📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 গণিমতের সম্পদবন্টন

📄 গণিমতের সম্পদবন্টন


ক. খায়বার শহরের দ্বিতীয় অংশের পতন এবং মুসলিম বাহিনী খায়বারের ছোটো-বড়ো সবকটি দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়ার পর মুসলমানরা মালে গণিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) একত্র করতে শুরু করে। নববী যুগে এর আগে মুসলমানরা কোনো যুদ্ধেই এতো অধিক পরিমাণ গণিমত অর্জন করেনি, যে পরিমাণ তারা এই যুদ্ধ থেকে অর্জন করেছিল। এই মহাবিজয়ে মুসলিম বাহিনী রণসমরঞ্জাম ছাড়াও অন্যান্য প্রচুর সম্পদ অর্জন করে।
বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য ছাড়াও মুসলমানরা এখানকার জমিজমা, বাগ-বাগিচা ও খেজুরের গুদাম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে ঘি, চর্বি, মধু ও তেল ছিল উল্লেখযোগ্য। রসূল সা. সবাইকে এসব খাবার থেকে খাদ্যগ্রহণ করতে অনুমতি দিয়েছিলেন এবং সেগুলো থেকে অন্যান্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মতো রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য এক পঞ্চমাংশ রাখা হয়নি।
কাপড়, গৃহস্থালী পণ্য, উট, গরু ও ছাগল জাতীয় সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ কুরআনে কারীমে বর্ণিত প্রয়োজনীয় খাতসমূহের জন্য রেখে অবশিষ্ট চার-পঞ্চমাংশ মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়।
বিপুল সংখ্যক ইহুদি নারী মুসলমানদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে হস্তগত হয়। গণিমতের সম্পদের আওতাভুক্ত হওয়ায় রসূল সা. তাদেরকে মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। কৃষিজমি ও খেজুরবাগানের মতো সম্পদগুলো রসূল সা. মোট ৩৬টি অংশে ভাগ করে প্রতিটি অংশকে আবার ১০০ অংশে বণ্টন করেন। ৩৬০০ ভাগে বণ্টিত এসব সম্পদের অর্ধেক তথা ১৮০০ অংশ মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। আর বাকি অর্ধেক অংশ সংরক্ষিত রাখা হয় মুসলমানদের ভবিষ্যৎ ও সাধারণ প্রয়োজনে কাজে লাগানোর জন্য।
যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সন্ধান করার সময় সাহাবায়ে কেরাম রা. তাদের দুর্গে তাওরাতের কয়েকটি কপি পান। ইহুদিরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিবেদন করে এই কপিগুলো যেন তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং সাহাবাদেরকে ইহুদিদের এই কপিগুলো ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেন। এ ক্ষেত্রে তিনি তাদের সাথে এমন আচরণ করেননি, যেমনটি রোমানরা জেরুজালেম হামলার সময় করেছিল। তারা সেখানকার যাবতীয় সম্মানিত ধর্মীয় পুস্তক জ্বালিয়ে দিয়েছিল। অথবা যেমনটি করেছিল খ্রিষ্টানরা, যখন তারা স্পেনে ইহুদিদের ওপর হামলা করে; তখন তাদের কাছে থাকা তাওরাতের সকল কপি পুড়িয়ে দেয়।
রসূল সা. খায়বারের ইহুদিদেরকে নিজেদের ভূমিতে কৃষিকাজ করার পর তার অর্ধেক অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার শর্ত আরোপ করে সেখানে বসবাসের অনুমতি দেন। পাশাপাশি তিনি এটিও শর্তে উল্লেখ করে দেন যে, মুসলমানরা যখন চাইবে তখন তাদের সেখান থেকে নির্বাসিত করতে পারবে। প্রথমোক্ত শর্তে চুক্তি করতে ইহুদিরাই ছিল বেশি আগ্রহী। তারা রসূল সা.-এর কাছে এই মর্মে নিবেদন করে যে, আমরা আপনাদের চাইতে কৃষিকার্যে অধিক দক্ষ। তাদের অনুরোধে রসূল সা. তাদেরকে নির্বাসিত করার ইচ্ছা পোষণ করলেও এ দুটি শর্ত দিয়ে তাদের সেখানেই থাকতে দেন।
