📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বনু জুযায়মার দিকে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-কে প্রেরণ

📄 বনু জুযায়মার দিকে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-কে প্রেরণ


রসূল সা. খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-কে বনু জুযায়মা গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য পাঠান। এটা ছিল অষ্টম হিজরির শাওয়াল মাসে হুনাইন যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা। বনু সুলাইম, মুদলাজ ও আনসার-মুহাজির সাহাবীগণের সমন্বয়ে প্রায় পাঁচশো ত্রিশজনের এ বাহিনী বনু জুযায়মা অভিমুখে বের হয়ে পড়ে। খালেদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে আসা এ বাহিনী দেখে বনু জুযায়মা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে প্রতিরোধ করতে এলে খালেদ বলেন, সব মানুষেরা ইসলামগ্রহণ করেছে; সুতরাং তোমরা অস্ত্র ফেলে দাও। বনু জুযায়মার জুহদর নামক ব্যক্তি চেঁচিয়ে বলে উঠলো, তোমাদের ধ্বংস হোক! নিশ্চয়ই ইনি সেনাপতি খালেদ ইবনে ওয়ালীদ। তিনি তোমাদের অস্ত্রমুক্ত করে প্রথমে বন্দী করবেন, অতঃপর হত্যা করবেন। আল্লাহর শপথ! আমি অস্ত্রসমর্পণ করবো না। তবে কিছু সময় পর সে অস্ত্রসমর্পণ করলে সবাই অস্ত্রসমর্পণ করে। অস্ত্রসমর্পণ সমাপ্ত হলে খালেদ ইবনে ওয়ালিদের আদেশে তাদের একত্রিত করা হয় এবং তিনি সে গোত্রের লোকজনকে ইসলাম গ্রহণ করার আহ্বান জানান কিন্তু তারা স্পষ্টভাবে এ কথা বলেনি যে, 'আমরা ইসলাম গ্রহণ করলাম'; বরং তারা এ কথা বলে যে, 'আমরা ধর্মান্তরিত হলাম। আমরা ধর্মান্তরিত হলাম।' ফলে খালেদ রা. তাদেরকে বন্দী ও হত্যা করার জন্যে পাকড়াও করেন। ইবনে ওমর রা. বলেন, খালেদ আমাদের প্রত্যেকের হাতে একজন করে বন্দীকে তুলে দেন। পরের দিন সকাল বেলা আমাদের প্রত্যেককে নির্দেশ দেন নিজ নিজ বন্দীকে হত্যা করতে। জবাবে আমি বললাম, আল্লাহর কসম আমি আমার বন্দীকে হত্যা করবো না এবং তার মতো আরও অনেকে বন্দীদের হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানালেন। ফলে কিছু বন্দী নিহত হয় এবং কিছু জীবিত থাকে। ইবনে ওমর রা. বলেন, এরপর সকলে রসূল সা.-এর কাছে ফিরে এসে খালেদের কর্মকাণ্ড সবিস্তারে তাকে জানায়। তখন নবী করীম সা. দুহাত উঠিয়ে দোআ করেন: 'হে আল্লাহ! খালেদ যে কাজ করেছে, তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।

এদিকে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ-এর মাঝে এ নিয়ে বেশ বাদানুবাদ হয়। আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.-এর ধারণা ছিল হয়তো খালেদ ইবনে ওয়ালীদ জাহেলি যুগে জুযায়মা কর্তৃক তার চাচা ফাকিহ ইবনে মুগীরা-এর হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ হিসেবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। তাদের এই উত্তপ্ত বাগবিতণ্ডার ব্যাপারে সহীহ মুসলিমে এসেছে, একবার খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.-এর মধ্যে কোনো ব্যাপারে দ্বন্দ্ব হয়। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ আবদুর রহমান ইবনে আউফকে কিছু মন্দ কথা বললে রসূল সা. বলেন, 'তোমরা আমার সাহাবীদের কাউকে মন্দ বলো না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর রাস্তায় দান করো তবুও তা আমার সাহাবীদের দান করা সামান্য পরিমাণ সাদকার সমতুল্য হবে না।

