📄 গাযওয়ায়ে হুনাইনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি
অষ্টম হিজরির পাঁচ শাওয়াল মুসলিম বাহিনী হুনাইন অভিমুখে যুদ্ধযাত্রা করে। দশ শাওয়াল অপরাহ্ণে তারা সেখানে পৌঁছেন। রসূলুল্লাহ সা. মক্কাবাসীদের মধ্য থেকে দুই হাজার এবং মক্কা বিজয়ের সময় তাঁর সাথে মদীনা থেকে আগত দশ হাজার সাহাবীসহ মোট বারো হাজার সৈন্য নিয়ে অভিযানে বের হন। এই সময় অবশিষ্ট মক্কাবাসীর জন্য তিনি আত্তাব ইবনে উসাইদকে মক্কার শাসক নিযুক্ত করেন এবং তিনি নিজে সৈন্য নিয়ে হাওয়াযিনের মুকাবিলায় অগ্রসর হন। অন্যদিকে হাওয়াযিন ও সাকিফ গোত্রের সমন্বিত বাহিনীর সংখ্যা মুসলমানদের প্রায় দ্বিগুণ বা তার চেয়ে বেশি ছিল। নওমুসলিমদের কেউ কেউ তখন এ কথা বলাবলি করছিলেন, আজ হয়তো আমরা সংখ্যাস্বল্পতার কারণে পরাজিত হবো না। প্রকৃতপক্ষে তারা সংখ্যাধিক্যের কারণে একপ্রকার আত্ম-অহমিকায় ভুগছিলেন。
টিকাঃ
১০১২. ইবনে সা'আদ প্রণীত তাবাকাতুল কুবরা: ২/১৫০।
১০১৩. আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ: ২/৪৯৭।
📄 হাওয়াযিন ও সাকিফ নেতার সামরিক পদক্ষেপ
ক. হাওয়াযিন ও সাকিফ নেতার সামরিক পদক্ষেপ
হাওয়াযিন ও সাকিফের সর্বাধিনায়ক ছিল মালেক ইবনে আউফ। সে তার বাহিনীকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে যেসব পদক্ষেপ হাতে নেয়, তা হলো :
১. সেনাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধিতে কৌশল
মালেক ইবনে আউফ তার কাফের জোটের সামনে বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়। তাতে সে বলে, এর আগে মুহাম্মাদ কোনো প্রকৃত যুদ্ধ করেননি। এতদিন যাদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করেছেন, তারা সবাই যুদ্ধে অনভিজ্ঞ ছিল। তাই তিনি সহজেই তাদের পরাজিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমাদের সমরকৌশলে কোনোরূপ ঘাটতি নেই。
২. সেনাদের পরিবার ও সম্পদ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা
কাফের জোটের নেতা মালেক ইবনে আউফের পরামর্শ মতে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের পরিবার-পরিজন ও শিশুসহ তাদের যাবতীয় ধনসম্পদ সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেনারা যেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অটল থাকে এবং পালিয়ে যেতে না পারে, এ লক্ষ্যেই এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সে মনে করেছিল, কোনো যোদ্ধা যখন একথা বুঝতে পারবে যে, যুদ্ধের ময়দানে তার সর্বাধিক প্রিয় বস্তুগুলো উপস্থিত রয়েছে, তখন সে আর পালানোর চেষ্টা করবে না।
আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, আমরা মক্কা বিজয়ের পর একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। সেখানে কাফেররা আমাদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে সুন্দর সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করছিল। প্রথম তাদের অশ্বারোহী বাহিনী, অতঃপর পদাতিক বাহিনী, অতঃপর নারী-শিশু এমনকি তাদের গবাদি পশুর জন্য আলাদা সারি তৈরি করে রাখা হয়。
৩. তরবারির খাপ ধ্বংস করে দেওয়ার নির্দেশ
কোনো শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে আরবরা নিজেদের তরবারির খাপগুলো ধ্বংস করে ফেলতো। এর দ্বারা তারা বোঝাতে চাইতো বিজয় বা মৃত্যু ছাড়া কোনো ফলাফল মেনে নিতে আমরা প্রস্তুত নই। কাফের জোট বাহিনীর নেতা মালেক ইবনে আউফও তার বাহিনীকে এমন নির্দেশ দেয়। সে বলেছিল, যখন তোমরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতরণ করবে, তোমাদের তরবারিসমূহের খাপগুলো ধ্বংস করে ফেলবে এবং ভয়ানকভাবে তাদের ওপর আক্রমণ করবে。