চুক্তিনামার দ্বিতীয় ধারাটি ছিল, মুসলমানরা যখন চাইবে তখন তাদেরকে সেখান থেকে নির্বাসিত করতে পারবে। ইহুদিদের কৃষক হিসেবে সেখানে বহাল রাখা مسلمانوں জন্য অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হয়। আগে থেকেই ইহুদিরা কৃষিকাজে অভ্যস্থ ছিল। অন্যদের তুলনায় কৃষিক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা অনেক বেশি ছিল। তাই তাদের সেখানে বহাল রাখা যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত ছিল। কেননা তাদের মজুরি দিতে হতো না। তদুপরি মুসলমানরা সেখান থেকে উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক অংশের মালিক হতো।
তাদের শক্তি ও মনোবল দমিয়ে রাখার জন্য রসূলুল্লাহ সা. এই শর্ত আরোপ করেন যে, মুসলমানরা যখন চাইবে, তাদের নির্বাসিত করতে পারবে। ইহুদিরা সবসময় এ নিয়ে ভীত থাকতো। ওমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর যুগে যখন তারা অন্যায়ভাবে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর হাত কনুইয়ের দিক থেকে ভেঙে দিয়েছিল তখন তিনি দ্বিতীয় শর্তের বাস্তবায়ন করেন। ইতোপূর্বে রসূলুল্লাহ সা.- এর যুগে তারা আবদুল্লাহ ইবনে সাহাল রা.-কে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল। ওমর রা.-এর যুগে দ্বিতীয়বার তাদের প্রতারণা ও শর্তভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া যায়। ফলে তাদের নির্বাসনে পাঠানো হয়।
খায়বারের ইহুদিরা নিজেদের স্বর্ণ ও রৌপ্য লুকিয়ে ফেলতে চেয়েছিল- যাতে তা মুসলমানদের হাতে না যায়। এদিকে বনু কুরায়যার সাথে নিহত হুয়াই ইবনে আখতাবের একটি মৃগনাভি বনু নাযির গোত্রের ইহুদিরা নির্বাসিত হওয়ার সময় লুকিয়ে ফেলেছিল।
রসূল সা. হুয়াই ইবনে আখতাবের চাচা সাইয়াকে জিজ্ঞেস করেন, হুয়াই ইবনে আখতাবের সেই মৃগনাভি কোথায়? উত্তরে তিনি বলেন, যুদ্ধের খরচ ও অন্যান্য কাজে তা ব্যয় করা হয়েছে। তখন আল্লাহর রসূল সা. বলেন, এত অল্প সময়ে এমন মূলব্যবান বস্তু তো খরচ হওয়ার কথা না! অতঃপর আল্লাহর রসূল সা. যুবায়ের ইবনে আওয়াম রা.-কে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসাবাদকালে মৃদু শাস্তি দিলে সে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হয় যে, আমি হুয়াইকে অমুক নির্জন জায়গায় চলাফেরা করতে দেখেছি। সাহাবীরা সেখানে গিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে ওই মৃগনাভি পেয়ে যান।
ইহুদিদের সাথে কৃষিকাজের চুক্তির যেসব শর্ত নির্ধারিত হয়েছিল তার ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-কে দায়িত্বশীল বানানো হয়। তিনি প্রতিবছর সেখানে গিয়ে ফসলের জরিপ করতেন। ইহুদিরা প্রথমে আল্লাহর রসূল সা.-এর কাছে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-এর ফসল নির্ধারণ ও জরিপের কঠোরতার ব্যাপারে অভিযোগ করে। পরবর্তীকালে তারা আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.-কে ঘুষের প্রস্তাব দেয়। জবাবে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বলেন, হে আল্লাহর দুশমনরা! তোমরা আমাকে হারাম খাওয়াতে চাচ্ছো! আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তির পক্ষ থেকে এসেছি যিনি আমার সবচাইতে প্রিয়। আর তোমরা আমার কাছে শূকর-বানরের চাইতেও নিকৃষ্ট। অবশ্য রসূল সা.-এর প্রতি আমার ভালোবাসা ও তোমাদের প্রতি ঘৃণার কারণে আমি ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত হব না। তার উত্তর শুনে তারা বলতে লাগলো, এমন ন্যায়বিচারের কারণেই পৃথিবী এখনো টিকে আছে।
খায়বারের কর্তৃত্ব গ্রহণ ও ইহুদিদের সাথে কৃষিকাজের চুক্তির ফলে মুসলমানরা একটি স্থায়ী উপার্জনের উপায় পায়। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, খায়বার বিজয়ের পূর্বে আমরা কখনো পরিতৃপ্ত হয়ে খেতে পারিনি। এই বিজয়ের পর মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থার ক্রমোন্নতি ঘটে। এদিকে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতকারীদেরকে আনসাররা যেসব খেজুরগাছ দিয়েছিলেন, খায়বার বিজয়ের পর মুহাজিররা তা ফিরিয়ে দেন।