রসূল সা. আলী রা.-কে তাদের রক্তপণ এবং তাদের মনোতুষ্টির জন্য আরও অতিরিক্ত কিছু সম্পদ দিয়ে আসার নির্দেশ দেন। এমন হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে রসূল সা. বনু জুযায়মার মন জয় করেন। দূর করে দেন তাদের মনের দুঃখ-বেদনা। খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর উক্ত আচরণ ছিল একটি ইজতিহাদি ভুল। এর প্রমাণ হচ্ছে, রসূল সা. এ ব্যাপারে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-কে তিরস্কার করেননি। কোনো প্রকার শাস্তিও দেননি।

টিকাঃ
১২৪৭. আসসারায়া ওয়াল বুয়ুসিন নববিয়্যাহ: ২৪৮।
১২৪৮. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৬৪।
১২৪৯. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ ৫৭৯।
১২৫০. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ ৫৭৯।
১২৫১. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৫৭৯।
১২৫২. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৫৭৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মূর্তি-উপাসনাগার ধ্বংস

📄 মূর্তি-উপাসনাগার ধ্বংস


পবিত্র বায়তুল্লাহকে মূর্তি হতে পবিত্র করার পর মক্কায় যেসব ঘরে মূর্তি সংরক্ষণ করা হতো, সেগুলোও ধ্বংসের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বহুকাল যাবত অজ্ঞতার যুগের এসব স্মৃতিচিহ্ন ক্রমান্বয়ে গড়ে উঠেছিল মক্কা নগরীতে। এ প্রেক্ষিতে নবীজি সা. আরবভূমিকে এসব অপবিত্র মূর্তি থেকে মুক্ত করার জন্য বিভিন্ন বাহিনী পাঠান।

টিকাঃ
১২৫৩. মুঈনুস সীরাহ: ৩৯৪।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 উযযা ধ্বংস করলে খালেদ ইবনে ওয়ালিদের অভিযান

📄 উযযা ধ্বংস করলে খালেদ ইবনে ওয়ালিদের অভিযান


ক. রসূল সা. খালেদ ইবনে ওয়ালীদের নেতৃত্বে ত্রিশজন অশ্বারোহীকে মক্কার সর্ববৃহৎ মূর্তি উয্যার দিকে পাঠান। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. সেখানে গিয়ে মূর্তি ও তৎসংশ্লিষ্ট পুরো স্থাপনা ধ্বংস করে দেন। তখন তিনি গুনগুন করে আবৃত্তি করছিলেন, 'আমি তোমাকে অস্বীকার করছি, তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি না। কেননা, আমি দেখেছি আল্লাহ তাআলা তোমাকে অপমান করেছেন। এরপর তিনি সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করে রসূলুল্লাহ সা.-কে সবকিছু অবহিত করেন। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বললেন, পুনরায় ফিরে যাও, তুমি কিছুই করতে পারনি। সুতরাং খালেদ আবার সেখানে ফিরে গেলেন। উয্যা মুর্তির সেবায়েতরা খালেদকে দেখেই ভীত বিহ্বল হয়ে পাহাড়ে গিয়ে উঠলো। পালাবার সময় তারা বলতে লাগলো: 'ওহে উয্যা! ওকে নিশ্চল করে দাও। ওকে অন্ধ করে দাও। যদি তা না পারো, তবে নিজে লাঞ্ছিত হয়ে মরে যাও।'

রাবী বলেন, খালেদ মুর্তির কাছে পৌছে দেখেন, এক উলঙ্গ এলোকেশী নারী, মাটি খুড়ে খুড়ে মাথায় ও মুখে মাখছে। খালেদ রা. তাকে তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করলেন। তারপর তিনি ফিরে এসে রসূলুল্লাহ সা.-কে এ ঘটনা জানালে তিনি বললেন: এটাই প্রকৃত উয্যা।

টিকাঃ
১২৫৪. আসসারায়া ওয়াল বুয়ুসিন নববিয়্যাহ ২৮২।
১২৫৫. প্রাগুক্ত।
১২৫৬. প্রাগুক্ত।
১২৫৭. আসসারায়া ওয়াল বুয়ুসিন নববিয়্যাহ : ২৮৩।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মানাত ধ্বংস করতে সাআদ ইবনে যায়েদ আশহালীর অভিযান

