📄 পটভূমি
ক. মক্কার মুশরিকদের একটি মারাত্মক ভুল ছিল মুসলমানদের মিত্রশক্তি বনু খুযাআর বিরুদ্ধে বনু বকরকে অস্ত্রশস্ত্র ও জনবল দিয়ে সাহায্য করা। একদিন রাতে খুযাআ গোত্রের লোকেরা তাদের নিজস্ব ঝর্ণা ওয়াতীরে আবস্থানকালে নাওফেল ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা খুযায়ী একজনকে হত্যা করলো। আর যায় কোথায়। উভয় গোত্র অন্যান্য গোত্রের সাথে দল পাকিয়ে তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হলো। কুরায়েশরা এই সময় বনু বকরকে অস্ত্র দিল এবং কুরায়েশদের অনেকেই রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে বনু বকরের সাথে আক্রমণে যোগ দিলো। দিশেহারা হয়ে খুযাআ গোত্র মসজিদুল হারামের নিষিদ্ধ গন্ডীর মধ্যে আশ্রয় নিলো। নাওফেলের নেতৃত্বে প্রতিহিংসাপরায়ণ দায়েল গোত্রের লোকেরা তাদের ধাওয়া করে হারাম শরীফ পর্যন্ত এলো। বনু বকরের লোকেরা নাওফেলকে বললো, হে নওফেল, এবার থামো। আমরা এখন হারাম শরীফের অভ্যন্তরে আছি। খোদাকে ভয় করো।
তখন নাওফেল একটা সাংঘাতিক কথা বলে বসলো। সে বললো, আজকে তার কোন ইলাহ বা রব নেই। হে বনু বকর, তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করো। অতঃপর আমর ইবনে সালেম খুযায়ী ৪০ জনের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে আল্লাহর রসূল সা.-এর দরবারে মদীনায় এসে উপস্থিত হয়। তারা আল্লাহর রসূল সা.-এর কাছে বকর গোত্রের নিপীড়ন, তাদের হত্যাকাণ্ড ও এ জঘন্য কাজে কুরায়েশদের প্রকাশ্য সহযোগিতার কথা তুলে ধরে। রসূলুল্লাহ সা. যখন মসজিদে লোকজন পরিবেষ্টিত অবস্থায় বসে ছিলেন, তখন সে সেখানে গিয়ে উপনীত হয় এবং একটি কবিতা আবৃত্তি করে সাহায্য প্রার্থনা করে :
اللهم إني ناشد محمدا حلف أبينا وأبيه الأتلدا كنا والدا وكنت ولدا ثمت أسلمنا ولم ننزع يدا
فانصر رسول الله نصرا عتدا وادعوا عباد الله ياتوا مددا
فيهم رسول الله قد تجردا إن سيم خسفا وجهه تربدا
في فيلق كالبحر يجري مزبدا إن قريشا أخلفوك الموعدا
ونقضوا ميثاقك المؤكدا قد جعلوا لي بكداء مرصدا
وزعموا أن لست أدعو أحدا فهم أذل وأقل عددا
هم بيتونا بالوتير هجدا فقتلونا ركعا وسجدا
হে আল্লাহ! আমি মুহাম্মাদকে আমাদের পিতা ও তাঁর পিতার পুরানো মৈত্রীর কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ও তা কার্যকর করার অনুরোধ জানাই।
তোমরা সন্তান ছিলে। আর আমরা পিতা ছিলাম। সেখানে আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং তা ত্যাগ করিনি।
আমাদেরকে অবিলম্বে সাহায্য করো। আর আল্লাহর বান্দাদেরকে আহ্বান করো যেন সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।
তাদের মধ্যে আল্লাহর রসূল রয়েছেন যিনি (চুক্তি থেকে) বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছেন। তাকে যদি আবমাননা করা হয় তাহলে তাঁর মুখে কলংক লেপন করা হবে।
তিনি রয়েছেন এমন একটি বাহিনীর সঙ্গে যা সমুদ্রের মত ফেনারাশি নিয়ে প্রবাহিত। জেনে রাখো, কুরায়েশরা আপনার সাথে কৃত ওয়াদার বিপরীত কাজ করেছে।
