📄 নবীজির পক্ষ থেকে জাফর রা.-এর সন্তানদের সম্মান
রসূল সা. জাফর ইবনে আবু তালিব রা.-এর শাহাদাতের পর তার স্ত্রী আসমা বিনতে উমায়েসের কাছে যান। তিনি তাকে লক্ষ্য করে বলেন, জাফরের সন্তানদের আমার সামনে উপস্থিত করো। সন্তানদের তার কাছে আনা হলে আল্লাহর রসূল সা. তাদের কাছে টেনে নেন। আদর করে তাদের চুম্বন করেন এবং কাঁদেন। আসমা রা. বললেন, হে আল্লাহর রসূল! জাফর এবং তার সঙ্গীদের ব্যাপারে আপনার কাছে কোনো সংবাদ পৌঁছেছে কি? রসূল সা. বলেন, তিনি আজ শাহাদাত বরণ করেছেন। এটা শুনে আসমা রা. কাঁদতে থাকেন। রসূল সা. সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে বলেন, জাফরের শোকাহত পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করতে তোমরা ভুলবে না।
এই হাদীস দ্বারা শরীয়তের কিছু মাসআলা উদ্ঘাটিত হয়। যেমন:
স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীর ক্রন্দন করা: রসূল সা. আসমা বিনতে উমায়েসের কাছে জাফর ও তার সঙ্গীদের শাহাদাতের সংবাদ জানালে আসমা উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে থাকেন। রসূল সা. তাকে বাধা দেননি বা তার ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি। এতে বোঝা যায়, স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী কান্নাকাটি করতে পারে। এ ধরনের কান্নাকাটি করা নিষিদ্ধ হলে নিঃসন্দেহে আল্লাহর রসূল সা. তাকে বাঁধা দিতেন। তবে যে ধরনের কান্নাকাটি করা বা শোকগাঁথা গাওয়ার জাহিলি যুগে প্রচলন ছিল, নিঃসন্দেহে ইসলাম তা থেকে মানুষকে নিবৃত্ত করে। এমনিভাবে নিজের মুখমণ্ডলে আঘাত করা, বুকে আঘাত করে মাতম করা ইত্যাদি শরীয়তে নিষিদ্ধ।
মৃত ব্যক্তির পরিবারের জন্য খাবার পাঠানো মুস্তাহাব: রসূল সা. উপস্থিত লোকদের জাফর-এর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের লক্ষ্যে তাদের জন্য খাবার তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এতে মৃত ব্যক্তির আত্মীয় স্বজনের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়। এটা ইসলামী সমাজে সহমর্মিতার অন্যতম ধারা। অথচ এর বিপরীতে দেখা যায় বর্তমানে মুসলমান সমাজে সমবেদনা প্রকাশের জন্য আগমনকারীদের জন্য মৃত ব্যক্তির পরিজনদের খাবার তৈরি করতে হয়। এটা নিঃসন্দেহে একটি গর্হিত কাজ। মুসলমানদের তা থেকে বিরত থাকা চাই।
একই সঙ্গে রসূল সা. তিন দিনের বেশি মৃত ব্যক্তিদের জন্য কাঁদতে নিষেধ করেছেন। রসূল সা. আসমা বিনতে উমায়সের কাছে এসে বলেন, আমার ভাইয়ের জন্য আজকের পর আর কাঁদবে না। তার সন্তানদের আমার কাছে ডেকে আনো। রসূল সা. মাথা মুণ্ডনকারীদের ডেকে এনে তাদের মাথা মুণ্ডন করিয়ে দেন এবং বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে জাফর আমার চাচা আবু তালিবের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং আবদুল্লাহ আকৃতি ও আচরণে আমার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এরপর আবদুল্লাহর হাত ধরে আল্লাহর কাছে দোআ করেন, হে আল্লাহ, জাফরের মৃত্যুর পর এই গৃহবাসীর জন্য আপনি দায়িত্বশীল হোন এবং আবদুল্লাহর ব্যবসাবাণিজ্যে বরকত দান করুন। রসূল সা. তিনবার এ দোআ করেছিলেন।
সন্তানদের মা শিশুদের এতিম হওয়া ও অভাবের বিষয়টি নবীজিকে জানালে তিনি বলেন, তুমি কি এদের ব্যাপারে দারিদ্র্যের ভয় করছো? ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে আমি তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করছি। এটিই ছিল শহীদদের সন্তানদের দায়িত্ব গ্রহণ ও তাদের সম্মানে নবীজির কর্মপদ্ধতি।
