📄 মক্কার পথে যাগ্রা এবং পথের কিছু ঘটনা
ক. রসূলুল্লাহ সা.অষ্টম হিজরির দশ রমজান মক্কা অভিযানে রওনা হন। মদীনায় তার স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করা হয় আবু রুহম কুলসুম ইবনে হুসাইন ইবনে উতবা ইবনে খালফ আনসারীকে। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সাড়ে আট বছর পর দশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে নবীজি মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন। যাত্রাপথে আল্লাহর রসূল সা. ও মুসলিম মুজাহিদরা উসফান ও কুদাইদ অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থিত কাদিন নামক জায়গায় পৌছা পর্যন্ত রোজা রাখলেও মাসের পরবর্তী রোযা আর রাখেননি। পথিমধ্যে জুহফা নামক জায়গায় আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব তার পরিবার-পরিজন নিয়ে হিজরত করে মদীনার উদ্দেশে যাওয়ার পথে রসূল সা.-এর সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। নবীজি সা. তাকে দেখে খুব খুশি হন। মক্কাবাসীর সামরিক ও অভ্যন্তরীণ খবরাখবর রসূল সা.-এর কাছে পৌঁছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত আব্বাস রা. তার পরিবারসহ মক্কা থেকে বের হয়ে আসেন। এর দ্বারা তার ওপর অর্পিত দায়িত্বের সমাপ্তির বিষয়টি বোঝা যায়। কেননা, মক্কায় তার অবস্থান ছিল নবীজির নির্দেশে।
খ. আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ও আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়্যার ইসলাম গ্রহণ
আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ও আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া ইবনে মুগীরা পথিমধ্যে (মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী) সানিয়াতুল উকাব নামক স্থানে রসূলুল্লাহ সা.-এর সান্নিধ্যে উপনীত হলো। তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাক্ষাতপ্রার্থী হলে উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, আপনার চাচাতো ভাই ও শ্যালক এসেছে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'ওদের দিয়ে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার চাচাতো ভাই তো আমাকে অপমান করেছে। আর আমার শ্যালক (আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া উম্মে সালামার সৎ ভাই) মক্কায় অবস্থানকালে আমার চরম বিরোধিতা করেছে।'
তারা যখন উভয়ে এই জবাব পেলো, তখন আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস বললো, রসূলুল্লাহ সা. যদি আমাকে সাক্ষাত করার সুযোগ না দেন তাহলে আমি আমার এই ছেলে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে একদিকে চলে যাবো এবং ক্ষুধা তৃষ্ণায় ধুঁকে ধুঁকে মরবো।
একথা শুনে রসূলুল্লাহ সা.-এর মন বিগলিত হলো। তিনি অনুমতি দিলেন। তখন তারা উভয়ে তাঁর কাছে গেলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন। আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ইতোপূর্বে রসূলুল্লাহ সা.-এর নিন্দাসূচক যেসব কবিতা আবৃত্তি করেছেন তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। ইসলাম প্রহণ করার পর নতুন কবিতা আবৃত্তি করলেন। কবিতাটি এই:
لعمرك إني يوم أحمل راية لتغلب خيل اللات خيل محمد لكالمدلج الحيران أظلم ليله فهذا أواني حين أهدى وأهتدي هداني هاد غير نفسي ونالني مع الله من طردت كل مطرد أصد وأنأى جاهدا عن محمد وأدعى (وإن لم أنتسب) من محمد هم ما هم من لم يقل بهواهم وإن كان ذا رأي يلم ويفند أريد لأرضيهم ولست بلائط مع القوم ما لم أهد في كل مقعد فقل الثقيف لا أريد قتالها وقل الثقيف تلك: غيري أوعدي فما كنت في الجيش الذي نال عامرا وما كان عن جرا لساني ولا يدي قبائل جاءت من بلاد بعيدة نزائع جاءت من سهام و سردد
আমি যেদিন সেনাপতি হয়ে লড়াই করবো, মুহাম্মাদের বাহিনী মুশরিক বাহিনীর ওপর অবশ্যই জয়যুক্ত হবে।
মুশরিক বাহিনী রাতের আঁধারে দিশেহারা যাত্রীর মত। আজ আমার পালা এসেছে যখন আমি হেদায়াত লাভ করেছি।
আমাকে সেই হেদায়াতকারী হেদায়াত করেছেন, বদলে দিয়েছেন এবং আমাকে আল্লাহর সাহচর্যে পৌছিয়ে দিয়েছেন যাকে আমি দূরে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম।
