📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 অবনত মস্তকে মক্কায় প্রবেশ

📄 অবনত মস্তকে মক্কায় প্রবেশ


মক্কা বিজয়ের দিন কালো পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় ইহরাম ব্যতীতই রসূল সা. মক্কায় প্রবেশ করেন। রসূলুল্লাহ সা. মক্কায় এভাবে প্রবেশ করেন যে, তার মস্তক আনুগত্য ও বিনয়াধিক্যে একেবারে ঝুঁকে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিলো তার চিবুক বুঝি উটনীর কুঁজ স্পর্শ করবে। মক্কায় প্রবেশকালে তিনি সূরা ফাতহ পড়ছিলেন।
বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশকালে (যা ছিল আরব উপদ্বীপের হৃৎপিণ্ড বিশেষ এবং এর আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র) ন্যায়বিচার ও সাম্য, বিনয় ও আনুগত্যের এমন কোনো নীতি ছিল না যা তিনি অবলম্বন করেননি। তার মুক্ত দাস হযরত যায়েদ পুত্র উসামা রা.-কে এ সময় তিনি তার বাহনে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। বনী হাশিম ও কুরায়েশ বংশীয় কোনো সাহাবীর এই সৌভাগ্য হয়নি। দিনটি ছিল ২১ শে রমযান শুক্রবার।

নবীজি সা. সেদিন কীভাবে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে মুহাম্মাদ গাযালী বলেন, বিজয়ী সৈন্যরা দলে দলে এগিয়ে যাচ্ছিলো। রসূল সা. তখন তার বাহনে কালো পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় মাথা নিচু করে বসেছিলেন। আল্লাহর ভয়ে তার মাথা অবনত হয়ে আসছিল। তিনি তার বাহনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বিনয়ে তিনি নুয়ে যাচ্ছিলেন। অসংখ্য জনতা সেদিন তার একটি আদেশের অপেক্ষায় ছিল।
এই বিরাট বিজয়ে তার মানসপটে ভেসে ওঠে অতীত স্মৃতি। যেদিন তিনি মক্কা থেকে বিতাড়িত হয়ে বের হন, সেদিনের কথা মনে পড়ে তার। বহু পথ পাড়ি দিয়ে সেদিন তিনি প্রিয় জন্মভূমি মক্কায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। রবের করুণায় তিনি ছিলেন মহা সৌভাগ্যবান। আল্লাহর অপার দয়ার কথা মনে করেই তিনি বিনীতভাবে মাথা নুইয়ে রাখেন।

রসূলুল্লাহ সা. মক্কা বিজয়ের পর মক্কার নিরাপত্তা বহাল রাখার নিমিত্তে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। এ প্রেক্ষিতে আমরা দেখতে পাই, যখন তিনি আবু সুফিয়ানকে লক্ষ্য করে সাআদ ইবনে ওবাদা রা.-এর এই উক্তি শুনতে পান, 'আজ প্রচণ্ড লড়াইয়ের দিন। আজ রক্তপাতের দিন। আজ কা'বার সীমানায়ও রক্তপাত বৈধ হবে। আজ আল্লাহ তাআলা কুরায়েশদের অপমানিত করেছেন।' নবীজি সা. বললেন, 'আজ দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শনের দিন। আজ আল্লাহ তাআলা কুরায়েশকে সম্মানিত করবেন এবং কা'বার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।'
তিনি হযরত সাআদ রা.-কে ডেকে পাঠালেন এবং তার হাত থেকে ইসলামের পতাকা নিয়ে তার ছেলে কায়েস ইবনে সা'দ রা.-এর হাতে তুলে দিলেন। অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নবীজি সা. অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত এড়াতে চেয়েছেন। আর এটি করতে গিয়ে আল্লাহর রসূল সা. সা'দ বা তার গোত্রকে হতাশ করেননি। পিতার পরিবর্তে তার ছেলেকে নেতৃত্ব দিয়ে আবু সুফিয়ানের আহত অন্তরকে প্রবোধ দিলেন। অন্যদিকে, সাআদ ইবনে উবাদা রা.-কেও নবীজি সা. বিষণ্ণ ও মনঃক্ষুণ্ণ দেখতে চাইছিলেন না যিনি ইসলামের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন।

রসূলুল্লাহ সা. যখন মক্কায় অবতরণ করলেন এবং লোকেরা কিছুটা শান্ত হলো, তখন তিনি বায়তুল্লাহর দিকে রওনা হলেন এবং বায়তুল্লাহর চারদিকে তাওয়াফ করলেন। এ সময় তার হাতে একটি ধনুক ছিল। কা'বা শরীফে ছিল তিনশো ষাটটি মূর্তি। তিনি ধনুকের সাহায্যে মূর্তিগুলোর দিকে খোঁচা দিচ্ছিলেন আর বলছিলেন:
جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا
হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।
جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيدُه
সত্য এসেছে এবং বাতিল কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, আর কিছু পুনরাবৃত্তিও করতে পারে না।
তিনি এ কথা বলছিলেন আর একটি একটি করে মূর্তি মুখ থুবড়ে পড়ছিল।