আসমা ইবনে উমায়েসের সাথে আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর বিয়ে: আসমা রা.-এর ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর আবু বকর সিদ্দীক রা. তাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। তিনি সম্মতি জানালে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। তার গর্ভেই মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর জন্মলাভ করেন। আবু বকর রা.-এর ইনতেকালের পর আসমা আলী রা.-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দাম্পত্যজীবনেও সন্তান জন্ম গ্রহণ করে।
ইমাম ইবনে কাসীর বর্ণনা করেন, আসমা বিনতে উমায়েস তার দীর্ঘ কবিতায় তার স্বামী জাফর ইবনে আবু তালিবের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহর শপথ! তোমার জন্য আমার অন্তর সবসময় ব্যাকুল এবং আমার দেহ তোমার জন্য ধুলো মিশ্রিত। আল্লাহ এমন চোখের কল্যাণ করুন, যে তোমার মতো যুবককে দেখেছে। যে যুদ্ধক্ষেত্রে বারংবার আক্রমণকারী এবং দৃঢ়পদে যুদ্ধ পরিচালনা করে থাকে।
টিকাঃ
১১৫১. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/২৮।
১১৫২. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ৬৮।
১১৫৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৫২।
১১৫৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৫২।
১১৫৫. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ২/৪৩০।
১১৫৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩৫৩।
১১৫৭. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩৫২।
📄 নেতৃত্বের তাৎপর্য
নবীজির পক্ষ থেকে মনোনীত সর্বশেষ সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-এর শাহাদাতবরণের পর সাবিত ইবনে আকরাম এগিয়ে এসে ইসলামী-বাহিনীর পতাকা তুলে ধরেন। একজন যোদ্ধা হিসেবে তার যা করণীয় ছিল তা-ই তিনি করেছিলেন। কোনো বাহিনীর পতাকা ভূলুণ্ঠিত হওয়া সে বাহিনীর পরাজয় হিসেবে ধরে নেওয়া হয়; তাই তিনি পতাকা সমুন্নত রেখেছিলেন এবং মুসলমানদের চিৎকার করে ডাকছিলেন যেন তারা নিজেদের আমীর নির্বাচন করে নেয়। তাকেই নেতৃত্বের প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি বলছিলেন, এ ভার বহনের শক্তি আমার নেই। এরপর লোকেরা খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-কে নির্বাচন করেন।
আরেক বর্ণনা মতে, সাবিত পতাকা উঠিয়ে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ-এর কাছে গেলে খালেদ তাকে বলছিলেন, আমি আপনার কাছ থেকে এ পতাকা গ্রহণ করবো না। আপনি অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন। উত্তরে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি এ পতাকা আপনাকে দেওয়ার জন্যই নিয়েছিলাম।
দুটি বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, হযরত সাবিত রা. প্রথমে মুসলমানদের একত্র করে যুদ্ধের পতাকা খালেদ রা.-এর হাতে তুলে দেন। তিনি যোগ্য নেতৃত্বের হাতেই দায়িত্ব অর্পণ করেন। যদিও উপস্থিত সবাই তাকে বলছিলেন, আপনি আমির হন। কিন্তু তিনি নিজেকে এ পদে অধিষ্ঠিত করা সমীচীন মনে করেননি। কেননা, তিনি মনে করেছিলেন, এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য উত্তম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি উপস্থিত রয়েছে। অযোগ্য ব্যক্তির কাছে ক্ষমতা অর্পণ করা হলে তাতে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। কোনো কাজ যখন একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য করা হয়ে থাকে, তখন সেখানে কোনো ধরনের মর্যাদা ও প্রতিপত্তির লোভ থাকে না।