সেদিন আমি মুহাম্মাদের মাঝে আন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম এবং তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে রণপায়তারা করেছিলাম, আর আমাকে মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে ডাকা হচ্ছিলো, যদিও আমি তাঁর ডাকে সাড়া দেইনি।
তিনি যে পথে চলছিলেন সে পথেই চলতে থাকলেন। মুশরিকদের খেয়াল খুশি মুতাবিক কথা বললেন না। যদিও তিনি বিশুদ্ধ মতের অধিকারী হিসেবে কথা বলছিলেন, তথাপি তাঁকে মিথ্যুক বলে অভিহিত করা হয়েছিল। যতক্ষন আমি হেদায়াত পাইনি ততক্ষণ প্রত্যেক বৈঠকে তাদেরকে (মুশরিকদেরকে) খুশি করতে চেয়েছিলাম এবং (মুসলিম) জনতার সাথে সংযুক্ত হইনি।
সুতরাং বনু সাকীফকে বলে দাও, আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাই না। বনু সাকীফকে বলে দাও, আমাকে নয় অন্য কাউকে ভীতি প্রদর্শন করুক।
কেননা আমি সেই বাহিনীর ভেতরে ছিলাম না যে বাহিনী জনপদকে আক্রমণ করেছিল এবং সে আক্রমণ আমার জিহ্বা কিংবা হাতের দ্বারা সংঘটিত হয়নি।
সে বাহিনীতে ছিল দূরাঞ্চল থেকে আগত গোত্রসমূহ এবং সাহাম ও সুরদাদ থেকে আগত অচেনা যোদ্ধারা।
কথিত আছে, তিনি যখন কবিতার এই অংশটি আবৃত্তি করছিলেন, 'আমাকে আল্লাহর সাহচর্যে পৌছিয়ে দিয়েছেন সেই ব্যক্তি যাকে আমি বহু দূরে তড়িয়ে দিয়েছিলাম'; তখন রসূলুল্লাহ সা. তার বুক চাপড়ে বলেছিলেন, 'তুমিই তো আমাকে দূরে তাড়িয়ে দিয়েছিলে।
আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস সবসময় কবিতার মাধ্যমে নবীজির নিন্দা করতেন। এদিকে আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়্যা রসূল সা.-কে বলেছিলেন, আমি আপনার ওপর ঈমান আনবো না যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আকাশে সিঁড়ি লাগিয়ে আমার সামনে আকাশে উঠবেন এবং সেখান থেকে একটি লিখিত কাগজে চারজন ফেরেশতার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নিজের নবুয়ত প্রমাণ করবেন।
এমন মারাত্মক ধৃষ্টতাসুলভ অপরাধ সত্ত্বেও রসূল সা. তাদের আবেদনে সাড়া দেন এবং ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন। এটা ছিল নবীজির উদারতা ও ক্ষমার একটি সাধারণ দৃষ্টান্ত। যে আবু সুফিয়ান ইবনুল হারেস নবীজির নিন্দায় কবিতা আবৃত্তি করতেন, তিনি নবীজির প্রশংসায় কবিতা আবৃত্তি করলেন। এরপর তিনি ইসলামের প্রতি অত্যন্ত অনুগত হন। গাযওয়ায়ে হুনাইনে নবীজির সাথে বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্ব দেখান।
টিকাঃ
১১৮৮. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ ৫৬০-৫৬১।
১১৮৯. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৫৬১।
১১৯০. সহীহ বুখারী: ৪২৭৬।
১১৯১. আবু ফারিস প্রণীত আসসীরাহ: ৪০৬। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/২৭২।
১১৯২. তাআম্মুলাত ফিসসীরাতিন নববিয়্যাহ ২৫৪।
১১৯৩. মুসতাদরাকে হাকিম: ৩/৪৩-৪৫।
১১৯৪. সীরাতে ইবনে হিশাম: ১/২৯৫-৩০০।
১১৯৫. আত তারীখুল ইসলামী: ৭/১৭২।
ক. রসূলুল্লাহ সা.অষ্টম হিজরির দশ রমজান মক্কা অভিযানে রওনা হন। মদীনায় তার স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করা হয় আবু রুহম কুলসুম ইবনে হুসাইন ইবনে উতবা ইবনে খালফ আনসারীকে। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সাড়ে আট বছর পর দশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে নবীজি মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন। যাত্রাপথে আল্লাহর রসূল সা. ও মুসলিম মুজাহিদরা উসফান ও কুদাইদ অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থিত কাদিন নামক জায়গায় পৌছা পর্যন্ত রোজা রাখলেও মাসের পরবর্তী রোযা আর রাখেননি। পথিমধ্যে জুহফা নামক জায়গায় আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব তার পরিবার-পরিজন নিয়ে হিজরত করে মদীনার উদ্দেশে যাওয়ার পথে রসূল সা.-এর সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। নবীজি সা. তাকে দেখে খুব খুশি হন। মক্কাবাসীর সামরিক ও অভ্যন্তরীণ খবরাখবর রসূল সা.-এর কাছে পৌঁছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত আব্বাস রা. তার পরিবারসহ মক্কা থেকে বের হয়ে আসেন। এর দ্বারা তার ওপর অর্পিত দায়িত্বের সমাপ্তির বিষয়টি বোঝা যায়। কেননা, মক্কায় তার অবস্থান ছিল নবীজির নির্দেশে।
খ. আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ও আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়্যার ইসলাম গ্রহণ
আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ও আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া ইবনে মুগীরা পথিমধ্যে (মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী) সানিয়াতুল উকাব নামক স্থানে রসূলুল্লাহ সা.-এর সান্নিধ্যে উপনীত হলো। তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাক্ষাতপ্রার্থী হলে উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, আপনার চাচাতো ভাই ও শ্যালক এসেছে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'ওদের দিয়ে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার চাচাতো ভাই তো আমাকে অপমান করেছে। আর আমার শ্যালক (আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া উম্মে সালামার সৎ ভাই) মক্কায় অবস্থানকালে আমার চরম বিরোধিতা করেছে।'
তারা যখন উভয়ে এই জবাব পেলো, তখন আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস বললো, রসূলুল্লাহ সা. যদি আমাকে সাক্ষাত করার সুযোগ না দেন তাহলে আমি আমার এই ছেলে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে একদিকে চলে যাবো এবং ক্ষুধা তৃষ্ণায় ধুঁকে ধুঁকে মরবো।
একথা শুনে রসূলুল্লাহ সা.-এর মন বিগলিত হলো। তিনি অনুমতি দিলেন। তখন তারা উভয়ে তাঁর কাছে গেলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন। আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ইতোপূর্বে রসূলুল্লাহ সা.-এর নিন্দাসূচক যেসব কবিতা আবৃত্তি করেছেন তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। ইসলাম প্রহণ করার পর নতুন কবিতা আবৃত্তি করলেন। কবিতাটি এই:
لعمرك إني يوم أحمل راية لتغلب خيل اللات خيل محمد لكالمدلج الحيران أظلم ليله فهذا أواني حين أهدى وأهتدي هداني هاد غير نفسي ونالني مع الله من طردت كل مطرد أصد وأنأى جاهدا عن محمد وأدعى (وإن لم أنتسب) من محمد هم ما هم من لم يقل بهواهم وإن كان ذا رأي يلم ويفند أريد لأرضيهم ولست بلائط مع القوم ما لم أهد في كل مقعد فقل الثقيف لا أريد قتالها وقل الثقيف تلك: غيري أوعدي فما كنت في الجيش الذي نال عامرا وما كان عن جرا لساني ولا يدي قبائل جاءت من بلاد بعيدة نزائع جاءت من سهام و سردد
আমি যেদিন সেনাপতি হয়ে লড়াই করবো, মুহাম্মাদের বাহিনী মুশরিক বাহিনীর ওপর অবশ্যই জয়যুক্ত হবে।
মুশরিক বাহিনী রাতের আঁধারে দিশেহারা যাত্রীর মত। আজ আমার পালা এসেছে যখন আমি হেদায়াত লাভ করেছি।
আমাকে সেই হেদায়াতকারী হেদায়াত করেছেন, বদলে দিয়েছেন এবং আমাকে আল্লাহর সাহচর্যে পৌছিয়ে দিয়েছেন যাকে আমি দূরে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম।
সেদিন আমি মুহাম্মাদের মাঝে আন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম এবং তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে রণপায়তারা করেছিলাম, আর আমাকে মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে ডাকা হচ্ছিলো, যদিও আমি তাঁর ডাকে সাড়া দেইনি।
তিনি যে পথে চলছিলেন সে পথেই চলতে থাকলেন। মুশরিকদের খেয়াল খুশি মুতাবিক কথা বললেন না। যদিও তিনি বিশুদ্ধ মতের অধিকারী হিসেবে কথা বলছিলেন, তথাপি তাঁকে মিথ্যুক বলে অভিহিত করা হয়েছিল। যতক্ষন আমি হেদায়াত পাইনি ততক্ষণ প্রত্যেক বৈঠকে তাদেরকে (মুশরিকদেরকে) খুশি করতে চেয়েছিলাম এবং (মুসলিম) জনতার সাথে সংযুক্ত হইনি।
সুতরাং বনু সাকীফকে বলে দাও, আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাই না। বনু সাকীফকে বলে দাও, আমাকে নয় অন্য কাউকে ভীতি প্রদর্শন করুক।
কেননা আমি সেই বাহিনীর ভেতরে ছিলাম না যে বাহিনী জনপদকে আক্রমণ করেছিল এবং সে আক্রমণ আমার জিহ্বা কিংবা হাতের দ্বারা সংঘটিত হয়নি।
সে বাহিনীতে ছিল দূরাঞ্চল থেকে আগত গোত্রসমূহ এবং সাহাম ও সুরদাদ থেকে আগত অচেনা যোদ্ধারা।
কথিত আছে, তিনি যখন কবিতার এই অংশটি আবৃত্তি করছিলেন, 'আমাকে আল্লাহর সাহচর্যে পৌছিয়ে দিয়েছেন সেই ব্যক্তি যাকে আমি বহু দূরে তড়িয়ে দিয়েছিলাম'; তখন রসূলুল্লাহ সা. তার বুক চাপড়ে বলেছিলেন, 'তুমিই তো আমাকে দূরে তাড়িয়ে দিয়েছিলে।
আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস সবসময় কবিতার মাধ্যমে নবীজির নিন্দা করতেন। এদিকে আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়্যা রসূল সা.-কে বলেছিলেন, আমি আপনার ওপর ঈমান আনবো না যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আকাশে সিঁড়ি লাগিয়ে আমার সামনে আকাশে উঠবেন এবং সেখান থেকে একটি লিখিত কাগজে চারজন ফেরেশতার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নিজের নবুয়ত প্রমাণ করবেন।