৪. মুসলমানদের বিরুদ্ধে গেরিলাবাহিনী প্রস্তুত রাখা
রণাঙ্গন সম্পর্কে কাফের জোটের নেতা মালেক ইবনে আউফের যথেষ্ট ধারণা ছিল। তাই সে যুদ্ধের ময়দানের অবস্থানগত কিছু সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। সমরবিশারদ দুরাইদ ইবনে সাম্মাহর পরামর্শে মুসলিম বাহিনীর সদস্যদের আক্রমণের জন্য সে বিভিন্ন গেরিলাবাহিনী প্রস্তুত করে রাখে। মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে তার এ পরিকল্পনা যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল।
৫. মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণের সিদ্ধান্ত
কাফের জোটের নেতা মালেক ইবনে আউফের সিদ্ধান্ত ছিল, মুসলমানদের বিরুদ্ধে তারাই প্রথম আক্রমণ করবে। কেননা, বিভিন্ন যুদ্ধের ইতিহাসে দেখা যায় যারা আক্রমণকারী হয় তারাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করে থাকে। আক্রমণের শিকার ব্যক্তিরা অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রাথমিক কিছু ক্ষেত্রে তার এই পরিকল্পনা কাজে লাগলেও আল্লাহর মেহেরবানিতে পরে যুদ্ধের গতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। রসূল সা. নিজ বাহিনী নিয়ে অবিচল থাকেন। প্রথম দিকে কিছুটা চাপে পড়লেও শেষ পর্যন্ত মুসলমানরাই বিজয়ের মুকুট পরেন。
৬. মুসলমানদের বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধ
হাওয়াযিন গোত্রের কাফের জোট মুসলমানদের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য মানসিকভাবে তাদের দুর্বল করার চেষ্টা করে। এই লক্ষ্যে তারা তাদের পেছনে হাজার হাজার নারীদের ইটের ওপর দাঁড় করিয়ে সৈনিক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে। কয়েক লক্ষ সৈন্য আছে মনে করে মুসলমানরা যেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে。
খ. তাদের বিরুদ্ধে রসূল সা.-এর সামরিক পরিকল্পনা
হাওয়াযিনের এই রণপ্রস্তুতির কথা শুনে রসূলুল্লাহ সা. যেসব পরিকল্পনা হাতে নেন, তা হলো:
১. তাদের তথ্য সংগ্রহে আবু হাদরাদ আসলামীকে প্রেরণ
হাওয়াযিনের এই রণপ্রস্তুতির কথা শুনে রসূলুল্লাহ সা. আবদুল্লাহ ইবনে আবু হাদরাদ আসলামীকে কৌশলে তাদের ভেতরে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করে আনতে পাঠান। আবদুল্লাহ তাদের ভেতরে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করে এসে রসূলুল্লাহ সা.- কে জানান। যদিও তিনি সব তথ্য সংগ্রহ করতে পারেননি। তার দায়িত্ব ছিল শত্রুবাহিনীর সাথে মিশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের গৃহীত পরিকল্পনাগুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা। কাফেররা কোথায় কোথায় অবস্থান করছে, সেই তথ্যও সংগ্রহ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তিনি বিস্তারিত এসব তথ্য সংগ্রহ করতে পারেননি।
নিম্নাঞ্চল থেকে মুসলমানদের ওপর অতর্কিত গেরিলা হামলা শুরু হয়। কাফের জোট সেখান থেকে মুসলমানদের ওপর বৃষ্টির মতো তীর ছুড়ছিল। ফলে মুসলমানরা প্রাথমিক পর্যায়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। এর কারণ হচ্ছে, আগে থেকে মুসলমানরা এসব জায়গাগুলো সম্পর্কে অবগত ছিল না। ফলে তারা কিছুটা প্রতিকুলতার মুখে পড়ে। শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভালো অবস্থান নিতে রসূল সা. তাদের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন。
২. সেনাসংখ্যা ও বর্শা বর্ম ধার
রসূলুল্লাহ সা. মক্কাবাসীদের মধ্য থেকে দুই হাজার এবং মক্কা বিজয়ের সময় তাঁর সাথে মদীনা থেকে আগত দশ হাজার সাহাবীসহ মোট বারো হাজার সৈন্য নিয়ে এই অভিযানে বের হয়েছিলেন। আনাস ইবনে মালেক বর্ণনা করেন, হুনাইন যুদ্ধে হাওয়াযিন ও গাতফান গোত্রের লোকেরা নিজেদের সন্তানসন্ততি এমনকি গৃহপালিত প্রাণীগুলোকেও যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসে। এদিকে রসূল সা.-এর বাহিনীতে দশ হাজার সাহাবীর সাথে আরও দুই হাজার নতুন মুসলমান যুক্ত হন।