নবীজি সা. কা'বা শরীফের দেওয়ালে বেশ কিছু ছবি টাঙানো দেখতে পান। তার নির্দেশে সেগুলো নামিয়ে ফেলা হয় এবং চূর্ণবিচূর্ণ করা হয়। এসব ছবি বায়তুল্লাহর ভেতর থেকে বের করা ছাড়া তিনি বায়তুল্লাহয় প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানান। সেগুলো ছিল কাফেরদের ধারণা অনুযায়ী ইবরাহীম ও ইসমাইল আ.-এর ছবি। তাদের হাতে ভাগ্যনির্ধারণী তীর আছে এমন দৃশ্য সেইসব ছবিগুলোতে ছিল। এগুলো দেখে রসূল সা. বলেন, আল্লাহ মুশরিকদের ধ্বংস করুন। তারা অবশ্যই জানে ইবরাহীম ও ইসমাইল আ. কক্ষণো তীর দিয়ে ভাগ্য নির্ণয় করেননি।

অতঃপর আল্লাহর রসূল সা. বায়তুল্লাহর ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে তাকবিরধ্বনি দেন এবং নামায আদায় করেন। ওমর রা. হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, রসূল সা. যখন কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিলেন তখন সেখানে উসামা, বেলাল ও ওসমান ইবনে তালহা রা. অবস্থান করছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. সেখানে পৌছলে কাবার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তিনি কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, আমি বেলাল রা.-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বায়তুল্লাহর অভ্যন্তরে রসূল সা. কী করেছেন? তিনি আমাকে জানান যে, রসূল সা. বায়তুল্লাহর অভ্যন্তরে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করেছেন। তিনি এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, যেখানে তার বাম দিকে দুটি খুঁটি, ডানদিকে একটি খুঁটি পেছন দিকে তিনটি খুঁটি ছিল। সে সময় বায়তুল্লাহর ভেতর ছয়টি খুঁটি ছিল।

ইসলামগ্রহণের আগে ওসমান ইবনে তালহার কাছে বায়তুল্লাহর চাবি থাকতো। রসূলুল্লাহ সা. মসজিদুল হারামে অবস্থানকালে তার কাছে আলী ইবনে আবু তালিব এলেন। তার হাতে ছিল কা'বার চাবি। তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! হাজীদের আপ্যায়নের পাশাপাশি কা'বার দ্বার রক্ষকের দায়িত্বও আমাদের হাতে নিয়ে নিন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, ওসমান ইবেন তালহা কোথায়? ওসমানকে ডাকা হলো। তিনি বললেন, হে ওসমান! এই নাও তোমার চাবি। আজকের দিন সৌজন্য ও হৃদ্যতা প্রদর্শনের দিন।

রসূলুল্লাহ সা. হিজরত করে যাবার আগে একবার ওসমান ইবনে তালহার কাছে বায়তুল্লাহর চাবি চেয়েছিলেন। তখন ওসমান ইবনে তালহা নবীজির সাথে মন্দ আচরণ করেছিল। কিন্তু তার পরিবর্তে রসূল সা. আজ তার সাথে সদাচরণ করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। শুধু তাই নয়, রসূল সা. তাকে বলেন, হে ওসমান, আজ তুমি দেখেছো বায়তুল্লাহর এই চাবি আমার হাতে এসেছে, আমি যাকে ইচ্ছা তাকে দিতে পারি। জবাবে সে বলে, আজ অবশ্যই কুরায়েশরা ধ্বংস ও লাঞ্ছিত হয়েছে। রসূল সা. তাকে বলেন, না, বরং তারা আজ আরও সম্মানিত ও মর্যাদাবান হয়েছে। নবীজির একথায় ওসমান ইবনে তালহা কিছুটা আশাবাদী হয়ে ওঠেন। যেহেতু রসূল সা. তাকে এই বলে চাবি ফেরত দিয়েছিলেন যে, এই নাও তোমার চাবি, হে ওসমান। আজ সদাচরণ ও ওয়াদা রক্ষার দিন। এই নাও চাবি। এ চাবি এখন থেকে তোমার কাছেই থাকবে আর একমাত্র জালিম ছাড়া অন্য কেউ এ চাবি তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে না।

