📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বিশিষ্ট সাহাবাদের মাঝে দায়িত্ব বন্টন

📄 বিশিষ্ট সাহাবাদের মাঝে দায়িত্ব বন্টন


যিতুয়া নামক এলাকায় পৌঁছার পর রসূলুল্লাহ সা. বিশিষ্ট সাহাবাদের মাঝে দায়িত্ব বণ্টন করেন। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-কে ডানদিকের বাহিনী এবং যুবায়ের রা.-কে বাম দিকের বাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত করেন। পদাতিক বাহিনীর নেতৃত্ব অর্পণ করেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা.-এর ওপর।

অতঃপর রসূল সা. আবু হুরায়রা রা.-কে আনসার সাহাবীগণকে ডেকে আনতে পাঠান। তারা এলে নবীজি তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, হে আনসাররা! তোমরা কি কুরায়েশদের আবাধ্যতা দেখেছো? তারা বললেন, জি, দেখেছি। নবীজি বললেন, যদি আগামীকালও তোমরা তাদের মধ্যে তা দেখতে পাও তাহলে পরিপূর্ণভাবে দমন করবে। আগামীকাল সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী অঞ্চল তোমাদের দায়িত্বে থাকবে।

রসূলুল্লাহ সা. যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা.-কে মুহাজির ও তাদের অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন, তোমরা মক্কার ঊর্ধ্বঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করবে। মক্কার গোরস্তানের পার্শ্ববর্তী একটি এলাকার নাম হাজুন। হাজুনে মুসলিম বাহিনীর পতাকা স্থাপন করে তাদেরকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখানেই অপেক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-কে কুযাআ, সুলাইম ও অন্য কয়েকটি গোত্রের বাহিনী নিয়ে মক্কার নিম্নাঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে মুসলিম বাহিনীর পতাকা সেই অঞ্চলে অবস্থিত লোকালয়ে স্থাপনের নির্দেশ দেন। অন্যদিকে সাআদ ইবনে উবাদা রা.-কে আল্লাহর রসূলের অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে আনসারদের নেতৃত্ব দিয়ে পাঠান। তিনি তাদের সংযমী থাকতে বলেন এবং আক্রমণের আগ পর্যন্ত নিজেদের পক্ষ থেকে আক্রমণ না করার নির্দেশ দেন। এভাবে প্রতিটি বাহিনীকেই নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কারা কোথায় অবস্থান করবে তাও বলে দেওয়া হয়।

মুসলিম মুজাহিদরা একযোগে একই সময়ে মক্কার চারদিক থেকে শহরে প্রবেশ করে। এই বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সাহস কারো ছিল না। এটা ছিল মক্কার মুশরিকদের ওপর মারাত্মক আঘাত। এক্ষেত্রে রসূল সা. অত্যন্ত দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। ফলে মুশরিকরা কোনো ধরনের প্রতিরোধের সুযোগ পায়নি। মুজাহিদ বাহিনী নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছে যায় বিনা রক্তপাতে। অবশ্য খালেদ ইবনে ওয়ালিদের বাহিনী কিছুটা প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছিল।

সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, ইকরামা ইবনে আবু জেহেল ও সুহাইল ইবনে আমরের নেতৃত্বে কুরায়েশের একদল উগ্রপন্থী মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সেই ক্ষুদ্র চেষ্টা পণ্ড করে দেন। তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

বনু বকর গোত্রের হিমাস ইবনে খালেদের ঘটনা ইতিহাস-গ্রন্থাদিতে উদ্ধৃত রয়েছে। মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সে তার অস্ত্রে শান দিতে শুরু করে। তা দেখে তার স্ত্রী তাকে বলে, এসব প্রস্তুত করা হচ্ছে কিসের জন্য? জবাবে সে বলে, মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীদের জন্য। তার স্ত্রী তাকে বলে, আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীদের মুকাবিলায় তুমি কিছু করতে পারবে বলে তো আমার মনে হয় না। হিমাস বলে, আল্লাহর কসম! আমি তো আশা করছি তাদের কাউকে অবশ্যই তোমার সামনে হাজির করতে পারবো। তারপর সে কবিতায় বললো:
আজ যদি তারা মুকাবিলার জন্যে এগিয়ে আসে তবে কোনো পরোয়া করি না। কেননা আমার কাছে রয়েছে বর্শা ও দু'ধারী তরবারি যা শত্রু বধ করতে দ্রুত কার্যকর।

মক্কা বিজয়ের দিন এসব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সে ইকরামার লোকদের সাথে মিলে মুসলমনদের প্রতিরোধ করতে যায়। পরে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে হিমাস পালিয়ে বাড়িতে চলে যায় এবং ঘরে প্রবেশ করে স্ত্রীকে ডেকে বলে, ঘরের দরজা বন্ধ করে দাও। স্ত্রী তাকে বললো, তোমার সেই বাহাদুরীর কথা গেল কোথায়? হিমাস তখন কবিতায় বলে:
إنك لو شهدت يوم الخندمه إذ فر صفوان وفر عكرمه وأبو يزيد قائم كالموتمه واستقبلتهم بالسيوف المسلمه
يقطعن كل ساعد وجمجمه ضربا فلا يسمع إلا غمغمه لهم نهيت خلفنا وهمهمه لم تنطقي في اللوم أدنى كلمه
ওহে! তুমি যদি খানদামার যুদ্ধে উপস্থিত থাকতে, তবে সাফওয়ান ও ইকরামার পলায়নের অবস্থা দেখতে পেতে। সেদিন আবু ইয়াযীদ (সুহাইল) স্তম্ভের ন্যায় দাঁড়িয়েছিল। আমি তাদের মুকাবিলা করেছি অনুগত তরবারি দ্বারা। তরবারিগুলো হাতের কব্জি ও মাথার খুলি ছেদন করে যাচ্ছিলো। যুদ্ধের ঘনঘটায় গুমগুম আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিলো না। তাদের রণ-হুংকারে আমি দূরে পশ্চাতে ফিরে আসি। তুমি যদি ওসব দেখতে তবে তিরস্কারমূলক একটি কথাও বলতে না।