📄 মানাত ধ্বংস করতে সাআদ ইবনে যায়েদ আশহালীর অভিযান


লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থিত কুদাইদের নিকটবর্তী মুশাললাল নামক স্থানে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ মূর্তির নাম 'মানাত'। ইসলামের আবির্ভাবের আগে মূর্তিটির উপাসনা করতো আউস, খাযরাজ, গাস্সান ও তাদের সমমনা ব্যক্তিরা। হজের সময় তারা এর কাছে এসে তাকবিরধ্বনি দিতো। তারা এটাকে এতটাই সম্মান দিতো যে, তার জন্য সাফা ও মারওয়ায় তাওয়াফ থেকে বিরত থাকতো। তাদের পূর্বপুরুষ থেকেই মানাত মূর্তিটির সম্মানে সাফা-মারওয়ায় তাওয়াফের পরিবর্তে মূর্তিটির পূজা করার রেওয়াজ প্রচলিত ছিল।

এরা যখন ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে নবীজির কাছে আসেন, তখন নবীজি সা. তাদেরকে হজের বিধান সম্পর্কে জানান। তারা এ প্রসঙ্গটি রসূল সা.-এর সামনে উত্থাপন করেন। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَطَّوَّفَ بِهِمَا وَمَنْ تَطَوَّعَ خَيْرًا فَإِنَّ اللَّهَ شَاكِرٌ عَلِيمٌ .
নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে বাইতুল্লাহর হজ করবে কিংবা উমরা করবে তার কোনো অপরাধ হবে না যে, সে এগুলোর তাওয়াফ করবে। আর কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎকাজ করলে আল্লাহ তো পুরস্কারদাতা, সর্বজ্ঞ।

আরবভূমিতে মূর্তিপূজার প্রবর্তক ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ধর্ম থেকে বিচ্যুত আমর ইবনে লুহাই আল খুযায়ী এই মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করে। আল্লাহ তাআলা যখন মক্কার বিজয় দান করেন, তখন রসূল সা. মানাত নামক মূর্তি ধ্বংস করতে সাআদ ইবনে যায়েদ আশহালী রা.-এর নেতৃত্বে বিশজন অশ্বারোহীর একটি দল পাঠান।

সাআদ ইবনে যায়েদ তার সঙ্গীদের নিয়ে অতি দ্রুত নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদনকল্পে মূর্তির অবস্থানস্থলে পৌঁছান। তাকে দেখেই মূর্তির সেবকরা জিজ্ঞাসা করলো, আপনি কেন এসেছেন? জবাবে তিনি বলেন, আমি মূর্তিটি ধ্বংস করতে এসেছি। মূর্তির উপাসনাকারীরা বিনা বাক্যব্যয়ে পেছনে চলে যায়। সামনে এগিয়ে যান সাআদ। সেখানে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ এক নারীকে উস্কোখুস্কো চুলে কান্নাকাটি করে অভিশাপ দিতে দেখেন।

আরেকদিকে, বেশ দৃঢ়চিত্তে মূর্তির উপাসক চিৎকার করে বলছিল, হে মানাত, আপনার অবাধ্যতাকারীকে আপনি ধ্বংস করে দিন। কিন্তু তার এই চিৎকার শূণ্যে হারিয়ে যায়। সাআদ ইবনে যায়েদকে তা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি কালবিলম্ব না করে তার সঙ্গীদের নিয়ে মূর্তিটি সমূলে উপড়ে ফেলেন। পরে নবীজির কাছে গিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেন।

টিকাঃ
১২৫৮. প্রাগুক্ত: ২৮৬।
১২৫৯. শরহুন নববী আলা সহীহ মুসলিম: ৯/২২।
১২৬০. সুরা বাকারা: আয়াত ১৫৮।
১২৬১. আসসারায়া ওয়াল বুয়ুসিন নববিয়‍্যাহ: ২৮৭।
১২৬২. প্রাগুক্ত।
১২৬৩. ইবনে সাআদ প্রণীত তাবাকাতুল কুবরা: ২/১৪৬।
১২৬৪. ইবনে সাআد প্রণীত তাবাকাতুল কুবরা: ২/১৪৬।
১২৬৫. আসসারায়া ওয়াল বুয়ুসিন নববিয়‍্যাহ: ২৮৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00