📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 পটভূমি ও সময়

📄 পটভূমি ও সময়


মুসলমান এবং বাইজেন্টাইনদের মধ্যে যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে দিতে তৎপর হয়ে ওঠে সিরিয়ান আরবরা। দাওমাতুল জান্দালে অবস্থানকারী কুযাআ গোত্রের বনু কালব মুসলমানদের উত্যক্ত করতে থাকে। সিরিয়া থেকে মদীনায় প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নিয়ে ব্যবসায়িক কাজে যাতায়াত করা মুসলিম কাফেলাকে আক্রমণ করে তারা মদীনার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করে। রসূল সা. তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পঞ্চম হিজরিতে দাওমাতুল জান্দাল অভিমুখে সেনাবাহিনী পাঠান। সংবাদ পেয়ে তারা পালিয়ে যায় বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে।

অন্যদিকে, রসূল সা. দিহয়া কালবী রা.-কে বিশেষ একটি কাজে পাঠিয়েছিলেন। দায়িত্ব পালন শেষে তিনি ফিরে আসার সময় জুযাম ও লাখম গোত্রের কিছু লোক তাকে হিসমা নামক স্থানে অবরুদ্ধ করে তার সবকিছু ছিনতাই করে নিয়ে যায়। ষষ্ঠ হিজরিতে হিসমা অভিমুখে যায়েদ ইবনে হারেসা রা.-এর সারিয়া এ কারণেই সংঘটিত হয়েছিল।

একই সঙ্গে মুজহায ও কুযাআ গোত্রের লোকেরা ষষ্ঠ হিজরিতে ইসলামের দাওয়াতের উদ্দেশ্যে পাঠানো যায়েদ ইবনে হারেসা রা.-এর বাহিনীর ওপর যে ধরনের অন্যায় অত্যাচার করে, সেটিও ছিল এই যুদ্ধের একটি কারণ।

হুদায়বিয়ার সন্ধির পরের ঘটনা। বুসরের গভর্নর ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অধীন। তার কাছে রসূল সা. হারেস ইবনে উমায়ের রা.-কে দূত হিসেবে পাঠান। কিন্তু তারা তাকে শহীদ করে দেয়। আবার একই সঙ্গে তাদের পক্ষ থেকে মুসলমানদের ওপর হামলার আশঙ্কা দিন দিন বাড়তে থাকে।

দূত ও বার্তাবাহকদের সাথে সম্মানজনক আচরণের সর্বস্বীকৃত রীতি-নীতির তোয়াক্কা না করে শুরাহবিল ইবনে আমর গাসসানী রসূল সা.-এর প্রেরিত বার্তাবাহক হারেস ইবনে উমায়েরকে নির্মমভাবে শহীদ করে। দামেস্কের শাসনকর্তা হারেস ইবনে আবু সিমার গাসসানীও রসূলুল্লাহ সা.-এর বার্তাবাহকদের সাথে অভদ্র আচরণ করে এবং মদীনা আক্রমণের হুমকি দেয়। একে একে এ ধরনের কয়েকটি নিন্দনীয় ঘটনা প্রকাশ পেলে রসূল সা. আমর ইবনে কাআব গিফারী রা.-এর নেতৃত্বে 'যাতু আতলা' নামক অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াতের উদ্দ্যেশ্যে একটি বাহিনী পাঠান। কিন্তু সেখানকার মানুষেরা সাহাবীদের চারদিক থেকে ঘেরাও করে আক্রমণ করে নির্মমভাবে শহীদ করে দেয়। রক্তাক্ত আহত দলনেতা জীবিত অবস্থায় মদীনায় এসে পৌঁছতে সক্ষম হন। তিনি রসূল সা.-কে পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন।

এদিকে সিরিয়ার খ্রিষ্টানেরা রোমান সাম্রাজ্যের মদদপুষ্ট হয়ে সেখানকার মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করতে থাকে। ইসলাম গ্রহণের অভিযোগে তারা নির্মমভাবে শহীদ করে মাআন অঞ্চলের গভর্নরকে। এমনিভাবে সিরিয়ান আরবে কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলেই তাকে হত্যা করা হতো।

