📄 উযযা ধ্বংস করলে খালেদ ইবনে ওয়ালিদের অভিযান
ক. রসূল সা. খালেদ ইবনে ওয়ালীদের নেতৃত্বে ত্রিশজন অশ্বারোহীকে মক্কার সর্ববৃহৎ মূর্তি উয্যার দিকে পাঠান। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. সেখানে গিয়ে মূর্তি ও তৎসংশ্লিষ্ট পুরো স্থাপনা ধ্বংস করে দেন। তখন তিনি গুনগুন করে আবৃত্তি করছিলেন, 'আমি তোমাকে অস্বীকার করছি, তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি না। কেননা, আমি দেখেছি আল্লাহ তাআলা তোমাকে অপমান করেছেন। এরপর তিনি সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করে রসূলুল্লাহ সা.-কে সবকিছু অবহিত করেন। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বললেন, পুনরায় ফিরে যাও, তুমি কিছুই করতে পারনি। সুতরাং খালেদ আবার সেখানে ফিরে গেলেন। উয্যা মুর্তির সেবায়েতরা খালেদকে দেখেই ভীত বিহ্বল হয়ে পাহাড়ে গিয়ে উঠলো। পালাবার সময় তারা বলতে লাগলো: 'ওহে উয্যা! ওকে নিশ্চল করে দাও। ওকে অন্ধ করে দাও। যদি তা না পারো, তবে নিজে লাঞ্ছিত হয়ে মরে যাও।'
রাবী বলেন, খালেদ মুর্তির কাছে পৌছে দেখেন, এক উলঙ্গ এলোকেশী নারী, মাটি খুড়ে খুড়ে মাথায় ও মুখে মাখছে। খালেদ রা. তাকে তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করলেন। তারপর তিনি ফিরে এসে রসূলুল্লাহ সা.-কে এ ঘটনা জানালে তিনি বললেন: এটাই প্রকৃত উয্যা।
টিকাঃ
১২৫৪. আসসারায়া ওয়াল বুয়ুসিন নববিয়্যাহ ২৮২।
১২৫৫. প্রাগুক্ত।
১২৫৬. প্রাগুক্ত।
১২৫৭. আসসারায়া ওয়াল বুয়ুসিন নববিয়্যাহ : ২৮৩।
📄 মানাত ধ্বংস করতে সাআদ ইবনে যায়েদ আশহালীর অভিযান
লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থিত কুদাইদের নিকটবর্তী মুশাললাল নামক স্থানে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ মূর্তির নাম 'মানাত'। ইসলামের আবির্ভাবের আগে মূর্তিটির উপাসনা করতো আউস, খাযরাজ, গাস্সান ও তাদের সমমনা ব্যক্তিরা। হজের সময় তারা এর কাছে এসে তাকবিরধ্বনি দিতো। তারা এটাকে এতটাই সম্মান দিতো যে, তার জন্য সাফা ও মারওয়ায় তাওয়াফ থেকে বিরত থাকতো। তাদের পূর্বপুরুষ থেকেই মানাত মূর্তিটির সম্মানে সাফা-মারওয়ায় তাওয়াফের পরিবর্তে মূর্তিটির পূজা করার রেওয়াজ প্রচলিত ছিল।
এরা যখন ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে নবীজির কাছে আসেন, তখন নবীজি সা. তাদেরকে হজের বিধান সম্পর্কে জানান। তারা এ প্রসঙ্গটি রসূল সা.-এর সামনে উত্থাপন করেন। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَطَّوَّفَ بِهِمَا وَمَنْ تَطَوَّعَ خَيْرًا فَإِنَّ اللَّهَ شَاكِرٌ عَلِيمٌ .
নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে বাইতুল্লাহর হজ করবে কিংবা উমরা করবে তার কোনো অপরাধ হবে না যে, সে এগুলোর তাওয়াফ করবে। আর কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎকাজ করলে আল্লাহ তো পুরস্কারদাতা, সর্বজ্ঞ।
আরবভূমিতে মূর্তিপূজার প্রবর্তক ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ধর্ম থেকে বিচ্যুত আমর ইবনে লুহাই আল খুযায়ী এই মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করে। আল্লাহ তাআলা যখন মক্কার বিজয় দান করেন, তখন রসূল সা. মানাত নামক মূর্তি ধ্বংস করতে সাআদ ইবনে যায়েদ আশহালী রা.-এর নেতৃত্বে বিশজন অশ্বারোহীর একটি দল পাঠান।
সাআদ ইবনে যায়েদ তার সঙ্গীদের নিয়ে অতি দ্রুত নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদনকল্পে মূর্তির অবস্থানস্থলে পৌঁছান। তাকে দেখেই মূর্তির সেবকরা জিজ্ঞাসা করলো, আপনি কেন এসেছেন? জবাবে তিনি বলেন, আমি মূর্তিটি ধ্বংস করতে এসেছি। মূর্তির উপাসনাকারীরা বিনা বাক্যব্যয়ে পেছনে চলে যায়। সামনে এগিয়ে যান সাআদ। সেখানে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ এক নারীকে উস্কোখুস্কো চুলে কান্নাকাটি করে অভিশাপ দিতে দেখেন।
আরেকদিকে, বেশ দৃঢ়চিত্তে মূর্তির উপাসক চিৎকার করে বলছিল, হে মানাত, আপনার অবাধ্যতাকারীকে আপনি ধ্বংস করে দিন। কিন্তু তার এই চিৎকার শূণ্যে হারিয়ে যায়। সাআদ ইবনে যায়েদকে তা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি কালবিলম্ব না করে তার সঙ্গীদের নিয়ে মূর্তিটি সমূলে উপড়ে ফেলেন। পরে নবীজির কাছে গিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেন।
টিকাঃ
১২৫৮. প্রাগুক্ত: ২৮৬।
১২৫৯. শরহুন নববী আলা সহীহ মুসলিম: ৯/২২।
১২৬০. সুরা বাকারা: আয়াত ১৫৮।
১২৬১. আসসারায়া ওয়াল বুয়ুসিন নববিয়্যাহ: ২৮৭।
১২৬২. প্রাগুক্ত।
১২৬৩. ইবনে সাআদ প্রণীত তাবাকাতুল কুবরা: ২/১৪৬।
১২৬৪. ইবনে সাআد প্রণীত তাবাকাতুল কুবরা: ২/১৪৬।
১২৬৫. আসসারায়া ওয়াল বুয়ুসিন নববিয়্যাহ: ২৮৮।
📄 সুওয়া ধ্বংস করতে আমর ইবনে আস
নুহ আ.-এর সম্প্রদায় সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন: وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا
আর তারা বলে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদের বর্জন করো না; বর্জন করো না ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগূস, ইয়াউক ও নাসরকে।
এখানে বলা হয়েছে, সুওয়া' নামক মূর্তিটিকে মূলত নুহ আ.-এর সম্প্রদায়ের লোকেরা উপাসনা করতো। কালক্রমে এই মূর্তিটি হুযাইল গোত্রের অধিবাসীদের কাছে আসে। হুযাইল গোত্রের লোকেরা এই মূর্তির প্রতি অগাধ আস্থা ও শ্রদ্ধা পোষণ করতো। এমনকি তারা এর আশেপাশে হজ আদায় করতো।
মক্কা বিজয়ের পর হুযাইল গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের সুওয়া মূর্তিটি ধ্বংস করতে রসূল সা. আমর ইবনে আস রা.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠান। আমর রা. বলেন, যখন আমি মূর্তির কাছে গিয়ে পৌঁছলাম, তার রক্ষণাবেক্ষণকারী আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কেনো এসেছো? আমি বললাম, রসূল সা. আমাকে এই মূর্তিটি ধ্বংস করতে পাঠিয়েছেন। সে আমাকে বললো, তুমি এটি করতে পারবে না। আমি বললাম, কেন? সে বললো, এই মূর্তিটি ধ্বংস করা সম্ভব নয়। আমি বললাম, তুমি এখনো মিথ্যা ধারণা পোষণ করে বসে আছো! তোমার ধ্বংস হোক! এই মূর্তিটি না দেখতে পারে, না শুনতে পারে আর না কিছু করতে সক্ষম। অতঃপর আমি মূর্তিটি ধ্বংস করে ফেললাম। আমার সঙ্গীদের নির্দেশ দিলাম, এর আশেপাশের নির্মিত স্থাপনাগুলোও ধ্বংস করে দাও। অবশেষে মূর্তির সেবককে জিজ্ঞেস করলাম, এখন তুমি এ ব্যাপারে কী বলবে? তখন সে বললো, আমি আল্লাহর ওপর ঈমান আনলাম।
এসব মূর্তি ধ্বংসের জন্য বাহিনী পাঠিয়ে রসূলুল্লাহ সা. বুঝিয়ে দিয়েছেন, কুফর ও শিরকের এমন নিদর্শন তথা মূর্তি ধ্বংসের সুযোগ পাওয়া মাত্র তা ধ্বংস করে দিতে হবে। এতে বিলম্ব করা জায়েয নয়। অনুরূপভাবে যেসব কবর ও পাথরকে সম্মান জানানো হয় এবং উপাসনা করা হয়, সেগুলোও সামর্থ্য থাকলে ধ্বংস করে দিতে হবে, অবশিষ্ট রাখা বৈধ হবে না। কেননা এগুলো লাত, উয্যা ও মানাতের পরিবর্তিত রূপ। এগুলোতেও শিরকের পরিমাণ কম নয়।
টিকাঃ
১২৬৬. সুরা নূহ: আয়াত ২৩।
১২৬৭. আসসারায়া ওয়াল বুয়ুসিন নববিয়্যাহ : ২৯২।
১২৬৮. সুবুলুর রাশাদ: ৬/৩০৩।
১২৬৯. ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ২/৮৭০।
১২৭০. আসসারায়া ওয়াল বুয়ুসিন নববিয়্যাহ : ৩০২।