা. আবু আমির রা.- এর সঙ্গে আমাকেও পাঠিয়েছিলেন। এ যুদ্ধে আবু আমির রা.-এর হাঁটুতে একটি তীর লাগে। জুশাম গোত্রের এক লোক তীরটি নিক্ষেপ করেছিল। তখন আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, চাচাজান! কে আপনার দিকে তীর ছুঁড়েছে? তখন তিনি ইশারায় দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ওই যে, ওই ব্যক্তি আমাকে তীর মেরেছে। আমাকে হত্যা করেছে। আমি লোকটিকে লক্ষ্য করে তার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। সে আমাকে দেখামাত্র পালাতে শুরু করলো। আমি এ কথা বলতে বলতে তার পিছু নিলাম, পালাতে লজ্জা করে না! আমার কথা শুনে লোকটি থেমে গেলো। আমরা তরবারি দিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করলাম এবং আমি ওকে হত্যা করে ফেললাম। তারপর আমি আবু আমির রা.-কে বললাম, আল্লাহ আপনার আঘাতকারীকে হত্যা করেছেন। তিনি বললেন, এখন এ তীরটি বের করে দাও। আমি তীরটি বের করে দিলাম। তখন ক্ষতস্থান থেকে কিছু পানি বের হলো। তিনি আমাকে বললেন, হে ভাতিজা! তুমি নবী সা.-কে আমার সালাম জানাবে এবং আমার মাগফিরাতের জন্য দোআ করতে বলবে।

আবু আমির রা. তার স্থলে আমাকে সেনাদলের অধিনায়ক নিয়োগ করলেন। এরপর তিনি কিছুক্ষণ বেঁচে ছিলেন, তারপর ইন্তেকাল করলেন। (যুদ্ধ শেষে) আমি ফিরে এসে নবী সা.-এর গৃহে প্রবেশ করলাম। তিনি তখন পাকানো দড়ির তৈরি একটি খাটিয়ায় শায়িত ছিলেন। খাটিয়ার উপর পাতলা একটি বিছানা ছিল। কাজেই তার পৃষ্ঠে এবং দুই পার্শ্বে পাকানো দড়ির দাগ পড়ে গিয়েছিল। আমি তাকে আমাদের এবং আবু আমির রা.-এর সংবাদ জানালাম। তাকে এ কথাও বললাম যে, তিনি মৃত্যুর আগে আপনার কাছে মাগফেরাতের দোআ চেয়েছেন। এ কথা শুনে নবী সা. পানি আনতে বললেন এবং উযু করলেন। তারপর দু'হাত উপরে তুলে বললেন:
اللهم اغفر لعبيد أبي عامر
হে আল্লাহ! তোমার প্রিয় বান্দা আবু আমিরকে ক্ষমা করো।

উভয় হাত উত্তোলনের কারণে আমি তার বগলদ্বয়ের শুভ্রাংশ দেখতে পাচ্ছিলাম। তারপর তিনি বললেন:
اللهم اجعله يوم القيامة فوق كثير من خلقك من الناس
হে আল্লাহ! কেয়ামত দিবসে তুমি তাকে অনেক মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান কোরো।

আমি বললাম, আমার জন্যও দোআ করুন। তিনি দোআ করলেন:
اللهم اغفر لعبد الله بن قيس ذنبه وأدخله يوم القيامة مدخلا كريما
হে আল্লাহ! আবদুল্লাহ ইবনে কায়সের গুনাহ ক্ষমা করে দাও এবং কেয়ামত দিবসে তুমি তাঁকে সম্মানিত স্থানে প্রবেশ করাও।
বর্ণনাকারী আবু বুরদা রা. বলেন, দু'টি দোআর একটি ছিল আবু আমির রা.-এর জন্য আর অপরটি ছিল আবু মূসা রা.-এর জন্য。

