📄 এই যুদ্ধের তাৎপর্য
মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে এই যুদ্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হয়। উভয় দলের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ। এটা রোমান সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত ইতিহাসে অত্যন্ত প্রভাবক ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে সিরিয়ান অঞ্চলসমূহের বিজয় ও রোমানদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার দ্বার উন্মোচন করেছিল এই যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ছিল রসূল সা.-এর পক্ষ থেকে একটি আক্রমণাত্মক হামলা। এ যুদ্ধের ফলে গোটা আরবের মনে বিপুলভাবে পড়েছিল মুসলমানদের প্রভাব। প্রকৃত বিচারে, এই যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানরা রোমানদের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে অবগতি লাভ করে। তাদের রণকৌশল সম্পর্কেও ধারণা পায়।
টিকাঃ
১১৪৯. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ৬৪।
📄 মুতা অভিযানের বৈশিষ্ট্য
মুতা এমন এক যুদ্ধ যার সংবাদ রসূল সা.-এর কাছে ওহির মাধ্যমে পৌছানো হয়। তিনজন কমান্ডারের শাহাদাতের সংবাদ নিয়মমাফিক সংবাদ আসার পূর্বেই জানানো হয়েছিল নবীজিকে। শুধু তাই নয়, রসূল সা. এই যুদ্ধের অন্যান্য কার্যক্রমের কথাও জানিয়ে দিয়েছিলেন খবর আসার আগেই। অন্যান্য যুদ্ধের তুলনায় এ যুদ্ধের আরেকটি বিশেষত্ব হলো, রসূল সা. এই যুদ্ধের মুজাহিদদের জন্য একের পর এক তিন জন আমীর নির্বাচন করেছিলেন। তম্মধ্যে প্রথমে যায়েদ ইবনে হারেসা, এরপর জাফর ইবনে আবু তালিব, এরপর আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা. ছিলেন।
টিকাঃ
১১৫০. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ৬৬।
📄 নবীজির পক্ষ থেকে জাফর রা.-এর সন্তানদের সম্মান
রসূল সা. জাফর ইবনে আবু তালিব রা.-এর শাহাদাতের পর তার স্ত্রী আসমা বিনতে উমায়েসের কাছে যান। তিনি তাকে লক্ষ্য করে বলেন, জাফরের সন্তানদের আমার সামনে উপস্থিত করো। সন্তানদের তার কাছে আনা হলে আল্লাহর রসূল সা. তাদের কাছে টেনে নেন। আদর করে তাদের চুম্বন করেন এবং কাঁদেন। আসমা রা. বললেন, হে আল্লাহর রসূল! জাফর এবং তার সঙ্গীদের ব্যাপারে আপনার কাছে কোনো সংবাদ পৌঁছেছে কি? রসূল সা. বলেন, তিনি আজ শাহাদাত বরণ করেছেন। এটা শুনে আসমা রা. কাঁদতে থাকেন। রসূল সা. সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে বলেন, জাফরের শোকাহত পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করতে তোমরা ভুলবে না।
এই হাদীস দ্বারা শরীয়তের কিছু মাসআলা উদ্ঘাটিত হয়। যেমন:
স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীর ক্রন্দন করা: রসূল সা. আসমা বিনতে উমায়েসের কাছে জাফর ও তার সঙ্গীদের শাহাদাতের সংবাদ জানালে আসমা উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে থাকেন। রসূল সা. তাকে বাধা দেননি বা তার ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি। এতে বোঝা যায়, স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী কান্নাকাটি করতে পারে। এ ধরনের কান্নাকাটি করা নিষিদ্ধ হলে নিঃসন্দেহে আল্লাহর রসূল সা. তাকে বাঁধা দিতেন। তবে যে ধরনের কান্নাকাটি করা বা শোকগাঁথা গাওয়ার জাহিলি যুগে প্রচলন ছিল, নিঃসন্দেহে ইসলাম তা থেকে মানুষকে নিবৃত্ত করে। এমনিভাবে নিজের মুখমণ্ডলে আঘাত করা, বুকে আঘাত করে মাতম করা ইত্যাদি শরীয়তে নিষিদ্ধ।
মৃত ব্যক্তির পরিবারের জন্য খাবার পাঠানো মুস্তাহাব: রসূল সা. উপস্থিত লোকদের জাফর-এর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের লক্ষ্যে তাদের জন্য খাবার তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এতে মৃত ব্যক্তির আত্মীয় স্বজনের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়। এটা ইসলামী সমাজে সহমর্মিতার অন্যতম ধারা। অথচ এর বিপরীতে দেখা যায় বর্তমানে মুসলমান সমাজে সমবেদনা প্রকাশের জন্য আগমনকারীদের জন্য মৃত ব্যক্তির পরিজনদের খাবার তৈরি করতে হয়। এটা নিঃসন্দেহে একটি গর্হিত কাজ। মুসলমানদের তা থেকে বিরত থাকা চাই।
একই সঙ্গে রসূল সা. তিন দিনের বেশি মৃত ব্যক্তিদের জন্য কাঁদতে নিষেধ করেছেন। রসূল সা. আসমা বিনতে উমায়সের কাছে এসে বলেন, আমার ভাইয়ের জন্য আজকের পর আর কাঁদবে না। তার সন্তানদের আমার কাছে ডেকে আনো। রসূল সা. মাথা মুণ্ডনকারীদের ডেকে এনে তাদের মাথা মুণ্ডন করিয়ে দেন এবং বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে জাফর আমার চাচা আবু তালিবের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং আবদুল্লাহ আকৃতি ও আচরণে আমার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এরপর আবদুল্লাহর হাত ধরে আল্লাহর কাছে দোআ করেন, হে আল্লাহ, জাফরের মৃত্যুর পর এই গৃহবাসীর জন্য আপনি দায়িত্বশীল হোন এবং আবদুল্লাহর ব্যবসাবাণিজ্যে বরকত দান করুন। রসূল সা. তিনবার এ দোআ করেছিলেন।