রক্তপাত ও মুখোমুখি সংঘর্ষ ছাড়া মুসলমানরা যেন মক্কায় প্রবেশ করতে পারে, এ লক্ষ্যে মুসলিম মুজাহিদরা আগে থেকেই সাধারণ নাগরিকদের চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিল, 'যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। যে ব্যক্তি নিজের বাড়ির দরজা বন্ধ করে রাখবে সেও নিরাপদ থাকবে। যে ব্যক্তি মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে তাকেও কিছু বলা হবে না।'

রসূলুল্লাহ সা. আবু সুফিয়ানকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিলেন; যেন তিনি স্বেচ্ছায় সবাইকে নিজ ঘরে প্রবেশ করতে সহযোগিতা করেন। সবাইকে নিরাপদ অবস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

আবু সুফিয়ান ঘোষণা করে দিলেন, হে কুরায়েশগণ, মুহাম্মাদ এমন এক বাহিনী নিয়ে এসেছেন যার মুকাবিলা করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। এখন আবু সুফিয়ানের বাড়ীতে যে আশ্রয় নেবে তার ভয় নেই।
এই সময় উতবার কন্যা হিন্দ আবু সুফিয়ানের কাছে গিয়ে তার গোঁফ টেনে ধরে বললেন, হে কুরায়েশগণ, এই মোটা পেটুককে হত্যা করো। জাতির নেতৃত্বের মর্যাদায় থেকে সে কলঙ্কিত হয়েছে। আবু সুফিয়ান বললেন, তোমাদের বিপর্যয় সম্পর্কে সাবধান হও। এই নারীর কথায় তোমরা বিপথগামী হয়ো না। তোমাদের ওপর এক অপ্রতিরোধ্য বাহিনী সমাগত। এমতাবস্থায় আমার বাড়িতে যে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ থাকবে।

সবাই বললো, তোমার ওপর অভিসম্পাত! তোমার বাড়িতে কি আমাদের সবার জায়গা হবে? আবু সুফিয়ান বললো, যে ব্যক্তি নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকবে এবং যে ব্যক্তি হারামে প্রবেশ করবে সেও নিরাপদ থকবে। লোকেরা সবাই যার যার বাড়ীতে অথবা হারামে চলে গেলো।