তারা আপনার সাথে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করেছে এবং কাদা নামক স্থানে গুপ্ত ঘাটি স্থাপন করেছে।
তারা ভেবেছে আমরা কারো সাহায্য পাবো না। অথচ তারা সংখ্যায় অল্প ও শক্তিতে অপেক্ষাকৃত হীনবল
তারা আল ওয়াতীরে রাতের বেলা আমাদের কাছে এসেছে এবং আমাদের রুকু ও সিজদারত অবস্থায় হত্যা করেছে।
রসূলুল্লাহ সা. এ ঘটনা শুনে বললেন, হে আমর, তোমাকে সাহায্য করা হবে। এর পরপরই তিনি আকাশে এক খন্ড মেঘ দেখে বললেন, এই মেঘখন্ডটিই বনু কাআবের সাহায্যের সূচনা করবে।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহর রসূল সা. উক্ত ঘটনা শোনার পর যখন এ ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন, তখন তিনি কুরায়েশদের কাছে একটি বার্তা পাঠিয়ে বললেন, তোমরা বকর গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করো ও খুযাআ গোত্রের মৃতদের রক্তপণ পরিশোধ করো। অন্যথায় আমি তোমাদের বিরুদ্ধে লড়বো।
কুরায়েশদের নেতা কুরযা ইবনে আবদে আমর ইবনে নওফেল ইবনে আবদে মানাফ (মুআবিয়া রা.-এর শ্বশুর) বলে উঠলেন, নিশ্চয়ই বকর গোত্রের লোকেরা আমাদের অনুসারী। যদি আমরা তাদের সঙ্গত্যাগ করি তাহলে আমরা সব কূল হারিয়ে ফেলবো। যদি আমরা তাদের সাথে মৈত্রী পরিত্যাগ করি তাহলে আমাদের সমমনা আর কেউ বাকি থাকবে না। আমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণাই দেবো।
এ দ্বারা বুঝা যায়, রসূল সা. হঠাৎ করেই কুরায়েশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেননি; বরং তিনি তাদের একাধিক সুযোগ দিয়েছিলেন। শেষে তারা যুদ্ধকেই বেছে নেয়।
টিকাঃ
১১৬৭. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/৩৯।
১১৬৮. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/৪৪।
১১৬৯. সীরাতে ইবনে হিশাম ৪/৪৪। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৭৮।
১১৭০. আল মাতালিবুল আলিয়া: ৪/২৪৩।
১১৭১. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৭/১৬৪।
📄 কুরায়শদের বোকামির খেসারত দিতে আবু সুফিয়ানের প্রচেষ্টা
খ. সন্ধিচুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কুরায়েশদের পক্ষ থেকে আবু সুফিয়ানকে মদীনায় পাঠানো হয়। মদীনায় প্রবেশ করে রসূল সা.-এর কাছে এই বিষয়টি উত্থাপন করতে চাইলে তিনি তাকে এড়িয়ে যান। তাই বাধ্য হয়ে রসূল সা.-এর সাথে তার মধ্যস্থতা করে দিতে আবু সুফিয়ান আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী রা. ও অন্যান্য বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরামের কাছে যায়। তারা সবাই মধ্যস্থতা করতে অস্বীকৃতি জানান। শেষে সে মক্কায় ফিরে যায় কোনোধরনের চুক্তি বা ঐকমত্য ছাড়াই।
মদীনায় অবস্থানকালে আবু সুফিয়ান নিজের মেয়ে উম্মুল মুমিনীন উম্মে হাবীবার কাছে গিয়েছিল। সে রসূলুল্লাহ সা.-এর বিছানায় বসার উপক্রম করতেই উম্মে হাবীবা বিছানা গুটিয়ে ফেললেন। তা দেখে আবু সুফিয়ান বললো, হে আমার মেয়ে! তুমি কি আমাকে ওই বিছানায় বসার যোগ্য মনে করোনি?