এমন মারাত্মক ধৃষ্টতাসুলভ অপরাধ সত্ত্বেও রসূল সা. তাদের আবেদনে সাড়া দেন এবং ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন। এটা ছিল নবীজির উদারতা ও ক্ষমার একটি সাধারণ দৃষ্টান্ত। যে আবু সুফিয়ান ইবনুল হারেস নবীজির নিন্দায় কবিতা আবৃত্তি করতেন, তিনি নবীজির প্রশংসায় কবিতা আবৃত্তি করলেন। এরপর তিনি ইসলামের প্রতি অত্যন্ত অনুগত হন। গাযওয়ায়ে হুনাইনে নবীজির সাথে বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্ব দেখান।
টিকাঃ
১১৮৮. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ ৫৬০-৫৬১।
১১৮৯. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৫৬১।
১১৯০. সহীহ বুখারী: ৪২৭৬।
১১৯১. আবু ফারিস প্রণীত আসসীরাহ: ৪০৬। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/২৭২।
১১৯২. তাআম্মুলাত ফিসসীরাতিন নববিয়্যাহ ২৫৪।
১১৯৩. মুসতাদরাকে হাকিম: ৩/৪৩-৪৫।
১১৯৪. সীরাতে ইবনে হিশাম: ১/২৯৫-৩০০।
১১৯৫. আত তারীখুল ইসলামী: ৭/১৭২।
📄 আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ও আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়ার ইসলাম গ্রহণ
আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ও আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া ইবনে মুগীরা পথিমধ্যে (মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী) সানিয়াতুল উকাব নামক স্থানে রসূলুল্লাহ সা.-এর সান্নিধ্যে উপনীত হলো। তারা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাক্ষাতপ্রার্থী হলে উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, আপনার চাচাতো ভাই ও শ্যালক এসেছে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'ওদের দিয়ে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার চাচাতো ভাই তো আমাকে অপমান করেছে। আর আমার শ্যালক (আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া উম্মে সালামার সৎ ভাই) মক্কায় অবস্থানকালে আমার চরম বিরোধিতা করেছে।'
তারা যখন উভয়ে এই জবাব পেলো, তখন আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস বললো, রসূলুল্লাহ সা. যদি আমাকে সাক্ষাত করার সুযোগ না দেন তাহলে আমি আমার এই ছেলে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে একদিকে চলে যাবো এবং ক্ষুধা তৃষ্ণায় ধুঁকে ধুঁকে মরবো।
একথা শুনে রসূলুল্লাহ সা.-এর মন বিগলিত হলো। তিনি অনুমতি দিলেন। তখন তারা উভয়ে তাঁর কাছে গেলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন। আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ইতোপূর্বে রসূলুল্লাহ সা.-এর নিন্দাসূচক যেসব কবিতা আবৃত্তি করেছেন তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। ইসলাম প্রহণ করার পর নতুন কবিতা আবৃত্তি করলেন। কবিতাটি এই:
لعمرك إني يوم أحمل راية لتغلب خيل اللات خيل محمد لكالمدلج الحيران أظلم ليله فهذا أواني حين أهدى وأهتدي هداني هاد غير نفسي ونالني مع الله من طردت كل مطرد أصد وأنأى جاهدا عن محمد وأدعى (وإن لم أنتسب) من محمد هم ما هم من لم يقل بهواهم وإن كان ذا رأي يلم ويفند أريد لأرضيهم ولست بلائط مع القوم ما لم أهد في كل مقعد فقل الثقيف لا أريد قتالها وقل الثقيف تلك: غيري أوعدي فما كنت في الجيش الذي نال عامرا وما كان عن جرا لساني ولا يدي قبائل جاءت من بلاد بعيدة نزائع جاءت من سهام و سردد
আমি যেদিন সেনাপতি হয়ে লড়াই করবো, মুহাম্মাদের বাহিনী মুশরিক বাহিনীর ওপর অবশ্যই জয়যুক্ত হবে।
মুশরিক বাহিনী রাতের আঁধারে দিশেহারা যাত্রীর মত। আজ আমার পালা এসেছে যখন আমি হেদায়াত লাভ করেছি।
আমাকে সেই হেদায়াতকারী হেদায়াত করেছেন, বদলে দিয়েছেন এবং আমাকে আল্লাহর সাহচর্যে পৌছিয়ে দিয়েছেন যাকে আমি দূরে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম।
সেদিন আমি মুহাম্মাদের মাঝে আন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম এবং তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে রণপায়তারা করেছিলাম, আর আমাকে মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে ডাকা হচ্ছিলো, যদিও আমি তাঁর ডাকে সাড়া দেইনি।