রসূল সা.-এর ইচ্ছা ছিল হাসান ইবনে সাবিত রা. কুরায়েশদের নিন্দা করে যে কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন সে অনুযায়ী মুসলিম বাহিনী মক্কার উঁচু অঞ্চল দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করুক। হাসসান ইবনে সাবিত রা.-এর সে কবিতাটি ছিল তার শ্রেষ্ঠতম কবিতা:
عدمنا خيلنا إن لم تروها تثير النقع موعدها كداء يبارين الأسنة مصعدات على أكتافها الأسل الظماء تظل جيادنا متمطرات تلطمهن بالخمر النساء فإما تعرضوا عنا اعتمرنا وكان الفتح وانكشف الغطاء وإلا فاصبروا الجلاد يوم يعز الله فيه من يشاء وجبريل أمين الله فينا وروح القدس ليس له كفاء وقال الله: قد أرسلت عبدا يقول الحق إن نفع البلاء شهدت به فقوموا صدقوه فقلتم: لا نقوم ولا نشاء وقال الله: قد يسرت جندا هم الأنصار عرضتها اللقاء لنا في كل يوم من معد سباب أو قتال أو هجاء فنحكم بالقوافي من هجانا ونضرب حين تختلط الدماء ألا أبلغ أبا سفيان عني فأنت مجوف نخب هواء وأن سيوفنا تركتك عبدا وعبد الدار سادتها الإماء كأن سبيئة من بيت رأس تعفيها الروامس والسماء هجوت محمدا فأجبت عنه وعند الله في ذاك الجزاء
اتهجوه ولست له بكفء فشركما لخيركما الفداء هجوت مباركا برا حنيفا أمين الله شيمته الوفاء فمن يهجو رسول الله منكم ويمدحه وينصره سواء فإن أبي ووالده وعرضي لعرض محمد منكم وقاء فإما تثقفن بنو لؤي جذيمة إن قتلهم شفاء أولئك معشر نصروا علينا ففي أظفارنا منهم دماء وحلف الحارث بن أبي ضرار وحلف قريظة منا براء لساني صارم لا عيب فيه وبحري لا تكدره الدلاء
আমাদের অশ্বারোহী বাহিনী থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি, যা ধুলা উড়িয়ে ছোটে এবং যার গন্তব্য হলো কা'দা (মক্কার উচ্চভূমি), জানি না তোমরা তা দেখেছো কিনা। যে বাহিনী লাগাম নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয় (কে আগে সওয়ার হবে সে জন্য) এবং যে বাহিনীর ঘাড়ের ওপর রক্তপিপাসু বর্শা রয়েছে। আমাদের ঘোড়াগুলো অতি দ্রুতবেগে ছোটে। নারীরা ওড়না দিয়েও তাকে হাঁকিয়ে নিতে পারে। তোমরা যদি আমাদের বাধা না দাও তাহলে আমরা ওমরা করবো; অবশ্য বিজয় অবধারিত হয়ে আছে এবং সমস্ত পর্দা ছিন্ন হয়ে গেছে। অন্যথায় ভবিষ্যতের কোনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। আল্লাহর দূত জিবরীল আমাদের মধ্যে রয়েছেন। তিনি পরম পবিত্র আত্মা যার সমতুল্য কেউ নেই। আল্লাহ বলেন যে, এমন এক বান্দাকে আমি পাঠিয়েছি যিনি বিপদ আপদে উপকারী হক কথা বলে থাকেন। আমি তার কার্যকলাপের সাক্ষী। তোমরা তাকে মেনে নাও। কিন্তু তোমরা জবাব দিলে, আমরা তাকে মানবো না, মানবার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। আল্লাহ আরো বললেন, আমি আনসার বাহিনীকে পাঠিয়ে দিয়েছি, তাদের লক্ষ্য হলো যুদ্ধ। আমাদের কিছু না কিছু মুকাবিলা করতে হয়-কখনো গালাগলি, কখনো যুদ্ধ, কখনো তিরষ্কার। যারা তিরষ্কার বা গালাগালি করে, তাদেরকে ছন্দবদ্ধ ভাষায় দাঁতভাঙ্গা জবাব দিই, আর যারা আমাদের রক্তপাতে লিপ্ত হয় তাদের ওপর আঘাত হানি। আবু সুফিয়ানকে জানিয়ে দাও আমাদের মক্কায় প্রবেশের সময় আসন্ন। আর এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আমাদের তরবারী তোমাকে এবং আবদুদ দার গোত্রের সরদারদেরকে দাস বানিয়ে ছেড়েছে। তুমি মুহাম্মাদকে গালাগালি করেছো। আমি শুধু জবাব দিয়েছি এবং আল্লাহর কাছে এর প্রতিদান রয়েছে। তুমি এক পরম কল্যাণময় পরোপকারী ও একনিষ্ঠ সত্যপন্থীকে গালাগালি করেছো। যিনি আল্লাহর পরম বিশ্বস্ত এবং ওয়াদা পূর্ণ করা যার জীবনের ব্রত। যে ব্যক্তি আল্লাহর রসূলকে গালাগাল করে আর যে ব্যক্তি তাঁর প্রশংসা করে ও সাহায্য করে, সে কি সমান হতে পারে? বস্তুত আমার পিতা, দাদা এবং আমার সম্ভ্রমের বিনিময়ে মুহাম্মাদের সম্ভ্রম তোমাদের হাত থেকে রক্ষা করবো। আমার কথা অকাট্য এবং নির্দোষ। আমার সমুদ্র কয়েক বালতি পানি দিয়ে কলুষিত করা সম্ভব নয়。

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত রয়েছে, মক্কা বিজয় অভিযানে আল্লাহর রসূল সা. মুসলমান নারীদের দেখেন তারা অশ্বগুলোর চেহারায় নিজেদের উড়না দিয়ে আঘাত করছে। তিনি হাসিমুখে আবু বকরের দিকে তাকিয়ে বলেন, হে আবু বকর, এটি যেন হাসসান ইবনে সাবেতের ওই কবিতার মতো যেখানে সে বলেছিল:
تظل جيادنا متمطرات تلطمهن بالخمر النساء আমাদের ঘোড়াগুলো অতি দ্রুতবেগে ছোটে। নারীরা ওড়না দিয়েও তাকে হাঁকিয়ে নিতে পারে।

টিকাঃ
১২০৭. মুইনুস সিরাত: ৩৮৯।
১২০৮. সহীহ মুসলিম: ১৭৮০।
১২০৯. মুঈনুস সীরাহ : ৩৯০।
১২১০. মুঈনুস সীরাহ : ৩৯০।
১২১১. সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মদীনা: ৩৯৭।
১২১২. কিয়াদাতুর রসূল আসসিয়াসিয়াহ ওয়াল আসকারীয়াহ: ১২২-১২৩।
১২১৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩৯৫।
১২১৪. দিরাসাহ ফিস সীরাহ: ২৪৫।
১২১৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৯০।
১২১৬. সহীহ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ: ৫২৪।
১২১৭. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/৩০৯।
১২১৮. ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ২/৮৩১।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 অবনত মস্তকে মক্কায় প্রবেশ

📄 অবনত মস্তকে মক্কায় প্রবেশ


মক্কা বিজয়ের দিন কালো পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় ইহরাম ব্যতীতই রসূল সা. মক্কায় প্রবেশ করেন। রসূলুল্লাহ সা. মক্কায় এভাবে প্রবেশ করেন যে, তার মস্তক আনুগত্য ও বিনয়াধিক্যে একেবারে ঝুঁকে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিলো তার চিবুক বুঝি উটনীর কুঁজ স্পর্শ করবে। মক্কায় প্রবেশকালে তিনি সূরা ফাতহ পড়ছিলেন।
বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশকালে (যা ছিল আরব উপদ্বীপের হৃৎপিণ্ড বিশেষ এবং এর আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র) ন্যায়বিচার ও সাম্য, বিনয় ও আনুগত্যের এমন কোনো নীতি ছিল না যা তিনি অবলম্বন করেননি। তার মুক্ত দাস হযরত যায়েদ পুত্র উসামা রা.-কে এ সময় তিনি তার বাহনে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। বনী হাশিম ও কুরায়েশ বংশীয় কোনো সাহাবীর এই সৌভাগ্য হয়নি। দিনটি ছিল ২১ শে রমযান শুক্রবার।