টিকাঃ
১০৬২. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআল ইয়াহুদ: ৩/১৪০।
১০৬৩. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআল ইয়াহুদ: ৩/১৪১-১৪২।
১০৬৪. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ২/৪১৯।
১০৬৫. আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ: ১/৩২৮।
১০৬৬. তাআম্মুলাত ফি সীরাতির রসূল: ২২৮-২২৯।
১০৬৭. আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ: ১/৩৬২।
১০৬৮. ইমাম যাহাবী প্রণীত তারীখুল ইসলাম: আল মাগাযী: ৪২৪।
১০৬৯. ইমাম যাহাবী প্রণীত তারীখুল ইসলাম: আল মাগাযী: ৪২৪।
১০৭০. সহীহ বুখারী: ৪২৪৩।
১০৭১. মুঈনুস সীরাহ: ৩৫২।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 সাফিয়্যা বিনতে হুযাই-এর সাথে রসূল সা.-এর বিয়ে

📄 সাফিয়্যা বিনতে হুযাই-এর সাথে রসূল সা.-এর বিয়ে


খায়বারের কামুস নামক দুর্গ বিজয়ের পর মুসলমানদের হাতে যেসব যুদ্ধবন্দী আসে, তাদের একজন ছিলেন সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই ইবনে আখতাব। নবীজি সা. তাকে দিহয়া কালবী রা.-কে দান করেছিলেন। জনৈক ব্যক্তি রসূল সা.-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি দিহয়া কালবীর হাতে সাফিয়্যা বিনতে হুয়াইকে তুলে দিয়েছেন, অথচ নিজের গোত্রের নেত্রী হিসেবে তিনি আপনার উপযুক্ত। রসূল সা. তার পরামর্শ গ্রহণ করে দিহয়া কালবী রা.-কে এর পরিবর্তে অন্য কোনো একজন দাসী নিয়ে যেতে বলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যাকে আযাদ করে দেন এবং তাকে বিবাহ করেন। তার মুক্তিপণের বিনিময়কে মোহর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। বিয়ে সংঘটিত হয় তার ইসলাম গ্রহণের পর।

আল্লাহর রসূল সা. খায়বার অঞ্চল ত্যাগ করার পূর্বেই সাফিয়া রা. ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হয়ে যান। আল্লাহর রসূল সা. তাকে নিজের বাহনের পেছনে আরোহণ করান। খায়বার অঞ্চল থেকে ছয় মাইল অতিক্রম করে সেখানে ছাউনি ফেলা হলে আল্লাহর রসূল সা. তার সাথে রাত কাটাতে চান। কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। রসূল সা. এতে কিছুটা কষ্ট অনুভব করেন। পরবর্তী ছাউনি সাহবা নামক স্থানে ফেলা হয়। উম্মে সুলাইম সাফিয়্যা রা.-কে সুসজ্জিত করেন এবং সুগন্ধিযুক্ত করে রসূল সা.-এর কাছে পাঠিয়ে দেন। রসূল সা.-এর সাথে প্রথম রাত্রিযাপনকালে তিনি তাকে পূর্ববর্তী ছাউনিতে রাত্রিযাপনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের কারণ জিজ্ঞেস করেন। উত্তরে সাফিয়্যা রা. বলেন, যেহেতু ওই অঞ্চলটি ইহুদিদের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল তাই আমি আপনার ব্যাপারে ভীত সন্ত্রস্ত ছিলাম যে, তারা এ কারণে আপনার ওপর আক্রমণ করে বসতে পারে। এ কথা শুনে তার প্রতি রসূল সা.-এর আন্তরিকতা আরও বৃদ্ধি পায়।

সাহবা প্রান্তরে রসূল সা. তিন দিন অবস্থান করে সেখানে ওলিমার আয়োজন করেন। তাতে মুসলমানদের দাওয়াত করেন। ওলিমায় মাংসের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। শুধু খেজুর, পনির ও ঘি-এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মুসলমানরা তখনও বুঝতে পারছিলেন না সাফিয়্যা উম্মাহাতুল মুমিনিনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন নাকি এখনো দাসী হিসেবেই আছেন। কিন্তু যখন পরবর্তী সফরে আল্লাহর রসূল সা.-এর পেছনেই তার জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয় এবং তার আসন পর্দা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় তখন মুসলমানরা নিশ্চিত হলেন যে, তিনি উম্মাহাতুল মুমিনিনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

ইমাম বায়হাকী রহ. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর সূত্রে বিশুদ্ধ সনদে উল্লেখ করেন: রসূল সা. সাফিয়্যা রা.-এর চোখের দিকে একটি নীল দাগ দেখতে পেয়ে তাকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সাফিয়্যা জানালেন, তিনি যখন ইহুদি সরদার কেনানা ইবনে রবী ইবনে আবিল হুকাইকের স্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি একবার স্বপ্নে দেখেন, আকাশের চাঁদ যেন তার কোলে এসে পড়েছে। তিনি তার স্বপ্নের কথা স্বামীর কাছে বর্ণনা করলে তার স্বামী রেগে যায় এবং তাকে চপেটাঘাত করে বলে, ইয়াসরিবের অধিপতি তোমার স্বামী হোক-এটাই কি তুমি কামনা করো?