তিনি যে পথে চলছিলেন সে পথেই চলতে থাকলেন। মুশরিকদের খেয়াল খুশি মুতাবিক কথা বললেন না। যদিও তিনি বিশুদ্ধ মতের অধিকারী হিসেবে কথা বলছিলেন, তথাপি তাঁকে মিথ্যুক বলে অভিহিত করা হয়েছিল। যতক্ষন আমি হেদায়াত পাইনি ততক্ষণ প্রত্যেক বৈঠকে তাদেরকে (মুশরিকদেরকে) খুশি করতে চেয়েছিলাম এবং (মুসলিম) জনতার সাথে সংযুক্ত হইনি।
সুতরাং বনু সাকীফকে বলে দাও, আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাই না। বনু সাকীফকে বলে দাও, আমাকে নয় অন্য কাউকে ভীতি প্রদর্শন করুক।
কেননা আমি সেই বাহিনীর ভেতরে ছিলাম না যে বাহিনী জনপদকে আক্রমণ করেছিল এবং সে আক্রমণ আমার জিহ্বা কিংবা হাতের দ্বারা সংঘটিত হয়নি।
সে বাহিনীতে ছিল দূরাঞ্চল থেকে আগত গোত্রসমূহ এবং সাহাম ও সুরদাদ থেকে আগত অচেনা যোদ্ধারা।
কথিত আছে, তিনি যখন কবিতার এই অংশটি আবৃত্তি করছিলেন, 'আমাকে আল্লাহর সাহচর্যে পৌছিয়ে দিয়েছেন সেই ব্যক্তি যাকে আমি বহু দূরে তড়িয়ে দিয়েছিলাম'; তখন রসূলুল্লাহ সা. তার বুক চাপড়ে বলেছিলেন, 'তুমিই তো আমাকে দূরে তাড়িয়ে দিয়েছিলে।
আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস সবসময় কবিতার মাধ্যমে নবীজির নিন্দা করতেন। এদিকে আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়্যা রসূল সা.-কে বলেছিলেন, আমি আপনার ওপর ঈমান আনবো না যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আকাশে সিঁড়ি লাগিয়ে আমার সামনে আকাশে উঠবেন এবং সেখান থেকে একটি লিখিত কাগজে চারজন ফেরেশতার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নিজের নবুয়ত প্রমাণ করবেন।
এমন মারাত্মক ধৃষ্টতাসুলভ অপরাধ সত্ত্বেও রসূল সা. তাদের আবেদনে সাড়া দেন এবং ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন। এটা ছিল নবীজির উদারতা ও ক্ষমার একটি সাধারণ দৃষ্টান্ত। যে আবু সুফিয়ান ইবনুল হারেস নবীজির নিন্দায় কবিতা আবৃত্তি করতেন, তিনি নবীজির প্রশংসায় কবিতা আবৃত্তি করলেন। এরপর তিনি ইসলামের প্রতি অত্যন্ত অনুগত হন। গাযওয়ায়ে হুনাইনে নবীজির সাথে বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্ব দেখান।
টিকাঃ
১১৯৩. মুসতাদরাকে হাকিম: ৩/৪৩-৪৫।
১১৯৪. সীরাতে ইবনে হিশাম: ১/২৯৫-৩০০।
১১৯৫. আত তারীখুল ইসলামী: ৭/১৭২।
📄 কুরায়শ নেতা আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ
মাররুয যাহরান নামক এলাকায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে রসূল সা. সবাইকে সেখানে যাত্রাবিরতি করতে বলেন। আগুন জ্বালিয়ে থাকার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে সবাই অবস্থান করতে লাগলো। বাহিনীর নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয় ওমর ইবনুল খাত্তাব রা.-কে।
আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব প্রমাদ গুনলেন। তিনি বুঝলেন যে কুরায়েশরা যদি স্ব উদ্যোগে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে সন্ধি না করে এবং তিনি যদি জোরপূর্বক মক্কায় প্রবেশ করেন, তাহলে কুরায়েশরা চিরতরে নির্মূল হয়ে যাবে।
আব্বাস রা. বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর সাদা খচ্চরটিতে আরোহণ করে আরাক নামক স্থানে এসে খোঁজ করতে লাগলাম কোনো কাঠুরিয়া, দুধওয়ালা কিংবা আর কোনো লোক মক্কার দিকে যায় কিনা। তাহলে বলবো মক্কাবাসীকে রসূলুল্লাহ সা.-এর আগমনের খবর দিতে যাতে তারা রসূলুল্লাহ সা. জোরপূর্বক মক্কায় প্রবেশ করার আগে তাঁর কাছে এসে সন্ধি করে।
এদিকে আবু সুফিয়ান, হাকিম ইবনে হিজাম ও বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা খোঁজখবর নেওয়ার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছিলো। আগুনের দীর্ঘ সারি দেখতে পেয়ে আবু সুফিয়ান বলে উঠলো, আমি এ রাতের মতো এতো আলো, এতো বড়ো বাহিনী কখনো দেখিনি। বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা বলে উঠলো, এটা নিশ্চয়ই খুযাআ গোত্রের বাহিনী। তারা নিশ্চয়ই যুদ্ধের প্রস্ততি নিয়েছে। আবু সুফিয়ান জবাব দিলো, খুযাআর এত প্রতাপ ও জনবল নেই যে, এত আগুন জ্বালাবে এবং এত বড় বাহিনীর সমাবেশ ঘটাবে।
আমি আবু সুফিয়ানের কণ্ঠস্বর চিনতে পেরে বললাম, ওহে আবু সুফিয়ান! সে বললো, কে আব্বাস নাকি? আমি বললাম, হ্যাঁ। সে বললো, খবর কি?