নবীজি সা. সেদিন কীভাবে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে মুহাম্মাদ গাযালী বলেন, বিজয়ী সৈন্যরা দলে দলে এগিয়ে যাচ্ছিলো। রসূল সা. তখন তার বাহনে কালো পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় মাথা নিচু করে বসেছিলেন। আল্লাহর ভয়ে তার মাথা অবনত হয়ে আসছিল। তিনি তার বাহনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বিনয়ে তিনি নুয়ে যাচ্ছিলেন। অসংখ্য জনতা সেদিন তার একটি আদেশের অপেক্ষায় ছিল।
এই বিরাট বিজয়ে তার মানসপটে ভেসে ওঠে অতীত স্মৃতি। যেদিন তিনি মক্কা থেকে বিতাড়িত হয়ে বের হন, সেদিনের কথা মনে পড়ে তার। বহু পথ পাড়ি দিয়ে সেদিন তিনি প্রিয় জন্মভূমি মক্কায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। রবের করুণায় তিনি ছিলেন মহা সৌভাগ্যবান। আল্লাহর অপার দয়ার কথা মনে করেই তিনি বিনীতভাবে মাথা নুইয়ে রাখেন।

রসূলুল্লাহ সা. মক্কা বিজয়ের পর মক্কার নিরাপত্তা বহাল রাখার নিমিত্তে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। এ প্রেক্ষিতে আমরা দেখতে পাই, যখন তিনি আবু সুফিয়ানকে লক্ষ্য করে সাআদ ইবনে ওবাদা রা.-এর এই উক্তি শুনতে পান, 'আজ প্রচণ্ড লড়াইয়ের দিন। আজ রক্তপাতের দিন। আজ কা'বার সীমানায়ও রক্তপাত বৈধ হবে। আজ আল্লাহ তাআলা কুরায়েশদের অপমানিত করেছেন।' নবীজি সা. বললেন, 'আজ দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শনের দিন। আজ আল্লাহ তাআলা কুরায়েশকে সম্মানিত করবেন এবং কা'বার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।'
তিনি হযরত সাআদ রা.-কে ডেকে পাঠালেন এবং তার হাত থেকে ইসলামের পতাকা নিয়ে তার ছেলে কায়েস ইবনে সা'দ রা.-এর হাতে তুলে দিলেন। অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নবীজি সা. অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত এড়াতে চেয়েছেন। আর এটি করতে গিয়ে আল্লাহর রসূল সা. সা'দ বা তার গোত্রকে হতাশ করেননি। পিতার পরিবর্তে তার ছেলেকে নেতৃত্ব দিয়ে আবু সুফিয়ানের আহত অন্তরকে প্রবোধ দিলেন। অন্যদিকে, সাআদ ইবনে উবাদা রা.-কেও নবীজি সা. বিষণ্ণ ও মনঃক্ষুণ্ণ দেখতে চাইছিলেন না যিনি ইসলামের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন।

রসূলুল্লাহ সা. যখন মক্কায় অবতরণ করলেন এবং লোকেরা কিছুটা শান্ত হলো, তখন তিনি বায়তুল্লাহর দিকে রওনা হলেন এবং বায়তুল্লাহর চারদিকে তাওয়াফ করলেন। এ সময় তার হাতে একটি ধনুক ছিল। কা'বা শরীফে ছিল তিনশো ষাটটি মূর্তি। তিনি ধনুকের সাহায্যে মূর্তিগুলোর দিকে খোঁচা দিচ্ছিলেন আর বলছিলেন:
جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا
হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।
جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيدُه
সত্য এসেছে এবং বাতিল কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, আর কিছু পুনরাবৃত্তিও করতে পারে না।
তিনি এ কথা বলছিলেন আর একটি একটি করে মূর্তি মুখ থুবড়ে পড়ছিল।

নবীজি সা. কা'বা শরীফের দেওয়ালে বেশ কিছু ছবি টাঙানো দেখতে পান। তার নির্দেশে সেগুলো নামিয়ে ফেলা হয় এবং চূর্ণবিচূর্ণ করা হয়। এসব ছবি বায়তুল্লাহর ভেতর থেকে বের করা ছাড়া তিনি বায়তুল্লাহয় প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানান। সেগুলো ছিল কাফেরদের ধারণা অনুযায়ী ইবরাহীম ও ইসমাইল আ.-এর ছবি। তাদের হাতে ভাগ্যনির্ধারণী তীর আছে এমন দৃশ্য সেইসব ছবিগুলোতে ছিল। এগুলো দেখে রসূল সা. বলেন, আল্লাহ মুশরিকদের ধ্বংস করুন। তারা অবশ্যই জানে ইবরাহীম ও ইসমাইল আ. কক্ষণো তীর দিয়ে ভাগ্য নির্ণয় করেননি।

অতঃপর আল্লাহর রসূল সা. বায়তুল্লাহর ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে তাকবিরধ্বনি দেন এবং নামায আদায় করেন। ওমর রা. হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, রসূল সা. যখন কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিলেন তখন সেখানে উসামা, বেলাল ও ওসমান ইবনে তালহা রা. অবস্থান করছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. সেখানে পৌছলে কাবার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তিনি কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, আমি বেলাল রা.-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বায়তুল্লাহর অভ্যন্তরে রসূল সা. কী করেছেন? তিনি আমাকে জানান যে, রসূল সা. বায়তুল্লাহর অভ্যন্তরে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করেছেন। তিনি এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, যেখানে তার বাম দিকে দুটি খুঁটি, ডানদিকে একটি খুঁটি পেছন দিকে তিনটি খুঁটি ছিল। সে সময় বায়তুল্লাহর ভেতর ছয়টি খুঁটি ছিল।