২. তায়েফে পলায়নকারীদের অবরোধ
রসূলুল্লাহ সা. তায়েফ অবরোধ করলেন। নতুন নতুন সামরিক কৌশল প্রয়োগ করেন তাদের বিরুদ্ধে। এ লক্ষ্যে তিনি ঘনঘন পরামর্শসভা ডাকেন। অবরোধ চলাকালে তিনি মুসলিম বাহিনীর অবস্থানের জন্য উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করেন। শত্রুপক্ষকে চাপে রাখার লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেন।

টিকাঃ
১০২৬. সহীহ বুখারী: ৪৩২৩।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 নতুন সমরাস্ত্র ব্যবহার

📄 নতুন সমরাস্ত্র ব্যবহার


ক. এ সময় তিনি এমন কিছু রণকৌশল ও অস্ত্র প্রয়োগ করেন, যা এর আগে কেউ কোনো যুদ্ধে ব্যবহার করেনি। যেমন:

কামান: তায়েফ এলাকার সাকিফ গোত্রের দুর্গ অবরোধ করার সময় নবীজি সা.-কামান ব্যবহার করেছেন। মিনজানিক বা কামান এমন ভারি অস্ত্র, যার মাধ্যমে অবরোধ চলাকালে বিশাল বিশাল পাথর নিক্ষেপ করা হতো। আর এভাবে পাথর নিক্ষেপ করে ধ্বংস করা হতো দুর্গের প্রাচীর ও উঁচু মিনার। দূরবর্তী অঞ্চলে আগুনের গোলা নিক্ষেপের মাধ্যমে অগ্নিসংযোগ করা যেতো এ কামানের দ্বারা। কামান পরিচালনা ও তার ব্যবহারের জন্য একটি বিশেষ-বাহিনী গঠন করা হয়।

ট্যাংক: এ সময় রসূলুল্লাহ সা. প্রথমবারের মতো যেসব অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন, তার মধ্যে দাব্বাবা বা ট্যাংক ছিল অন্যতম। এটি ছিল গাছের তৈরি ছোটো কক্ষের মতো একটি অস্ত্র, যা শত্রুপক্ষের তীরের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য ব্যবহৃত হতো। এছাড়া এটার মাধ্যমে দুর্গের দেয়াল ধ্বংসের কাজও করা হতো।

কাঁটাযুক্ত ফাঁদ: তায়েফ যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হয় বর্তমান যুগের স্থল মাইনের সদৃশ কাঁটাযুক্ত ফাঁদ। এটা তখন অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়। ক্রুশের আকৃতিতে দুটি দণ্ড কোণাকুণিভাবে বেঁধে দেওয়া হতো, ফলে এটা চারকোণবিশিষ্ট একটি আকৃতির মতো দেখাতো। দূরবর্তী কোনো স্থানে এটা নিক্ষেপ করা হলে তাতে আটকে যেত ঘোড়া বা পদাতিক বাহিনী। ফলে দুর্বল হয়ে পড়তো শত্রুপক্ষের দ্রুত আক্রমণের ক্ষমতা। ঐতিহাসিকরা বলেন, রসূল সা. তায়েফ যুদ্ধের সময় সাকিফ গোত্রের দুর্গের আশেপাশে এই ধরনের কাঁটাযুক্ত ফাঁদ ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

রসূলুল্লাহ সা.-এর এ ধরনের কর্মপদ্ধতিতে উম্মতের সর্বস্তরের মানুষের জন্য রয়েছে দিক নির্দেশনা। বুদ্ধিবৃত্তিক কলাকৌশলের মাধ্যমে উপকারী জিনিস আবিষ্কার করা ও তার মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার শিক্ষাও আমরা এর মাধ্যমে পাই।

