📄 সুহাইল ইবনে আমরের ইসলাম গ্রহণ
সুহাইল ইবনে আমর বলেন, রসূল সা. বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করলে আমি আমার ঘরের দরজা বন্ধ করে ভেতরে বসে রইলাম এবং আমার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে সুহাইলকে আমার জন্য নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি আনতে মুহাম্মাদের কাছে পাঠালাম। কেননা, আমার ভয় ছিল, মুসলমানরা আমাকে হত্যা করে ফেলবে। এ সময় আমার মানসপটে ভেসে ওঠে মুসলমানদের সাথে আমার কৃত ঘৃণ্য আচরণগুলো। আমার চেয়ে জঘণ্য আচরণ হয়তো আর কেউ করেনি। হুদায়বিয়ার দিন আমিই রসূল সা.-এর সাথে সাক্ষাত করেছিলাম এবং চুক্তিপত্র লিখিয়েছিলাম। বদর ও উহুদ যুদ্ধে আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়েছি। কুরায়েশদের হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সবক'টি যুদ্ধেই আমি অংশগ্রহণ করেছি।
আবদুল্লাহ ইবনে সুহাইল রসূল সা.-এর কাছে গিয়ে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ সা.! আপনি কি আমার পিতাকে নিরাপত্তা দেবেন? রসূল সা. বললেন, 'আল্লাহর নিরাপত্তায় সে নিরাপদ, তাকে বের হয়ে আসতে বলো।' এরপর রসূল সা. তার আশেপাশের সবাইকে বললেন, 'তোমাদের কেউ যদি সুহাইলকে দেখো, তাহলে সে যেন তার সাথে মন্দ আচরণ না-করে। তাকে বের হয়ে আসতে দাও। আল্লাহর শপথ! সুহাইল একজন সম্মানিত ব্যক্তি। তার মতো ভালো মানুষ ইসলাম গ্রহণ না করে থাকবে না।'
ছেলে আবদুল্লাহ ঘরে ফিরে এসে বিস্তারিত জানালে তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ ছোট ও বড় সর্বাবস্থায় উত্তম সদাচরণকারী। তবুও সুহাইল ইসলামগ্রহণ করেননি। কাফের অবস্থায় রসূল সা.-এর সাথে তিনি হুনাইন যুদ্ধে অংশ নেন। ওই সফরেই জিরানা নামক স্থানে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
'নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ ছোট ও বড় সর্বাবস্থায় উত্তম সদাচরণকারী'- ইসলামগ্রহণের পূর্বে সুহাইলের এই উক্তি দ্বারা রসূল সা.-এর শিশুকাল থেকে বয়োবৃদ্ধকাল পর্যন্ত পুরো জীবন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। অবশ্য পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং একজন খাঁটি মুসলমান হিসেবেই জীবন কাটিয়েছিলেন। তিনি অধিক নামায আদায়, রোযা পালন ও দান-খয়রাত করতেন। আখেরাতকে দুনিয়ার ওপর প্রাধান্য দিতেন। ফলে তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। তিনি খুব বেশি কান্নাকাটি করতেন। কুরআন তেলাওয়াতের সময় ভয়ে বিগলিত হয়ে যেতেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর একাংশের নেতৃত্ব ছিল তার হাতে।
টিকাঃ
১২৭১. ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ২/৮৪৬-৮৪৭।
১২৭২. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ২/১৯৫।
📄 সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার ইসলাম গ্রহণ
আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. বলেন, মক্কা বিজয়ের পর সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া শুয়াইবা নামক এলাকায় পালিয়ে যান। তার একমাত্র সঙ্গী গোলাম ইয়াসারকে তিনি বার বার বলছিলেন, দেখো পেছনে কেউ আসছে কি না। এক সময় সে বললো, উমায়ের ইবনে ওয়াহাব এদিকেই আসছেন। সাফওয়ান বললেন, তার আসায় আমার কী হবে? নিঃসন্দেহে সে আমাদের হত্যা করতে আসছে। অতঃপর উমায়ের তার কাছাকাছি এলে তিনি তাকে বললেন, হে উমায়ের! আমার সাথে তোমরা যে আচরণ করেছো তা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়নি? তোমাদের ধর্ম ও তোমাদের বাহিনীর ভয়ে আজ আমি দেশান্তরী হতে যাচ্ছি। তুমি কি আমাকে হত্যা করতে এসেছো?
