📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 খায়বার অভিমুখে মুজাহিদদের যাত্রা

📄 খায়বার অভিমুখে মুজাহিদদের যাত্রা


খায়বারের দুর্গগুলো কতো দুর্ভেদ্য এবং সেখানকার সামরিক শক্তি ও পর্যাপ্ত যুদ্ধ-সরঞ্জামের তথ্য মুসলমানরা জানতেন। তবুও পরিপূর্ণ ঈমানি চেতনা নিয়ে তাঁরা খায়বার অভিমুখে যাত্রা করেন। মুসলমানরা যাত্রাপথে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর ধ্বনি দিচ্ছিলেন। রসূল সা. তাদের মৃদু আওয়াজে জিকির করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, 'হে লোকেরা, তোমরা নিজেদের ওপর দয়া করো। তোমরা কোনো বধির অথবা অনুপস্থিত কাউকে ডাকছো না। তোমরা ডাকছো সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা মহান আল্লাহকে।

সহীহ বুখারীতে খায়বার অভিমুখে সফরের বিস্তারিত বিবরণ হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া রা. থেকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-খায়বারের পথে আমরা রাতের বেলা পথ চলছিলাম। ইতোমধ্যে জনৈক ব্যক্তি (আমার চাচা) আমের ইবনুল আকওয়া-কে বললো, 'হে 'আমের! তুমি কি আমাদেরকে তোমার অসাধারণ কিছু কবিতা শোনাবে না? আমের ছিলেন একজন উঁচুদরের কবি। একথা শুনে তিনি নিজের বাহন থেকে নামলেন এবং নিজ কওমের জন্য প্রার্থনামূলক কবিতা বলা শুরু করলেন।

اللهم لولا أنت ما اهتدينا ولا تصدقنا ولا صلينا فاغفر فداء لك ما أبقينا وألقين سكينة علينا وثبت الأقدام إن لاقينا إنا إذا صيح بنا أبينا وبالصياح عولوا علينا
'হে আল্লাহ! তুমি না হলে আমরা হেদায়াত লাভ করতাম না, সদকাহ দিতাম না আর সালাত আদায় করতাম না।
তাই আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন, যতো দিন আপনার প্রতি সমর্পিত হয়ে থাকবো। আমাদের ওপর শান্তি বর্ষণ করুন এবং শত্রুর মুকাবেলায় আমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখুন।
আমাদেরকে যখন (কুফরের দিকে) ডাকা হয় আমরা তখন তা প্রত্যাখ্যান করি। আর এ কারণে তারা চীৎকার করে আমাদের বিরুদ্ধে লোক-লস্কর জমা করে।

মুসনাদে আহমাদে এ অংশটুকু বাড়তি আছে,
ان الذين قد بغوا علينا اذا أرادوا فتنة ألبنا
'নিঃসন্দেহে যারা আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, তারা যখন ফেতনা বাড়াবার ইচ্ছা করে, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি।'

রসূলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করলেন, 'এই চালকটি কে'? লোকেরা বললো, 'আমের ইবনুল আকওয়া'। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'আল্লাহ তার ওপর রহম করুন'। তখন ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলে উঠলেন, হে আল্লাহর নবী! তার নাম তো শহীদদের তালিকায় উঠে গেলো। যদি আপনি তার দ্বারা আমাদের উপকৃত হওয়ার সুযোগ করে দিতেন!

ইমাম বুখারী রহ. সুয়াইদ ইবনে নুমান রা.-এর রেওয়ায়াত উল্লেখ করেছেন যে, তিনি খায়বারের বছর রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে বেরিয়েছিলেন। তারা সাহবায় পৌঁছলে সেখানে রসূল সা. আসর পড়ান। পরে তিনি খাবার তলব করলে শুধু ছাতু আনা হয়। রসূল সা.-এর নির্দেশে ছাতু ভিজিয়ে দেয়া হয়। তিনি ছাতু খেলেন এবং আমরাও খেলাম। অতঃপর রসূল সা. মাগরিবের নামাযের উদ্দেশ্যে দাঁড়ালেন এবং কুলি করলেন। আমরাও কুলি করলাম। এরপর রসূল সা. অযু না করেই নামায আদায় করলেন।

আল্লাহর রসূল সা. কাফের-বাহিনীর সংবাদ সংগ্রহের জন্য আব্বাদ ইবনে বিশর রা. এর নেতৃত্বে কয়েকজনের একটি দল প্রেরণ করেন। আব্বাদ ইবনে বিশর রা. বাহিনীর আগে আগে থেকে সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তখন আশজা' গোত্রের সন্দেহজনক এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসে। তাকে দেখতে ইহুদিদের গুপ্তচরের মতো লাগছিল।

আব্বাদ রা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কে তুমি? জবাবে সে বললো, আমার উট হারিয়ে গেছে, আমি উটের সন্ধান করছি।

আব্বাদ রা. : তুমি কি খায়বারের ব্যাপারে কিছু জানো?