আমি বললাম, তুমি জান না? এই তো রসূলুল্লাহ সা. ও তার বাহিনী। আল্লাহর শপথ! কুরায়েশদের জীবন বিপন্ন। সে বললো, তাহলে এখন উপায় কী? আমি বললাম, রসূলুল্লাহ সা. যদি তোমাকে বন্দী করেন, তাহলে খুন করে ফেলবেন। অতএব এই খচ্চরের পেছনে ওঠো। আমি তোমাকে রসূলুল্লাহ সা. কাছে নিয়ে যাই এবং তোমার জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করি।
অতঃপর সে আমার পেছনে চড়ে বসলো। তার সঙ্গীদ্বয় ফিরে গেলো। আবু সুফিয়ানকে নিয়ে আমি মুসলিম বাহিনীর এক এক অগ্নিকুণ্ডের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। সবাই বলছিল, এ কে? কিন্তু একবার নজর বুলিয়ে এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর খচ্চরে আমাকে আরোহী দেখে প্রত্যেকেই শান্ত হয়ে যাচ্ছিল। আমার পেছনে যে আবু সুফিয়ান রয়েছে তা কেউ লক্ষ করছিল না।
পথিমধ্যে ওমর ইবনুল খাত্তাব-এর তাবু এলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে যাচ্ছে? পেছনে আবু সুফিয়ানকে বসা দেখে তিনি বললেন, আল্লাহর শত্রু আবু সুফিয়ান! আল্লাহর শুকরীয়া যে, তিনি কোনো চুক্তি ছাড়াই তোমাকে আমাদের হাতে এনে দিয়েছেন। একথা বলেই তিনি দৌড়ে চললেন রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে। এদিকে আমিও দ্রুত ছুটলাম। ওমর ও খচ্চর কেউই তেমন দ্রুতগামী ছিল না। তথাপি খচ্চর একটু আগে গেলো। খচ্চর থেকে নেমে আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে ওমর রা.ও গেলেন সেখানে। তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! এই যে আবু সুফিয়ান। আল্লাহ ওকে অনায়াসেই আমাদের হাতে এনে দিয়েছেন। ওর সাথে আমাদের কোনো চুক্তিও হয়নি। সুতরাং আমাকে অনুমতি দিন ওর গর্দান উড়িয়ে দিই।
আব্বাস রা. বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি তাকে নিরাপত্তা দিয়েছি। যখন ওমর তাকে হত্যা করতে বারবার অনুমতি চাচ্ছিলেন আমি তাকে বললাম, হে ওমর, নিবৃত্ত হও। আল্লাহর শপথ! যদি সে বনু আদির কেউ হতো, তাহলে তুমি নিশ্চয়ই তাকে হত্যা করতে এতোটা উৎসাহী হতে না। যেহেতু সে বনু আবদে মানাফ গোত্রের সেজন্য তুমি এমনটি করছো।
ওমর রা. বললেন, আব্বাস! আপনি এ রকম কথা বলবেন না। আমার পিতা যদি ইসলাম গ্রহণ করতেন, তবুও তার ইসলাম গ্রহণ আমার কাছে আপনার ইসলাম গ্রহণের চেয়ে বেশি প্রিয় হতো না।
রসূলুল্লাহ সা. বললেন, হে আব্বাস, আবু সুফিয়ানকে তোমার আশ্রয়ে নিয়ে যাও। সকালে তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি আবু সুফিয়ানকে নিয়ে গেলাম। রাত্রে সে আমার কাছে থাকলো। সকাল বেলা তাকে নিয়ে আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে গেলাম। রসূল সা. তাকে দেখে বললেন, হে আবু সুফিয়ান, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই একথা মেনে নেয়ার সময় কি তোমার এখনও আসেনি? সে বললো, আপনার উদারতা, মহত্ত্ব, স্বজনবাৎসল্য অতুলনীয়। আমার ধারণা, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ যদি থাকতো তাহলে এতো দিনে আমাকে সাহায্য করতো।
রসূলুল্লাহ সা. আবার বললেন, হে আবু সুফিয়ান, আমি যে আল্লাহর রসূল, তা কি এখন পর্যন্ত তুমি উপলদ্ধি করোনি? আবু সুফিয়ান বললো, আপনার জন্য আমার মাতাপিতা উৎসর্গ হোক! আপনি এতো উদার, সহনশীল এবং আত্মীয় সমাদরকারী যে, তা ভাষায় ব্যক্ত করতে পারি না। তবে আপনার রসূল হওয়া সম্পর্কে আমার এখনো কিছু দ্বিধা-সংশয় রয়েছে।
আব্বাস তখন বললেন, ধিক তোমাকে! ইসলাম গ্রহণ করো এবং সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সা. তাঁর রসূল। নচেৎ এক্ষুণি তোমার গর্দান মারা হবে।
আবু সুফিয়ান সত্যের সাক্ষ্য দিলো এবং ইসলাম গ্রহণ করলো। অতঃপর আব্বাস রা. বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ সা., আবু সুফিয়ান একটু মর্যাদাপ্রিয়। কাজেই তাকে গৌরবজনক একটা কিছু দিন।
রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'বেশ, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। যে ব্যক্তি নিজের বাড়ির দরজা বন্ধ করে রাখবে সেও নিরাপদ থাকবে। যে ব্যক্তি মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে তাঁকেও কিছু বলা হবে না।'
অতঃপর আবু সুফিয়ান মক্কায় ফিরে যাওয়ার জন্য রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট থেকে বের হলে রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'হে আব্বাস, তাকে উপত্যকার কিনারে পাহাড়ের মাথায় গিরিপথে একটু থামিয়ে রাখো। আল্লাহর সৈনিকরা তার সামনে দিয়ে যাক এবং সে তাদেরকে দেখুক।'
আব্বাস রা. বলেন, এরপর আমি গিয়ে রসূলুল্লাহ সা. যে জায়গার কথা বলেছিলেন সেই গিরিপথে তাকে কিছুক্ষণ থামিয়ে রাখলাম। বিভিন্ন গোত্র নিজ নিজ পতাকার পেছনে সারিবদ্ধভাবে যাচ্ছিলো। যখনই একটা গোত্র তার সামনে দিয়ে যায়, সে আমাকে জিজ্ঞেস করে, হে আব্বাস! এরা কারা? আমি বলি, এরা বনু সুলাইম অথবা বনু মুযাইনা অথবা অমুক গোত্র, তমুক গোত্র।
আবু সুফিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলে, এদের সাথে আমার কোনো তুলনাই হয় না।
এরপর রসূলুল্লাহ সা. তার সবুজ পতাকার বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন। এতে মুহাজির ও আনসারদের সমাবেশ ঘটেছিল। এ বাহিনীতে লোহার ধারালো অস্ত্র ছাড়া আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হচ্ছিলো না। আবু সুফিয়ান বললো, সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ! হে আব্বাস! এরা কারা? আমি বললাম, এ বাহিনীতে রয়েছেন স্বয়ং রসূলুল্লাহ সা. এবং তার সাথে আছেন মুহাজির ও আনসারগণ। সে বললো, এ বাহিনীর মুকাবিলা করার ক্ষমতা কারো নেই। আল্লাহর শপথ, হে আব্বাস! তোমার ভ্রাতুষ্পুত্র আগামীকাল এক বিরাট সাম্রাজ্যের অধিপতি হতে যাচ্ছেন। আমি বললাম, হে আবু সুফিয়ান! এটা রাজা হওয়ার কোনো ব্যাপার নয়। এটা নবুয়্যতের প্রতাপ। সে বললো, তাহলে এটা কতই না চমৎকার। আমি বললাম, তুমি তাড়াতাড়ি কুরায়েশদের কাছে চলে যাও।
টিকাঃ
১১৯৬. মুইনুস সিরাত: ৩৯১।
১১৯৭. সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ : ৫১৮-৫২০।
📄 আলোচ্য ঘটনায় যেসব শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে
১. আবু সুফিয়ান মুসলমানদের হাতে এক রকম বন্দী ছিলেন। ওমর তার গর্দান উড়িয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু আব্বাস রা. বললেন তিনি তাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। পর দিন সকালে নবীজির দরবারে এলে তাকে চমকে দিয়ে রসূলুল্লাহ সা. কোনো ধরনের তিরস্কার না করে ইসলামের দাওয়াত দেন। প্রিয়নবীর এমন ব্যবহারে সে অভিভূত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় সে 'আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। হে মুহাম্মাদ, আপনি এত উদার সহনশীল এবং আত্মীয় সমাদরকারী যে, তা ভাষায় ব্যক্ত করতে পারি না'-এ কথাগুলো বলতে বাধ্য হয়।
আবার আব্বাস যখন আল্লাহর রসূল সা.-কে বললেন, 'ইয়া রসূলাল্লাহ সা., আবু সুফিয়ান একটু মর্যাদাপ্রিয়। কাজেই তাকে গৌরবজনক কোনো একটা মর্যাদা দিন।' এর জবাবে নবীজি সা. বলেন, 'বেশ, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।' নিজের বাড়ির এ বৈশিষ্ট্যের কারণে নিশ্চয়ই আবু সুফিয়ান আনন্দিত হয়েছিল। যা তাকে শক্তিশালী ঈমানের অধিকারী হতে সহযোগিতা করে।