রসূল সা.-এর দূত হারেস ইবনে উমায়ের রা.-এর শাহাদাতসহ একের পর এক এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড ও রোমানদের জুলুম মুসলমানদের অন্তরজ্বালা বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। শুধু মহান রাব্বুল আলামিন-এর ওপর ঈমান এবং মুহাম্মাদ সা.-কে আল্লাহর রসূল মানার অপরাধে মানুষের ওপর চালানো এই অত্যাচার নির্যাতনে মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন।

একই সাথে রোমান শাসকদের অনুগত যেসব আরব মুসলমানদের উত্ত্যক্ত করছিল এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দিয়ে ইসলামধর্মের দায়ীদের নির্মমভাবে শহীদ করে যাচ্ছিলো, তাই তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া মুসলমানদের জন্য আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। কারণ তারা যেন এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি না করতে পারে এবং মুসলিম দায়ীরা নিরাপদে সে অঞ্চলে দাওয়াত দিতে পারে। পাশাপাশি নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দ্রব্য আমদানি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে মদীনা ও সিরিয়া অভিমুখী মুসলমান ব্যবসায়ীরা যেন নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে।

রসূলুল্লাহ সা. অষ্টম হিজরিতে মুসলমানদের যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান। মুসলমানরা দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তিন হাজার সৈন্যের সমন্বয়ে বিশাল মুজাহিদ বাহিনী তৈরি হয়। তাদের নেতৃত্বের জন্য ধারাবাহিকক্রমে আল্লাহর রসূল সা. তিন ব্যক্তিকে নির্বাচন করেন। তম্মধ্যে প্রথম যায়েদ ইবনে হারেসা রা., এরপর জাফর ইবনে আবু তালিব রা., এরপর আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-কে নেতৃত্বের জন্য নির্ধারণ করা হয়। ইমাম বুখারী তার সনদে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূল সা. মুতার যুদ্ধে যায়েদ ইবনে হারেসা রা.-কে আমীর বানান। এরপর বলেন, যদি যায়েদ শহীদ হয়ে যায়, তাহলে জাফর নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। যদি সেও শহীদ হয়ে যায়, তাহলে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা নেতৃত্বের ভার নেবে।

রসূল সা. মুজাহিদদের আদেশ দিয়েছিলেন, হারেস ইবনে উমায়ের ইজদী যেখানে শাহাদাতবরণ করেছিলেন তারা যেন সেখানে গিয়ে প্রথমে এলাকাবাসীকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। যদি তারা ইসলামগ্রহণ করে তাহলে তা তাদের জন্য কল্যাণকর, অন্যথায় আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে যেন তাদের ওপর আক্রমণ করা হয়।

রসূল সা. মুজাহিদদেরকে বিদায় দেওয়ার আগে যুদ্ধসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপদেশ দিতেন। এই যুদ্ধে পাঠানোর সময়ও রসূল সা. তাদের বিভিন্ন উপদেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি তোমাদের আল্লাহভীতির উপদেশ দিচ্ছি। নিজেদের সহযোদ্ধা মুসলমানদের সাথে সদাচরণ করবে। আল্লাহর রাস্তায় আল্লাহর জন্য আল্লাহকে অস্বীকারকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে না। শিশু, নারী, বয়স্ক এবং দুনিয়াত্যাগী সন্ন্যাসীদের হত্যা করবে না। কোনো বৃক্ষ বা খেজুরগাছ ধ্বংস করবে না। কোনো স্থাপনা ধ্বসিয়ে দেবে না। যখন কোনো শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি হবে তাদের প্রথমে ইসলামের দাওয়াত দেবে, এরপর জিযিয়া আদায়ের প্রস্তাব দেবে। তারা এসব প্রস্তাব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে লড়াই করবে।