উম্মে হাবীবা রা. বললেন, ওটা রসূলুল্লাহ সা.-এর বিছানা। আর আপনি একজন মুশরিক, অপবিত্র। আমি চাই না যে, আপনি রাসুলুল্লাহ সা.-এর বিছানায় বসেন। আবু সুফিয়ান বললো, হে আমার মেয়ে! আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর তুমি খারাপ হয়ে গিয়েছো।
দুইবার হিজরতের সৌভাগ্য অর্জনকারী উম্মে হাবিবা রা.-এর জন্য তার পিতার সাথে এই ধরনের আচরণ করা খুব অস্বাভাবিক ছিল না। কেননা তার সাথে তার পিতার সেই জাহেলিয়াতের যুগ থেকেই সম্পর্ক ছিন্ন ছিল। তিনি তার পিতাকে দীর্ঘ ষোলোটি বছর দেখেননি। যখন তার সাথে তার পিতার সাক্ষাত হয়েছিল, তখন তিনি তাকে সম্মান দেওয়ার উপযুক্ত ভাবেননি; কারণ তিনি ছিলেন মুশরিকদের নেতা এবং ইসলাম ও নবীর বিরুদ্ধে অনেক বছর ধরে যুদ্ধ ও বিদ্বেষী ভূমিকা পালন করে যাওয়া একজন ব্যক্তি।
সাহাবায়ে কেরামের যাপিত জীবনের প্রকৃতি এমনই ছিল। তাদের শত্রুতা- মিত্রতার মানদণ্ড ছিল ইসলাম। অত্যন্ত প্রভাব ও শক্তির অধিকারী আবু সুফিয়ানকে মুখের ওপর এতো কঠিন উত্তর দেওয়া-এটা উম্মে হাবিবার অবিচল ঈমানীশক্তির প্রমাণ। ইসলামী ব্যক্তিত্বের মর্যাদা রক্ষায় সাহাবায়ে কেরামের সর্বোচ্চ সচেতনতার চিত্র আমরা দেখতে পাই তার আচরণে।
এভাবে প্রকাশ্যে কুরায়েশদের প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিভঙ্গের ফলে রসূল সা. মক্কা বিজয় ও সেখানকার কাফেরদের দমন করার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মহান আল্লাহ নবীজিকে পরিপূর্ণ সাহায্য করেন। আরো যেসব অনুসঙ্গ এক্ষেত্রে কার্যকর ছিল তা হলো:
১. গোটা মদীনাজুড়ে মুসলমানদের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। মদীনার ইসলামী সাম্রাজ্য ইহুদিদের চক্রান্ত ইত্যাদি থেকে পরিপূর্ণভাবে মুক্তি লাভ করে। বনু কায়নুকা, বনু নাযির, বনু কুরায়যা ও খায়বারের ইহুদিদের উচিত শিক্ষা দেওয়ায় তাদের শক্তি খর্ব হয়ে যায়।
২. মুসলমানদের আরেকটি সুবিধার দিক হচ্ছে, মদীনার মুনাফেকরা তাদের পৃষ্ঠপোষক ইহুদিদের হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। এভাবে নিঃশেষ হয়ে যায় শত্রুদের শক্তি।
৩. হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির পর রসূল সা. সামরিক শক্তিবৃদ্ধি ও বিভিন্ন যুদ্ধযাত্রা অব্যাহত রাখেন। এতে করে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি পেতে থাকে।
৪. মুসলমানদের আরেকটি সুবিধাজনক দিক ছিল, খায়বার বিজয়ের পর তারা বিপুল পরিমাণে সম্পত্তির অধিকারী হয়। অন্যদিকে, অর্থনৈতিকভাবে কুরায়েশরা মারাত্মক অবনতির শিকার হয়।
৫. মদীনার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলের লোকেরা দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেয়। এতে মুসলমানরা নিশ্চিত ছিল যে, যেকোনো সামরিক অভিযান শুরু করলে শত্রুদের বিপক্ষে তারা যথেষ্ট পরিমাণে সাহায্য পাবে।