এভাবে উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে রসূল সা. আবু সুফিয়ানের অন্তর থেকে হিংসার বীজ উপড়ে ফেলেন। কুরায়েশদের মধ্যে যেমন তার প্রতিপত্তি ছিল, ইসলাম গ্রহণের পরও সে প্রতিপত্তি কোনো অংশে খর্ব হয়নি এ ধরনের একটা অনুভূতি তার ভেতর তৈরি করে দেন। ইসলামের পথে আহ্বানকারী আলিম ও দায়ীদের উচিত, মর্যাদাবান ও সামাজিকভাবে সম্মানিত লোকদের সাথে আচরণের সময় নবীজির এই আদর্শ সামনে রাখা।
২. আবু সুফিয়ান মক্কায় ফিরে যাওয়ার জন্য রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট থেকে বের হলে রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'হে আব্বাস, তাকে উপত্যকার কিনারে পাহাড়ের মাথায় গিরিপথে একটু থামিয়ে রাখো। আল্লাহর সৈনিকরা তার সামনে দিয়ে যাক এবং সে তাদেরকে দেখুক।'
আব্বাস রা. রসূল সা.-এর নির্দেশ পালন করেন। মূলত এর মাধ্যমে রসূল সা.-এর উদ্দেশ্য ছিল কুরায়েশদের একজন শ্রেষ্ঠ নেতার মনে ইসলামের প্রভাব সৃষ্টি করা। যার ফলে আবু সুফিয়ান যখন নিজের চোখে বিশাল মুসলিম বাহিনীর বিস্তৃতি, নিয়মতান্ত্রিকতা, তাদের অস্ত্রের বহর ও সুশৃঙ্খল অবস্থান দেখছিলেন, তখন তার মনের মধ্যে এ কথা গেঁথে যায় যে, যদি এরা মক্কায় প্রবেশ করে শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে মক্কা নগরীকে মুক্তি দিতে চায়, তাহলে এটা তাদের জন্য কঠিন কিছু নয়। তিনি নিশ্চিত হয়ে যান যে, কুরায়েশরা কখনো এ বাহিনীর প্রতিরোধ করতে পারবে না। আর এ জন্যই যখন মুহাজির ও আনসারদের বিশাল বাহিনী যাচ্ছিলো আবু সুফিয়ান বলে ওঠেন, সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ! হে আব্বাস! এরা কারা? আব্বাস বলেন, এ বাহিনীতে রয়েছেন স্বয়ং রসূলুল্লাহ সা. এবং তার সাথে আছেন মুহাজির ও আনসরাগণ। আবু সুফিয়ান বলেন, এ বাহিনীর মুকাবিলা করার ক্ষমতা কারো নেই।
অতঃপর তিনি আব্বাস রা.-কে লক্ষ্য করে বলেন, হে আবুল ফজল, তোমার ভ্রাতুষ্পুত্র আগামীকাল এক বিরাট সাম্রাজ্যের অধিপতি হতে যাচ্ছেন। আব্বাস বলেন, হে আবু সুফিয়ান! এটা রাজত্ব লাভের কোনো ব্যাপার নয়, এটা নবুয়াতের প্রতাপ। তিনি বলেন, তাহলে এটা কতই না চমৎকার।
'এটা নবুয়াতের প্রতাপ'-এমন একটি বাক্য, যা আল্লাহ তাআলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আব্বাসের মুখ থেকে বের হয়েছিল। যা কেয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি সন্দিহান ও এমন অপবাদ দেওয়া ব্যক্তির জবাব হতে পারে, যারা ধারণা করে যে, আল্লাহর রসূলুল্লাহ সা.-এর দাওয়াত মূলত তার রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব বা আরব জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ছিল। এই একটি বাক্যই রসূল সা.-এর জীবনের লক্ষ্য ফুটিয়ে তুলেছে। তার জীবনের প্রতিটি কাজ এ সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি পৃথিবীর বুকে তার কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, বরং আল্লাহর বাণী মানবজাতির কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন।
মক্কায় প্রবেশ করার আগেই রসূল সা. কাফেরদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে চান। এ লক্ষ্যে তিনি মুসলিম বাহিনীর প্রত্যেককে আলাদা করে আগুন প্রজ্জ্বলিত করার নির্দেশ দেন। দিগন্তজুড়ে মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা প্রত্যেকেই যখন আগুন প্রজ্বলিত করে, তখন দশ হাজার প্রদীপের আলোয় ঝলমল করা বিশাল বাহিনী নিশ্চয়ই কুরায়েশ-বাহিনীর অন্তরাত্মায় কম্পন ধরিয়ে দিয়েছিল। এভাবেই রসূল সা. তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করতে চেয়েছিলেন যেন তারা কোনো ধরনের প্রতিরোধের কথা চিন্তা করতেও সক্ষম না হয়। পবিত্র ভূমিতে কোনো ধরনের রক্তপাত ছাড়াই যেন তারা ইসলামের আনুগত্য স্বীকার করে। নিজের পরিকল্পনায় সফল হন নবীজি সা.। পরবর্তী জিহাদগুলোতেও এই কৌশল অবলম্বন করা হয়।