ইসলামগ্রহণের আগে ওসমান ইবনে তালহার কাছে বায়তুল্লাহর চাবি থাকতো। রসূলুল্লাহ সা. মসজিদুল হারামে অবস্থানকালে তার কাছে আলী ইবনে আবু তালিব এলেন। তার হাতে ছিল কা'বার চাবি। তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! হাজীদের আপ্যায়নের পাশাপাশি কা'বার দ্বার রক্ষকের দায়িত্বও আমাদের হাতে নিয়ে নিন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, ওসমান ইবেন তালহা কোথায়? ওসমানকে ডাকা হলো। তিনি বললেন, হে ওসমান! এই নাও তোমার চাবি। আজকের দিন সৌজন্য ও হৃদ্যতা প্রদর্শনের দিন।

রসূলুল্লাহ সা. হিজরত করে যাবার আগে একবার ওসমান ইবনে তালহার কাছে বায়তুল্লাহর চাবি চেয়েছিলেন। তখন ওসমান ইবনে তালহা নবীজির সাথে মন্দ আচরণ করেছিল। কিন্তু তার পরিবর্তে রসূল সা. আজ তার সাথে সদাচরণ করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। শুধু তাই নয়, রসূল সা. তাকে বলেন, হে ওসমান, আজ তুমি দেখেছো বায়তুল্লাহর এই চাবি আমার হাতে এসেছে, আমি যাকে ইচ্ছা তাকে দিতে পারি। জবাবে সে বলে, আজ অবশ্যই কুরায়েশরা ধ্বংস ও লাঞ্ছিত হয়েছে। রসূল সা. তাকে বলেন, না, বরং তারা আজ আরও সম্মানিত ও মর্যাদাবান হয়েছে। নবীজির একথায় ওসমান ইবনে তালহা কিছুটা আশাবাদী হয়ে ওঠেন। যেহেতু রসূল সা. তাকে এই বলে চাবি ফেরত দিয়েছিলেন যে, এই নাও তোমার চাবি, হে ওসমান। আজ সদাচরণ ও ওয়াদা রক্ষার দিন। এই নাও চাবি। এ চাবি এখন থেকে তোমার কাছেই থাকবে আর একমাত্র জালিম ছাড়া অন্য কেউ এ চাবি তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে না।

রসূলুল্লাহ সা. নিজে কাবার চাবি দখল করে রাখতে চাননি। নিজের বংশ বনু হাশিমের অনেকে এর প্রতি আগ্রহ দেখালেও তিনি সেদিকে কর্ণপাত করেননি। স্বাভাবিকভাবেই কাবার চাবির অধিকার পাওয়া মর্যাদার একটি ব্যাপার ছিল। কিন্তু নবুওয়াতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এটি ছিল না। প্রিয়নবীর কাছে সত্য ও কল্যাণকর কাজই ছিল মর্যাদার ও শ্রেষ্ঠত্বের। তার শত্রুরাও তার কাছ থেকে এমন আচরণই পেয়েছে।

রসূল সা. বেলালকে বায়তুল্লাহর ছাদে উঠে যোহরের আযান দিতে বলেন।
বেলাল ছাদে উঠে যোহরের নামাযের আযান দেন। নিস্তব্ধ মক্কাবাসী নতুন ইবাদতের আহ্বান যেন মোহাবিষ্ট হয়ে শুনছিল। গোটা মক্কায় গুঞ্জরিত হচ্ছিলো এ আযানের ধ্বনি। নিশ্চই শয়তান সেদিন ভীষণ ক্ষিপ্ত ছিল। সে তার অনুসারীদের নিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে পালাচ্ছিলো। আল্লাহ মহান আল্লাহ মহান।

যে বেলাল চাবুকের আঘাত খেতে খেতে কেবল 'আহাদ আহাদ' বলে চিৎকার করতেন, সেদিন দীপ্তিময় কণ্ঠে সেই তিনি বায়তুল্লাহর ছাদে উঠে ঘোষণা করছিলেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ' আর মক্কার সব মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই আযানের মধুর কলতান শুনছিল।

টিকাঃ
১২১৯. সহীহ মুসলিম: ১৩৫৮।
১২২০. আস সীরাতুন নববিয়্যাহ লিননদবী: ৩৩৭।
১২২১. ফিকহুস সীরাহ লিলগাজালি: ৩৭৯-৩৮০।
১২২২. কিয়াদাতুর রসূল আসসিয়াসিয়াহ ওয়াল আসকারীয়াহ: ১৯৬।
১২২৩. সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত ৮১।
১২২৪. সুরা সাবা ৪৯।
১২২৫. আস সীরাতুন নববিয়‍্যাহ লিননদবী: ৩৩৯।
১২২৬. আস সীরাতুন নববিয়‍্যাহ লিননদবী: ৩৩৯।
১২২৭. সহীহ বুখারী: ৪২৮৮।
১২২৮. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/৬১-৬২।
১২২৯. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/৬১।
১২৩০. আল মাগাযী: ২/৮৩৮।
১২৩১. আল মাগাযী: ২/৮৩৮।
১২৩২. সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মদীনা: ৪০১।
১২৩৩. ফিকহুস সীরাহ লিলগাযালী: ৩৮৩।
১২৩৪. ফিকহুস সীরাহ লিলবুতী: ২৬৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা

📄 সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা


ক. মক্কা বিজয়ের দিন মক্কার অধিবাসীরা সাধারণ ক্ষমা লাভ করে। অথচ তারা ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই রসূল সা. ও দীনি দাওয়াতের প্রতি জঘন্যতম আচরণ করে আসছিল। চাইলেই মুসলিম মুজাহিদরা তাদের নির্মূল করতে পারতো। কিন্তু না, নবীজি সেদিন দেখালেন ক্ষমার এক অতুল দৃষ্টান্ত। মুশরিকরা যা কল্পনাই করতে পারেনি। নবীজি সা. তাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি তোমাদের সাথে কী আচরণ করবো বলে তোমরা ধারণা করো? জবাবে তারা বললো, হে সম্মানিত ভাই! আমরা কল্যাণের আশা করি। দয়ার নবী তাদের আশ্বস্ত করে বললেন,
لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ
আজ তোমাদের উপর কোনো ভৎর্সনা নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। '

সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে মক্কার মুশরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল। তাদেরকে হত্যা করা হয়নি। কাউকে বন্দীও করা হয়নি। তাদের সম্পদ ও ভূখণ্ডের মালিকানা তাদের হাতেই ছিল। পরিবর্তে তাদের ওপর কোনো ট্যাক্সও ধার্য করা হয়নি। অন্যান্য যেসব ভূখণ্ড যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানদের হাতে এসেছিল, সেসব ক্ষেত্রে এমন আচরণ করা হয়নি। কেননা, মক্কা মর্যাদাপূর্ণ ভূমি। মক্কায় মহান আল্লাহর ইবাদত করা হয়। পবিত্র কা'বার অবস্থান মক্কায়।
এ প্রেক্ষিতে জামহুর ইমামগণের মতে, মক্কার ভূমি বিক্রি করা বা মক্কায় অবস্থিত বাসস্থান ভাড়া দেওয়া নাজায়েয। সেখানকার অধিবাসীদের জন্য যতটুকু প্রয়োজন তাতে তারা বসবাস করবে। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত জায়গাগুলোতে আল্লাহর ঘরের মেহমান তথা হজ ও উমরাকারীরা এসে থাকবে। পক্ষান্তরে কিছু কিছু আলেমের উক্তি হচ্ছে, পৃথিবীর অন্যান্য নগরীর মতো মক্কা নগরীর ভূখণ্ড বিক্রি করা এবং সেখানকার ঘর ভাড়া দেওয়া জায়েয। দলিল-প্রমাণের আলোকে এই পক্ষের বক্তব্য শক্তিশালী। অন্য পক্ষ অর্থাৎ যারা নাজায়েয বলে মত দিয়েছেন, তাদের প্রমাণসমূহ মুরসাল ও মাওকূফ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।

খ. যারা সাধারণ ক্ষমা পায়নি
দয়ার পাশাপাশি কঠোরতাও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্য জরুরি। মক্কা বিজয়ের পরে রসূল সা. প্রায় দশজন ব্যক্তিকে সাধারণ ক্ষমার আওতার বাইরে রাখেন। তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দেন। কেননা, তাদের অপরাধ ছিল অমার্জনীয়। ইসলাম ও مسلمانوں বিরুদ্ধে তাদের কুকীর্তি ছিল ক্ষমার অযোগ্য। এছাড়া মক্কা বিজয়ের পর তারা মক্কাবাসীদের পুনরায় مسلمانوں বিরুদ্ধে যুদ্ধে উসকানি দেবে এমন আশঙ্কাও ছিল প্রবল। এ কারণে রসূল সা. বলেছেন, যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই তাদের হত্যা করাবে।

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারী গ্রন্থে লিখেন, আমি ক্ষমার অযোগ্য এসব ব্যক্তিদের নাম বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জমা করেছি। তারা হলো : আবদুল উয্যা ইবনে খাতাল, আবদুল্লাহ ইবনে সাআদ ইবনে আবী সারাহ, ইকরামা ইবনে আবু জেহেল, হুয়াইরিস ইবনে নুকাইদ, মুকাইস ইবনে হুবাবাহ, হাব্বার ইবনে আসওয়াদ ও ইবনে খাতালের দুই দাসী ফারতানী ও কারীবা, আবদুল মুত্তালিবের মুক্ত দাসী সারা।
আবু মা'শারের বর্ণনায় ক্ষমার অযোগ্যদের তালিকায় হারেস ইবনে তালাল খুযায়ীর নামও রয়েছে। ইমাম হাকিমের বর্ণনায় ক্ষমার অযোগ্যদের তালিকায় কাআব ইবনে যুহাইর, ওয়াহশী ইবনে হারব ও হিন্দ বিনতে উতবার নামও পাওয়া যায়।

উপরোক্ত তালিকার কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিল। কেউ কেউ নবীজির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে ইসলাম গ্রহণ করে। নবীজি সা. তাদের ক্ষমা করে দেন। পরবর্তীকালে তারা ইসলামী আদর্শে জীবনযাপন করে।

