📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বেদুইন শহীদ

📄 বেদুইন শহীদ


জনৈক বেদুঈন রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ঈমান আনলো, আনুগত্য প্রকাশ করলো। সে বললো, আমি আপনার সঙ্গে হিজরত করবো। তাই রসূলুল্লাহ সা. তার ব্যাপারে কোনও একজন সাহাবীকে ওসিয়ত করলেন। খায়বার যুদ্ধ সংঘটিত হলে রসূলে কারীম সা. গনীমতের মাল বণ্টনকালে তাকে অংশীদার করলেন। তাকে যে অংশ তিনি দিয়েছিলেন, জনৈক সাহাবী তা তার নিকট পৌছে দেয়। লোকটি বকরি চরাতো। লোকটি উপস্থিত হলে তার বন্ধুরা তাকে তার অংশ দেয়। সে বললো, এটা কি? জবাবে তারা জানালো রসূলুল্লাহ সা. তোমাকে এ অংশ দান করেছেন। তখন লোকটি রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তার গণিমতের অংশ লাভের কথা নিশ্চিত করে বললো, আমি এ মালের জন্য আপনার আনুগত্য করিনি; বরং আমি তো আপনার আনুগত্য স্বীকার করেছি এজন্য যে, আমার এ দিকে তীর বিদ্ধ হবে-এ কথা বলে সে তীর দ্বারা তার গলার দিকে ইশারা করলো-আর মৃত্যু বরণ করে আমি জান্নাতে প্রবেশ করবো। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, ان تصدق الله يصدقك 'তোমার নিয়ত যদি সত্য হয়ে থাকে তবে আল্লাহ তা পুরণ করবেন।'

এরপর দুশমনের সঙ্গে লড়াই করার জন্য সাহাবীরা সকলেই রওয়ানা হলেন। লড়াই শেষে লোকটির মৃতদেহ রসূলুল্লাহ সা.-এর সমীপে উপস্থিত করা হলো। দেখা গেলো সে যেখানে ইশারা করেছিল, সেখানেই তীরের আঘাত লেগেছে। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, সে কি ওই ব্যক্তি? লোকেরা বললো, হ্যাঁ। তখন নবী করীম সা. বললেন, صدق الله فصدقه 'সে আল্লাহর সঙ্গে সত্য অঙ্গীকার করেছিল, আল্লাহ তার অঙ্গীকারকে সত্যে পরিণত করেছেন।' লোকটিকে নবী করীম সা. তার নিজের জুব্বা দ্বারা কাফন পরান এবং তার জানাযার নামায পড়ান। (নামায শেষে রসূলুল্লাহ সা.-এর মুখ থেকে) এ দোআ স্পষ্ট শোনা যায়:
اللهم هذا عبدك خرج مهاجرا في سبيلك قتل شهيدا হে আল্লাহ! লোকটি তোমারই রান্দা। তোমার রাস্তায় হিজরত করে বের হয়েছে। শহীদ হিসাবে সে নিহত হয়েছে, আমি এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছি।

টিকাঃ
১০৫০. সুনানে নাসায়ি: ৪/৬০।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 কালো রাখাল

📄 কালো রাখাল


খায়বারবাসীদের নিকট জনৈক হাবশী ক্রীতদাস এলো, যে ছিল তার মালিকের ছাগপালের রাখাল। সে যখন দেখতে পেলো যে, খায়বারবাসীরা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে, তখন সে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করে তোমরা কী চাও? তারা বললো, আমরা এ ব্যক্তির সঙ্গে লড়াই করবো, যে নিজেকে নবী বলে দাবী করছে। এতে নবীর প্রতি তার মন আকৃষ্ট হলো। সে বকরী নিয়ে রসূল সা. এর সমীপে হাজির হলো। জিজ্ঞেস করলো, আপনি কিসের দিকে আহ্বান জানান? তিনি বললেন: আমি তোমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাই। আমি আহ্বান জানাই যে, তুমি সাক্ষ্য দেবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ্ নেই, আমি আল্লাহর রসূল এবং আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করবে না।

তখন গোলাম বললো, আমি যদি একথার সাক্ষ্য দেই এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনি তাহলে আমি কী পাবো? রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'এই কথার ওপর অবিচল থেকে মৃত্যুবরণ করতে পারলে তুমি জান্নাত লাভ করবে।'

গোলামটি ঈমান এনে বললো, ইয়া রসূলাল্লাহ! এসব বকরি তো আমার নিকট আমানত। তখন রসূল সা. বললেন, 'এসব বকরিকে কংকর নিক্ষেপ করে আমাদের সৈন্যদলের আওতা থেকে তাড়িয়ে দাও। আল্লাহ তাআলা তোমার আমানত যথাস্থানে পৌঁছাবেন।'

সে তাই করলো। বকরিগুলো তার মালিকের নিকট ফিরে গেলো। তখন তার ইহুদি মনিব আঁচ করতে পারলো যে, তার গোলাম ইসলাম গ্রহণ করেছে।