সাবিতও মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দিতে অক্ষম ছিলেন না। তিনি বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার চাইতে যোগ্যতম ব্যক্তির উপস্থিতিতে তিনি তা গ্রহণ করা সমীচীন মনে করলেন না। যদিও খালেদ ইবনে ওয়ালীদ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এর মাত্র তিন মাস আগে। কেননা, এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার আদেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়নই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
টিকাঃ
১১৫৮. 'আত তারীখুল ইসলামী: ৭/১২৪।
১১৫৯. মুঈনুস সীরাহ: ৩৭৬।
📄 নেতার সম্মানর নববী শিক্ষা
আউফ ইবনে মালিক আসজায়ী রা. বলেন, আমি যায়েদ ইবনে হারেসা রা.-এর সাথে মুতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমার সাথে আমার ইয়েমেনের এক হিময়ারী মিত্রও ছিল। রোমান বাহিনীর সাথে একপর্যায়ে আমাদের যুদ্ধ বাধে। তাদের একব্যক্তি লাল রঙের একটি উটে চড়ে পরিপূর্ণ অস্ত্র ও বর্মে সজ্জিত হয়ে মুসলমানদের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ করে। আমার সঙ্গী হিময়ারী ভাইটি একটি পাথরের পেছনে তার জন্য ওঁত পেতে বসেন। রোমান লোকটি তার সামনে দিয়ে অতিক্রমকালে তরবারির আঘাতে সে তার ঘোড়ার পা কেটে দেয়। রোমান ব্যক্তিটি পলায়ন করতে চাইলেও তিনি ধাওয়া করে তাকে আক্রমণ করে হত্যা করেন। ঘোড়াসহ তার যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র নিজের কাছে রাখেন।
মহান আল্লাহ যখন মুসলিমদের বিজয় দিলেন, খালেদ ইবনুল ওয়ালীদ রা. লোক পাঠিয়ে তার কাছ থেকে মালপত্র নিয়ে নিলেন। আউফ রা. বলেন, আমি এসে বললাম, হে খালেদ! তুমি কি জানো না, রসূলুল্লাহ সা. নিহতের মালপত্র হত্যাকারীকে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু আমার ধারণা, এক্ষেত্রে এটা বেশি হয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, তার মাল অবশ্যই তাকে ফেরত দাও। অন্যথায় তোমার এ কাজের কথা রসূলুল্লাহ সা.-কে অবহিত করবো। তিনি লোকটিকে তার প্রাপ্য ফেরত দিতে অসম্মতি জানান।
আউফ রা. বলেন, আমরা যখন রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট সমবেত হই, ইয়েমেনীর ঘটনাটি তাঁকে জানাই এবং খালেদের আচরণের কথাও অবহিত করি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, হে খালেদ! এই কাজ কেন করলে? তিনি বললেন, আল্লাহর রসূল! আমার কাছে তার জন্য এই মালপত্র বেশি মনে হয়েছে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, খালেদ! তার প্রাপ্য থেকে তুমি যা নিয়েছো তা তাকে ফেরত দাও। আউফ রা. বলেন, আমি বললাম, হে খালেদ! এখন হলো তো, তোমাকে যা বলেছিলাম। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, এ কী কথা! আউফ রা. বললেন, আমি তাকে আমাদের পরস্পরের বিতর্কের কথা বললাম। রসূলুল্লাহ সা. এতে অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, হে খালেদ! তুমি তার মাল ফিরিয়ে দিও না। তোমরা কি আমার নিযুক্ত নেতাদের পরিত্যাগ করবে? তারা ভালো করলে তা থেকে তোমরা উপকৃত হবে, আর খারাপ করলে সেটা তাদের উপর চাপিয়ে দেবে?
নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে মানবিক প্রবৃত্তির কারণে ভুলত্রুটি হতে পারে। কিন্তু এমন ভুলত্রুটির ক্ষেত্রে তাদের লজ্জা না দেওয়া নবীজির আদর্শ। তাদের অপমান ও কুৎসা রটনা ব্যতীত তাদের শোধরানোর পরামর্শ দিতে হবে। হিময়ার গোত্রের সেই মুজাহিদকে নিহত ব্যক্তির যাবতীয় সম্পত্তি দিতে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তিনি এতে মুজাহিদকে অপমান করেননি বরং তার ইজতিহাদের ভিত্তিতে সর্বসাধারণের সুবিধার্থে এ ধরনের বিধান প্রয়োগ করেছিলেন। যেন একজন সৈন্য বেশি পরিমাণ সম্পদ পেয়ে না যায়।
আউফ ইবনে মালেক রা. যখন খালেদ ইবনে ওয়ালীদকে এ থেকে নিবৃত করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি যথার্থ করেছিলেন এবং তাকে বাস্তব মাসআলা সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ যখন তার কথা গ্রহণ করলেন না, তখন তিনি এ ব্যাপারে আল্লাহর রসূল সা.-কে জানান। এ পর্যন্ত তার কাজ সত্য ও ন্যায়ের সঙ্গে সুন্দর ও সুষ্ঠু ছিল। তার উচিত ছিল শুধু সত্যিকার পাওনাদারকে তার পাওনা পৌছে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করা। কিন্তু তিনি সেখানেই থেমে থাকেননি। বরং বিষয়টাকে ব্যক্তিগত বিজয় ও প্রতিশোধস্পৃহায় পরিণত করেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনি খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-কে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেন। তাই রসূল সা. আউফ রা.-কে সমর্থন করেননি। তাকে কঠোরভাবে সাবধান করেন। নেতার অধিকার সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকতে বলেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রসূল সা. খালেদ ইবনে ওয়ালীদকে নিহত ব্যক্তির অস্ত্রশস্ত্র হিময়ারি মুজাহিদকে ফিরিয়ে না দেওয়ার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, এর মাধ্যমে কি উক্ত মুজাহিদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়নি? নিঃসন্দেহে এ কথা বলা যায়, রসূল সা. একজনের অপরাধে অবশ্যই অপরকে শাস্তি দেননি। হয়তো রসূল সা. উক্ত পাওনাদার মুজাহিদকে এ ফয়সালার ব্যাপারে সম্মত করেছিলেন। অবশ্য এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা মেলেনি।
যারা আমীরের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, তারা উন্নত সভ্যতার অধিকারি হতে পারে না। নববী আদর্শ উম্মতকে এ ব্যাপারে একটি উন্নত নীতিমালা দিয়েছে। প্রতিটি ব্যক্তিকে তার অবস্থান বিবেচনা করে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি ব্যক্তিকে ধর্মীয় বিবেচনায় তার যোগ্য স্থান প্রদান করা উচিত এবং আল্লাহর নির্ধারিত নিজ নিজ গন্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِۦ فَسَوْفَ يَأْتِى ٱللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُۥٓ أَذِلَّةٍ عَلَى ٱلْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى ٱلْكَٰفِرِينَ يُجَٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَآئِمٍۢ ۚ ذَٰلِكَ فَضْلُ ٱللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَآءُ ۚ وَ ٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ
হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার দীন থেকে ফিরে যাবে তাহলে অচিরেই আল্লাহ এমন কওমকে আনবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালবাসবে। তারা মুমিনদের উপর বিনম্র এবং কাফেরদের উপর কঠোর হবে। আল্লাহর রাস্তায় তারা জিহাদ করবে এবং কোনো কটাক্ষকারীর কটাক্ষকে ভয় করবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে তা দান করেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।
