📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 আলোচ্য ঘটনায় যেসব শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে

📄 আলোচ্য ঘটনায় যেসব শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে


১. আবু সুফিয়ান মুসলমানদের হাতে এক রকম বন্দী ছিলেন। ওমর তার গর্দান উড়িয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু আব্বাস রা. বললেন তিনি তাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। পর দিন সকালে নবীজির দরবারে এলে তাকে চমকে দিয়ে রসূলুল্লাহ সা. কোনো ধরনের তিরস্কার না করে ইসলামের দাওয়াত দেন। প্রিয়নবীর এমন ব্যবহারে সে অভিভূত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় সে 'আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। হে মুহাম্মাদ, আপনি এত উদার সহনশীল এবং আত্মীয় সমাদরকারী যে, তা ভাষায় ব্যক্ত করতে পারি না'-এ কথাগুলো বলতে বাধ্য হয়।
আবার আব্বাস যখন আল্লাহর রসূল সা.-কে বললেন, 'ইয়া রসূলাল্লাহ সা., আবু সুফিয়ান একটু মর্যাদাপ্রিয়। কাজেই তাকে গৌরবজনক কোনো একটা মর্যাদা দিন।' এর জবাবে নবীজি সা. বলেন, 'বেশ, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।' নিজের বাড়ির এ বৈশিষ্ট্যের কারণে নিশ্চয়ই আবু সুফিয়ান আনন্দিত হয়েছিল। যা তাকে শক্তিশালী ঈমানের অধিকারী হতে সহযোগিতা করে।
এভাবে উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে রসূল সা. আবু সুফিয়ানের অন্তর থেকে হিংসার বীজ উপড়ে ফেলেন। কুরায়েশদের মধ্যে যেমন তার প্রতিপত্তি ছিল, ইসলাম গ্রহণের পরও সে প্রতিপত্তি কোনো অংশে খর্ব হয়নি এ ধরনের একটা অনুভূতি তার ভেতর তৈরি করে দেন। ইসলামের পথে আহ্বানকারী আলিম ও দায়ীদের উচিত, মর্যাদাবান ও সামাজিকভাবে সম্মানিত লোকদের সাথে আচরণের সময় নবীজির এই আদর্শ সামনে রাখা।
২. আবু সুফিয়ান মক্কায় ফিরে যাওয়ার জন্য রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট থেকে বের হলে রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'হে আব্বাস, তাকে উপত্যকার কিনারে পাহাড়ের মাথায় গিরিপথে একটু থামিয়ে রাখো। আল্লাহর সৈনিকরা তার সামনে দিয়ে যাক এবং সে তাদেরকে দেখুক।'
আব্বাস রা. রসূল সা.-এর নির্দেশ পালন করেন। মূলত এর মাধ্যমে রসূল সা.-এর উদ্দেশ্য ছিল কুরায়েশদের একজন শ্রেষ্ঠ নেতার মনে ইসলামের প্রভাব সৃষ্টি করা। যার ফলে আবু সুফিয়ান যখন নিজের চোখে বিশাল মুসলিম বাহিনীর বিস্তৃতি, নিয়মতান্ত্রিকতা, তাদের অস্ত্রের বহর ও সুশৃঙ্খল অবস্থান দেখছিলেন, তখন তার মনের মধ্যে এ কথা গেঁথে যায় যে, যদি এরা মক্কায় প্রবেশ করে শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে মক্কা নগরীকে মুক্তি দিতে চায়, তাহলে এটা তাদের জন্য কঠিন কিছু নয়। তিনি নিশ্চিত হয়ে যান যে, কুরায়েশরা কখনো এ বাহিনীর প্রতিরোধ করতে পারবে না। আর এ জন্যই যখন মুহাজির ও আনসারদের বিশাল বাহিনী যাচ্ছিলো আবু সুফিয়ান বলে ওঠেন, সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ! হে আব্বাস! এরা কারা? আব্বাস বলেন, এ বাহিনীতে রয়েছেন স্বয়ং রসূলুল্লাহ সা. এবং তার সাথে আছেন মুহাজির ও আনসরাগণ। আবু সুফিয়ান বলেন, এ বাহিনীর মুকাবিলা করার ক্ষমতা কারো নেই।
অতঃপর তিনি আব্বাস রা.-কে লক্ষ্য করে বলেন, হে আবুল ফজল, তোমার ভ্রাতুষ্পুত্র আগামীকাল এক বিরাট সাম্রাজ্যের অধিপতি হতে যাচ্ছেন। আব্বাস বলেন, হে আবু সুফিয়ান! এটা রাজত্ব লাভের কোনো ব্যাপার নয়, এটা নবুয়াতের প্রতাপ। তিনি বলেন, তাহলে এটা কতই না চমৎকার।
'এটা নবুয়াতের প্রতাপ'-এমন একটি বাক্য, যা আল্লাহ তাআলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আব্বাসের মুখ থেকে বের হয়েছিল। যা কেয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি সন্দিহান ও এমন অপবাদ দেওয়া ব্যক্তির জবাব হতে পারে, যারা ধারণা করে যে, আল্লাহর রসূলুল্লাহ সা.-এর দাওয়াত মূলত তার রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব বা আরব জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ছিল। এই একটি বাক্যই রসূল সা.-এর জীবনের লক্ষ্য ফুটিয়ে তুলেছে। তার জীবনের প্রতিটি কাজ এ সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি পৃথিবীর বুকে তার কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, বরং আল্লাহর বাণী মানবজাতির কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন।
মক্কায় প্রবেশ করার আগেই রসূল সা. কাফেরদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে চান। এ লক্ষ্যে তিনি মুসলিম বাহিনীর প্রত্যেককে আলাদা করে আগুন প্রজ্জ্বলিত করার নির্দেশ দেন। দিগন্তজুড়ে মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা প্রত্যেকেই যখন আগুন প্রজ্বলিত করে, তখন দশ হাজার প্রদীপের আলোয় ঝলমল করা বিশাল বাহিনী নিশ্চয়ই কুরায়েশ-বাহিনীর অন্তরাত্মায় কম্পন ধরিয়ে দিয়েছিল। এভাবেই রসূল সা. তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করতে চেয়েছিলেন যেন তারা কোনো ধরনের প্রতিরোধের কথা চিন্তা করতেও সক্ষম না হয়। পবিত্র ভূমিতে কোনো ধরনের রক্তপাত ছাড়াই যেন তারা ইসলামের আনুগত্য স্বীকার করে। নিজের পরিকল্পনায় সফল হন নবীজি সা.। পরবর্তী জিহাদগুলোতেও এই কৌশল অবলম্বন করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00