তখন রসূলুল্লাহ সা. দাঁড়িয়ে লোকদেরকে উপদেশ দিলেন। এরপর আলী রা.- কে পতাকা দিলেন। আলী রা.-এর বাহিনীর সাথে সেই কৃষ্ণাঙ্গ দাসটিও লড়াই করতে গেলো এবং শহীদ হলো। তার মৃতদেহ মুসলিম সেনা ছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হলো। রসূল সা. সেনা ছাউনিতে উপস্থিত হলেন এবং সাহাবীগণকে সেখানে প্রত্যক্ষ করলেন। তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা এ দাসকে সম্মানিত করেছেন আর তাকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করেছেন। সত্যিকার অর্থে ইসলাম তার অন্তরে স্থান করে নিয়েছিল আর আমি তার শিয়রে দু'জন আয়তলোচনা হুর দেখতে পেয়েছি।' অথচ সে এখনো আল্লাহর দরবারে একটি সিজদাও করেনি।

টিকাঃ
১০৫১. বায়হাকী প্রণীত দালাইলুন নুবুওয়াহ: ৪/২১৯, ২২০; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৯২, ১৯৩
১০৫২. যাদুল মাআদ: ৩/৩২৩। আস সীরাতুল হালাবিয়া: ৩/৩৯।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 জাহান্নামী বীর

📄 জাহান্নামী বীর


খায়বারে রসূলুল্লাহ সা. তার সঙ্গীদের মধ্য থেকে মুসলিম হওয়ার দাবীদার এক ব্যক্তি সম্পর্কে বললেন, লোকটি জাহান্নামী। এরপর যুদ্ধ আরম্ভ হলে লোকটি সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করলো এবং তার দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলো। এতে রসূলুল্লাহ সা.-এর ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যাপারে কারো কারো মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল। অতঃপর লোকটি আঘাতের যন্ত্রণায় অসহ্য হয়ে তৃণীরের ভিতর হাত ঢুকিয়ে সেখান থেকে তীর বের করে আনলো এবং তীরটি নিজের বক্ষদেশে ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করলো। তা দেখে কতিপয় মুসলমান দ্রুত ছুটে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ আপনার কথা সত্য প্রমাণিত করেছেন। ওই লোকটি নিজেই নিজের বক্ষে আঘাত করে আত্মহত্যা করেছে। তখন তিনি বললেন, 'হে অমুক! দাঁড়াও এবং ঘোষণা দাও যে, মুমিন ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। যদিও কখনো কখনো আল্লাহ ফাসিক ব্যক্তি দ্বারাও দীনের সাহায্য করে থাকেন।

টিকাঃ
১০৫৩. সহীহ বুখারী: ৪২০৪ সহীহ মুসলিমের (১১১) রেওয়ায়াতে খায়বারের পরিবর্তে হুনাইনের কথা উল্লেখ আছে। অথচ কাযী আয়ায রহ. বলেন- খায়বারের উল্লেখই বিশুদ্ধ। (নববী প্রণীত শারহু মুসলিম: ২/১২২

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 হাবশ থেকে জাফর রা. ও তার সঙ্গীদের প্রত্যাবর্তন

📄 হাবশ থেকে জাফর রা. ও তার সঙ্গীদের প্রত্যাবর্তন


রসূলুল্লাহ সা. তখনো খায়বারেই অবস্থান করছিলেন। হাবশা (আবিসিনিয়া) থেকে হযরত জাফর ইবনে আবী তালিব রা. হাবশায় হিজরতকারী অন্যান্য মুসলমান এবং তাদের সঙ্গে মিলিত ইয়েমেনবাসীকে নিয়ে সেখানে পৌছলেন। আল্লাহর রসূল সা. জাফর রা.-এর কপালে চুম্বন করলেন এবং তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
ما أدري بأيهما أنا أُسر بفتح خيبر أم بقدوم جعفر؟ আল্লাহর কসম! আমি জানি না কোনটাতে আমি বেশী খুশী হয়েছি। খায়বার বিজয়ে না জাফরের আগমনে?

রসূল সা. আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী সাহাবীদের ফেরত আনার জন্য আমর ইবনে উমাইয়্যা দামেরী রা.-কে সম্রাট নাজাশীর দরবারে পাঠিয়েছিলেন। তিনি খায়বার বিজয়ের দিন সেখানে অবস্থানরত সাহাবীদের দুটি নৌকায় চড়িয়ে সাগর পার করে রসূল সা.-এর দরবারে নিয়ে আসেন। জাফর ইবনে আবু তালিব রা.-এর সফরসঙ্গী ছিলেন আবু মুসা আশআরী রা. ও তার অন্যান্য সাথিরা।