রসূলুল্লাহ সা. নিজে কাবার চাবি দখল করে রাখতে চাননি। নিজের বংশ বনু হাশিমের অনেকে এর প্রতি আগ্রহ দেখালেও তিনি সেদিকে কর্ণপাত করেননি। স্বাভাবিকভাবেই কাবার চাবির অধিকার পাওয়া মর্যাদার একটি ব্যাপার ছিল। কিন্তু নবুওয়াতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এটি ছিল না। প্রিয়নবীর কাছে সত্য ও কল্যাণকর কাজই ছিল মর্যাদার ও শ্রেষ্ঠত্বের। তার শত্রুরাও তার কাছ থেকে এমন আচরণই পেয়েছে।

রসূল সা. বেলালকে বায়তুল্লাহর ছাদে উঠে যোহরের আযান দিতে বলেন।
বেলাল ছাদে উঠে যোহরের নামাযের আযান দেন। নিস্তব্ধ মক্কাবাসী নতুন ইবাদতের আহ্বান যেন মোহাবিষ্ট হয়ে শুনছিল। গোটা মক্কায় গুঞ্জরিত হচ্ছিলো এ আযানের ধ্বনি। নিশ্চই শয়তান সেদিন ভীষণ ক্ষিপ্ত ছিল। সে তার অনুসারীদের নিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে পালাচ্ছিলো। আল্লাহ মহান আল্লাহ মহান।

যে বেলাল চাবুকের আঘাত খেতে খেতে কেবল 'আহাদ আহাদ' বলে চিৎকার করতেন, সেদিন দীপ্তিময় কণ্ঠে সেই তিনি বায়তুল্লাহর ছাদে উঠে ঘোষণা করছিলেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ' আর মক্কার সব মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই আযানের মধুর কলতান শুনছিল।

টিকাঃ
১২১৯. সহীহ মুসলিম: ১৩৫৮।
১২২০. আস সীরাতুন নববিয়্যাহ লিননদবী: ৩৩৭।
১২২১. ফিকহুস সীরাহ লিলগাজালি: ৩৭৯-৩৮০।
১২২২. কিয়াদাতুর রসূল আসসিয়াসিয়াহ ওয়াল আসকারীয়াহ: ১৯৬।
১২২৩. সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত ৮১।
১২২৪. সুরা সাবা ৪৯।
১২২৫. আস সীরাতুন নববিয়‍্যাহ লিননদবী: ৩৩৯।
১২২৬. আস সীরাতুন নববিয়‍্যাহ লিননদবী: ৩৩৯।
১২২৭. সহীহ বুখারী: ৪২৮৮।
১২২৮. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/৬১-৬২।
১২২৯. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/৬১।
১২৩০. আল মাগাযী: ২/৮৩৮।
১২৩১. আল মাগাযী: ২/৮৩৮।
১২৩২. সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মদীনা: ৪০১।
১২৩৩. ফিকহুস সীরাহ লিলগাযালী: ৩৮৩।
১২৩৪. ফিকহুস সীরাহ লিলবুতী: ২৬৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা

📄 সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা


ক. মক্কা বিজয়ের দিন মক্কার অধিবাসীরা সাধারণ ক্ষমা লাভ করে। অথচ তারা ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই রসূল সা. ও দীনি দাওয়াতের প্রতি জঘন্যতম আচরণ করে আসছিল। চাইলেই মুসলিম মুজাহিদরা তাদের নির্মূল করতে পারতো। কিন্তু না, নবীজি সেদিন দেখালেন ক্ষমার এক অতুল দৃষ্টান্ত। মুশরিকরা যা কল্পনাই করতে পারেনি। নবীজি সা. তাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি তোমাদের সাথে কী আচরণ করবো বলে তোমরা ধারণা করো? জবাবে তারা বললো, হে সম্মানিত ভাই! আমরা কল্যাণের আশা করি। দয়ার নবী তাদের আশ্বস্ত করে বললেন,
لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ
আজ তোমাদের উপর কোনো ভৎর্সনা নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। '

সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে মক্কার মুশরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল। তাদেরকে হত্যা করা হয়নি। কাউকে বন্দীও করা হয়নি। তাদের সম্পদ ও ভূখণ্ডের মালিকানা তাদের হাতেই ছিল। পরিবর্তে তাদের ওপর কোনো ট্যাক্সও ধার্য করা হয়নি। অন্যান্য যেসব ভূখণ্ড যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানদের হাতে এসেছিল, সেসব ক্ষেত্রে এমন আচরণ করা হয়নি। কেননা, মক্কা মর্যাদাপূর্ণ ভূমি। মক্কায় মহান আল্লাহর ইবাদত করা হয়। পবিত্র কা'বার অবস্থান মক্কায়।
এ প্রেক্ষিতে জামহুর ইমামগণের মতে, মক্কার ভূমি বিক্রি করা বা মক্কায় অবস্থিত বাসস্থান ভাড়া দেওয়া নাজায়েয। সেখানকার অধিবাসীদের জন্য যতটুকু প্রয়োজন তাতে তারা বসবাস করবে। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত জায়গাগুলোতে আল্লাহর ঘরের মেহমান তথা হজ ও উমরাকারীরা এসে থাকবে। পক্ষান্তরে কিছু কিছু আলেমের উক্তি হচ্ছে, পৃথিবীর অন্যান্য নগরীর মতো মক্কা নগরীর ভূখণ্ড বিক্রি করা এবং সেখানকার ঘর ভাড়া দেওয়া জায়েয। দলিল-প্রমাণের আলোকে এই পক্ষের বক্তব্য শক্তিশালী। অন্য পক্ষ অর্থাৎ যারা নাজায়েয বলে মত দিয়েছেন, তাদের প্রমাণসমূহ মুরসাল ও মাওকূফ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।