গুপ্তচর: আমি সবেমাত্র খায়বার থেকে এলাম। আপনারা তাদের সম্পর্কে কী জানতে চাচ্ছেন?

আব্বাদ রা. : আমি ইহুদিদের সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।

গুপ্তচর: কেনানা ইবনে আবিল হুকাইক ও হাওযাহ ইবনে কায়েস তাদের মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ গোত্র গাতফানের কাছে গিয়েছিল। তারা তাদেরকে এই শর্তে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে এসেছে যে, তাদেরকে খায়বারের এক বছরের উৎপাদিত খেজুর দেয়া হবে। তারা ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্রসহ উতবা ইবনে বদরের নেতৃত্বে চলে এসেছে এবং তাদের দুর্গে প্রবেশ করেছে। ওই দুর্গে আগে থেকেই দশ হাজার লড়াকু সৈনিক মজুদ আছে। খায়বারের ইহুদিরা এমন দুর্গের অধিপতি যা কখনো বিজয় করা যাবে না। এছাড়া তাদের কাছে অফুরন্ত অস্ত্রশস্ত্র ও খাদ্যভান্ডার রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা হলেও তারা খাদ্য-সংকটে পড়বে না। পানিও ওদের রয়েছে প্রচুর। আমার ধারণা কেউই তাদের সাথে পেরে উঠতে পারবে না।

এই আলাপ শুনে আব্বাদ ইবনে বিশর রা. নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে, এই লোক ইহুদিদের গুপ্তচর। তিনি তাকে চাবুক মারলেন। বললেন, তুমি ইহুদিদের গুপ্তচর। সবকিছু সত্য করে বলো, নইলে তোমার মাথা উড়িয়ে দেবো।

গুপ্তচর : আমি সত্য বললে আপনি কি আমাকে নিরাপত্তা দেবেন?

আব্বাদ রা.: হ্যাঁ, তোমাকে নিরাপত্তা দেয়া হবে।

গুপ্তচর: ইয়াসরিবের ইহুদিদের ওপর তোমরা যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছো, তার প্রেক্ষিতে খায়বারের ইহুদিরা তোমাদের ব্যাপারে ভীষণ শঙ্কিত। আমার এক চাচাতো ভাই মদীনায় তার পণ্য বিক্রি করতে আসলে ওখানকার ইহুদিরা তাকে এই বার্তা দিয়ে কেনানা ইবনে আবিল হুকাইকের কাছে পাঠায় যে, মুসলমানদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। তাদের কাছে ঘোড়া এবং অস্ত্রশস্ত্রও তেমন নেই। সুতরাং তাদের ওপর একযোগে আক্রমণ চালাও। যাতে ওরা পালিয়ে যায়। কেননা এখনো তারা এমন কোনো জাতির মোকাবেলাই করেনি যারা ভালোভাবে যুদ্ধ করতে পারে। কুরায়েশ এবং আরবদের একথা ভালো জানা আছে যে, তোমাদের কাছে জনশক্তি, খাদ্যপণ্য ও অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে অঢেল। এছাড়া তোমাদের দুর্গও দুর্ভেদ্য। তাই তারা একথা শুনে খুবই আনন্দিত যে, মুহাম্মাদ সা. তোমাদের কাছে যাচ্ছে। (কেননা, তার ধারণা মতে যুদ্ধে তোমরাই বিজয় লাভ করবে)। কুরায়েশরা বলছিল, এই যুদ্ধে ইহুদিরা বিজয় লাভ করবে। এদিকে মুহাম্মাদ সা.-এর প্রতি হৃদ্যতা লালনকারীদের বক্তব্য হচ্ছে, মুহাম্মাদ সা. বিজয় লাভ করবেন। তবে জেনে রেখো, যদি মুহাম্মাদ সা. বিজয় লাভ করেন, তাহলে চিরকালীন অপদস্থতাই হবে আমাদের ললাটলিখন।