পরবর্তীতে সাফিয়্যা রা.-এর স্বপ্ন সত্যে পরিণত করেন মহান আল্লাহ তাআলা। জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি দিয়ে সকল মুমিনদের মা হওয়ার সৌভাগ্য দান করেন তাকে। জান্নাতেও রসূল সা.-এর স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন তিনি। রসূল সা. তাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। তিনি উটে আরোহণ করার সময় আল্লাহর রসূল সা. তার উটের পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন, যেন তিনি তার হাঁটুতে পা রেখে উটে আরোহণ করতে পারেন। এদিকে সাফিয়্যা রা.ও রসূল সা.-এর হাঁটুতে পা রাখতে রাজি হচ্ছিলেন না। অবশেষে রসূল সা.-এর হাঁটুতে নিজের হাঁটু রেখে তিনি বাহনে আরোহণ করেন।

খোদ সাফিয়‍্যা রা. নবীজির চারিত্রিক সৌন্দর্যের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, আমি রসূল সা.-এর চাইতে অধিক ভদ্র কাউকে দেখিনি। খায়বার থেকে ফেরার পথে রাতে আমি আল্লাহর রসূল সা.-এর বাহনে আরোহী ছিলাম। আমার প্রচণ্ড নিদ্রা আসায় বারবার আমার মাথা বাহনের কাঠের সাথে ধাক্কা খাচ্ছিলো। রসূল সা. কোমল স্পর্শে আমাকে জাগিয়ে বলেন, কিছুটা সামলে বসো।

ইসলাম গ্রহণ করে পবত্রি হওয়ার পর তাকে কেউ ইহুদী বলে কটাক্ষ করলে তিনি ভীষণ কষ্ট পেতেন। একদিন রসূলুল্লাহ সা. তার ঘরে গিয়ে দেখেন, তিনি কাঁদছেন। কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আয়েশা ও যায়নাব দাবি করে যে, তারা অন্য বেগমগণের চেয়ে উত্তম। কারণ, তারা আপনার বেগম হওয়া ছাড়াও চাচাতো বোন।

রসূল সা. তাকে খুশি করার জন্য বলেন, তুমি তাদেরকে এ কথা কেন বললে না যে, আমার বাবা হারূন আ., আমার চাচা মূসা আ. এবং আমার স্বামী মুহাম্মাদ। তাই তোমরা আমার চেয়ে ভালো হতে পারো কীভাবে!

রসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি হযরত সাফিয়্যার ছিল অন্তহীন ভালোবাসা। রসূল যখন আয়েশার গৃহে অন্তিম রোগশয্যায়, তখন একদিন সাফিয়্যা রা.-সহ অন্য বিবিগণ স্বামীকে দেখতে ও সেবা করতে একত্র হলেন। হযরত সাফিয়্যা রা. তখন অত্যন্ত ব্যথা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর নবী! আপনার এই সব কষ্ট আমি ভোগ করতে পারলে খুশি হতাম।' তার এমন কথা শুনে অন্য বিবিগণ একে অপরের দিকে এমনভাবে তাকাতে লাগলেন যেন তার কথায় তারা সন্দেহ করছেন। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর কসম! সে সত্য বলেছে। '

প্রথম বাসর রাতে হযরত আবু আয়্যুব আনসারী রা. রসূলুল্লাহ সা.-এর অজান্তে কোষমুক্ত তরবারি হাতে সারা রাত রসূলুল্লাহ সা.-এর তাঁবুর দরজায় পাহারা দেন। সকালে রসূল সা. তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে বলেন, এই নারীর পিতা, স্বামী, ভাইসহ সকল নিকট আত্মীয় নিহত হয়েছে। তাই আমার আশঙ্কা হচ্ছিলো, খারাপ কিছু করে না বসে। তার কথা শুনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটু হাসলেন এবং তার জন্য দোআ করলেন-হে আল্লাহ, আবু আইয়ুব যেভাবে সারারাত আমার হেফাজতে দাঁড়িয়ে ছিল তুমি তাকে সেভাবে হেফাজত করো

সাফিয়্যার সাথে রসূল সা.-এর বিবাহ ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। শুধু কামনা চরিতার্থ করার জন্যই রসূল সা. তাকে বিবাহ করেননি। নবীজির একটি অভিপ্রায় ছিল, যেভাবে তিনি তার গোত্রে সম্মানিত ছিলেন, তেমনই যেন مسلمانوں মধ্যে তার একটি সম্মানিত অবস্থান তৈরি হয়। যার সাথে বংশমর্যাদার দিক থেকে তার কোনো মিল নেই, এমন ব্যক্তির সাথে তার থাকা কষ্টকর হতো। এমনিতেই নিজের ভাই, বাবা ও গোত্রের অন্যান্য লোকদের হারিয়ে তিনি ছিলেন অনেকটা বিপর্যস্ত। রসূল সা.-এর সাথে বিবাহ ও চমৎকার আচরণে তার কষ্ট দূরীভূত হয়েছে। অন্যদিকে এর মাধ্যমে রসূল সা.-এর সাথে ইহুদিদের আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হয়। ফলে তাদের সাথে مسلمانوں শত্রুতা কমে আসার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাদের ইসলাম গ্রহণ ও مسلمانوں সাথে তাদের দ্বন্ধ হ্রাসের একটি উপলক্ষ ছিল এটি।