টিকাঃ
১১১৫. আল মুসলিমুনা ওয়ার রুম ফি আসরিন নবুওয়াহ: ৮৭।
১১১৬. তারীখে তাবারী: ৩/১০৩।
১১১৭. খাতামুন নাবিয়্যিন: ২/১১৩৯। আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ২০।
১১১৮. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়্যীন: ২০।
১১১৯. আল মুসলিমুনা ওয়ার রুম ফি আসরিন নবুওয়াহ : ৮৯।
১১২০. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ২০।
১১২১. সহীহ বুখারী: ৪২৬১।
১১২৩. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ২১।
১১২৪. আল মাগাযী: ২/৭৫৭-৭৫৮।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মুজাহিদদের রণযাত্রা

📄 মুজাহিদদের রণযাত্রা


রসূল সা. ও মুসলমানরা মুজাহিদদের বিদায় জানানোর সময় আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে দোআ করছিলেন, হে আল্লাহ, আমাদের মুজাহিদ ভাইদের সাহায্য করুন। নবীজিসহ অন্যান্য মুসলমান তাদের বিদায়ী সালাম জানাচ্ছিলেন এবং এ দোআ করছিলেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের সকল বিপদাপদ থেকে দূরে রাখুন এবং সহী সালামতে গণিমতের মালসহ ফিরিয়ে আনুন।

মুসলমানগণ তাদের বিদায় ও সালাম জানাতে এলে আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা কেঁদে ফেললেন। লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, দুনিয়ার মোহে কিংবা তোমাদের মায়ায় কাঁদছি না। আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওাসালাল্লামকে কুরআনের একটি আয়াত পড়তে শুনেছি। সে আয়াতে দোযখের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে
وَإِنْ مِّنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا
তোদমাদের প্রত্যেককে ওই জাহান্নামের কাছে আসতে হবে। এটা তোমার প্রতিপালকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

আমি বুঝতে পারছি না জাহান্নামের কাছে যাওয়ার পর আমি কী ভাবে তা থেকে উদ্ধার পাবো? মুসলমানরা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আল্লাহ তোমাদের সঙ্গী হোন! তিনি তোমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন এবং আমাদের কাছে সহী সালামতে ফিরিয়ে আনুন। জবাবে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এই কবিতা আবৃত্তি করলেন :
لكنني أسأل الرحمن مغفرة وضربة ذات فرع تقذف الزبدا أو طعنة بيدي حران مجهزة بحربة تنفذ الأحشاء والكبدا حتى يقولوا إذا مروا على جدثي أرشدك الله من غاز وقد رشدا
আমি পরম করুণাময়ের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি আর কামনা করছি যেন কাফেরদের ওপর রক্তক্ষয়ী আঘাত হানতে সক্ষম হই।
অথবা আমার রক্ত পিপাসু হাত দিয়ে বর্শার এমন আঘাত হানতে পারি যা শত্রুকে দ্রুত মৃত্যুর মুখে নিক্ষেপ করবে এবং তার কলিজা ও নাড়িভুঁড়ি ছিন্নভিন্ন করে দেবে।
যেন আমার কবরের কাছে দিয়ে অতিক্রমকারীরা বলতে পার যে, এই ব্যক্তিকে আল্লাহ হিদায়াতের পথে চালিত করে গাজী বানিয়ে দিয়েছিলেন এবং সে সুপথ পেয়েছিল।

রসূলুল্লাহ সা. আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-কে বিদায় জানাচ্ছিলেন। তখন তিনি রসূল সা.-এর সামনে এ কবিতা আবৃত্তি করেন :
فثبت الله ما آتاك من حسن تثبيت موسى ونصرا كالذي نصروا

إني تفرست فيك الخير نافلة الله يعلم أني ثابت البصر أنت الرسول فمن يحرم نوافله والوجه منه . فقد أزرى به القدر

হে রসূলাল্লাহ! যে সৌন্দর্য আল্লাহ আপনাকে দান করেছেন মুসা আ.- এর ন্যায় তার স্থায়িত্বও যেন তিনি আপনাকে দান করেন।
আপনাকে আল্লাহ সাহায্য করুন যেমন সাহায্য সাহাবীরা আপনাকে করেছেন। আমি আপনাকে কল্যাণের আধাররূপে প্রত্যক্ষ করেছি। আর আল্লাহ জানেন যে, আমি প্রখর দৃষ্টির অধিকারী।
আপনি খাঁটি ও যথার্থ রসূল। যে ব্যক্তি এ রসূলের গুণাবলী থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখলো এবং তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো তার তাকদীর যেন তাকে কলুষিত করলো।