খ. যারা সাধারণ ক্ষমা পায়নি
দয়ার পাশাপাশি কঠোরতাও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্য জরুরি। মক্কা বিজয়ের পরে রসূল সা. প্রায় দশজন ব্যক্তিকে সাধারণ ক্ষমার আওতার বাইরে রাখেন। তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দেন। কেননা, তাদের অপরাধ ছিল অমার্জনীয়। ইসলাম ও مسلمانوں বিরুদ্ধে তাদের কুকীর্তি ছিল ক্ষমার অযোগ্য। এছাড়া মক্কা বিজয়ের পর তারা মক্কাবাসীদের পুনরায় مسلمانوں বিরুদ্ধে যুদ্ধে উসকানি দেবে এমন আশঙ্কাও ছিল প্রবল। এ কারণে রসূল সা. বলেছেন, যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই তাদের হত্যা করাবে।

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারী গ্রন্থে লিখেন, আমি ক্ষমার অযোগ্য এসব ব্যক্তিদের নাম বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জমা করেছি। তারা হলো : আবদুল উয্যা ইবনে খাতাল, আবদুল্লাহ ইবনে সাআদ ইবনে আবী সারাহ, ইকরামা ইবনে আবু জেহেল, হুয়াইরিস ইবনে নুকাইদ, মুকাইস ইবনে হুবাবাহ, হাব্বার ইবনে আসওয়াদ ও ইবনে খাতালের দুই দাসী ফারতানী ও কারীবা, আবদুল মুত্তালিবের মুক্ত দাসী সারা।
আবু মা'শারের বর্ণনায় ক্ষমার অযোগ্যদের তালিকায় হারেস ইবনে তালাল খুযায়ীর নামও রয়েছে। ইমাম হাকিমের বর্ণনায় ক্ষমার অযোগ্যদের তালিকায় কাআব ইবনে যুহাইর, ওয়াহশী ইবনে হারব ও হিন্দ বিনতে উতবার নামও পাওয়া যায়।

উপরোক্ত তালিকার কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিল। কেউ কেউ নবীজির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে ইসলাম গ্রহণ করে। নবীজি সা. তাদের ক্ষমা করে দেন। পরবর্তীকালে তারা ইসলামী আদর্শে জীবনযাপন করে।

গ. মক্কা বিজয়ের দিন নবীজির ভাষণ ও মক্কাবাসীর ইসলাম গ্রহণ
রসূলুল্লাহ সা. মক্কা বিজয়ের দিন সকালে জানতে পারেন, তার মিত্রপক্ষ বনু খুযাআর লোকেরা জাহেলিয়া যুগে তাদের গোত্রের নিহত এক ব্যক্তির বদলায় হুযাইল গোত্রের এক মুশরিক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। এটা শুনে রসূল সা. রাগান্বিত হন। তিনি ভাষণ দিতে দাঁড়ান এবং বলেন: 'হে জনতা! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সূচনা লগ্ন থেকে মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। আল্লাহর সম্মানে কেয়ামত পর্যন্ত এখানে যাবতীয় হত্যাকাণ্ড হারাম। যারা আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী, তাদের জন্য এখানে রক্তপাত করা হারাম। এখানকার গাছ কাটা এবং ঘাস উপড়ানোও হারাম। আমার আগে কাউকে এর অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমার পরবর্তীদের জন্যও এটা বৈধ নয়। এখানকার মুশরিকদের অপরাধের শাস্তি হিসেবে কিছু সময়ের জন্য আমাকে এ অঞ্চলের বৈধতা দান করা হয়েছে। অতঃপর পূর্বেকার মতো আগামীতেও এই বিধান বলবৎ থাকবে। তোমাদের মধ্যে যারা উপস্থিত রয়েছে, তারা যেন অনুপস্থিত সবাইকে জানিয়ে দেয়। কেউ যদি তোমাদের বলে, নবীজি সা. এখানে কাফেরদের হত্যা করেছিলেন, জবাবে তোমরা বলবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার রসূলের জন্য তা বৈধ করেছিলেন। পরে আর কারো জন্য এটা বৈধ নয়।
হে খুযাআ গোত্রের লোকেরা! তোমরা হত্যা থেকে নিজেদের হাত গুটিয়ে ফেলো। যে লোককে তোমরা হত্যা করেছো, আমি তার রক্তপণ আদায় করে দেবো। আজকের পর কাউকে হত্যা করা হলে নিহত ব্যক্তির পরিবারের জন্য দুটি অধিকার থাকবে; একটি হলো, প্রতিশোধ হিসেবে হত্যাকারীকে হত্যা করা, আরেকটি হচ্ছে, রক্তপণ নেওয়া।