মুসলিম বাহিনীকে অস্ত্রসজ্জিত করার জন্য আল্লাহর রসূল সা. তার চাচাতো ভাই নওফেল ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের কাছে তিন হাজার বর্শা ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার কাছ থেকে বর্ম চেয়ে পাঠান এবং যুদ্ধশেষে এসব যুদ্ধাস্ত্র তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। যদিও নওফেল ও সাফওয়ান তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। সাফওয়ান ইবনে ইয়ালা ইবনে উমাইয়্যা পিতা ইয়ালা হতে, তিনি রসূল সা. হতে বর্ণনা করেন, রসূল সা. তাকে বলেছিলেন, যখন আমার দূত তোমার কাছে যাবে, তার কাছে ত্রিশটি বর্ম এবং ত্রিশ বা তার চাইতে কম সংখ্যক উট দিয়ে দেবে। তিনি জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি এসব যুদ্ধাস্ত্র ধার হিসেবে দেবো? রসূল সা. বলেন, হ্যাঁ।
আরেক বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহর রসূল সা. সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যার কাছে হুনাইন যুদ্ধের সময় বর্ম চাইলে সাফওয়ান বললো, হে মুহাম্মাদ! আপনি কি তা জোরপূর্বক নেবেন? তিনি বললেন, না, বরং ধার হিসেবে নেবো তোমাকে ফেরত দেওয়ার শর্তে। সাফওয়ান বললো, তাহলে আপত্তি নেই। সুতরাং সে একশ' বর্ম ও অন্য অস্ত্রশস্ত্র দিল। বর্ণনাকারীর মতে, যুদ্ধের জন্য ধার নেওয়া অস্ত্রসমূহের মধ্য থেকে কিছু হারিয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধশেষে রসূল সা. যখন সেগুলোর বিনিময় দিতে চাইলেন তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! আমার কাছে এখন এসব সম্পদের চাইতে ইসলাম বেশি প্রিয়। ইমাম আবু দাউদ রহ. বলেন, এসব অস্ত্র তিনি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ধার হিসেবে দিলেও পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন。
গ. রণাঙ্গনে নবীজির অবিচলতা ও তার প্রভাব
শত্রু সেনারা مسلمانوں আগেই হুনাইন প্রান্তরের বিভিন্ন উপত্যকায় আশ্রয় নিয়েছিল এবং সংকীর্ণ দুর্গম গিরিগুহায় ও তার আশেপাশে লুকিয়ে مسلمانوں জন্য ওৎ পেতে ছিল। তারা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষমান ছিল। মুসলমানরা অসতর্ক অবস্থায় গিরিপথ দিয়ে যাচ্ছিলো, এই সময় হঠাৎ তারা একযোগে مسلمانوں ওপর হামলা চালায়। হামলার আকস্মিকতায় হতবুদ্ধি হয়ে মুসলমানরা যে যেদিকে পারলো পড়িমরি করে ছুটে পালাতে লাগলো। কারো দিকে কারো তাকানোর ফুরসত ছিল না। রণাঙ্গনে রসূল সা. ও মুষ্টিমেয় ক'জন সাহাবী ছিলেন। তারা কাফেরদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
চরম ভয়াবহ এ পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে আব্বাস রা. বলেন, হুনাইন যুদ্ধে আমি রসূল সা.-এর সাথে ছিলাম। আমি ও আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস রসূল সা.-কে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছিলাম না। রসূল সা. একটি সাদা খচ্চরের পিঠে ছিলেন। মুসলমান ও কাফেরদের প্রথম লড়াইয়ে যখন মুসলমানরা পিছু হটছিলেন, তখনও রসূল সা. নিজের বাহন নিয়ে কাফেরদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। আব্বাস রা. বলেন, আমি রসূল সা.-এর বাহনের লাগাম ধরে ছিলাম এবং তাকে বাধা দিচ্ছিলাম যেন বাহন দ্রুত সামনের দিকে অগ্রসর না হয়। রসূলুল্লাহ সা. আমাকে বললেন, 'আব্বাস! চিৎকার করে এভাবে ডাক দাও : হে আনসাররা! ওহে বাবুল বৃক্ষের নীচে অঙ্গীকারকারীরা!'