উমায়ের তাকে বললেন, হে আবু ওয়াহাব, আমি তোমার কাছে পৃথিবীর সর্বোত্তম চরিত্রের মানব ও দয়ালু ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছি। আমি রসূল সা.-কে বলেছিলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমার গোত্রের প্রধান আপনার ভয়ে সাগরে প্রাণ বির্জন দিতে পালিয়ে গেছে। সে ভেবেছে আপনি তাকে নিরাপত্তা দেবেন না।
রসূল সা. বললেন, আমি তাকে নিরাপত্তা দিলাম। তাই আমি তোমার পেছনে পেছনে বিষয়টি জানাতে এসেছি। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যা বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি আমার কাছে আমার নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো প্রমাণ নিয়ে আসবে, ততক্ষণ আমি তোমার সাথে ফিরে যাবার সাহস পাচ্ছি না। অতঃপর উমায়ের রসূল সা.-এর কাছে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! সাফওয়ান আত্মহত্যার জন্য পালিয়ে যাচ্ছিলো। আমি তাকে আপনার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা দেবার খবর দিলে সে আমাকে বলছে, সে এই মর্মে প্রমাণ চায়। তখন রসূলুল্লাহ সা. তার নিকট নিজের পাগড়ীটি দিয়ে দিলেন। যা মাথায় দিয়ে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। উমায়ের পাগড়ীটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এবং এমন অবস্থায় তাকে পেয়ে যান যখন সে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। উমায়ের তাকে ডেকে বললেন, হে সাফওয়ান! আমার পিতা-মাতা তোমার জন্যে উৎসর্গ হোন! আল্লাহকে ভয় করো, নিজেকে ধ্বংস করো না। এই যে আমি রসূলুল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্যে নিরাপত্তা প্রমাণ নিয়ে এসেছি। সাফওয়ান বললো, তোমার সর্বনাশ হোক! তুমি আমার নিকট থেকে দূর হও। আমার সাথে কোনো কথা বলো না। উমায়ের বললেন, সাফওয়ান! তোমার জন্যে আমার পিতামাতা উৎসর্গ হোন! দেখো, রাসুলুল্লাহ্ সা. মানবকূলের সর্বোত্তম ব্যক্তি। মানবজাতির মধ্যে সর্বাধিক সদাচারী লোক, মানব গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহিষ্ণু পুরুষ এবং সমগ্র মানবমণ্ডলীর মধ্যে সর্বোকৃষ্ট ব্যক্তি। তিনি তো তোমার চাচাতো ভাই। তার সম্মান তোমারই সম্মান। তার গৌরব তোমারই গৌরব, তার রাজত্ব তোমারই রাজত্ব।
সাফওয়ান বললো, আমি নিজের জীবনের ব্যাপারে তাকে ভয় করি। উমায়ের বললেন, তার সহিষ্ণুতা ও মহানুভবতা এর অনেক উর্ধ্বে। এরপর সাফওয়ান উমায়েরের সাথে ফিরে আসে এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সাফওয়ান বললো, ও দাবি করছে, আপনি নাকি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন? রসূলুল্লাহ সা. বললেন, সে সত্য কথাই বলেছে। সাফওয়ান বললো, তাহলে ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করার জন্যে আমাকে দু'মাসের অবকাশ দিন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, যাও, চার মাসের অবকাশ দেওয়া হলো। (ভালোরূপে চিন্তা-ভাবনা করো)।
পরে রসূল সা. হাওয়াযিন গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হলে সাফওয়ান কাফের অবস্থায় তার সাথে যুদ্ধে বেরিয়ে পড়ে। রসূলুল্লাহ সা. সাফওয়ানকে ডেকে পাঠালেন। সে তখনও মুশরিক ছিল। নবীজি তাকে বললেন, হে আবু উমাইয়া! তোমার অস্ত্রগুলো আমাদেরকে ধার দাও! আমরা তা দিয়ে আগামীকাল আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়বো। সাফওয়ান বললো, আপনি কি তা জোরপূর্বক নেবেন? তিনি বললেন, না, বরং ধার হিসেবে নিতে চাই এবং যুদ্ধ শেষে তোমাকে ফেরত দেবো। সাফওয়ান বললো, তাহলে আপত্তি নেই। সে একশ' বর্ম এবং সে অনুপাতে অস্ত্রশস্ত্র দিলো।