নবীজির সাধারণ ক্ষমা মক্কাবাসীদের অন্তরে তোলপাড় সৃষ্টি করে। তারা প্রভাবিত হয় নবীজির মহানুভবতায়। মক্কার নারী-পুরুষ দলে দলে ইসলামে দীক্ষিত হয়। আর এভাবেই আল্লাহর নেয়ামত পূর্ণতা পায়।

রসূলুল্লাহ সা. শিশু-বৃদ্ধ-নারী-पुरुष নির্বিশেষে সবার বায়আত নেন। সাফা পাহাড়ে আল্লাহর রসূল সা. তাদের বায়আত নেওয়া শুরু করেন। প্রথমে পুরুষদের বায়আত নেন। এই বায়আত ছিল ইসলামের বিধান পালন, আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্যের ব্যাপারে। মুজাশি রা. বলেন, মক্কা বিজয়ের পর আমি আমার ভাই (মুজালিদ)-কে নিয়ে রসূল সা.-এর কাছে এসে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি আমার ভাইকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি যেন আপনি তার নিকট হতে হিজরত করার ব্যাপারে বায়আত গ্রহণ করেন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, (মক্কা বিজয়ের পূর্বে মক্কা থেকে মদীনায়) হিজরতকারীরা হিজরতের সমুদয় বরকত নিয়ে গেছে। আমি বললাম, তা হলে কোন্ বিষয়ের ওপর আপনি তার নিকট হতে বায়আত গ্রহণ করবেন? তিনি বললেন:
أبايعه على الإسلام والإيمان والجهاد
আমি তার নিকট হতে বায়আত গ্রহণ করবো ইসলাম, ঈমান ও জিহাদের ওপর。

ইমাম বুখারী হতে বর্ণিত, রসূল সা. মক্কা বিজয়ের দিন বলেছিলেন, ‘(মক্কা) বিজয়ের পর আর হিজরত নেই; বরং রয়েছে কেবল জিহাদ ও নিয়‍্যাত। যখন তোমাদের জিহাদের ডাক দেওয়া হয়, তখন বেরিয়ে পড়ো。

এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের যে বিধান मुसलमानों জন্য আবশ্যক ছিল, মক্কা বিজয়ের পর তা রহিত হয়ে গেছে। এর কারণ হচ্ছে, মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম শক্তি ও মর্যাদা লাভ করেছে। ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে অসংখ্য মানুষ। কিন্তু দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামের দিকে হিজরত করা বা যেখানে দীনি বিষয়াদি যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব নয়, সেখান থেকে নিরাপদ এলাকায় হিজরতের বিধান কেয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে। তবে মর্যাদার ক্ষেত্রে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সাথে অন্য হিজরত তুলনীয় হবে না।

অনুরূপভাবে যারা মক্কা বিজয়ের পর কেয়ামত পর্যন্ত জিহাদ ও আল্লাহর পথে জীবন ও সম্পদ ব্যয় করেছেন বা করবেন তারা কখনো মক্কা বিজয়ের পূর্বে যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করেছেন এবং যারা জিহাদ করেছেন তাদের সমমর্যাদার হবেন না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
وَمَا لَكُمْ أَلَّا تُنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا يَسْتَوِي مِنْكُمْ مَنْ أَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُولَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِنْ الَّذِينَ أَنْفَقُوا مِنْ بَعْدُ وَقَاتَلُوا وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করছ না? অথচ আসমানসমূহ ও জমিনের উত্তরাধিকারতো আল্লাহরই? তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে এবং যুদ্ধ করেছে তারা সমান নয়। তারা মর্যাদায় তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যারা পরে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ প্রত্যেকের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবগত।