টিকাঃ
১১২৫. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/২১।
১১২৬. সুরা মরিয়ম: ৭১।
১১২৭. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/২১।
১১২৮. মাগাযী রাসুলিল্লাহি লি ওরওয়া ইবনুজ জুবাইর: ২০৪-২০৫।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মাআন প্রান্তরে মুসলিম মুজাহিদ

📄 মাআন প্রান্তরে মুসলিম মুজাহিদ


মুসলিম মুজাহিদরা পৌছে গেলেন সিরিয়ার মাআন অঞ্চলে। এটা বর্তমানে জর্দানের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারলেন, রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে বালকা এলাকার মায়াব নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেছে। লাখাম, জুযام, বাহরা ও বালী গোত্রের আরো এক লাখ লোক তাদের সাথে যোগ দিয়েছে। তাদের নেতৃত্বে রয়েছে বালী গোত্রের এক ব্যক্তি এবং তার সঙ্গে আছে ইরাশ গোত্রের আরেক ব্যক্তি; তার নাম মালিক ইবনে রাফেলা। মুসলিম বাহিনী এসব খবর জেনে মাআনে দু'দিন অবস্থান করলো এবং তাদের করনীয় সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করলো। অবশেষে তারা সিদ্ধান্ত নিলো যে, রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে পত্র পাঠিয়ে শত্রুর সৈন্য সংখ্যা জানাবেন। তিনি হয় আরো সৈন্য পাঠিয়ে তাদের সাহায্য করবেন, না হয় যা ভালো মনে করেন নির্দেশ দেবেন এবং সেই মোতাবেক তারা কাজ করবেন। কেউ কেউ যায়েদ ইবনে হারেসা রা.-কে পরামর্শ দিয়েছিলেন, আপনি শত্রুপক্ষকে ভীত সন্ত্রস্ত ও প্রভাবিত করতে পেরেছেন সুতরাং ফিরে চলুন। নিরাপত্তা ও সুস্থতার কোনো বিকল্প নেই।

আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা মুসলমানদেরকে উৎসাহ দিয়ে বলেন, হে মুসলিমগণ! আজ তোমরা যা অপছন্দ করছো সেটাই তোমরা কামনা করছিলে। আর তা হলো শাহাদাত। আমরা সংখ্যা-শক্তি বা সংখ্যাধিক্যের জোরে লড়াই করি না। যে জীবনব্যবস্থার দ্বারা আল্লাহ আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন তার জন্য আমরা লড়াই করি। অতএব এগিয়ে যাও, বিজয় বা শাহাদাত এ দুটো উত্তম জিনিসের যে কোনো একটা অবশ্যই আমাদের জন্য নির্ধারিত আছে।

মুসলমানগণ সবাই বললেন, আল্লাহর শপথ, ইবনে রাওয়াহা হক কথা বলেছে। যায়েদ ইবনে হারেসা রা. মুসলিম বাহিনী নিয়ে বালকার দক্ষিণে অবস্থিত মুতা অভিমুখে এগিয়ে গেলেন। সেখানেই ইসলামের সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যে যুদ্ধে মুসলিম-বাহিনী পর্যায়ক্রমে তাদের তিনজন সেনাপতি হারিয়েছিল। যায়েদ ইবনে হারেসা মুসলিম বাহিনীর পতাকা উঁচু করে বীরত্বের সাথে লড়াই করতে করতে শত্রুবাহিনীর মাঝখানে গিয়ে পৌঁছান এবং শাহাদাতবরণ করেন।