সাফওয়ান রসূল সা.-এর সাথে তায়েফের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। রসূল সা. যখন যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে জিরানায় যাত্রাবিরতি করেন, তখন তিনি গণিমতলব্ধ সম্পদসমূহ দেখতে বের হন। তিনি লক্ষ করলেন, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া একপাল হৃষ্টপুষ্ট ছাগলের দিকে বার বার তাকাচ্ছে। রসূল সা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি এই ছাগলের পালটি পছন্দ হয়েছে? সাফওয়ান বললো, হ্যাঁ। রসূল সা. তাকে বললেন, এই ছাগলের পালটি আমি তোমাকে দিয়ে দিলাম।
রসূল সা.-এর এমন মহানুভবতা দেখে সাথে সাথে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া বলে উঠলেন, আল্লাহর নবী ছাড়া কোনো ব্যক্তি এমন মহানুভবতা দেখাতে পারে না। আল্লাহর শপথ! আমি এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সা. আল্লাহর রসূল। তিনি সেখানেই ইসলামে দীক্ষিত হন।
উপরোক্ত ঘটনায় আমরা দেখতে পাই, রসূল সা. সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াকে কীভাবে ইসলাম গ্রহণ করতে প্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রথমে তিনি তাকে নিরাপত্তা দেন। পরে চিন্তাভাবনার জন্য চার মাসের সুযোগ দেন। এরপর বিভিন্ন সদাচরণের পাশাপাশি তাকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ দান করেন। প্রথমে রসূল সা. তাকে ও মক্কার বেশ কয়েকজন নেতাকে একশোটি করে উট দেন। পরবর্তীতে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াকে আলাদাভাবে একপাল ছাগল দান করলে তিনি এতে যথেষ্ট প্রভাবিত হন। তিনি একথা বলতে বাধ্য হন যে, আল্লাহর নবী ছাড়া কোনো ব্যক্তি এতো মহানুভবতা দেখাতে পারে না। ফলে তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন।
নবীজির ব্যাপারে সাফওয়ান ইবনে ওমাইয়া বলেন, রসূল সা. আমাকে বহু সম্পদ দান করেছেন। এক সময় তিনি ছিলেন আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি। কিন্তু অপরিসীম বদান্যতার ফলে তিনি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি হয়ে যান।
টিকাঃ
১২৭০. ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ২/৮৫৩-৮৫৫।
১২৭৪. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৭/২২০।
১২৭৫. সহীহ মুসলিম: ২৩১৩।
📄 ইকরামা ইবনে আবু জেহেলের ইসলাম গ্রহণ
আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. বলেন, ইকরামা ইবনে আবু জেহেলের স্ত্রী উম্মে হাকিম নবীজির কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! ইকরামা মৃত্যুভয়ে ইয়েমেনে পালিয়ে গেছে। আপনি তাকে নিরাপত্তা দিন। রসূলুল্লাহ সা. তাকে নিরাপত্তা দিলেন। উম্মে হাকিম তাকে খুঁজতে বের হলেন। তার সাথে ছিল একজন রোমান দাস। সে তাকে মন্দ কাজের জন্য প্ররোচনা দিতে লাগলো। উম্মে হাকিম তাকে কৌশলে এড়িয়ে আক নামক গোত্রের কাছে পৌঁছে তাদের সাহায্য চাইলেন। বিস্তারিত শুনে তারা দাসকে বন্দী করে রাখলো।
ওদিকে ইকরামা তিহামা উপকূল দিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিতে নৌকায় আরোহণ করলেন। নৌকার কোনো একজন আরোহী তাকে বলছিল, তুমি আত্মরক্ষা করো। সে উত্তরে বললো, আমি কীভাবে আত্মরক্ষা করবো? উত্তরে সে বললো, তুমি বলো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্'। উত্তরে ইকরামা বললেন, আমি তো এ বাক্য থেকেই পালিয়ে এসেছি। তখন তার স্ত্রী উম্মে হাকিম এসে সেখানে উপস্থিত হলেন। তাকে বিভিন্নভাবে বোঝাতে লাগলেন তিনি।
তিনি বললেন, আমি যার কাছ থেকে এসেছি, মানুষের মধ্যে তিনি সবচেয়ে সেরা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় সবচেয়ে বেশি সচেতন। তুমি নিজেকে ধ্বংসের মুখে ফেলো না। আমি তোমার জন্য রসূলের কাছে আশ্রয় চেয়েছি। আশ্চর্যান্বিত ইকরামা প্রশ্ন করলেন, সত্যি তুমি স্বয়ং রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে গিয়েছো? তার স্ত্রী তাকে জানান, আমি নিজে তার সাথে কথা বলেছি। তোমাকে তিনি নিরাপত্তা দিয়েছেন। ইকরামা তার সাথে ফিরে আসেন এবং তার সেই রোমান দাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। স্ত্রী তাকে বিস্তারিত জানালে রাগান্বিত হয়ে তিনি দাসকে হত্যা করেন। ইকরামা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি মক্কায় এলে রসূল সা. তার সাহাবাদের বললেন, 'আবু জেহেলের ছেলে ইকরামা তোমাদের কাছে আসছে। তাই তোমরা তার সামনে আবু জেহেলকে মন্দ বলো না। কেননা, মৃত ব্যক্তিকে মন্দ বললে জীবিতরা কষ্ট পায়, মৃতরা নয়।'