আব্বাস ছিলেন বুলন্দ কণ্ঠের অধিকারী। তিনি বুলন্দ কণ্ঠে আহ্বান করেন। তিনি বলেন: আমি আদেশ অনুসারে ডাকা শুরু করলে প্রত্যেকে লাব্বায়েক বলে সাড়া দিতে লাগলো। এই সময় অশ্বারোহী সাহাবীদের কেউ কেউ ছুটন্ত ও পলায়নরত উটের গতি ফেরাতে ব্যর্থ হয়ে বর্ম দিয়ে সেগুলোর ষ্কন্ধে আঘাত করেন। তাতেও ফেরাতে না পেরে অস্ত্র নিয়ে উট থেকে নেমে আসেন এবং উটকে ছেড়ে দেন। অতঃপর যেদিক থেকে আওয়াজ আসছে সেদিকে এগিয়ে যান এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট পৌছে যান। এভাবে একশ জনের মতো সাহাবী জমায়েত হয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন এবং তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হলেন।
প্রথমে 'হে আনসারগণ' বলে ডাক দেওয়া হয়। পরে শুধু 'হে খাযরাজ' বলে ডাকা শুরু হয়। কেননা খাযরাজ রণাঙ্গনে দৃঢ়চিত্ত বলে আরবদের কাছে সুপরিচিত ছিল। অতঃপর খাযরাজের বহিনী এগিয়ে গিয়ে যুদ্ধে যোগ দিলে রণাঙ্গনের দিকে তাকিয়ে রসূল সা. বললেন, 'এবার রণাঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।'
হুনাইনের যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা নবীজিকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। যেনম :
* আকাশ থেকে ফেরেশতাদের অবতরণ।
* কাফের জোটের মনে মুসলমানদের প্রভাব বৃদ্ধি।
নবীজির একমুষ্টি কঙ্কর প্রত্যেক শত্রুসেনার চোখে পৌঁছে দেওয়া হয়। কঙ্কর ও মাটি মূলত এমন বাহ্যিক অস্ত্র ছিল যার মাধ্যমে আল্লাহ সেদিন তার প্রিয় রসূলকে সহযোগিতা করেছিলেন। কঙ্কর এবং মাটির দুই মুষ্টি রসূল সা. নিজের হাতে নিয়ে কাফেরদের দিকে নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তাদের প্রত্যেকের চোখেই তা পৌঁছে যায়। শেষ পর্যন্ত তারা পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হয়। আব্বাস রা. বলেন, রসূল সা. সেদিন কিছু কঙ্কর হাতে নিয়ে কাফেরদের দিকে নিক্ষেপ করে বলেন, মুহাম্মাদের রবের শপথ! কাফেররা পরাজিত হয়েছে।
আব্বাস রা. বলেন, আমি দেখছিলাম যুদ্ধ তখনও প্রথম অবস্থার মতোই ভয়াবহ। কিন্তু আল্লাহর কসম! যখন রসূল সা. তার হাতের কঙ্করগুলো কাফেরদের দিকে নিক্ষেপ করলেন, আমি দেখলাম, তাদের শক্তি ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে এবং যুদ্ধের প্রকৃতিও পাল্টে যাচ্ছে। শত্রুরা পিছু হটছে。
টিকাঃ
১০১৪. ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ৩/৮৯৩।
১০১৫. সহীহ মুসলিম: ১০৫৯।
১০১৬. মাজমাউজ যাওয়ায়েদ: ৬/১৭৯।
১০১৭. আল কিয়াদাতুল আসকারীয়াহ ফি আহদির রসূল: ২৫২।
১০১৮. তারিখে তাবারী: ৩/৭৩।
১০১৯. আল কিয়াদাতুল আসকারীয়াহ ফি আহদির রসূল: ৩৯৫-৩৯৬
১০২০. আবু দাউদ: ৪২৫৬২।
১০২১. সহীহ মুসলিম: ১৭৭৫।
১০২২. সহীহ মুসলিম: ১৭৭২।
১০২৩. সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ৫৯৯।
১০২৪. আল কিয়াদাতুল আসকারীয়াহ ফি আহদির রসূল: ২৫৯।