সাফিয়্যা রা. ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, বিচক্ষণ ও স্পষ্টভাষী। হযরত সাফিয়্যা রা.-এর এক দাসী একবার খলীফা হযরত ওমর রা.-এর নিকট অভিযোগ করলেন যে, এখনও তার মধ্যে ইহুদী ভাব বিদ্যমান। কারণ তিনি এখনও শনিবারকে মানেন এবং ইহুদীদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখেন। দাসীর কথার সত্যতা যাচায়ের জন্য হযরত ওমর রা. লোক মারফত হযরত সাফিয়্যা রা.-কে অভিযোগের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। তিনি জবাব দেন, 'যখন থেকে আল্লাহ আমাকে শনিবারের পরিবর্তে জুমআ দান করেছেন, তখন থেকে শনিবারকে মানার কোনো প্রয়োজন নেই। ইহুদিদের সাথে আমার সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে আমার বক্তব্য হলো, সেখানে আমার আত্মীয়-স্বজন আছে। তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার দিকে আমার দৃষ্টি রাখতে হয়। তারপর তিনি দাসীকে ডেকে জানতে চান, এ অভিযোগ করতে কে তোমাকে উৎসাহিত করেছেন? দাসী বললেন, শয়তান। হযরত সাফিয়্যা রা. চুপ হয়ে যান এবং দাসীকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেন।

উম্মুল মুমিনীন হযরত সফিয়‍্যা রা. রসূলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের পর চল্লিশ বছর জীবিত ছিলেন। এই সময়টুকু তিনি আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী, ইলম ও দাওয়াতের কাজে কাটান। খেলাফতে রাশেদার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি দেখেছেন। দিক-দিগন্তে দেখেছেন ইসলামের সুনির্মল আলো। হিজরী ৫০ বা মতান্তরে ৫২ সনের রমযান মাসে ৬০ বছর বয়সে হযরত সাফিয়্যা রা. মদীনায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এবং পৃথিবীর বুকে রেখে যান এক আলোকোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

টিকাঃ
১০৭২. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৩৮৩।
১০৭৩. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ ২/৩৮৩।
১০৭৪. আসসুরা মাআল ইয়াহুদ ৩/১০১।
১০৭৫. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ২/৩৮৪।
১০৭৬. আসসুরা মাআল ইয়াহুদ ৩/১০৩।
১০৭৭. আসসুরা মাআল ইয়াহুদ ৩/১২২
১০৭৮. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ২/৩৮৪।
১০৭৯. আস সীরাতুল হালাবিয়া: ৩/৪৫।
১০৮০. তিরমিযী: ৩৮৯২।
১০৮১. তাবাকাতে ইবনে সাআদ: ৮/১২৮।
১০৮২. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ২/৩৮৫।
১০৮৩. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ২/৩৮৫।
১০৮৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/২৩৩; আল ইসতিআব: ৪/৩৪৮।
১০৮৫. আবু শাহবা প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ২/৩৮৫।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বিষমিশ্রিত গোশত খাইয়ে নবীজিকে হত্যার চেষ্টা

📄 বিষমিশ্রিত গোশত খাইয়ে নবীজিকে হত্যার চেষ্টা


আবু হুরায়রা রা. বলেন, খায়বার বিজিত হওয়ার পর রসূল সা.-কে একটি ভুনাকৃত বকরি হাদিয়া দেওয়া হয়। তাতে বিষ মিশ্রিত ছিল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'এখানে যতো ইহুদি আছে আমার কাছে তাদের একত্রিত করো।'

তার কাছে সকলকে একত্র করা হলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উদ্দেশে বললেন, 'আমি তোমাদের নিকট একটি ব্যাপারে জানতে চাই, তোমরা কি সে বিষয়ে আমাকে সত্য কথা বলবে?' তারা বললো, হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমাদের পিতা কে?' তারা বললো, আমাদের পিতা অমুক। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা মিথ্যে বলেছো বরং তোমাদের পিতা অমুক।' তারা বললো, আপনি সত্য বলেছেন ও সঠিক বলেছেন। এরপর তিনি বললেন, 'আমি যদি তোমাদের নিকট আর একটি প্রশ্ন করি, তাহলে কি তোমরা সেক্ষেত্রে আমাকে সত্য কথা বলবে?' তারা বললো, হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম যদি আমরা মিথ্যে বলি তবে তো আপনি আমাদের মিথ্যা জেনে ফেলবেন, যেভাবে জেনেছেন আমাদের পিতার ব্যাপারে। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, 'জাহান্নামী কারা?' তারা বললো, আমরা সেখানে অল্প কয়দিনের জন্যে থাকবো। তারপর আপনারা আমাদের স্থানে যাবেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরাই সেখানে অপমানিত হয়ে থাকবে। আল্লাহর কসম! আমরা কখনও সেখানে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত হবো না।' এরপর তিনি তাদের বললেন, 'আমি যদি তোমাদের কাছে আর একটি বিষয়ে প্রশ্ন করি, তবে কি তোমরা সে বিষয়ে আমার কাছে সত্য কথা বলবে?' তারা বললো, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, 'তোমরা কি এ ছাগলের মধ্যে বিষ মিশিয়েছো?' তারা বললো, হ্যাঁ। তিনি বললেন, কেন তোমরা করেছো এ কাজ? তারা বললো, আমরা চেয়েছি, যদি আপনি মিথ্যাবাদী হন, তবে আমরা আপনার থেকে রেহাই পেয়ে যাবো। আর যদি আপনি সত্য নবী হন, তবে এটা আপনার কোনো ক্ষতি করবে না।