তারপর পতাকা হাতে নেন জাফর ইবনে আবু তালিব। তিনি ঘোড়া থেকে নেমে ঘোড়ার পা কেটে ফেলেন এবং যুদ্ধ করে শহীদ হন। শাহাদাত বরণের প্রাক্কালে তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করেন:
يا حبذا الجنة واقترابها طيبة باردة شرابها والروم روم قد دنا عذابها علي إن لاقيتها ضرابها
আহ! কি চমৎকার জান্নাত এবং তার সান্নিধ্য লাভ! জান্নাত যেমন অতি উত্তম ও পবিত্র, তার পানীয়ও তেমনি।
রোমকদের আযাব ঘনিয়ে এসেছে, তারা কাফের এবং আমার তুলনায় অনেক নিকৃষ্ট যদিও তাদের আঘাত খেয়েছি।

জাফর ইবনে আবু তালিব নিজের ডান হাতে ইসলামী পতাকা উড্ডীন করে রেখেছিলেন। যখন তা কেটে দেওয়া হয় তখন তিনি বাম হাতে পতাকা ধারণ করেন। যখন তাও কেটে দেওয়া হয়, তখন তিনি উভয় বাহুর সমন্বয়ে বুকের সাথে লাগিয়ে ইসলামী পতাকা উড্ডীন করে রাখেন এবং যুদ্ধ করতে করতে এক পর্যায়ে শাহাদাত বরণ করেন। শাহাদাতের সময় তার বয়স হয়েছিল পঁয়ত্রিশ বছর। তার শরীরে তরবারি, বর্শা ও তিরের প্রায় ৯০টি আঘাত ছিল। যেসব আঘাতের কোনো চিহ্নই তার পেছনদিকে ছিল না; বরং প্রতিটি আঘাতই ছিল সামনের দিক থেকে।

ইমাম বুখারী সহীহ বুখারীতে নিজস্ব সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. হতে বর্ণনা করেন, ওই যুদ্ধে তাদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। যুদ্ধশেষে আমরা জাফর ইবনে আবু তালিব রা.-কে তালাশ করলে তাকে শহীদগণের মধ্যে পেলাম। তখন আমরা তার দেহে বর্শা ও তিরের ৯০টিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি।

আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে দুইখানা ডানা দিয়েছেন যা দিয়ে তিনি যেখানে খুশী উড়ে যেতে পারেন। আমির রহ. হতে বর্ণিত, ইবনে ওমর রা. যখনই জাফর ইবনে আবু তালিব রা.-এর পুত্র আবদুল্লাহকে সালাম দিতেন তখনই তিনি বলতেন, তোমার প্রতি সালাম, হে দু-ডানাওয়ালার পুত্র।

জাফর ইবনে আবু তালিবের শাহাদাতের পর আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ইসলামী-বাহিনীর পতাকা ধারণ করেন এবং অশ্বারোহণ করে বলেন,
أقسمت يا نفس لتنزلنه طائعة أو لتكرهنه إن أجلب الناس وشدوا الرنة ما لي أراك تكرهين الجنة قد طالما قد كنت مطمئنة هل أنت إلا نطفة في شنة یا نفس إلا تقتلي تموتي هذا حمام الموت قد صليت وما تمنيت فقد أعطيت إن تفعلي فعلهما هديت
কসম খেয়ে বলছি, হে ইবনে রাওয়াহা, এই ময়দানে তোমাকে নামতেই হবে, হয় তোমাকে নমাতেই হবে নচেত তোমাকে তা অপছন্দ করতে হবে।
সকল মানুষ যদি রণহুংকার দিয়ে জমায়েত হয়ে থাকে এবং তাদের মধ্যে কান্নার রোলও পড়ে থাকে, তোমাকে কেন জান্নাত সম্পর্কে নিস্পৃহ দেখছি?
সুখে শান্তিতে অনেকদিন তো কাটিয়ে দিয়েছো, অথচ তুমি তো একটি পুরনো পাত্রে এক ফোটা পানি ছাড়া আর কিছুই ছিলে না।
হে আমার আত্মা, আজ যদি নিহত না হও তাহলেও তোমাকে একদিন মরতে হবে। এটা মৃত্যুর ঘর যাতে তুমি প্রবেশ করেছো। তুমি এ যাবত যা চেয়েছো পেয়েছো। এখন যদি ওই দু'জনের মতো (যায়েদ ও জাফর) কাজ করো তাহলে সঠিক পথে চালিত হবে।

