📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 এই গাওয়ার সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন ফিকহী বিধান

📄 এই গাওয়ার সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন ফিকহী বিধান


ক. গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া হারাম। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বর্ণনা করেন, রসূল সা. খায়বারের যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।

খ. গর্ভবতী অবস্থায় বন্দী দাসীর সঙ্গে সহবাস হারাম। রসূল সা. বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন অন্যের ক্ষেতে পানি সেচ না করে।

গ. যুদ্ধবন্দী হিসেবে প্রাপ্ত দাসীদের সঙ্গে এক হায়েজ পরিমাণ সময় অপেক্ষা করার পূর্বে মেলামেশا নিষেধ। রসূল সা. বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলা ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে, তার জন্য অন্যের মালিকানায় ছিল এমন দাসীর সাথে এক হায়েজ পরিমাণ সময় অপেক্ষা না করে মেলামেশা করা অবৈধ। এ ধরনের দাসীগণের জন্য ইদ্দত পালন করা আবশ্যক নয়। চাই কাফের ব্যক্তির সাথে সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ থাকুক বা তার স্বামী মৃত বা জীবিত থাকুক। কেননা শরীয়তের পক্ষ থেকে ইদ্দতের বিধান রাখা হয়েছে স্বামীর বিদায়ে তার জন্য শোক পালনের উদ্দেশ্যে আর কাফেরের জন্য শোক পালন অনুচিত।

ঘ. অভিন্ন দ্রব্যের বিনিময়ের ক্ষেত্রে সুদ হারাম। এ মর্মে আবু সাঈদ খুদরী ও আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. এক ব্যক্তিকে খায়বারের কৃষক হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। একবার সে নবীজির কাছে জানিব নামীয় একধরনের উৎকৃষ্ট খেজুর নিয়ে এলে আল্লাহর রসূল সা. তাকে জিজ্ঞেস করেন, খায়বারের সব খেজুর কি এমন হয়? সে বললো, হে আল্লাহর রসূল! সব খেজুর এমন হয় না। আমরা এ ধরনের খেজুরের এক সা' অন্য ধরনের খেজুরের দুই বা তিন সা'র বিনিময় কিনে থাকি। রসূল সা. বলেন, এমনটি করবে না বরং নিম্নমানের খেজুর মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি করবে তারপর সেই মুদ্রা দিয়ে উত্তম খেজুর কিনবে। অভিন্ন দ্রব্যের বিনিময়ের ক্ষেত্রে কমবেশি করা সুদের অন্তর্ভুক্ত। পরিমাপের ক্ষেত্রে এ ধরনের সুদকে রিবাল ফজল বলে। রসূল সা. এ ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছেন। আর এ ধরনের লেনদেনের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে তিনি একটি চমৎকার সমাধান দিয়েছেন। তিনি এ জন্য তুলনামূলক স্বল্পদামের খেজুর একটি মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করে সেই মুদ্রার মাধ্যমে উত্তম খেজুর কেনার পরামর্শ দেন। কেননা, তাদের অনুসৃত রীতিতে এই বেচাকেনা সুদের পর্যায়ে পড়ে যায়।

ঙ. স্বর্ণপিণ্ড স্বর্ণের কোনো সামগ্রীর বিনিময়ে বা রৌপ্যপিণ্ড রৌপ্যের কোনো সামগ্রীর বিনিময়ে বিক্রি করা হারাম। উবাদা ইবনে সামিত রা. বলেন, রসূল সা. খায়বারের যুদ্ধের দিন স্বর্ণপিণ্ড স্বর্ণের কোনো জিনিসের বিনিময়ে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। অদ্রূপ রৌপ্যপিণ্ড অন্য কোনো রূপার সামগ্রীর বিনিময়ে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। রসূল সা. বলেন, তোমরা স্বর্ণপিণ্ড মিলিত স্বর্ণ বা রূপার জিনিসের বিনিময়ে বিক্রি করো আর রৌপ্যপিণ্ড স্বর্ণ বা স্বর্ণের অন্য কিছুর বিনিময়ে বিক্রি করো।

