📄 নেতার সম্মানর নববী শিক্ষা
আউফ ইবনে মালিক আসজায়ী রা. বলেন, আমি যায়েদ ইবনে হারেসা রা.-এর সাথে মুতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমার সাথে আমার ইয়েমেনের এক হিময়ারী মিত্রও ছিল। রোমান বাহিনীর সাথে একপর্যায়ে আমাদের যুদ্ধ বাধে। তাদের একব্যক্তি লাল রঙের একটি উটে চড়ে পরিপূর্ণ অস্ত্র ও বর্মে সজ্জিত হয়ে মুসলমানদের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ করে। আমার সঙ্গী হিময়ারী ভাইটি একটি পাথরের পেছনে তার জন্য ওঁত পেতে বসেন। রোমান লোকটি তার সামনে দিয়ে অতিক্রমকালে তরবারির আঘাতে সে তার ঘোড়ার পা কেটে দেয়। রোমান ব্যক্তিটি পলায়ন করতে চাইলেও তিনি ধাওয়া করে তাকে আক্রমণ করে হত্যা করেন। ঘোড়াসহ তার যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র নিজের কাছে রাখেন।
মহান আল্লাহ যখন মুসলিমদের বিজয় দিলেন, খালেদ ইবনুল ওয়ালীদ রা. লোক পাঠিয়ে তার কাছ থেকে মালপত্র নিয়ে নিলেন। আউফ রা. বলেন, আমি এসে বললাম, হে খালেদ! তুমি কি জানো না, রসূলুল্লাহ সা. নিহতের মালপত্র হত্যাকারীকে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু আমার ধারণা, এক্ষেত্রে এটা বেশি হয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, তার মাল অবশ্যই তাকে ফেরত দাও। অন্যথায় তোমার এ কাজের কথা রসূলুল্লাহ সা.-কে অবহিত করবো। তিনি লোকটিকে তার প্রাপ্য ফেরত দিতে অসম্মতি জানান।
আউফ রা. বলেন, আমরা যখন রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট সমবেত হই, ইয়েমেনীর ঘটনাটি তাঁকে জানাই এবং খালেদের আচরণের কথাও অবহিত করি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, হে খালেদ! এই কাজ কেন করলে? তিনি বললেন, আল্লাহর রসূল! আমার কাছে তার জন্য এই মালপত্র বেশি মনে হয়েছে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, খালেদ! তার প্রাপ্য থেকে তুমি যা নিয়েছো তা তাকে ফেরত দাও। আউফ রা. বলেন, আমি বললাম, হে খালেদ! এখন হলো তো, তোমাকে যা বলেছিলাম। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, এ কী কথা! আউফ রা. বললেন, আমি তাকে আমাদের পরস্পরের বিতর্কের কথা বললাম। রসূলুল্লাহ সা. এতে অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, হে খালেদ! তুমি তার মাল ফিরিয়ে দিও না। তোমরা কি আমার নিযুক্ত নেতাদের পরিত্যাগ করবে? তারা ভালো করলে তা থেকে তোমরা উপকৃত হবে, আর খারাপ করলে সেটা তাদের উপর চাপিয়ে দেবে?
নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে মানবিক প্রবৃত্তির কারণে ভুলত্রুটি হতে পারে। কিন্তু এমন ভুলত্রুটির ক্ষেত্রে তাদের লজ্জা না দেওয়া নবীজির আদর্শ। তাদের অপমান ও কুৎসা রটনা ব্যতীত তাদের শোধরানোর পরামর্শ দিতে হবে। হিময়ার গোত্রের সেই মুজাহিদকে নিহত ব্যক্তির যাবতীয় সম্পত্তি দিতে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তিনি এতে মুজাহিদকে অপমান করেননি বরং তার ইজতিহাদের ভিত্তিতে সর্বসাধারণের সুবিধার্থে এ ধরনের বিধান প্রয়োগ করেছিলেন। যেন একজন সৈন্য বেশি পরিমাণ সম্পদ পেয়ে না যায়।
আউফ ইবনে মালেক রা. যখন খালেদ ইবনে ওয়ালীদকে এ থেকে নিবৃত করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি যথার্থ করেছিলেন এবং তাকে বাস্তব মাসআলা সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ যখন তার কথা গ্রহণ করলেন না, তখন তিনি এ ব্যাপারে আল্লাহর রসূল সা.