যাযাবর লোকটি আব্বাদ ইবনে বিশর রা.-কে বললো, এসব কথা আমি শুনে ফেলেছিলাম। এ কারণে কেনানা ইবনে আবিল হুকাইক আমাকে বললো, তোমার ওপর কেউ কোনো সন্দেহ করবে না। তুমি গিয়ে তাদের সমুদয় অবস্থা জেনে এসে আমাকে অবহিত করো। একজন ফকিরের বেশে তুমি তাদের কাছে চলে যাও। তাদেরকে আমাদের সংখ্যাধিক্য এবং বৈষয়িক প্রাচুর্য দ্বারা ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলো। পরে তাদের সব অবস্থা জেনে আমাদের কাছে ফিরে এসো।

রসূলুল্লাহ সা. খায়বার পৌছে সাহাবীদের বললেন, قِفُوا ‘থামো’। সব মুজাহিদ সাথে সাথে থেমে গেলেন। এরপর রসূলুল্লাহ সা. আল্লাহর দরবারে দোআ করলেন:
اللَّهم رَبَّ السَّمَوَاتِ وَمَا أَظْلَلْنَ وَرَبَّ الْأَرَضِينَ وَمَا أَقَلَلْنَ وَرَبَّ الشَّيَاطِينِ وَمَا أَضَلَلْنَ وَرَبَّ الرِّيَاحِ وَمَا أَدْرَيْنَ فَإِنَّا نَسْأَلُكَ خَيْرَ هَذِهِ الْقَرْيَةِ وَخَيْرَ أَهْلِهَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ أَهْلِهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا أَقَدِمُوا بِسْمِ اللَّهِ
‘হে আল্লাহ, আসমান জমিন ও তার মধ্যে অবস্থিত সবকিছুর অধিপতি, সব শয়তান এবং তারা যত লোককে বিভ্রান্ত করেছে তাদেরও মালিক এবং বাতাসও তার চালিত, প্রবাহিত ও উৎক্ষিপ্ত জিনিসসমূহের নিরংকুশ রব, আমরা আপনার কাছে এই জনপদ ও তার অধিবাসীদের সব রকমের অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহর নামে তোমরা এগিয়ে যাও।'
তিনি প্রতিটি জনপদে প্রবেশকালেই এ দোআ পড়ে নিতেন। রাতের বেলা যখন রসূল সা. খায়বার অঞ্চলে পৌঁছলেন, তখন তার বাহিনীকে খায়বারের উঁচু এলাকায় রাতযাপনের আদেশ দেন। ইসলামী-বাহিনী অত্যন্ত প্রত্যুষে জাগ্রত হয়ে রাযী প্রান্তরে ছাউনি ফেলে। আর এভাবেই গাতফানের পক্ষ থেকে ইহুদিদের কাছে সাহায্য আসার যাবতীয় রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।

হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. ফজরের নামায পড়ান। নামায শেষ হওয়ার পর মুসলমানরা নিজ নিজ বাহনে আরোহণ করলেন। তারা দেখলেন সকাল বেলা খায়বারের শ্রমিকরা কোদাল ও ঝুড়ি নিয়ে দিনের কাজে বেরুচ্ছে। রসূলুল্লাহ সা. ও তার বাহিনিকে দেখে তারা সবিস্ময়ে বলে উঠলো, 'এ যে মুহাম্মাদ, আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ তার বাহিনীসহ!' আনাস রা. বলেন, আল্লাহর রসূল সা. তাদের দেখে বলে উঠলেন :
اللهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ خَرِبَتْ خَيْبَرُ إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذَرِينَ
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, খায়বার ধ্বংস হোক। আমরা যখন কোনো কাওমের আঙ্গিনায় অবতরণ করি, তখন সতর্কীকৃতদের প্রভাত হয় মন্দ।

টিকাঃ
১০২০. সহীহ বুখারী: ৬৩৮৪।
১০২১. সহীহ বুখারী: ৪১৯৬; সহীহ মুসলিম: ১৮০২
১০২২. সহীহ বুখারী: ২৮৩৭; সহীহ মুসলিম: ১৮০৭; মুসনাদে আহমাদ: ৪/৫২
১০২৩. সহীহ বুখারী: ৪১৯৬
১০২৪. সহীহ বুখারী: ৪১৯৫; আসসুরা মাআল ইয়াহুদ ২/৩০
১০২৫. ওয়াকেদী প্রণীত আল-মাগাযী: ২/৬৪১, ৬৪২।
১০২৬. সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ: ৪৫৮।
১০২৭. আসসুরা মাআল ইয়াহুদ ২/৪৫।
১০২৮. সহীহ বুখারী: ২৯৯১ ও ৪১৯৮