হাদীসের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ সমান সমান বিক্রি করতে হবে। রূপার বিনিময়ে রূপা সমান সমান বিক্রি করতে হবে। কমবেশি করা যাবেনা। স্বর্ণ ও রৌপ্যের বিনিময়ের ক্ষেত্রে সমান করা আবশ্যক নয়।

চ. ফসল বা ফলের বর্গাচাষ। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, রসূল সা. খায়বারের ভূমি সেখানকার ইহুদিদেরকে এ চুক্তিতে প্রদান করেছিলেন যে, তারা চাষাবাদ করবে আর উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক লাভ করবে। বিভিন্ন গবেষকগণ এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, এ ধরনের ক্রয়-বিক্রয় ও লেনদেনের বিধান খায়বারের ক্ষেত্রে কেন বর্ণিত হয়েছে? শায়েখ আবু যুহরা রহ. এর জবাবে বলেন, খায়বারের বিজয় আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে مسلمانوں জন্য ছিল একটি বিশাল বিজয়। মদীনায় প্রয়োজনীয়তা দেখা না দিলেও ফসল ও ফলের বর্গাচাষসহ বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের বিধান খায়বারে জরুরি ভিত্তিতে দেখা দেয়।

ছ. ঘোড়ার গোশত খাওয়া বৈধ। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বারের দিন গৃহপালিত গাধার গোশত আহার করতে নিষেধ করেছেন আর ঘোড়ার মাংস ভক্ষণের অনুমতি দিয়েছেন।

জ. মুতআ বিয়ে হারাম। আলী রা. বলেন, রসূল সা. খায়বার যুদ্ধের দিন মহিলাদের মুতআ করা থেকে এবং গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া থেকে নিষেধ করেছেন।

ঝ. খায়বার যুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ। বনু গিফার গোত্রের উমাইয়্যা বিনতে সালত রা. বলেন, আমি আমার গোত্রের কয়েকজন নারীকে নিয়ে আল্লাহর রসূল সা.-এর দরবারে উপস্থিত হলাম। আমরা তার কাছে নিবেদন করি যে, আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে আহত ব্যক্তিদের সেবাশুশ্রুষা ও নিজেদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করার জন্য মুসলিম সেনাবাহিনীর সঙ্গে যেতে চাই। আমাদের অনুমতি দিয়ে আল্লাহর রসূল সা. বলেন, আল্লাহ তাআলার বরকতের আশা রেখে তোমরা চলো। অতঃপর আমরা আল্লাহর রসূল সা.-এর সাথে রওনা হলাম। একবার রসূল সা. যাত্রাপথে ফজরের সময় বের হলেন এবং আমিও আমার বাহনের তাঁবু থেকে বের হলাম। আমি দেখতে পেলাম যেখানে আমি বসে ছিলাম তাতে কিছুটা রক্ত লেগে আছে। ঋতুমতী হওয়ার সেটি ছিল আমার প্রথম দিন। আমি তাতে কিছুটা লজ্জিত হয়ে পড়ি এবং পিছিয়ে যাই। রসূল সা. আমার অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, হয়তো তুমি ঋতুমতী হয়েছো। আমি ইতিবাচক উত্তর দিলে রসূল সা. আমাকে বলেন, তুমি ঋতুমতী নারীর বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করো। অতঃপর কোনো পাত্রে পানি নিয়ে যেখানে রক্ত লেগেছে সেখানে কিছু লবন ছিটিয়ে তা ধুয়ে ফেলো এবং তোমার বাহনে ফিরে যাও।

খায়বার বিজয়ের পর আল্লাহর রসূল সা. যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে আমাকে কিছু অংশ দান করেন এবং আমার গলায় এখন যে হার আছে রসূল সা. আমাকে তা সেখানে দান করেছেন এবং নিজ হাতে আমাকে তা পরিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহর শপথ! সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও এই হার আমার গলা থেকে সরেনি।

উমাইয়‍্যা বিনতে সালত রা. মৃত্যুকালে ওসিয়ত করে যান যেন হারটি তার কবরে তার সাথে দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, সেদিন থেকে আমি যে পানি দিয়ে অজু করি প্রতিবারই সেই পানির সাথে লবণ মিশ্রিত করে নিই। তিনি তার আত্মীয়দের ওসিয়ত করেন, যেন তার মৃত্যুর পর তাকে গোসল করানোর পানিতেও লবণ মিশ্রিত করে নেওয়া হয়। মুসলিম নারীদের সামনে ইসলামের জন্য জিহাদে অংশগ্রহণের এক অনন্য নজির পেশ করেন উমাইয়্যা বিনতে সালত রা.।