-কে জানান। এ পর্যন্ত তার কাজ সত্য ও ন্যায়ের সঙ্গে সুন্দর ও সুষ্ঠু ছিল। তার উচিত ছিল শুধু সত্যিকার পাওনাদারকে তার পাওনা পৌছে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করা। কিন্তু তিনি সেখানেই থেমে থাকেননি। বরং বিষয়টাকে ব্যক্তিগত বিজয় ও প্রতিশোধস্পৃহায় পরিণত করেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনি খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-কে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেন। তাই রসূল সা. আউফ রা.-কে সমর্থন করেননি। তাকে কঠোরভাবে সাবধান করেন। নেতার অধিকার সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকতে বলেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রসূল সা. খালেদ ইবনে ওয়ালীদকে নিহত ব্যক্তির অস্ত্রশস্ত্র হিময়ারি মুজাহিদকে ফিরিয়ে না দেওয়ার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, এর মাধ্যমে কি উক্ত মুজাহিদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়নি? নিঃসন্দেহে এ কথা বলা যায়, রসূল সা. একজনের অপরাধে অবশ্যই অপরকে শাস্তি দেননি। হয়তো রসূল সা. উক্ত পাওনাদার মুজাহিদকে এ ফয়সালার ব্যাপারে সম্মত করেছিলেন। অবশ্য এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা মেলেনি।
যারা আমীরের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, তারা উন্নত সভ্যতার অধিকারি হতে পারে না। নববী আদর্শ উম্মতকে এ ব্যাপারে একটি উন্নত নীতিমালা দিয়েছে। প্রতিটি ব্যক্তিকে তার অবস্থান বিবেচনা করে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি ব্যক্তিকে ধর্মীয় বিবেচনায় তার যোগ্য স্থান প্রদান করা উচিত এবং আল্লাহর নির্ধারিত নিজ নিজ গন্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِۦ فَسَوْفَ يَأْتِى ٱللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُۥٓ أَذِلَّةٍ عَلَى ٱلْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى ٱلْكَٰفِرِينَ يُجَٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَآئِمٍۢ ۚ ذَٰلِكَ فَضْلُ ٱللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَآءُ ۚ وَ ٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ
হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার দীন থেকে ফিরে যাবে তাহলে অচিরেই আল্লাহ এমন কওমকে আনবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালবাসবে। তারা মুমিনদের উপর বিনম্র এবং কাফেরদের উপর কঠোর হবে। আল্লাহর রাস্তায় তারা জিহাদ করবে এবং কোনো কটাক্ষকারীর কটাক্ষকে ভয় করবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে তা দান করেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।
রসূল সা. বলেছেন, 'তোমরা কি আমার পক্ষ থেকে নির্বাচিত আমীরকে ক্ষমা করতে পারো না?' এর দ্বারা খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-এর মর্যাদার বোঝা যায়। কেননা, আল্লাহর রসূল সা. তাকে নিজের পক্ষ থেকে নির্বাচিত আমীর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এভাবেই রসূল সা. মানুষের যথাযথ সম্মান করতেন।
টিকাঃ
১১৬০. সুনানে আবু দাউদ: ২৭১৯।
১১৬১. আত তারীখুল ইসলামী: ৭/১৩০।
১১৬২. সুরা মায়েদা: ৫৪।
১১৬৩. বাটার चोर... [OCR ত্রুটির কারণে এই অংশটি অসম্পূর্ণ এবং বোধগম্য নয়]
📄 ঈমানের পরিমাপ ও রণাঙ্গনে তার প্রভাব
মাআন প্রান্তরে শত্রুবাহিনীর সংখ্যাধিক্যের ব্যাপারে আলোচনার জন্য মুজাহিদরা বৈঠকে বসেছিল। مسلمانوں বাহ্যিক সরঞ্জামের স্বল্পতা তাদের যুদ্ধে যেতে বারণ করেছিল। কিন্তু তবুও নিজেদের ঈমানীশক্তিতে বলিয়ান হয়ে আধ্যাত্মিক শক্তির ওপর ভরসা করে তারা যুদ্ধে অংশ নেন। তারা ভেবেছিলেন, যেহেতু তারা শাহাদাতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়েছেন, নিজেদের লক্ষ্যকে সামনে দেখেও কেন তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে পিছু হটবেন?