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 খায়বার দুর্গের বিজয়

📄 খায়বার দুর্গের বিজয়


নিজেদের দুর্গগুলোতে আশ্রয় নেয় খায়বারের ইহুদিরা। মুসলমানরা তাদের অবরুদ্ধ করে সেখানে অবস্থান নেয়। পর্যায়ক্রমে তারা একটি একটি করে দুর্গ বিজয় করতে থাকে। প্রথমে বিজয় করা হয় নায়েম নামের দুর্গ। এরপর বিজয় করা হয় খায়বারের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত নাতাত অঞ্চলের সাআব ও শিক অঞ্চলে অবস্থিত আবুন্নাজার দুর্গ। পরে আবুল হুকাইকের কামুস দুর্গ মুসলমানদের হাতে আসে। এটি ছিল কাতিবা অঞ্চলের সর্ববৃহৎ ও শক্তিশালী দুর্গ। পর্যায়ক্রমে ওয়াতিহ ও সুলালিম নামক অঞ্চলের দুর্গগুলোও মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

খায়বার যুদ্ধে সর্বপ্রথম শাহাদাত বরণ করেন মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা.- এর ভাই মাহমূদ ইবনে মাসলামা রা.। কঠিন যুদ্ধে তিনি বেশ বীরদর্পে লড়াইয়ের পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন। তবে দিনটি ছিল ভীষণ তাপদাহপূর্ণ। তাই কিছুটা বিশ্রামের লক্ষ্যে তিনি নায়েম দুর্গের সাথে লাগোয়া একটি প্রাসাদের ছায়ায় চলে যান। তিনি ভেবেছিলেন ওখানে কোনো ইহুদি যোদ্ধা নেই। কিন্তু মারহাব তাকে দেখে ফেলে। সে প্রাসাদের ছাদে চড়ে বিশাল এক যাঁতার পাটা তার মাথার ওপর নিক্ষেপ করে। আঘাত এতোটাই জটিল ছিল যে, তার কপালের চামড়া মুখে এসে গিয়েছিল। তাকে আহত অবস্থায়ই রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি নিজ হাতে তার চামড়া যথাস্থানে রাখেন এবং তার ওপর পট্টি বাঁধেন। পরে তাকে চিকিৎসালয়ে স্থানান্তর করা হয়। রাজী প্রান্তরে তার চিকিৎসা চলতে থাকে। তৃতীয় দিন তিনি ইন্তেকাল করেন。

নায়েম দুর্গ অবরোধের সূচনাকালে মুসলমানদের পতাকা ছিল আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর হাতে। কিন্তু দুর্গটি বিজয় করা সম্ভব হচ্ছিল না। মুসলমানদের ভয়াবহ যুদ্ধ ও প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হচ্ছিলো। তখন রসূল সা. বললেন,
لَأُعْطِيَنَّ هَذِهِ الرَّايَةَ غَدًا رَجُلًا يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَى يَدَيْهِ يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُوْلَهُ وَيُحِبُّهُ الله وَرَسُوْلُهُ
আগামীকাল সকালে আমি এমন এক লোকের হাতে ঝান্ডা তুলে দেবো যার হাতে আল্লাহ খায়বারে বিজয় দান করবেন। যে আল্লাহ এবং তার রসূলকে ভালোবাসে এবং যাকে আল্লাহ এবং তার রসূল ভালোবাসেন।

মুসলিমগণ এ জল্পনায় রাত কাটালো যে, তাদের মধ্যে কাকে দেয়া হবে এ ঝান্ডা। সকালে সবাই রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে আসলেন আর প্রত্যেকেই তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করছিলেন। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'আলী ইবনে আবু তালিব রা. কোথায়?' সহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! তিনি তো চক্ষুরোগে আক্রান্ত। তিনি বললেন, 'তার কাছে লোক পাঠাও।' তাকে আনা হলে রসূলুল্লাহ সা. তার উভয় চোখে থুথু লাগিয়ে তার জন্য দোআ করলেন। ফলে তার চোখ এতো ভালো হয়ে গেলো যেন তার চোখে কোনো রোগই ছিল না। এরপর তিনি তার হাতে ঝান্ডা প্রদান করলেন। তারপর রসূলুল্লাহ সা. বললেন,
انْفُذُ عَلَى رِسْلِكَ حَتَّى تَنْزِلَ بِسَاحَتِهِمْ ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الإِسْلَامِ وَأَخْبِرْهُمْ بِمَا يَجِبُ عَلَيْهِمْ مِنْ حَقِّ اللَّهِ فِيْهِ فَوَاللهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ
তুমি বর্তমান অবস্থায়ই তাদের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে হাজির হও, এরপর তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দাও, ইসলাম গ্রহণের পর তাদের ওপর যে দায়িত্ব বর্তাবে সে সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করো। কারণ আল্লাহর কসম! তোমার দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ যদি মাত্র একজন মানুষকেও হেদায়াত দেন তাহলে তা তোমার জন্য লাল রঙের (মূল্যবান) উটের মালিক হওয়ার চেয়ে উত্তম।