৬. স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, এ যুদ্ধের মূল কারণ ছিল কুরায়েশদের প্রতিশ্রুতি ও চুক্তি ভঙ্গ করা। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর খায়বার বিজয় হয়। এদিকে কুরায়েশদের প্রতিশ্রুতিভঙ্গ ও চুক্তিলঙ্ঘনের পাশাপাশি আরবভূখণ্ডে মুসলমানদের শক্তি ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির ফলে রসূল সা.-এর সামনে মক্কা বিজয়ের সুযোগ আসে। রসূল সা. সুযোগটি হাতছাড়া না করে চুক্তি ভঙ্গ করার অপরাধে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। এ লক্ষ্যে তিনি এমন এক বাহিনী তৈরি করেন, হিজাযে যার দৃষ্টান্ত ইতোপূর্বে দেখা যায়নি। এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল দশ হাজার।
টিকাঃ
১১৭২. আত তারীখুস সিয়াসি ওয়াল আসকারী: ৩৬৫।
১১৭৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৪৭৯।
১১২৪. মুইনুস সিরাত: ৩৯৫।
১১৭৫. আত তারীখুল ইসলামী লিলহুমাইদী: ৭/১৭০-১৭১।
১১৭৬. আবু ফারিস প্রণীত আসসীরাহ: ৪০১।
১১৭৭. আল কামেল ফিত তারিখ: ২/২৪৪। আত তারীখুস সিয়াসি ওয়াল আসকারী: ৩৬৬।
📄 যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি
রসূল সা. আমাদের হাতে কলমে শিখিয়েছেন কীভাবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কীভাবে সমাজ সংস্কার ও বিনির্মানে ভূমিকা রাখতে হবে। সেনাবাহিনী প্রেরণ ও যুদ্ধযাত্রার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য কখন কীভাবে আসবে, তারও নিয়ম শিখিয়ে গেছেন তিনি। যুদ্ধের জন্য রসূল সা. আত্মিক ও বাহ্যিক উভয় ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। মক্কা অভিযানে যাত্রার আগেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তাই আমরা দেখতে পাই, নবীজি সা. যখন মক্কা অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি সংবাদটি গোপন রাখেন। এর কারণ ছিল কাফেররা যেন নবীজির এই যুদ্ধযাত্রার খবর জানতে না পারে। ফলে তারা মুসলমানদের প্রতিরোধের সুযোগ পাবে না। হঠাৎ তাদের ওপর আক্রমণের উদ্দেশ্যে রসূল সা. বেশ কিছু পদক্ষেপ নেন। যেমন:
📄 নিকটজনদের কাছেও অভিযানের বিষয় গোপন রাখা
ক. রসূল সা. এই অভিযানের যাবতীয় তথ্য সম্পূর্ণভাবে গোপন রাখেন। এমনকি তার সবচেয়ে কাছের মানুষ আবু বকর রা. এবং অন্যান্য সাহাবীদের কাছ থেকেও তা গোপন রাখা হয়। তার সবচাইতে প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েশা রা.-কেও তিনি এ ব্যাপারে কিছুই অবহিত করেননি। তাই কেউ আল্লাহর রসূল সা.-এর গন্তব্যস্থল, প্রস্তুতির কারণ বা কোন শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাচ্ছেন, এসব বিষয়ে জানতে পারেনি। এর একটি প্রমাণ হচ্ছে, আবু বকর সিদ্দীক রা. যখন তার মেয়ে আয়েশা রা.-কে রসূল সা.-এর গন্তব্যস্থল সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, রসূল সা. এ সম্পর্কে আমাকে কিছুই বলেননি।
নবীজির এই কৌশল দ্বারা বোঝা যায়, সামরিক কর্মকর্তাদের উচিত নিজেদের কর্মপরিকল্পনা ক্ষেত্র বিশেষে নিজেদের আপনজন এমনকি স্ত্রীদের কাছেও গোপন রাখা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা নিজেদের অজ্ঞতাবশত এ ধরনের কথা কারও কাছে ফাঁস করে দেন, এর ফলে পরে অযাচিত বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
টিকাঃ
১১৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/২৮২। আর রসূলুল কায়েদ : ৩৩৩-৩৩৪।
১১৭৯. আল কিয়াদাতুল আসকারীয়াহ ফি আহদির রসূল: ৩৯৫-৩৯৬।