যায়েদ ইবনে আরকাম রা. বলেন, আমি এতিম অবস্থায় আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হচ্ছিলাম। এ যুদ্ধে তিনি আমাকে তার সাথে নিয়ে যান। রাতে তিনি আবৃত্তি করছিলেন: 'মুসলমানরা আমাকে সিরিয়ায় এমন জায়গায় রেখে গেলো যেখানে থাকতে আমি খুব আগ্রহী।'
এই কবিতা শুনে আমি কাঁদতে লাগলাম। তিনি আমাকে চাবুক দিয়ে মৃদু আঘাত করে বললেন, হে ভীতু, যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে শাহাদাতের সৌভাগ্য দান করেন, তাতে তোমার কি কোনো ক্ষতি আছে? স্বাধীনভাবে তুমি বাহনে চড়ে নিজের এলাকায় ফিরতে পারবে।
কেবল অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে কোনো জাতি বিজয় লাভ করতে পারে না। আত্মিক শক্তিতে বলিয়ান হওয়া বিজয়ের জন্য পূর্বশর্ত। ইবনে কাসীর রহ. এ যুদ্ধ সম্পর্কে বলেন, বিস্ময়ের অন্ত থাকে না, যখন দেখি দুটি ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করছে। একটি দল আল্লাহর পথে নিজেদের উৎসর্গ করছে, যাদের সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার। অন্যদিকে কাফেরদের বাহিনী যাদের সংখ্যা ২ লাখ; সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত ১ লাখ রোমান অন্য ১ লাখ আরবের খ্রিষ্টান বাহিনী। যারা সম্মুখযুদ্ধ ও সাধারণ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তবুও मुसलमानों মাত্র ১২ জন শাহাদাতবরণ করেন এবং কাফেরদের অসংখ্য সৈন্য মারা যায়। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. বর্ণনা করেন, সেদিনের যুদ্ধে আমার হাতে নয়টি তলোয়ার ভেঙে যায়। শেষ পর্যন্ত আমার হাতে শুধু একটি ইয়েমেনি ছোটো খঞ্জর ছিল। তিনি তার এসব তরবারির মাধ্যমে সেদিন কতজন খ্রিষ্টান সৈন্যকে মৃত্যুর উপত্যকায় পৌঁছে দিয়েছিলেন তা সহজেই অনুমান করা যায়। অন্যদের আলোচনা না হয় বাদই থাকুক, এই সংখ্যাটাও কি কম? অন্যান্য মুসলমানরাও অসংখ্য খ্রিষ্টান সৈন্যকে হত্যা করেছিলেন।
টিকাঃ
১১৬৪. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/২৪-২৫।
১১৬৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৫৯।
📄 মুতার শহীদদের উদ্দেশে কাআব ইবনে মালেক রা.-এর কবিতা
في ليلة وردت علي همومها طورا أخن وتارة أتمهل واعتادني حزن فبت كأنني ببنات نعش والسماك موكل وكأنما بين الجوانح والحشا مما تأوبني شهاب مدخل وجدا على النفر الذين تتابعوا يوما بمؤتة أسندوا لم ينقلوا صلى الإله عليهم من فتية وسقى عظامهم الغمام المسبل صبروا بمؤتة للإله نفوسهم حذر الردى ومخافة أن ينكلوا فمضوا أمام المسلمين كأنهم فنق عليهن الحديد المرفل إذ يهتدون بجعفر ولوائه حيث التقى وعث الصفوف فتغير القمر المنير لفقده والشمس قد كسفت وكادت تأفل
এ অশ্রুপাত ঘটেছে এমন একরাতে যে রাতে আমার ওপর দুঃখ নেমে এসেছে। কোনো কোনো সময় আমি সশব্দে কাঁদি আবার কোনো কোনো সময় আমি তাতে বিরতি দেই। আমাকে দুশ্চিন্তা এতই নাজেহাল করেছে যে, বিনিদ্র রাত যাপন করার সময় আমি যেন সপ্তর্ষিমণ্ডল ও মীন রাশির দায়িত্বে নিয়োজিত। পাঁজর ও নাড়িভুঁড়ির মধ্যভাগে অবস্থান করছে একটি উল্কা (নকশা) যা আমাকে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য করেছে এবং ক্রোধান্বিত করেছে ওই সমস্ত লোককে যারা মুতার যুদ্ধে সেনাপতির আদেশের অনুগত ছিল, আদেশ পালনে নিষ্ঠাবান ছিল এবং বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। আল্লাহ্ তা'আলা এরূপ তরুণদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন এবং বৃষ্টিতে পরিপূর্ণ মেঘখণ্ড দ্বারা তাদের নেতাদেরকে তৃপ্ত করুক।
তারা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যে মৃতার যুদ্ধে ধৈর্য ধারণ করেছিলেন। নিজেদের ধ্বংসকে প্রতিহত করতে এবং পালিয়ে না যাওয়ার প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় থেকে তারা প্রাণপণ যুদ্ধ করেছেন। সাহসী সেনারা সাধারণ মুসলিম সেনাদের সম্মুখভাগে অগ্রসর হলেন। তারা যেন দুঃখের পর শাহাদাতের সুখ ভোগ করতে লাগলেন। তাদের পরনে ছিল প্রলম্বিত লৌহবর্ম। যারা জাফর রা. ও তাঁর হাতে ধারণকৃত পতাকার দ্বারা সঠিক পথের দিশা পেয়েছিলেন। তারা ছিলেন অগ্রগামী দলের সম্মুখে। সেই অগ্রগামী দল কতই না উত্তম দল। এরপর যুদ্ধরত ব্যূহগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। যেখানে সৈন্যের সারিগুলো ভীষণ যুদ্ধে রত ছিল, সেখানে জাফরও এ ভয়াবহ যুদ্ধে যোগদান করেন এবং শাহাদতবরণ করেন। তার শাহাদতের কারণে উজ্জ্বল নক্ষত্র যেন বিবর্ণ হয়ে পড়লো, সূর্য গ্রহণে পতিত হলো ও অস্ত যাওয়ার উপক্রম হলো।
মুতার শহীদদের শোকগাথায় কাআব ইবনে মালেক রা.-এর মতো হাসসান ইবনে সাবিত রা.ও সাহাবায়ে কেরাম, জাফর ইবনে আবু তালিব, যায়েদ ইবনে হারেসা ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-কে নিয়ে মর্মবিদারী কাব্য রচনা করেন।
টিকাঃ
১১৬৬. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/৩৩-৩৪।