গ. মক্কা বিজয়ের দিন নবীজির ভাষণ ও মক্কাবাসীর ইসলাম গ্রহণ
রসূলুল্লাহ সা. মক্কা বিজয়ের দিন সকালে জানতে পারেন, তার মিত্রপক্ষ বনু খুযাআর লোকেরা জাহেলিয়া যুগে তাদের গোত্রের নিহত এক ব্যক্তির বদলায় হুযাইল গোত্রের এক মুশরিক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। এটা শুনে রসূল সা. রাগান্বিত হন। তিনি ভাষণ দিতে দাঁড়ান এবং বলেন: 'হে জনতা! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সূচনা লগ্ন থেকে মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। আল্লাহর সম্মানে কেয়ামত পর্যন্ত এখানে যাবতীয় হত্যাকাণ্ড হারাম। যারা আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী, তাদের জন্য এখানে রক্তপাত করা হারাম। এখানকার গাছ কাটা এবং ঘাস উপড়ানোও হারাম। আমার আগে কাউকে এর অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমার পরবর্তীদের জন্যও এটা বৈধ নয়। এখানকার মুশরিকদের অপরাধের শাস্তি হিসেবে কিছু সময়ের জন্য আমাকে এ অঞ্চলের বৈধতা দান করা হয়েছে। অতঃপর পূর্বেকার মতো আগামীতেও এই বিধান বলবৎ থাকবে। তোমাদের মধ্যে যারা উপস্থিত রয়েছে, তারা যেন অনুপস্থিত সবাইকে জানিয়ে দেয়। কেউ যদি তোমাদের বলে, নবীজি সা. এখানে কাফেরদের হত্যা করেছিলেন, জবাবে তোমরা বলবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার রসূলের জন্য তা বৈধ করেছিলেন। পরে আর কারো জন্য এটা বৈধ নয়।
হে খুযাআ গোত্রের লোকেরা! তোমরা হত্যা থেকে নিজেদের হাত গুটিয়ে ফেলো। যে লোককে তোমরা হত্যা করেছো, আমি তার রক্তপণ আদায় করে দেবো। আজকের পর কাউকে হত্যা করা হলে নিহত ব্যক্তির পরিবারের জন্য দুটি অধিকার থাকবে; একটি হলো, প্রতিশোধ হিসেবে হত্যাকারীকে হত্যা করা, আরেকটি হচ্ছে, রক্তপণ নেওয়া।

নবীজির সাধারণ ক্ষমা মক্কাবাসীদের অন্তরে তোলপাড় সৃষ্টি করে। তারা প্রভাবিত হয় নবীজির মহানুভবতায়। মক্কার নারী-পুরুষ দলে দলে ইসলামে দীক্ষিত হয়। আর এভাবেই আল্লাহর নেয়ামত পূর্ণতা পায়।

রসূলুল্লাহ সা. শিশু-বৃদ্ধ-নারী-पुरुष নির্বিশেষে সবার বায়আত নেন। সাফা পাহাড়ে আল্লাহর রসূল সা. তাদের বায়আত নেওয়া শুরু করেন। প্রথমে পুরুষদের বায়আত নেন। এই বায়আত ছিল ইসলামের বিধান পালন, আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্যের ব্যাপারে। মুজাশি রা. বলেন, মক্কা বিজয়ের পর আমি আমার ভাই (মুজালিদ)-কে নিয়ে রসূল সা.-এর কাছে এসে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি আমার ভাইকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি যেন আপনি তার নিকট হতে হিজরত করার ব্যাপারে বায়আত গ্রহণ করেন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, (মক্কা বিজয়ের পূর্বে মক্কা থেকে মদীনায়) হিজরতকারীরা হিজরতের সমুদয় বরকত নিয়ে গেছে। আমি বললাম, তা হলে কোন্ বিষয়ের ওপর আপনি তার নিকট হতে বায়আত গ্রহণ করবেন? তিনি বললেন:
أبايعه على الإسلام والإيمان والجهاد
আমি তার নিকট হতে বায়আত গ্রহণ করবো ইসলাম, ঈমান ও জিহাদের ওপর。

ইমাম বুখারী হতে বর্ণিত, রসূল সা. মক্কা বিজয়ের দিন বলেছিলেন, ‘(মক্কা) বিজয়ের পর আর হিজরত নেই; বরং রয়েছে কেবল জিহাদ ও নিয়‍্যাত। যখন তোমাদের জিহাদের ডাক দেওয়া হয়, তখন বেরিয়ে পড়ো。

এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের যে বিধান मुसलमानों জন্য আবশ্যক ছিল, মক্কা বিজয়ের পর তা রহিত হয়ে গেছে। এর কারণ হচ্ছে, মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম শক্তি ও মর্যাদা লাভ করেছে। ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে অসংখ্য মানুষ। কিন্তু দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামের দিকে হিজরত করা বা যেখানে দীনি বিষয়াদি যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব নয়, সেখান থেকে নিরাপদ এলাকায় হিজরতের বিধান কেয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে। তবে মর্যাদার ক্ষেত্রে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সাথে অন্য হিজরত তুলনীয় হবে না।

অনুরূপভাবে যারা মক্কা বিজয়ের পর কেয়ামত পর্যন্ত জিহাদ ও আল্লাহর পথে জীবন ও সম্পদ ব্যয় করেছেন বা করবেন তারা কখনো মক্কা বিজয়ের পূর্বে যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করেছেন এবং যারা জিহাদ করেছেন তাদের সমমর্যাদার হবেন না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
وَمَا لَكُمْ أَلَّا تُنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا يَسْتَوِي مِنْكُمْ مَنْ أَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُولَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِنْ الَّذِينَ أَنْفَقُوا مِنْ بَعْدُ وَقَاتَلُوا وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করছ না? অথচ আসমানসমূহ ও জমিনের উত্তরাধিকারতো আল্লাহরই? তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে এবং যুদ্ধ করেছে তারা সমান নয়। তারা মর্যাদায় তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যারা পরে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ প্রত্যেকের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবগত।