আলী রা. কিছুদূর গেলেন এবং পেছনে না ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি তাদের সাথে কোন বিষয়ের ওপর যুদ্ধ করবো? রসূল সা. বললেন, তাদের সাথে ততোক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করবে, যতোক্ষণ তারা এ কথার সাক্ষ্য না দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সা. আল্লাহ তাআলার রসূল। তারা তা মেনে নিলে তোমার পক্ষ থেকে রক্ত ও সম্পদ নিরাপদ করে নেবে। তাদের হক ও হিসাব আল্লাহর জিম্মায় থাকবে。

যখন মুসলমানরা দুর্গ অবরোধ করে রাখেন, তখন দুর্গের নেতা ও বিখ্যাত যোদ্ধা মারহাব এগিয়ে আসে। এর আগে সে আমের ইবনে আকওয়া রা.-কে শহীদ করেছিল। আলী রা. তাকে মুখোমুখি যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং হত্যা করেন। অবশ্য অন্য এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তাকে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা. হত্যা করেছিলেন। তার হত্যায় ইহুদিদের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। পরাজয় তাদের ধাওয়া করতে থাকে।

বিভিন্ন বর্ণনায় একথা পাওয়া যায় যে, ইহুদিরা আলী রা.-এর হাত থেকে তার ঢাল ফেলে দিলে তিনি নায়েম দুর্গের একটি বিশাল দরজা ঢাল হিসেবে বহন করেন। কিন্তু এ ধরনের বর্ণনাগুলো নিতান্তই দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য। তবে তার বীরত্ব ও সাহসিকতার ব্যাপারে বহু বিশুদ্ধ বর্ণনা রয়েছে。

নায়েম দুর্গ জয়ের পর মুসলমানরা সাআব দুর্গ ঘেরাও করে নেয়। রসূলুল্লাহ সা. এই দুর্গে আক্রমণের জন্য মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে হুবাব ইবনে মুনযির আনসারী রা.-কে নিয়োগ দেন এবং তার হাতে পতাকা তুলে দেন। তিনদিনের যুদ্ধের পর তিনি তা বিজয় করেন। ওই দুর্গ বিজয়ের পর মুসলমানদের হাতে পর্যাপ্ত খাদ্য ও বিভিন্ন সামগ্রী চলে আসে।

এরপর মুজাহিদরা জুবায়ের দুর্গ অভিমুখে এগিয়ে যান। এখানে নায়েম ও সাআব দুর্গ হতে পরাজিত ও পলাতক ইহুদিরা একত্রিত হয়েছিল। মুসলমানরা তা অবরোধ করে রাখে এবং বাইরে থেকে সব ধরনের খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এতে ইহুদিদের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তিনদিনের মধ্যে তারা পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়। এ দুর্গ বিজয়ের মাধ্যমে তারা বিপুল পরিমাণ গণিমত লাভ করে। নাতাত অঞ্চলের যাবতীয় দুর্গ মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

অতঃপর মুসলমানরা শিক অঞ্চল অভিমুখে এগিয়ে যান। প্রথমে তারা সেখানে উবাই নামক দুর্গ জয় করতে সক্ষম হন। ওই দুর্গের যোদ্ধারা পালিয়ে নাজার কেল্লায় আশ্রয় নিলে মুসলমানরা তা অবরোধ করে রাখেন। একপর্যায়ে তারা দুর্গ খুলে দিতে বাধ্য হয়। এখানকার অন্যান্য ইহুদিরা নিজেদের দুর্গ থেকে পালিয়ে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ কামুস, ওয়াতিহ ও সুলালিম কেল্লায় অবস্থান নেয়। মুসলমানরা ১৪ দিন পর্যন্ত এসব দুর্গ অবরোধ করে রাখায় এক পর্যায়ে তারা সন্ধিচুক্তির আবেদন জানাতে বাধ্য হয়。