বুলুগুল আমানী গ্রন্থকার বলেন, ইহুদিদের সাল্লাম ইবনে মিশকামের স্ত্রী যায়নাব বিনতে হারেস আল্লাহর রসূল সা.-কে বিষযুক্ত ছাগলের মাংস দিয়েছিল। সে আগে থেকেই জানতো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহুর গোশত অধিক পছন্দ করতেন। তাই সে বাহুর গোশতে অধিক পরিমাণে বিষ মেশায়।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহুর গোশতটি নিয়ে সেখান থেকে এক টুকরো চাবালেন, কিন্তু গিলতে পারছিলেন না। তৎক্ষণাত তিনি তার মুখের গ্রাস ফেলে দেন। তার সাথে খেতে বসা বিশর ইবনে বারা রা. বিষযুক্ত ছাগলের মাংস চিবিয়ে গিলে ফেলেছিলেন আর এতেই তিনি শাহাদাতবরণ করেন।

উরওয়া ইবনে যুবায়েরের মাগাযীতে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহর রসূল সা. যখন ছাগলের সামনের বাহুর গোশত খাচ্ছিলেন তখন বিশর রা. অন্য একটি বাহুর গোশত মুখে দিয়েছিল। আল্লাহর রসূল সা. যখন মুখের খাদ্য বিষযুক্ত বুঝতে পেরে ফেলে দিয়েছেন তখন বিশরও মুখের গোশত ফেলে দেন। অতঃপর রসূল সা. বলেন, তোমরা এই খাবার থেকে হাত গুটিয়ে নাও। কেননা ছাগলের গোশত আমাকে জানাচ্ছে যে, তার মধ্যে বিষ মেশানো হয়েছে। তখন বিশর ইবনে বারা রা. বলেন, ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সম্মানিত করেছেন। আমিও তা খাওয়ার পূর্বে অনুভব করেছিলাম। কিন্তু আমি শুধু আপনার দস্তরখানের খাবার ফেলে দেওয়া ভালো মনে করিনি বিধায় তা ফেলে দিইনি। কিন্তু যখন আপনি মুখে খাবার তুলছিলেন তখন আমার নিজের জীবন কোনোভাবেই আপনার জীবনের চেয়ে বেশি প্রিয় মনে হয়নি। অবশ্য আমি এটা ভেবেছিলাম যে, যদি বাস্তবে খাবারটি বিষমিশ্রিত হয়ে থাকে, তাহলে আপনি অবশ্যই তা ফেলে দেবেন।

ইবনে কাইয়্যেম রহ. বলেন, ওই মহিলাকে রসূল সা.-এর দরবারে উপস্থিত করা হলে সে বলে, আমি আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম। উত্তরে আল্লাহর রসূল সা. বলেন, আল্লাহ তোমাকে আমার হত্যার ক্ষমতা দেননি। সাহাবীরা তাকে হত্যা করার অনুমতি চাইলে আল্লাহর রসূল সা. নিষেধ করেন। আল্লাহর রসূল সা. তাকে কিছু বললেন না এবং তাকে কোনো শাস্তিও দিলেন না। বিষের প্রভাবমুক্ত হওয়ার জন্য রসূল সা. কোমরে হিজামা করিয়েছিলেন ও অন্যান্য সাহাবীদের (যারা সে গোশত মুখে দিয়েছিলেন) হিজামা করার আদেশ দিয়েছিলেন; তবুও কয়েকজন সাহাবী এ বিষের প্রভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

তাৎক্ষণিকভাবে সে মহিলাকে হত্যা করা না হলেও পরবর্তীকালে তার হত্যার ব্যাপারে একাধিক মতামত পাওয়া যায়। সঠিক বর্ণনামতে, যখন বিশর ইবনে বারা রা. উক্ত বিষের প্রভাবে মৃত্যুবরণ করেন তখন তাকে হত্যা করা হয়।