রসূল সা. বলেছেন, 'তোমরা কি আমার পক্ষ থেকে নির্বাচিত আমীরকে ক্ষমা করতে পারো না?' এর দ্বারা খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-এর মর্যাদার বোঝা যায়। কেননা, আল্লাহর রসূল সা. তাকে নিজের পক্ষ থেকে নির্বাচিত আমীর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এভাবেই রসূল সা. মানুষের যথাযথ সম্মান করতেন।
টিকাঃ
১১৬০. সুনানে আবু দাউদ: ২৭১৯।
১১৬১. আত তারীখুল ইসলামী: ৭/১৩০।
১১৬২. সুরা মায়েদা: ৫৪।
১১৬৩. বাটার चोर... [OCR ত্রুটির কারণে এই অংশটি অসম্পূর্ণ এবং বোধগম্য নয়]
📄 ঈমানের পরিমাপ ও রণাঙ্গনে তার প্রভাব
মাআন প্রান্তরে শত্রুবাহিনীর সংখ্যাধিক্যের ব্যাপারে আলোচনার জন্য মুজাহিদরা বৈঠকে বসেছিল। مسلمانوں বাহ্যিক সরঞ্জামের স্বল্পতা তাদের যুদ্ধে যেতে বারণ করেছিল। কিন্তু তবুও নিজেদের ঈমানীশক্তিতে বলিয়ান হয়ে আধ্যাত্মিক শক্তির ওপর ভরসা করে তারা যুদ্ধে অংশ নেন। তারা ভেবেছিলেন, যেহেতু তারা শাহাদাতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়েছেন, নিজেদের লক্ষ্যকে সামনে দেখেও কেন তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে পিছু হটবেন?
যায়েদ ইবনে আরকাম রা. বলেন, আমি এতিম অবস্থায় আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হচ্ছিলাম। এ যুদ্ধে তিনি আমাকে তার সাথে নিয়ে যান। রাতে তিনি আবৃত্তি করছিলেন: 'মুসলমানরা আমাকে সিরিয়ায় এমন জায়গায় রেখে গেলো যেখানে থাকতে আমি খুব আগ্রহী।'
এই কবিতা শুনে আমি কাঁদতে লাগলাম। তিনি আমাকে চাবুক দিয়ে মৃদু আঘাত করে বললেন, হে ভীতু, যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে শাহাদাতের সৌভাগ্য দান করেন, তাতে তোমার কি কোনো ক্ষতি আছে? স্বাধীনভাবে তুমি বাহনে চড়ে নিজের এলাকায় ফিরতে পারবে।
কেবল অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে কোনো জাতি বিজয় লাভ করতে পারে না। আত্মিক শক্তিতে বলিয়ান হওয়া বিজয়ের জন্য পূর্বশর্ত। ইবনে কাসীর রহ. এ যুদ্ধ সম্পর্কে বলেন, বিস্ময়ের অন্ত থাকে না, যখন দেখি দুটি ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করছে। একটি দল আল্লাহর পথে নিজেদের উৎসর্গ করছে, যাদের সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার। অন্যদিকে কাফেরদের বাহিনী যাদের সংখ্যা ২ লাখ; সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত ১ লাখ রোমান অন্য ১ লাখ আরবের খ্রিষ্টান বাহিনী। যারা সম্মুখযুদ্ধ ও সাধারণ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তবুও मुसलमानों মাত্র ১২ জন শাহাদাতবরণ করেন এবং কাফেরদের অসংখ্য সৈন্য মারা যায়। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. বর্ণনা করেন, সেদিনের যুদ্ধে আমার হাতে নয়টি তলোয়ার ভেঙে যায়। শেষ পর্যন্ত আমার হাতে শুধু একটি ইয়েমেনি ছোটো খঞ্জর ছিল। তিনি তার এসব তরবারির মাধ্যমে সেদিন কতজন খ্রিষ্টান সৈন্যকে মৃত্যুর উপত্যকায় পৌঁছে দিয়েছিলেন তা সহজেই অনুমান করা যায়। অন্যদের আলোচনা না হয় বাদই থাকুক, এই সংখ্যাটাও কি কম? অন্যান্য মুসলমানরাও অসংখ্য খ্রিষ্টান সৈন্যকে হত্যা করেছিলেন।
টিকাঃ
১১৬৪. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/২৪-২৫।
১১৬৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৫৯।