পুরুষদের থেকে বায়আত নেয়ার পর তিনি মহিলাদের থেকে বায়আত গ্রহণ করেন। মহিলাদের দলে হিন্দ বিনতে উতবাও ছিলেন। হামযার প্রতি তার আচরণের কারণে লজ্জিত হয়ে অবগুণ্ঠন টেনে তিনি তথায় উপস্থিত হন। ওই ঘটনার কারণে রসূলুল্লাহ সা. তাকে পাকড়াও করতে পারেন বলে তিনি আশংকা করছিলেন। বায়আতের উদ্দেশ্যে নারীরা রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এলে তিনি বলেন, 'তোমরা আমার নিকট এই মর্মে বায়আত গ্রহণ করো যে, আল্লাহর সাথে অন্য কিছুকে শরীক করবে না। চুরি করবে না।'

হিন্দ বললেন, আবু সুফিয়ান কৃপণ ব্যক্তি। আমি আবু সুফিয়ানের মাল- সম্পদ না বলে নিলে কি সমস্যা হবে? রসূল সা. বললেন, তার সম্পদ থেকে তোমার এবং তোমার সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ হয় এই পরিমাণ সম্পদ নিতে পারো। যখন রসূল সা. এই মর্মে শপথ করাচ্ছিলেন যে, 'ব্যভিচার করবে না।' হিন্দ বলে উঠলেন, কোনো স্বাধীন নারী কি ব্যভিচার করতে পারে? রসূল সা. তাকে চিনতে পারলেন এবং বললেন, নিশ্চয়ই তুমি হিন্দ বিনতে উতবাহ। তিনি বললেন, হ্যাঁ। আপনি আমাকে পূর্বের অপরাধের জন্য ক্ষমা করে দিন! আল্লাহ আপনার মঙ্গল করবেন। অতঃপর আল্লাহর রসূল সা. তাকে ক্ষমা করে দেন।

আল্লাহর রসূল সা. নারীদের বায়আত করানোর ক্ষেত্রে তাদের হাতে স্পর্শ করেননি। তিনি কখনো নিজের নিকটাত্মীয় বা স্ত্রীগণ ব্যতীত অন্য কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেননি। সহীহাইনে এসেছে: আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! রসূল সা.-এর হাত কখনো কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রসূল সা. নারীদের শুধু কথার মাধ্যমে বায়আত করাতেন এবং তিনি এই কথা বলতেন, একজন নারীর জন্য আমার বক্তব্য শত নারীর জন্য আমার বক্তব্যের মতো।

টিকাঃ
১২৩৫. আল মুজতামা আল মাদানী লিলউমরী: ১৭৯।
১২৩৬. আল মুজতামা আল মাদানী লিলউমরী: ১৮০।
১২৩৭. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫১।
১২৩৮. ফাতহুল বারী: ৯/৮।
১২৩৯. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫১।
১২৪০. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫১।
১২৪১. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫৬।
১২৪২. সহীহ বুখারী: ৪৩০৫।
১২৪৩. সহীহ বুখারী: ২৭৮৩।
১২৪৪. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫৭।
১২৪৫. সূরা হাদীদ: আয়াত ১০।
১২৪৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩১৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 যারা সাধারণ ক্ষমা পায়নি

📄 যারা সাধারণ ক্ষমা পায়নি


দয়ার পাশাপাশি কঠোরতাও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্য জরুরি। মক্কা বিজয়ের পরে রসূল সা. প্রায় দশজন ব্যক্তিকে সাধারণ ক্ষমার আওতার বাইরে রাখেন। তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দেন। কেননা, তাদের অপরাধ ছিল অমার্জনীয়। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের কুকীর্তি ছিল ক্ষমার অযোগ্য। এছাড়া মক্কা বিজয়ের পর তারা মক্কাবাসীদের পুনরায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উসকানি দেবে এমন আশঙ্কাও ছিল প্রবল। এ কারণে রসূল সা. বলেছেন, যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই তাদের হত্যা করাবে।

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারী গ্রন্থে লিখেন, আমি ক্ষমার অযোগ্য এসব ব্যক্তিদের নাম বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জমা করেছি। তারা হলো : আবদুল উয্যা ইবনে খাতাল, আবদুল্লাহ ইবনে সাআد ইবনে আবী সারাহ, ইকরামা ইবনে আবু জেহেল, হুয়াইরিস ইবনে নুকাইদ, মুকাইস ইবনে হুবাবাহ, হাব্বার ইবনে আসওয়াদ ও ইবনে খাতালের দুই দাসী ফারতানী ও কারীবা, আবদুল মুত্তালিবের মুক্ত দাসী সারা।
আবু মা'শারের বর্ণনায় ক্ষমার অযোগ্যদের তালিকায় হারেস ইবনে তালাল খুযায়ীর নামও রয়েছে। ইমাম হাকিমের বর্ণনায় ক্ষমার অযোগ্যদের তালিকায় কাআব ইবনে যুহাইর, ওয়াহশী ইবনে হারব ও হিন্দ বিনতে উতবার নামও পাওয়া যায়।