১০২৫. সহীহ মুসলিম: ১৭৭৫।
📄 আওতাস ও তায়েফ অভিমুখে পলায়নকারীদের পিছু ধাওয়া
১. আবু মূসা রা. বলেন, হুনাইন যুদ্ধের পর নবী সা. আওতাস গোত্রের বিরুদ্ধে আবু আমির রা.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠালেন। যুদ্ধে তিনি দুরাইদ ইবনে সিম্মার সঙ্গে মুকাবিলা করলে দুরাইদ নিহত হয় এবং আল্লাহ তার সঙ্গীদেরকেও পরাস্ত করেন। আবু মূসা রা. বলেন, নবী সা. আবু আমির রা.- এর সঙ্গে আমাকেও পাঠিয়েছিলেন। এ যুদ্ধে আবু আমির রা.-এর হাঁটুতে একটি তীর লাগে। জুশাম গোত্রের এক লোক তীরটি নিক্ষেপ করেছিল। তখন আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, চাচাজান! কে আপনার দিকে তীর ছুঁড়েছে? তখন তিনি ইশারায় দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ওই যে, ওই ব্যক্তি আমাকে তীর মেরেছে। আমাকে হত্যা করেছে। আমি লোকটিকে লক্ষ্য করে তার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। সে আমাকে দেখামাত্র পালাতে শুরু করলো। আমি এ কথা বলতে বলতে তার পিছু নিলাম, পালাতে লজ্জা করে না! আমার কথা শুনে লোকটি থেমে গেলো। আমরা তরবারি দিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করলাম এবং আমি ওকে হত্যা করে ফেললাম। তারপর আমি আবু আমির রা.-কে বললাম, আল্লাহ আপনার আঘাতকারীকে হত্যা করেছেন। তিনি বললেন, এখন এ তীরটি বের করে দাও। আমি তীরটি বের করে দিলাম। তখন ক্ষতস্থান থেকে কিছু পানি বের হলো। তিনি আমাকে বললেন, হে ভাতিজা! তুমি নবী সা.-কে আমার সালাম জানাবে এবং আমার মাগফিরাতের জন্য দোআ করতে বলবে।
আবু আমির রা. তার স্থলে আমাকে সেনাদলের অধিনায়ক নিয়োগ করলেন। এরপর তিনি কিছুক্ষণ বেঁচে ছিলেন, তারপর ইন্তেকাল করলেন। (যুদ্ধ শেষে) আমি ফিরে এসে নবী সা.-এর গৃহে প্রবেশ করলাম। তিনি তখন পাকানো দড়ির তৈরি একটি খাটিয়ায় শায়িত ছিলেন। খাটিয়ার উপর পাতলা একটি বিছানা ছিল। কাজেই তার পৃষ্ঠে এবং দুই পার্শ্বে পাকানো দড়ির দাগ পড়ে গিয়েছিল। আমি তাকে আমাদের এবং আবু আমির রা.-এর সংবাদ জানালাম। তাকে এ কথাও বললাম যে, তিনি মৃত্যুর আগে আপনার কাছে মাগফেরাতের দোআ চেয়েছেন। এ কথা শুনে নবী সা. পানি আনতে বললেন এবং উযু করলেন। তারপর দু'হাত উপরে তুলে বললেন:
اللهم اغفر لعبيد أبي عامر
হে আল্লাহ! তোমার প্রিয় বান্দা আবু আমিরকে ক্ষমা করো।
উভয় হাত উত্তোলনের কারণে আমি তার বগলদ্বয়ের শুভ্রাংশ দেখতে পাচ্ছিলাম। তারপর তিনি বললেন:
اللهم اجعله يوم القيامة فوق كثير من خلقك من الناس
হে আল্লাহ! কেয়ামত দিবসে তুমি তাকে অনেক মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান কোরো।
আমি বললাম, আমার জন্যও দোআ করুন। তিনি দোআ করলেন:
اللهم اغفر لعبد الله بن قيس ذنبه وأدخله يوم القيامة مدخلا كريما
হে আল্লাহ! আবদুল্লাহ ইবনে কায়সের গুনাহ ক্ষমা করে দাও এবং কেয়ামত দিবসে তুমি তাঁকে সম্মানিত স্থানে প্রবেশ করাও।