যে বিষ মিশ্রিত করা হয়েছিল তা অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় বিশর ইবনে বারা রা. অল্পক্ষণের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন। অন্যদিকে আল্লাহর রসূল সা. মৃত্যুশয্যায় পর্যন্ত সে বিষের প্রভাব অনুভব করেন। ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারীতে আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূল সা. মৃত্যুশয্যায় তাকে বলেছিলেন,
مَا أَزَالُ أَجِدُ أَلَمَ الطَّعَامِ الَّذِي أَكَلْتُ بِخَيْبَرَ فَهَذَا أَوَانُ وَجَدْتُ انْقِطَاعَ أَبْهَرِي مِنْ ذَلِكَ السّم
আমি খায়বারে (বিষযুক্ত) যে খাবার খেয়েছিলাম আমি এখনও তার যন্ত্রণা অনুভব করছি। আর এখন মনে হচ্ছে, সে বিষক্রিয়ার ফলে আমার শিরাগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে।

টিকাঃ
১০৮৬. সহীহ বুখারী: ৫৭৭৭
১০৮৭. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৩৫২
১০৮৮. বুলুগুল আমানী: ২১/১২৩।
১০৮৯. মাগাজী রাসুলিল্লাহ: ১৯৮।
১০৯০. যাদুল মাআদ: ৩/৩৩৬।
১০৯১. যাদুল মাআদ: ৩/৩৩৬।
১০৯২. আসসুরা মাআল ইয়াহুদ ৩/১২১।
১০৯৩. সহীহ বুখারী বিশরহি ফাতহিল বারি: ৯/১৫৯-১৯৬।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 হাজ্জাজ ইবনে আলাত ও তার সম্পদ

📄 হাজ্জাজ ইবনে আলাত ও তার সম্পদ


আনাস রা. বলেন, খায়বার বিজয়ের পর হাজ্জাজ ইবনে আলাত আল্লাহর রসূল সা.-এর দরবারে এসে নিবেদন করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! মক্কায় আমার প্রচুর সম্পদ গচ্ছিত রয়েছে। মক্কার ব্যবসায়ীদের কাছে রয়েছে আমার পাওনা বিভিন্ন ধরনের মালপত্র। সুতরাং আমাকে অনুমতি দিন আমি যেন আমার সম্পদ তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারি। এ ব্যাপারে হয়তো আমার কিছু ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়ার দরকার হতে পারে। এরূপ করার অনুমতি আমাকে দিন!

রসূলুল্লাহ সা. তাকে সে অনুমতি দিলেন। মক্কায় পৌঁছে তিনি তার স্ত্রীকে বলেন, তোমার কাছে যে সম্পদ আছে তা একত্রিত করে আমাকে দিয়ে দাও। আমি খায়বারে গিয়ে মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীদের হত্যা করে তাদের কাছ থেকে যুদ্ধলব্ধ যে সম্পদ ইহুদিদের হস্তগত হয়েছে তা সব ক্রয় করতে চাই। যুদ্ধে মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছে ও তাদের যাবতীয় সম্পদ লুটে নেওয়া হয়েছে। এই সংবাদ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে মুশরিকরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলো। মুসলমানরা মূহ্যমান হয়ে পড়লো সীমাহীন শোকে। এ খবর আব্বাস রাযি. এর কাছে পৌঁছলে তিনি মর্মাহত হলেন; এমনকি দাঁড়াতেও পারলেন না।

মা'মার বর্ণনা করেন, আমাকে ওসমান জাযারী মিকসামের সূত্রে বর্ণনা করেন, আব্বাস রা. এ সংবাদ শুনে ঢলে পড়েন এবং তার ছেলে কুসাম যিনি রসূল সা.-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন, তাকে বুকের ওপর বসিয়ে এই কবিতা আবৃত্তি করেন :
حيي قثم حبي قثم شبيه ذي الأنف الأشم نبي رب ذي النعم برغم انف من رغم
আমার প্রিয় কুসাম! আমার প্রিয় কুসাম! যার নাক মুহাম্মাদের মতো তিনি নেয়ামতদাতা মহান রবের নবী। কেউ তাকে পছন্দ করুক বা না করুক।

সাবিত ইবনে আনাস বলেন, এরপর আব্বাস রা. তার একজন গোলামকে হাজ্জায ইবনে আলাতের কাছে বলে পাঠালেন, সর্বনাশ! তুমি এ কী সংবাদ নিয়ে এসেছো? আল্লাহ তাআলা যে ওয়াদা করেছেন তা তোমার আনীত সংবাদ হতে উত্তম। হাজ্জায ইবনে আলাত গোলামটিকে বললেন, আবুল ফযলকে আমার সালাম দেবে এবং বলবে, তার বাড়ির কোনো একটি জায়গা যেন খালি করে রাখেন। কেননা, আমি তার কাছে কিছু গোপন কথা বলবো যা তাকে আনন্দ দেবে।