পুরুষদের থেকে বায়আত নেয়ার পর তিনি মহিলাদের থেকে বায়আত গ্রহণ করেন। মহিলাদের দলে হিন্দ বিনতে উতবাও ছিলেন। হামযার প্রতি তার আচরণের কারণে লজ্জিত হয়ে অবগুণ্ঠন টেনে তিনি তথায় উপস্থিত হন। ওই ঘটনার কারণে রসূলুল্লাহ সা. তাকে পাকড়াও করতে পারেন বলে তিনি আশংকা করছিলেন। বায়আতের উদ্দেশ্যে নারীরা রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এলে তিনি বলেন, 'তোমরা আমার নিকট এই মর্মে বায়আত গ্রহণ করো যে, আল্লাহর সাথে অন্য কিছুকে শরীক করবে না। চুরি করবে না।'

হিন্দ বললেন, আবু সুফিয়ান কৃপণ ব্যক্তি। আমি আবু সুফিয়ানের মাল- সম্পদ না বলে নিলে কি সমস্যা হবে? রসূল সা. বললেন, তার সম্পদ থেকে তোমার এবং তোমার সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ হয় এই পরিমাণ সম্পদ নিতে পারো। যখন রসূল সা. এই মর্মে শপথ করাচ্ছিলেন যে, 'ব্যভিচার করবে না।' হিন্দ বলে উঠলেন, কোনো স্বাধীন নারী কি ব্যভিচার করতে পারে? রসূল সা. তাকে চিনতে পারলেন এবং বললেন, নিশ্চয়ই তুমি হিন্দ বিনতে উতবাহ। তিনি বললেন, হ্যাঁ। আপনি আমাকে পূর্বের অপরাধের জন্য ক্ষমা করে দিন! আল্লাহ আপনার মঙ্গল করবেন। অতঃপর আল্লাহর রসূল সা. তাকে ক্ষমা করে দেন।

আল্লাহর রসূল সা. নারীদের বায়আত করানোর ক্ষেত্রে তাদের হাতে স্পর্শ করেননি। তিনি কখনো নিজের নিকটাত্মীয় বা স্ত্রীগণ ব্যতীত অন্য কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেননি। সহীহাইনে এসেছে: আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! রসূল সা.-এর হাত কখনো কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রসূল সা. নারীদের শুধু কথার মাধ্যমে বায়আত করাতেন এবং তিনি এই কথা বলতেন, একজন নারীর জন্য আমার বক্তব্য শত নারীর জন্য আমার বক্তব্যের মতো।

টিকাঃ
১২৩৫. আল মুজতামা আল মাদানী লিলউমরী: ১৭৯।
১২৩৬. আল মুজতামা আল মাদানী লিলউমরী: ১৮০।
১২৩৭. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫১।
১২৩৮. ফাতহুল বারী: ৯/৮।
১২৩৯. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫১।
১২৪০. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫১।
১২৪১. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫৬।
১২৪২. সহীহ বুখারী: ৪৩০৫।
১২৪৩. সহীহ বুখারী: ২৭৮৩।
১২৪৪. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫৭।
১২৪৫. সূরা হাদীদ: আয়াত ১০।
১২৪৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩১৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 যারা সাধারণ ক্ষমা পায়নি

📄 যারা সাধারণ ক্ষমা পায়নি


দয়ার পাশাপাশি কঠোরতাও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্য জরুরি। মক্কা বিজয়ের পরে রসূল সা. প্রায় দশজন ব্যক্তিকে সাধারণ ক্ষমার আওতার বাইরে রাখেন। তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দেন। কেননা, তাদের অপরাধ ছিল অমার্জনীয়। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের কুকীর্তি ছিল ক্ষমার অযোগ্য। এছাড়া মক্কা বিজয়ের পর তারা মক্কাবাসীদের পুনরায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উসকানি দেবে এমন আশঙ্কাও ছিল প্রবল। এ কারণে রসূল সা. বলেছেন, যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই তাদের হত্যা করাবে।

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারী গ্রন্থে লিখেন, আমি ক্ষমার অযোগ্য এসব ব্যক্তিদের নাম বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জমা করেছি। তারা হলো : আবদুল উয্যা ইবনে খাতাল, আবদুল্লাহ ইবনে সাআد ইবনে আবী সারাহ, ইকরামা ইবনে আবু জেহেল, হুয়াইরিস ইবনে নুকাইদ, মুকাইস ইবনে হুবাবাহ, হাব্বার ইবনে আসওয়াদ ও ইবনে খাতালের দুই দাসী ফারতানী ও কারীবা, আবদুল মুত্তালিবের মুক্ত দাসী সারা।
আবু মা'শারের বর্ণনায় ক্ষমার অযোগ্যদের তালিকায় হারেস ইবনে তালাল খুযায়ীর নামও রয়েছে। ইমাম হাকিমের বর্ণনায় ক্ষমার অযোগ্যদের তালিকায় কাআব ইবনে যুহাইর, ওয়াহশী ইবনে হারব ও হিন্দ বিনতে উতবার নামও পাওয়া যায়।

উপরোক্ত তালিকার কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিল। কেউ কেউ নবীজির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে ইসলাম গ্রহণ করে। নবীজি সা. তাদের ক্ষমা করে দেন। পরবর্তীকালে তারা ইসলামী আদর্শে জীবনযাপন করে।

টিকাঃ
১২৩৭. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫১।
১২৩৮. ফাতহুল বারী: ৯/৮।
১২৩৯. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৪৫১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00