সন্তানদের মা শিশুদের এতিম হওয়া ও অভাবের বিষয়টি নবীজিকে জানালে তিনি বলেন, তুমি কি এদের ব্যাপারে দারিদ্র্যের ভয় করছো? ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে আমি তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করছি। এটিই ছিল শহীদদের সন্তানদের দায়িত্ব গ্রহণ ও তাদের সম্মানে নবীজির কর্মপদ্ধতি।
আসমা ইবনে উমায়েসের সাথে আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর বিয়ে: আসমা রা.-এর ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর আবু বকর সিদ্দীক রা. তাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। তিনি সম্মতি জানালে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। তার গর্ভেই মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর জন্মলাভ করেন। আবু বকর রা.-এর ইনতেকালের পর আসমা আলী রা.-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দাম্পত্যজীবনেও সন্তান জন্ম গ্রহণ করে।
ইমাম ইবনে কাসীর বর্ণনা করেন, আসমা বিনতে উমায়েস তার দীর্ঘ কবিতায় তার স্বামী জাফর ইবনে আবু তালিবের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহর শপথ! তোমার জন্য আমার অন্তর সবসময় ব্যাকুল এবং আমার দেহ তোমার জন্য ধুলো মিশ্রিত। আল্লাহ এমন চোখের কল্যাণ করুন, যে তোমার মতো যুবককে দেখেছে। যে যুদ্ধক্ষেত্রে বারংবার আক্রমণকারী এবং দৃঢ়পদে যুদ্ধ পরিচালনা করে থাকে।
টিকাঃ
১১৫১. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/২৮।
১১৫২. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ৬৮।
১১৫৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৫২।
১১৫৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৫২।
১১৫৫. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ২/৪৩০।
১১৫৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩৫৩।
১১৫৭. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩৫২।
📄 নেতৃত্বের তাৎপর্য
নবীজির পক্ষ থেকে মনোনীত সর্বশেষ সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-এর শাহাদাতবরণের পর সাবিত ইবনে আকরাম এগিয়ে এসে ইসলামী-বাহিনীর পতাকা তুলে ধরেন। একজন যোদ্ধা হিসেবে তার যা করণীয় ছিল তা-ই তিনি করেছিলেন। কোনো বাহিনীর পতাকা ভূলুণ্ঠিত হওয়া সে বাহিনীর পরাজয় হিসেবে ধরে নেওয়া হয়; তাই তিনি পতাকা সমুন্নত রেখেছিলেন এবং মুসলমানদের চিৎকার করে ডাকছিলেন যেন তারা নিজেদের আমীর নির্বাচন করে নেয়। তাকেই নেতৃত্বের প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি বলছিলেন, এ ভার বহনের শক্তি আমার নেই। এরপর লোকেরা খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-কে নির্বাচন করেন।
আরেক বর্ণনা মতে, সাবিত পতাকা উঠিয়ে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ-এর কাছে গেলে খালেদ তাকে বলছিলেন, আমি আপনার কাছ থেকে এ পতাকা গ্রহণ করবো না। আপনি অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন। উত্তরে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি এ পতাকা আপনাকে দেওয়ার জন্যই নিয়েছিলাম।
দুটি বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, হযরত সাবিত রা. প্রথমে মুসলমানদের একত্র করে যুদ্ধের পতাকা খালেদ রা.-এর হাতে তুলে দেন। তিনি যোগ্য নেতৃত্বের হাতেই দায়িত্ব অর্পণ করেন। যদিও উপস্থিত সবাই তাকে বলছিলেন, আপনি আমির হন। কিন্তু তিনি নিজেকে এ পদে অধিষ্ঠিত করা সমীচীন মনে করেননি। কেননা, তিনি মনে করেছিলেন, এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য উত্তম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি উপস্থিত রয়েছে। অযোগ্য ব্যক্তির কাছে ক্ষমতা অর্পণ করা হলে তাতে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। কোনো কাজ যখন একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য করা হয়ে থাকে, তখন সেখানে কোনো ধরনের মর্যাদা ও প্রতিপত্তির লোভ থাকে না।
সাবিতও মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দিতে অক্ষম ছিলেন না। তিনি বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার চাইতে যোগ্যতম ব্যক্তির উপস্থিতিতে তিনি তা গ্রহণ করা সমীচীন মনে করলেন না। যদিও খালেদ ইবনে ওয়ালীদ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এর মাত্র তিন মাস আগে। কেননা, এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার আদেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়নই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
টিকাঃ
১১৫৮. 'আত তারীখুল ইসলামী: ৭/১২৪।
১১৫৯. মুঈনুস সীরাহ: ৩৭৬।