ইকরামা যাত্রাপথে তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে চাইলে তার স্ত্রী এতে সাড়া না দিয়ে বলেছিলেন, তুমি কাফের আর আমি মুসলমান। জবাবে ইকরামা বলেন, নিশ্চয় যে ব্যাপারটি তোমাকে আমার সাথে মিলনে বাধা দিচ্ছে তার শক্তি অনেক বেশি। নবীজি সা. ইকরামা ও তার স্ত্রীকে আসতে দেখে দ্রুত তাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে যান। আনন্দের আতিশয্যে রসূল সা.-এর চাদর এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলো। পরে রসূল সা. এসে নিজের স্থানে বসলে ইকরামা তার সামনে বসেন। তার পাশে বসেন তার স্ত্রী।
ইকরামা বললেন, হে মুহাম্মাদ! এই নারীটি আমাকে সংবাদ দিয়েছে যে, আপনি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। রসূল সা. বললেন, সে ঠিকই বলেছে, আমি তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছি। ইকরামা জানতে চাইলেন, আপনি আমাকে এখন কী নির্দেশ দিচ্ছেন? রসূল সা. বললেন, আমি আহ্বান করছি, তুমি সাক্ষ্য দাও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো মাবুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল। তুমি নামায আদায় করবে। যাকাত আদায় করবে। এরপর রসূল সা. তাকে ইসলামের বিধিবিধান সম্পর্কে জানালেন। ইকরামা বললেন, নিশ্চয়ই আপনি আমাকে যে পথে ডাকছেন, তা সঠিক ও যথার্থ। এর আগেও আমাদের মাঝে অবস্থানকালে আপনি ছিলেন সবচেয়ে সত্যবাদী, কল্যাণকামী ও সুন্দর।
আচরণের অধিকারী। অতঃপর ইকরামা বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রসূল। অতঃপর তিনি নবীজিকে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! আমাকে এর চাইতে উত্তম কোনো কথা শিখিয়ে দিন যা আমি বলবো। রসূল সা. বললেন, তুমি বলো, আমি এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সা. আল্লাহর বান্দা ও রসূল।
ইকরামা আবার জানতে চাইলেন, এরপর আমি কী বলবো? আল্লাহর রসূল সা. বললেন, তুমি এ কথা বলো, 'আমি আল্লাহকে এবং উপস্থিত সবাইকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি মুসলমান, মুহাজির ও মুজাহিদ।' ইকরামা তাই করলেন।
নবীজি তাকে বললেন, তুমি আমার কাছে কোনো কিছু চাইতে পারো। তুমি যা চাইবে আমি তোমাকে তা দেবো। ইকরামা বলেন, এতদিন আমি আপনার বিরুদ্ধে শত্রুতা করেছি। আপনার বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আপনার সামনে ও পেছনে আপনার বিরুদ্ধে কথা বলেছি। আপনি আমার এসব পাপমুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে আমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করুন।
নবী সা. বললেন, 'হে আল্লাহ, তাকে আপনি ক্ষমা করে দিন। আমার বিরুদ্ধে সামনে-পেছনে সে যেসব শত্রুতামূলক আচরণ করেছে এবং দীন-বিরোধী যত অপরাধ করেছে, সব ক্ষমা করে দিন।' অতঃপর ইকরামা বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। এতদিন আমি আপনার বিরুদ্ধে যতো কিছু ব্যয় করেছি, এখন ইসলামের জন্য তার দ্বিগুণ ব্যয় করবো। আল্লাহর মনোনীত দীনের বিরুদ্ধে আমি যতগুলো যুদ্ধে অংশ নিয়েছি, তার দ্বিগুণ কষ্ট আল্লাহর রাস্তায় বরদাশত করবো। অতঃপর তিনি জিহাদে বের হন এবং ইয়ারমুকের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।
ইকরামার ইসলাম গ্রহণের পর তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ বহাল রাখেন রসূল সা.। নবীজির কোমল আচরণের প্রেক্ষিতে ইকরামা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়ে নবীজির গায়ের চাদর এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি তাকে হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন। আরেক বর্ণনায় এসেছে, রসূল সা. তাকে বলেছিলেন, হে আগত মুহাজির, তোমাকে সাদর সম্ভাষণ।