এটা শুনে আব্বাস রা. খুশীতে লাফ দিয়ে উঠলেন এবং গোলামের কপালে চুমু খেলেন। হাজ্জায যা বলেছিলেন গোলামটি হুবহু তার পুনরাবৃত্তি করলো। তখন আব্বাস রা. গোলামটিকে আযাদ করে দিলেন। অতঃপর হাজ্জাজ ইবনে আলাত আব্বাস রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাকে আল্লাহর রসূল সা.- এর খায়বার বিজয়ের সুসংবাদ প্রদান করেন। তিনি তাকে বিস্তারিতভাবে খায়বার যুদ্ধের বিপুল গণিমত ও আল্লাহর বিধানমতে তা বণ্টন করার সংবাদ প্রদান করেন। সাফিয়্যা রা.-কে আল্লাহর রসূল সা. পছন্দ করে মুক্ত করে দেন এবং পরবর্তীকালে তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন, এ সংবাদও তিনি জানান আব্বাস রা.-কে।

অতঃপর বলেন, আমি শুধু এখানে আমার সম্পদ নেওয়ার জন্য এসেছি এবং এ ব্যাপারে আমি আল্লাহর রসূল সা.-এর অনুমতি নিয়ে এসেছি। হে আবুল ফজল, আপনি তিন দিন পর্যন্ত এ সংবাদ লুকিয়ে রাখুন। আল্লাহর শপথ, যখন তিনদিন চলে যাবে, তখন আপনি যেভাবে ইচ্ছা এই সংবাদ প্রচার করতে পারবেন।

হাজ্জাজ ইবনে আলাতের স্ত্রী তার সকল অলংকার ও সম্পদ একত্র করে তার হাতে দিলে তিনি তা নিয়ে ফিরে যান। যখন তিনদিন শেষ হলো, আব্বাস রা. হাজ্জাযের স্ত্রীর নিকট আগমন করলেন এবং জিজ্ঞাস করলেন, তোমার স্বামী কোথায়? তখন সে সংবাদ দিলো, তিনি তো চলে গেছেন। আরও বললো, হে আবুল ফযল! তোমাকে যেন আল্লাহ চিন্তিত না করেন। তোমার কাছে যে সংবাদ পৌঁছেছে এটা আমাদেরকেও আহত করেছে। আব্বাস রা. বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহ যেন আমাকে চিন্তাযুক্ত না করেন। তবে আল্লাহর প্রশংসা এজন্যে যে আমি যা পছন্দ করছিলাম তাই হয়েছে। আল্লাহ তার রসূলকে খায়বারে বিজয় দান করেছেন। তথায় তাদের জমিনে আল্লাহ তাআলার অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যা রা.-কে নিজের জন্যে পছন্দ করেছেন।

হাজ্জাজ ইবনে আলাত এ সংবাদ আপনাদের কাছে তিন দিন পর্যন্ত গোপন রাখতে বলেছিল। সে এখানে শুধু নিজের সম্পদ নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছিল এবং কৌশলে তা নিয়ে সরে পড়তে এসব কথা প্রচার করেছিল। আব্বাস রা.-এর মুখ থেকে এ বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর মুসলমানরা প্রথমে যতোটা কষ্ট পেয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি কষ্ট এবার কাফেররা পেলো। মুসলমানরা আনন্দে বেরিয়ে পড়লেন। যারা আব্বাসের ঘরে লুকিয়ে বসেছিলেন তারাও বের হয়ে পড়লেন। আব্বাস এ আনন্দের সংবাদ তাদের মধ্যে বর্ণনা করলেন। مسلمانوں মধ্যে আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়লো। অন্যদিকে কাফেররা শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লো।

উপর্যুক্ত ঘটনা থেকে শরীয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান অনুধাবন করা যায়। যদি কোনো ব্যক্তি নিজের হক আদায়ের জন্য নিজের ব্যাপারে বা অন্য কারও ব্যাপারে এমন কোনো মিথ্যা কথা বলে, যার দ্বারা অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষতি হয় না, তাহলে তা বৈধ হবে। হাজ্জাজ ইবনে আলাত নিজের সম্পদ নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিছু মিথ্যা কথা বলেছিলেন। ফলে সেখানে অবস্থানরত مسلمانوں কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি; যদিও মুসলমানরা সে সংবাদ শুনে কিছুটা কষ্ট পেয়েছিল। কিন্তু পরে সত্য সংবাদ শুনে তারা আনন্দিত হন এবং তাদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পায়। তার নিজের সম্পদ সংগ্রহকে নির্বিঘ্ন করতেই এখানে মিথ্যাকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

টিকাঃ
১০৯৪. সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ৪৫৯।
১০৯৫. ইমাম যাহাবী প্রণীত তারীখুল ইসলাম: আল মাগাযী: ৪৩৯।
১০৯৬. মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৯৭৭১। ইমাম হায়সামি মাজমাউজ জাওয়ায়েদ (৬/১৫৪-১৫৫) গ্রন্থে বলেন এই হাদিসটি ইমাম আহমদ, আবু ইয়ালা ও তাবারানি সূত্রে বর্নীত ও বর্ণনাকারীগণ বিশুদ্ধ সূত্রের রাবি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00