বর্ণিত আছে, তারপর তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলেন। তখন তার এক চাচাতো ভাই এক টুকরো হাড্ডি জড়িত গোশত এনে তাকে দিয়ে বললেন নাও, এটা খেয়ে একটু শক্তি বাড়িয়ে নাও। কেননা তুমি এই ক'দিনে অত্যধিক কষ্ট করেছো। তিনি গোশতের টুকরোটা নিয়ে দাঁত দিয়ে কিছুটা ছিঁড়ে নিয়েছেন এমন সময় এক পাশে লোকজনের ভীষণ মারামারি হুড়োহুড়ির শব্দ শুনতে পেলেন। তখন তিনি বললেন আমি বেঁচে থাকতে? তিনি গোশতের টুকরোটা ছুঁড়ে ফেলে তরবারী হাতে অগ্রসর হলেন এবং যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন।

টিকাঃ
১১২৯. যাদুল মাআদ: ৩/৩৮২।
১১৩০. ইবনে আসাকির প্রণীত তারিখে দামেশক: ১/৩৯৬।
১১৩১. আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ: ২/৪৬৮।
১১৩২. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/২৫।
১১৩৩. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/২৫।
১১৪৪. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ৫৮।
১১০৫. সহীহ বুখারী: ৪২৬১।
১১০৬. সহীহ বুখারী: ৪২৬৪।
১১৩৭. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/২৯।
১১৩৮. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআস সালিবিয়‍্যীন: ৬১।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে সেনাপতি নির্বাচন

📄 খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে সেনাপতি নির্বাচন


এরপর বনু আজলান গোত্রের সাবিত ইবনে আকরাম পতাকা হাতে নিলেন। তিনি বললেন, হে মুসলমানগণ! তোমরা সর্বসম্মতভাবে একজন সেনাপতি বানাও। সবাই বললো, আপনিই আমাদের সেনাপতি। তিনি বললেন, আমি এ দায়িত্ব পালনে সক্ষম নই। তখন মুসলমানগণ খালেদ ইবনে ওয়ালীদকে সেনাপতি বানালেন।

ইমতাউল আসমা'গ্রন্থে এসেছে, সাবিত ইবনে আকরাম খালেদ ইবনে ওয়ালীদকে লক্ষ্য করে বলছিলেন, হে আবু সুলাইমান, আপনি পতাকা গ্রহণ করুন। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ উত্তরে বলেন, আপনি আমার চাইতে এই পতাকা বহনের বেশি উপযুক্ত। কেননা, একে তো আপনি আমার চাইতে বয়োবৃদ্ধ, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন; সর্বোপরি আপনি বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। সাবিত প্রত্যুত্তরে বলেন, আমি তো এই পতাকা শুধু আপনাকে দেওয়ার মানসে গ্রহণ করেছি; সুতরাং আপনি গ্রহণ করুন। অতঃপর খালেদ ইবনে ওয়ালীদ পতাকা গ্রহণ করেন।

খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-এর সামনে ভয়াবহ এ পরিস্থিতিতে মুসলিম বাহিনীকে বিশাল বিপর্যয় থেকে বের করে আনাই বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিকল্পনা ও তার ফলাফল চিন্তা করে তিনি এ সিদ্ধান্তে পৌছান যে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজেদের গুটিয়ে আনাই সর্বোত্তম পন্থা। যেখানে মুসলমানদের চাইতে শত্রুবাহিনীর সংখ্যা প্রায় ৬৬ গুণ বেশি, সে পরিস্থিতিতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজেদের সরিয়ে আনা উচিত। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ নিম্নোক্ত কৌশল হাতে নেন:

মুসলমান এবং রোমান সৈন্যদের মাঝে নিরাপদে যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করা সম্ভব হয় এমন পরিস্থিতি তৈরি করা।