রসূল সা. জিহাদ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে জাতিকে এভাবেই দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। খায়বার, ফাদাক, ওয়াদিউল কুরা ও তাইমা বিজয়ে আরব ভূখণ্ডে তুমুল সাড়া পড়ে যায়। কুফফার গোষ্ঠীর মাঝে ভীতির সঞ্চার হয়। কুরায়েশরা চিন্তিত হয়ে পড়ে। তারা ভাবতে পারেনি ইহুদিদের শক্তিশালী দুর্গসমূহ, অসংখ্য যোদ্ধা ও সমরাস্ত্র থাকা সত্ত্বেও তারা এভাবে পরাজয় বরণ করবে। কুরায়েশদের সমমনা ও মিত্র গোত্রগুলো ইহুদিদের পরাজয় ও मुसलमानों বিজয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। পর্যায়ক্রমে তারা मुसलमानों সাথে সন্ধি করার সুযোগ খুঁজে ফেরে। কারণ তারা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল, এছাড়া আর কোনো গতি নেই। আরবের প্রত্যন্ত এলাকায় ইসলামের পয়গাম পৌঁছাতে খায়বার বিজয় বিরাট ভূমিকা পালন করে। مسلمانوں সামরিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে শত্রুরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

খায়বার বিজয়ের পর রসূল সা. ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরো কিছু অভিযানে বিশিষ্ট সাহাবীদের নেতৃত্বে বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। কয়েকটি বাহিনী যুদ্ধের মুখোমুখী হয়, আর কয়েকটিতে যুদ্ধ করতে হয়নি।

টিকাঃ
১০৯৭. যাদুল মাআদ : ৪/১২২-১২৩। সহীহ বুখারী: ৪২১৫।
১০৯৮. ইবনে সাআদ প্রণীত তাবাকাতুল কুবরা: ২/১১৩।
১০৯৯. সুনানে আবু দাউদ: ২১৫৮। আর রাওযুল উনফ: ৪/৪১।
১১০০. আসসুরা মাআল ইয়াহুদ ২/১৩৪।
১১০১. সহীহ বুখারী: ৪২৪৪।
১১০২. আসসুরা মাআল ইয়াহুদ ২/১৩৪।
১১০৩. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪/৪১।
১১০৪. সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মদীনা: ৩২১।
১১০৫. আসসুরা মাআল ইয়াহুদ ২/১৩৬।
১১০৬. সহীহ বুখারী: ৪২১৯।
১১০৭. নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে মুতআ বিবাহ বলা হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে ক্ষেত্র বিশেষে যেমন যুদ্ধ চলাকালীন সময় ও সফরে বৈধ ছিল। কিন্তু তখনও সাধারণততঃ এভাবে বিবাহ বৈধ ছিল না। পরে খায়বারের যুদ্ধে এ ধরনের বিবাহকে হারাম ঘোষণা করা হয়। অতঃপর অষ্টম হিজরীতে মাক্কাহ বিজয়ের সময় মাত্র তিন দিনের জন্য তা বৈধ করা হয়েছিল। এরপর তা চিরতরে হারাম করা হয়। কিন্তু শিয়া মতাবলম্বীদের মতে মুতআ বিবাহ অদ্যাবধি বৈধ এবং পুণ্যের কাজ। এবং মুতআকারী ব্যক্তি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। (নাউযুবিল্লাহ)।
১১০৮. সহীহ বুখারী: ৪২১৬।
১১০৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/২০৫।
১১১০. সীরাতে ইবনে হিশাম : ৩/৩৭২-৩৭৩।
১১১১. ফিকহুস সীরাহ লিমুনীর আল গাযবান: ৫৩৪।
১১১২. নাযরাতুন নায়ীম: ১/৩৫৩।
১১১৩. নাযরাতুন নায়ীম: ১/৩৫৩।
১১১৪. 'আস সীরাতুন নববিয়্যাহ লিননদবী: ২২১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00