উপরোক্ত তালিকার কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিল। কেউ কেউ নবীজির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে ইসলাম গ্রহণ করে। নবীজি সা. তাদের ক্ষমা করে দেন। পরবর্তীকালে তারা ইসলামী আদর্শে জীবনযাপন করে।

টিকাঃ
১২৩৭. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫১।
১২৩৮. ফাতহুল বারী: ৯/৮।
১২৩৯. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫১।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মক্কা বিজয়ের দিন নবীজির ভাষণ ও মদীনাবাসীর ইসলাম গ্রহণ

📄 মক্কা বিজয়ের দিন নবীজির ভাষণ ও মদীনাবাসীর ইসলাম গ্রহণ


রসূলুল্লাহ সা. মক্কা বিজয়ের দিন সকালে জানতে পারেন, তার মিত্রপক্ষ বনু খুযাআর লোকেরা জাহেলিয়া যুগে তাদের গোত্রের নিহত এক ব্যক্তির বদলায় হুযাইল গোত্রের এক মুশরিক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। এটা শুনে রসূল সা. রাগান্বিত হন। তিনি ভাষণ দিতে দাঁড়ান এবং বলেন: 'হে জনতা! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সূচনা লগ্ন থেকে মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। আল্লাহর সম্মানে কেয়ামত পর্যন্ত এখানে যাবতীয় হত্যাকাণ্ড হারাম। যারা আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী, তাদের জন্য এখানে রক্তপাত করা হারাম। এখানকার গাছ কাটা এবং ঘাস উপড়ানোও হারাম। আমার আগে কাউকে এর অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমার পরবর্তীদের জন্যও এটা বৈধ নয়। এখানকার মুশরিকদের অপরাধের শাস্তি হিসেবে কিছু সময়ের জন্য আমাকে এ অঞ্চলের বৈধতা দান করা হয়েছে। অতঃপর পূর্বেকার মতো আগামীতেও এই বিধান বলবৎ থাকবে। তোমাদের মধ্যে যারা উপস্থিত রয়েছে, তারা যেন অনুপস্থিত সবাইকে জানিয়ে দেয়। কেউ যদি তোমাদের বলে, নবীজি সা. এখানে কাফেরদের হত্যা করেছিলেন, জবাবে তোমরা বলবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার রসূলের জন্য তা বৈধ করেছিলেন। পরে আর কারো জন্য এটা বৈধ নয়।
হে খুযাআ গোত্রের লোকেরা! তোমরা হত্যা থেকে নিজেদের হাত গুটিয়ে ফেলো। যে লোককে তোমরা হত্যা করেছো, আমি তার রক্তপণ আদায় করে দেবো। আজকের পর কাউকে হত্যা করা হলে নিহত ব্যক্তির পরিবারের জন্য দুটি অধিকার থাকবে; একটি হলো, প্রতিশোধ হিসেবে হত্যাকারীকে হত্যা করা, আরেকটি হচ্ছে, রক্তপণ নেওয়া।
নবীজির সাধারণ ক্ষমা মক্কাবাসীদের অন্তরে তোলপাড় সৃষ্টি করে। তারা প্রভাবিত হয় নবীজির মহানুভবতায়। মক্কার নারী-পুরুষ দলে দলে ইসলামে দীক্ষিত হয়। আর এভাবেই আল্লাহর নেয়ামত পূর্ণতা পায়।
রসূলুল্লাহ সা. শিশু-বৃদ্ধ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার বায়আত নেন। সাফা পাহাড়ে আল্লাহর রসূল সা. তাদের বায়আত নেওয়া শুরু করেন। প্রথমে পুরুষদের বায়আত নেন। এই বায়আত ছিল ইসলামের বিধান পালন, আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্যের ব্যাপারে। মুজাশি রা. বলেন, মক্কা বিজয়ের পর আমি আমার ভাই (মুজালিদ)-কে নিয়ে রসূল সা.-এর কাছে এসে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি আমার ভাইকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি যেন আপনি তার নিকট হতে হিজরত করার ব্যাপারে বায়আত গ্রহণ করেন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, (মক্কা বিজয়ের পূর্বে মক্কা থেকে মদীনায়) হিজরতকারীরা হিজরতের সমুদয় বরকত নিয়ে গেছে। আমি বললাম, তা হলে কোন্ বিষয়ের ওপর আপনি তার নিকট হতে বায়আত গ্রহণ করবেন? তিনি বললেন:
أبايعه على الإسلام والإيمان والجهاد
আমি তার নিকট হতে বায়আত গ্রহণ করবো ইসলাম, ঈমান ও জিহাদের ওপর。
ইমাম বুখারী হতে বর্ণিত, রসূল সা. মক্কা বিজয়ের দিন বলেছিলেন, ‘(মক্কা) বিজয়ের পর আর হিজরত নেই; বরং রয়েছে কেবল জিহাদ ও নিয়‍্যাত। যখন তোমাদের জিহাদের ডাক দেওয়া হয়, তখন বেরিয়ে পড়ো。
এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের যে বিধান مسلمانوں জন্য আবশ্যক ছিল, মক্কা বিজয়ের পর তা রহিত হয়ে গেছে। এর কারণ হচ্ছে, মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম শক্তি ও মর্যাদা লাভ করেছে। ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে অসংখ্য মানুষ। কিন্তু দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামের দিকে হিজরত করা বা যেখানে দীনি বিষয়াদি যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব নয়, সেখান থেকে নিরাপদ এলাকায় হিজরতের বিধান কেয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে। তবে মর্যাদার ক্ষেত্রে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সাথে অন্য হিজরত তুলনীয় হবে না।
অনুরূপভাবে যারা মক্কা বিজয়ের পর কেয়ামত পর্যন্ত জিহাদ ও আল্লাহর পথে জীবন ও সম্পদ ব্যয় করেছেন বা করবেন তারা কখনো মক্কা বিজয়ের পূর্বে যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করেছেন এবং যারা জিহাদ করেছেন তাদের সমমর্যাদার হবেন না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
وَمَا لَكُمْ أَلَّا تُنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا يَسْتَوِي مِنْكُمْ مَنْ أَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُولَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِنْ الَّذِينَ أَنْفَقُوا مِنْ بَعْدُ وَقَاتَلُوا وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করছ না? অথচ আসমানসমূহ ও জমিনের উত্তরাধিকারতো আল্লাহরই? তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে এবং যুদ্ধ করেছে তারা সমান নয়। তারা মর্যাদায় তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যারা পরে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ প্রত্যেকের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবগত।
পুরুষদের থেকে বায়আত নেয়ার পর তিনি মহিলাদের থেকে বায়আত গ্রহণ করেন। মহিলাদের দলে হিন্দ বিনতে উতবাও ছিলেন। হামযার প্রতি তার আচরণের কারণে লজ্জিত হয়ে অবগুণ্ঠন টেনে তিনি তথায় উপস্থিত হন। ওই ঘটনার কারণে রসূলুল্লাহ সা. তাকে পাকড়াও করতে পারেন বলে তিনি আশংকা করছিলেন। বায়আতের উদ্দেশ্যে নারীরা রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এলে তিনি বলেন, 'তোমরা আমার নিকট এই মর্মে বায়আত গ্রহণ করো যে, আল্লাহর সাথে অন্য কিছুকে শরীক করবে না। চুরি করবে না।'
হিন্দ বললেন, আবু সুফিয়ান কৃপণ ব্যক্তি। আমি আবু সুফিয়ানের মাল- সম্পদ না বলে নিলে কি সমস্যা হবে? রসূল সা. বললেন, তার সম্পদ থেকে তোমার এবং তোমার সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ হয় এই পরিমাণ সম্পদ নিতে পারো। যখন রসূল সা. এই মর্মে শপথ করাচ্ছিলেন যে, 'ব্যভিচার করবে না।' হিন্দ বলে উঠলেন, কোনো স্বাধীন নারী কি ব্যভিচার করতে পারে? রসূল সা. তাকে চিনতে পারলেন এবং বললেন, নিশ্চয়ই তুমি হিন্দ বিনতে উতবাহ। তিনি বললেন, হ্যাঁ। আপনি আমাকে পূর্বের অপরাধের জন্য ক্ষমা করে দিন! আল্লাহ আপনার মঙ্গল করবেন। অতঃপর আল্লাহর রসূল সা. তাকে ক্ষমা করে দেন।
আল্লাহর রসূল সা. নারীদের বায়আত کرানোর ক্ষেত্রে তাদের হাতে স্পর্শ করেননি। তিনি কখনো নিজের নিকটাত্মীয় বা স্ত্রীগণ ব্যতীত অন্য কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেননি। সহীহাইনে এসেছে: আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! রসূল সা.-এর হাত কখনো কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রসূল সা. নারীদের শুধু কথার মাধ্যমে বায়আত করাতেন এবং তিনি এই কথা বলতেন, একজন নারীর জন্য আমার বক্তব্য শত নারীর জন্য আমার বক্তব্যের মতো।

টিকাঃ
১২৪০. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫১।
১২৪১. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫৬।
১২৪২. সহীহ বুখারী: ৪৩০৫।
১২৪৩. সহীহ বুখারী: ২৭৮৩।
১২৪৪. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫৭।
১২৪৫. সূরা হাদীদ: আয়াত ১০।
১২৪৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩১৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00