এই পরিকল্পনা কার্যকর করতে শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্তিতে ফেলা জরুরি ছিল। শত্রু যেন ভাবে مسلمانوں কাছে এখনো সহযোগী বাহিনী প্রস্তুত আছে। এতে শত্রুপক্ষের আক্রমণ কিছুটা হালকা হলে মুসলমানরা যুদ্ধের ময়দান থেকে নিজেদের গুটিয়ে আনতে সক্ষম হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ বিকাল পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ়তার সাথে অবস্থান করেন। রাতের অন্ধকারে তিনি তার বাহিনীর সৈন্যদের অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলেন। ডান দিকের সৈন্যদের বাম দিকে এবং বাম দিকের সৈন্যদের ডানদিকে আনেন। এভাবে সম্মুখভাগের সৈন্যদের পেছনদিকে ও পেছনদিকের সৈন্যদের সম্মুখভাগে আনেন। সেনাবাহিনীর অবস্থান পরিবর্তনের সময় জোর তাকবিরধ্বনি দেওয়ার নির্দেশ দেন। ফজরের নামাযের সাথে সাথে তারা শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। ধারাবাহিক চরম আক্রমণের মাধ্যমে তারা শত্রুবাহিনীকে জানান দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন যে, আমাদের কাছে ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ নতুন বাহিনী সাহায্যের জন্য এসে গেছে।

খালেদের কৌশল সুফল বয়ে আনে। সকাল হতেই নতুন পতাকাবাহী ও নতুন চেহারার যোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে দেখে শত্রুবাহিনী নিশ্চিত ধরে নেয় যে, مسلمانوں কাছে নতুন সাহায্য-বাহিনী এসে পৌঁছেছে এবং তারা আমাদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। مسلمانوں সাহসী আক্রমণ শত্রুবাহিনীকে হতোদ্যম করে দেয়। তারা একথা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, مسلمانوں শোচনীয়ভাবে পরাজিত করার যে পরিকল্পনা তারা করেছিল তা সহজে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। مسلمانوں সাহসী আক্রমণের সামনে তারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে পরাজয় বরণ করে নিয়েছিল এবং পূর্বেকার যাবতীয় সাহসিকতা হারিয়ে ফেলছিল। মুজাহিদদের ওপর তাদের আক্রমণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছিলো।

খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. সুযোগ বুঝে ধীরে ধীরে নিজের বাহিনী পেছনে সরিয়ে আনতে লাগলেন। পরিস্থিতি সাপেক্ষে তার নেওয়া এ পদক্ষেপ অত্যন্ত যৌক্তিক ছিল। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. মধ্যভাগের সৈন্যদের সহযোগিতায় ডান ও বাম দিকের সৈন্যদের পেছনে সরিয়ে আনেন। পরবর্তীতে উভয় দিকের সৈন্যদের নিরাপত্তা-বেষ্টনী তৈরি করে মধ্যভাগের সৈন্যদের পেছন দিকে সরিয়ে নিয়ে আসেন। আর এভাবেই শত্রুবাহিনীর আক্রমণের আওতা থেকে মুক্ত হয়ে আসে গোটা মুসলিম বাহিনী।

ঐতিহাসিকদের ভাষ্য মতে, ভয়াবহ এ যুদ্ধে मुसलमानों মধ্য থেকে মাত্র বারো জন শাহাদাতবরণ করেন। খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. বলেন, মুতার যুদ্ধে আমার হাতে নয়টি তরবারি ভেঙে যায়। শেষ পর্যন্ত আমার হাতে শুধু একটি ইয়েমেনী খঞ্জর ছিল।

খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-এর কৌশলী পরিকল্পনায় আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের নিশ্চিত পরাজয় থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। প্রয়োজনের সময় রণাঙ্গন থেকে নিজেদের নিরাপদে বের হয়ে আসতে পারাই मुसलमानों জন্য অনেক বড়ো বিজয় ছিল।

টিকাঃ
১১৩৯. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/২৮।
১১৪০. ইমতাউল আসমা: ১/৩৪৮-৩৪৯।
১১৪১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৭৬৪।
১১৪২. মাআরিকে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ: ১৭৩।
১১৪৩. সহীহ বুখারী: ৪২৬৬।
১১৪৪. মাআরিকে খালি ইবনুর ওয়ালিদ: ১৭৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00