বর্ণনাকারী আবু বুরদা রা. বলেন, দু'টি দোআর একটি ছিল আবু আমির রা.-এর জন্য আর অপরটি ছিল আবু মূসা রা.-এর জন্য。
২. তায়েফে পলায়নকারীদের অবরোধ
রসূলুল্লাহ সা. তায়েফ অবরোধ করলেন। নতুন নতুন সামরিক কৌশল প্রয়োগ করেন তাদের বিরুদ্ধে। এ লক্ষ্যে তিনি ঘনঘন পরামর্শসভা ডাকেন। অবরোধ চলাকালে তিনি মুসলিম বাহিনীর অবস্থানের জন্য উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করেন। শত্রুপক্ষকে চাপে রাখার লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেন।
টিকাঃ
১০২৬. সহীহ বুখারী: ৪৩২৩।
📄 নতুন সমরাস্ত্র ব্যবহার
ক. এ সময় তিনি এমন কিছু রণকৌশল ও অস্ত্র প্রয়োগ করেন, যা এর আগে কেউ কোনো যুদ্ধে ব্যবহার করেনি। যেমন:
কামান: তায়েফ এলাকার সাকিফ গোত্রের দুর্গ অবরোধ করার সময় নবীজি সা.-কামান ব্যবহার করেছেন। মিনজানিক বা কামান এমন ভারি অস্ত্র, যার মাধ্যমে অবরোধ চলাকালে বিশাল বিশাল পাথর নিক্ষেপ করা হতো। আর এভাবে পাথর নিক্ষেপ করে ধ্বংস করা হতো দুর্গের প্রাচীর ও উঁচু মিনার। দূরবর্তী অঞ্চলে আগুনের গোলা নিক্ষেপের মাধ্যমে অগ্নিসংযোগ করা যেতো এ কামানের দ্বারা। কামান পরিচালনা ও তার ব্যবহারের জন্য একটি বিশেষ-বাহিনী গঠন করা হয়।
ট্যাংক: এ সময় রসূলুল্লাহ সা. প্রথমবারের মতো যেসব অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন, তার মধ্যে দাব্বাবা বা ট্যাংক ছিল অন্যতম। এটি ছিল গাছের তৈরি ছোটো কক্ষের মতো একটি অস্ত্র, যা শত্রুপক্ষের তীরের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য ব্যবহৃত হতো। এছাড়া এটার মাধ্যমে দুর্গের দেয়াল ধ্বংসের কাজও করা হতো।
কাঁটাযুক্ত ফাঁদ: তায়েফ যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হয় বর্তমান যুগের স্থল মাইনের সদৃশ কাঁটাযুক্ত ফাঁদ। এটা তখন অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়। ক্রুশের আকৃতিতে দুটি দণ্ড কোণাকুণিভাবে বেঁধে দেওয়া হতো, ফলে এটা চারকোণবিশিষ্ট একটি আকৃতির মতো দেখাতো। দূরবর্তী কোনো স্থানে এটা নিক্ষেপ করা হলে তাতে আটকে যেত ঘোড়া বা পদাতিক বাহিনী। ফলে দুর্বল হয়ে পড়তো শত্রুপক্ষের দ্রুত আক্রমণের ক্ষমতা। ঐতিহাসিকরা বলেন, রসূল সা. তায়েফ যুদ্ধের সময় সাকিফ গোত্রের দুর্গের আশেপাশে এই ধরনের কাঁটাযুক্ত ফাঁদ ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
রসূলুল্লাহ সা.-এর এ ধরনের কর্মপদ্ধতিতে উম্মতের সর্বস্তরের মানুষের জন্য রয়েছে দিক নির্দেশনা। বুদ্ধিবৃত্তিক কলাকৌশলের মাধ্যমে উপকারী জিনিস আবিষ্কার করা ও তার মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার শিক্ষাও আমরা এর মাধ্যমে পাই।
টিকাঃ
১৩২৭. সুনানে তিরমিযী: ২৯১২।
১৩২৮. আল মাদরাসাতুল আসকারীয়া আল ইসলামিয়া: ৪০৭।
১৩২৯. আল কিয়াদাতুল আসকারীয়াহ ফি আহদির রসূল: ৪০৫।
১৩৩০. আল ফননুল হারবী ফি সদরিল ইসলাম: ১৯৫।
১৩৩১. ইবনে সাআদ প্রণীত তাবাকাতুল কুবরা ২/২১৪।