আবু মুসা আশআরী রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমরা যখন ইয়েমেনে ছিলাম, তখন আমাদের কাছে নবী সা.-এর হিজরতের খবর পৌছলো। তাই আমি ও আমার দুভাই আবু বুরদা ও আবু রুহম এবং আমাদের কাওমের বায়ান্ন, তিপ্পান্ন জন এর কিছু বেশি লোকসহ আমরা হিজরতের উদ্দেশে বের হলাম। আমি ছিলাম আমার অপর দুভাইয়ের চেয়ে বয়সে ছোট। আমরা একটি জাহাজে উঠলাম। জাহাজটি আমাদেরকে আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশির নিকট নিয়ে গেলো। সেখানে আমরা জাফর ইবনে আবু তালিবের সাক্ষাৎ পেলাম এবং তার সঙ্গেই আমরা থেকে গেলাম। অবশেষে নবী সা.-এর খায়বার বিজয়ের সময় সকলে একযোগে মদীনায় এসে তার সঙ্গে মিলিত হলাম।

জাফর রা. ও তার সাথে হিজরতকারীরা প্রায় দশ বছর হাবশায় অবস্থান করেন। ইতোমধ্যে পবিত্র কুরআনের অনেকাংশ অবতীর্ণ হয়ে যায়। বহু যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এসব কারণে মুসলমানদের কেউ কেউ ধারণা করলেন যে, আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীরা এসব ভালো কাজ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ফযিলতের দিক থেকে অন্যদের চেয়ে তারা নিচু পর্যায়ের।

আবু মুসা আশআরী বলেন, এ সময়ে মুসলিমদের কেউ কেউ আমাদেরকে অর্থাৎ জাহাজে আগমনকারীদের বললো, হিজরতের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী। আমাদের সঙ্গে আগমনকারী আসমা বিনতে উমাইস একবার রসূল সা.-এর সহধর্মিণী হাফসার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। তিনিও (স্বামী জাফরসহ) নাজাশির দেশে হিজরতকারীদের সঙ্গে হিজরত করেছিলেন। আসমা রা. হাফসার কাছেই ছিলেন। এ সময়ে ওমর রা. তার ঘরে প্রবেশ করলেন। ওমর রা. আসমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? হাফসা রা. বললেন, তিনি আসমা বিনতে উমাইস। ওমর রা. বললেন, ইনি আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী আসমা? সমুদ্রপথে আগত?

আসমা রা. বললেন, হ্যাঁ! তখন ওমর রা. বললেন, হিজরতের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে আগ্রগামী। সুতরাং তোমাদের তুলনায় রসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর আমাদের হক বেশি। এতে আসমা রা. রেগে গেলেন এবং বললেন, কখনো হতে পারে না। আল্লাহর কসম! আপনারা তো রসূলুল্লাহ সা.-এর সঙ্গে ছিলেন, তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন, আপনাদের অবুঝ লোকদেরকে নসিহত করতেন। আর আমরা ছিলাম রসূলুল্লাহ সা. থেকে বহুদূরে সর্বদা শত্রুবেষ্টিত আবিসিনিয়ায়। আল্লাহ ও তার রসূলের উদ্দেশেই ছিল আমাদের এ হিজরত। আল্লাহর কসম! আমি কোনো খাবার খাবো না, পানিও পান করবো না, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি যা বলেছেন তা আমি রসূলুল্লাহ সা.-কে না জানাবো। সেখানে আমাদেরকে কষ্ট দেওয়া হতো, ভয় দেখানো হতো। শীঘ্রই আমি রসূল সা.-কে এসব কথা বলবো এবং তাকে জিজ্ঞেস করবো। তবে আল্লাহর কসম! আমি মিথ্যা বলবো না, পেঁচিয়ে বলবো না, বাড়িয়েও কিছু বলবো না। অতঃপর রসূল সা. আগমন করলে তিনি তার কাছে বিস্তারিত বললেন। উত্তরে আল্লাহর রসূল সা. তাকে বললেন, তারা তোমাদের চাইতে আমার বেশি নিকটতম নন। তারা একটিমাত্র হিজরত করেছে আর তোমরা দুটি হিজরত করেছো।

আসমা বিনতে উমাইস রা.-কে বলা রসূল সা.-এর এই বাণী তার সব সঙ্গীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তিনি স্বয়ং বলেন, আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী দলের সদস্যরা দলে দলে আমার কাছে এসে এই হাদীস শুনতো। রসূল সা. তাদের মর্যাদা-সংক্রান্ত যে মন্তব্য করেছেন, এর চেয়ে খুশির বিষয় তাদের জন্য পৃথিবীতে আর কিছু ছিল না। রসূল সা. খায়বার বিজয়ে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের সাথে পরামর্শক্রমে আবিসিনিয়া থেকে আসা সাহাবীদের মাঝে গণিমতের অংশ বণ্টন করেন।

টিকাঃ
১০৫৪. সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৩৫১-৩৫২।
১০৫৫. সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ৪৬১।
১০৫৬. সহীহ বুখারী: ৪২৩০।
১০৫৭. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ: ২/৪৬১।
১০৫৮. সহীহ বুখারী: ৪২৩১।
১০৫৯. ফিকহুস সীরাহ লিলগাজবান: ৫৩৫।
১০৬০. সহীহ মুসলিম: ২৫০২-২৫০৩।
১০৬১. আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআল ইয়াহুদ: ৩/৯২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00