টিকাঃ
১৩২৭. সুনানে তিরমিযী: ২৯১২।
১৩২৮. আল মাদরাসাতুল আসকারীয়া আল ইসলামিয়া: ৪০৭।
১৩২৯. আল কিয়াদাতুল আসকারীয়াহ ফি আহদির রসূল: ৪০৫।
১৩৩০. আল ফননুল হারবী ফি সদরিল ইসলাম: ১৯৫।
১৩৩১. ইবনে সাআদ প্রণীত তাবাকাতুল কুবরা ২/২১৪।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 যুদ্ধের উপযোগী জায়গা নির্বাচনে নবীজি

📄 যুদ্ধের উপযোগী জায়গা নির্বাচনে নবীজি


মুজাহিদরা যেখানে অবস্থান করছিল, সেটা ছিল কাফেরদের দুর্গের কাছে অরক্ষিত উন্মুক্ত প্রান্তর। তখনও সম্পূর্ণ মুজাহিদ বাহিনী তাঁবু স্থাপন করতে পারেনি, এমন সময়ে শত্রুরা বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষেপ করতে থাকে। অনেকেই তীরবিদ্ধ হয়। তায়েফবাসীর তীরের আওতা থেকে দূরে নিরাপদ জায়গায় তাঁবু ফেলতে পরামর্শ দেন হুবাব ইবনে মুনজির রা.। রসূল সা. এ পরামর্শ গ্রহণ করেন। হুবাব ইবনে মুনজির রা.-এর সামরিক জ্ঞান ছিল অসাধারণ। তাই রসূল সা. তাকে উপযুক্ত জায়গা নির্বাচনের দায়িত্ব দেন। তিনি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন এবং উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করে রসূল সা.- কে জানান। রসূল সা. তখন সবাইকে সেখানে যেতে বলেন。

উক্ত ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে একজন হলেন আমর ইবনে উমাইয়া দামেরী রা.। তিনি বলেন, যখন আমরা তাদের দুর্গের কাছে ছাউনি করলাম তখন শত্রুরা বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষেপ করতে লাগলো। অবস্থার ভয়াবহতা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। পরে আমরা তাদের প্রতিরোধ করতে গেলে আমাদের বহু মানুষ হতাহত হয়। এদিকে আল্লাহর রসূল সা. হুবাবকে ডেকে কিছুটা দূরে গিয়ে উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করার আদেশ দেন। হুবাব রা. সেখান থেকে বেরিয়ে তায়েফের মসজিদ (মসজিদে ইবনে আব্বাস)-এর স্থানটি নির্বাচন করেন। অতঃপর রসূল সা. সবাইকে সেখানে যেতে বলেন。

টিকাঃ
১০০২. ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ১/৪১৬।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 কাফেরদের মানসিক পীড়া দেওয়ার কৌশল

📄 কাফেরদের মানসিক পীড়া দেওয়ার কৌশল


তায়েফবাসীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ যুদ্ধ চলাকালে বহুসংখ্যক মুসলমান শহীদ হন। এমতাবস্থায় রসূল সা. সেখানকার আঙুর ও খেজুরের বাগানসমূহ জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে তায়েফবাসীকে মানসিক পীড়া দেওয়াও ছিল উদ্দেশ্য। সাকিফ গোত্রের লোকেরা রসূল সা.-কে তাদের সাথে তার আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে এ কাজ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করে। রসূলুল্লাহ সা. ঘোষণা দেন, তায়েফের ক্রিতদাসদের কেউ যদি দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে مسلمانوں পক্ষাবলম্বন করে তাহলে সে মুক্ত হয়ে যাবে। এ কথা শুনে তেত্রিশজনের একটি দল দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসে। এদের মধ্যে আবু বকরাহ সাকাফীও ছিলেন। তারা তখনই ইসলাম গ্রহণ করেন। রসূলুল্লাহ সা. তাদের মুক্ত বলে ঘোষণা দেন। পরে সাকিফ গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করলেও তিনি এসব দাসদের তাদের হাতে অর্পণ করেননি。

টিকাঃ
১৩৩৩. 'আস সীরাতুন নববিয়‍্যাহ আসসহীহাহ: ২/৫১০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00