নবীজির এমন সুন্দর কোমল আচরণে তিনি ইসলাম গ্রহণের প্রেরণা পান। তার স্ত্রী উম্মে হাকিম ইবনে হারেসেরও এ ব্যাপারে ভূমিকা ছিল। তিনি নবীজির কাছে এসে তার জন্য নিরাপত্তা চান। আল্লাহ তাকে মুসলমান বানাবেন-এ আশায় হন্যে হয়ে খোঁজেন স্বামীকে। তার স্বামী তার সাথে সহবাস করতে চাইলে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, তুমি কাফের আর আমি মুসলমান। স্ত্রীর এমন আচরণে যথেষ্ট প্রভাবিত হন ইকরামা। পরে তিনি রসূল সা.-এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। ইসলাম গ্রহণের সময় তিনি এতটাই একনিষ্ঠ ছিলেন যে, রসূল সা. যখন তাকে কোনো কিছু চাইতে বললেন, তখন তিনি জাগতিক কোনো বিষয় চাননি; বরং তিনি রসূল সা.-কে অনুরোধ করে বলেন, আমার পূর্বের পাপমুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করুন। অতঃপর তিনি রসূল সা.-এর দরবারে এই মর্মে অঙ্গীকার করেন যে, অতীতে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে যে পরিমাণ সম্পদ ব্যয় করেছেন ইসলামের জন্য তার দ্বিগুণ সম্পদ ব্যয় করবেন। ইসলামপূর্ব সময়ে ইসলামের বিরুদ্ধে যতোটা শ্রম দিয়েছিলেন, তার দ্বিগুণ শ্রম ইসলামের জন্য দেবেন। তিনি তার প্রতিশ্রুতিতে নিজেকে শতভাগ সত্য প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে রিদ্দার যুদ্ধসমূহ ও সিরিয়া বিজয়ে তিনি নিজেকে একজন সাহসী বীর মুজাহিদ হিসেবে পেশ করেন। পরিশেষে নিজের জান-মাল উৎসর্গ করে ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
টিকাঃ
১২৭৬. ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ২/৮৫১-৮৫৩।
১২৭৭. মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৯/৩৮।
১২৭৮. আবু ফারিস প্রণীত আসসীরাহ: ৪০৯-৪১০।
📄 আবু বকর রা.-এর পিতার ইসলাম গ্রহণ
আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. মক্কায় পৌঁছে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলে আবু বকর রা. তার পিতাকে নিয়ে তাঁর কাছে হাজির হন। রসূলুল্লাহ সা. তাঁকে দেখে বললেন, 'এই বৃদ্ধকে ঘরে রেখে এলে না কেন? আমিই তার কাছে যেতাম।'
আবু বকর রা. বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ সা., আপনার যাওয়ার চাইতে তাঁর আসাই অধিকতর শোভন। রসূলুল্লাহ সা. তাঁকে নিজের সামনে বসালেন। অতঃপর তার বুকে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, 'আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন।' আবু কুহাফা ইসলাম গ্রহণ করলেন। এরপর আবু বকর তাঁকে নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলেন। এ সময় আবু কুহাফার মাথায় 'সাগামা' নামক সাদা এক ধরনের গুল্ম জড়ানো ছিল। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'তার চুল থেকে এটা সরিয়ে দাও।'
রসূল সা. বয়সে প্রবীণদের কতটা গুরুত্ব ও সম্মান দিতেন-উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা তা অনুমান করা যায়। তিনি বলেছেন: যে ব্যক্তি আমাদের ছোটোদের স্নেহ করে না ও বড়দের সম্মান করে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। অন্যত্র এসেছে:
إن من إجلال الله إكرام ذي الشيبة المسلم নিশ্চয়ই বৃদ্ধ মুসলিমকে সম্মান করা মহান আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত।
একইভাবে তিনি ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামীদের ত্যাগ তিতিক্ষার কথা মনে রেখে তাদের সম্মান ও মর্যাদা দিতে বলতেন。
টিকাঃ
১২৭৯. সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ৫৩২।
১২৮০. সুনানে তিরমিযী: ১৯৮৬।
১২৮১. সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৪৩।
১২৮২. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৭/১৯৫।