এসব ঘটনা দ্বারা বোঝা যায়, রসূল সা. যুদ্ধের মাধ্যমে খায়বার বিজয় করেছিলেন। বুখারী, মুসলিম ও আবু দাউদ-এর বর্ণনা দ্বারা এটা প্রতীয়মান হয়。

অবশেষে গোটা খায়বার এলাকা মুসলমানদের পদানত হয়। এ সময়ই খায়বারের উত্তরাঞ্চলের ফাদাকবাসী সন্ধিচুক্তি করতে চায়। বিপুল পরিমাণে সম্পত্তির বিনিময়ে তারা নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা চায়। রসূল সা. তাদের আবেদন গ্রহণ করেন。

যেহেতু কোনো প্রকার আক্রমণ ছাড়া এই অঞ্চলটি মুসলমানদের হাতে আসে, তাই এটি আল্লাহর রসূল সা.-এর জন্য বিশেষায়িত করা হয়েছিল। অতঃপর মুসলমানরা খায়বার ও তাইমার মধ্যবর্তী লোকালয় ওয়াদিউল কুরা এলাকা কয়েকদিন অবরোধ করে। একপর্যায়ে তারা অস্ত্রসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ফলে মুসলমানরা বিপুল পরিমাণ গণিমত লাভ করে। সেখানকার জমি ও খেজুরবাগানগুলো ইহুদিদের দিয়ে দেওয়া হয়। তাদের সাথেও খায়বার অঞ্চলের মানুষদের মতো লেনদেনের চুক্তি সম্পাদিত হয়। তাইমা অঞ্চলের অধিবাসীরাও খায়বারের মতো চুক্তি করে। চরমভাবে পরাজিত হয় ইহুদিরা। তাদের যাবতীয় সম্পদ ও দুর্গ মুসলমানদের হাতে চলে আসে। এ যুদ্ধে তিরানব্বইজন ইহুদি মারা যায়। নারী ও শিশুদের সবাইকে যুদ্ধবন্দী বানিয়ে নেওয়া হয়। যাদের মধ্যে ছিলেন হুয়াই ইবনে আখতাবের মেয়েও। রসূল সা. তাকে মুক্ত করে বিয়ে করেন。

ইবনে ইসহাক বলেন, খায়বার যুদ্ধে বিশজন মুসলমান শহীদ হন। অন্যদিকে ওয়াকিদি পনেরোজন মুসলমান শহীদ হয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন。

টিকাঃ
১০২৯. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুইল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৫০১।
১০০০. ওয়াকেদী প্রণীত আল-মাগাযী: ২/১২১
১০০১. সহীহ বুখারী: ৪২১০
১০০২. সহীহ মুসলিম: ২৪০৫
১০০৩. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুইল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৫০২।
১০০৪. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুইল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৫০২।
১০০৫. আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ: ১/৩২৪।
১০০৬. আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ: ১/৩২৪।
১০০৭. ইমতাউল আসমা : ১/৩১১
১০০৮. ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ২/৬৫৮-৬৭১।
১০০০. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৫০৪।
১০৪০. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৫০৪।
১০৪১. সহীহ মুসলিম: ১৩৬৫।
১০৪২. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৫০৪।
১০৪৪. ওয়াকেদী প্রণীত মাগাযী: ৩/৬৯৯।
১০৪৫. যাদুল মাআদ: ৩/৩৫৪-৩৫৫।
১০৪৬. আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফি যুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ: ৫০৪।
১০৪৭. সহীহ মুসলিম: ১০৪৫।
১০৪৮. আস সীরাতুন নববিয়্যাহ আসসহীহাহ: ১/৩২৭।
১০৪৯. আল মাগাযী: ২/৭০০।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বেদুইন শহীদ, কালো রাখাল ও জাহান্নামী বীর

📄 বেদুইন শহীদ, কালো রাখাল ও জাহান্নামী বীর


ক. বেদুইন শহীদ

জনৈক বেদুঈন রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ঈমান আনলো, আনুগত্য প্রকাশ করলো। সে বললো, আমি আপনার সঙ্গে হিজরত করবো। তাই রসূলুল্লাহ সা. তার ব্যাপারে কোনও একজন সাহাবীকে ওসিয়ত করলেন। খায়বার যুদ্ধ সংঘটিত হলে রসূলে কারীম সা. গনীমতের মাল বণ্টনকালে তাকে অংশীদার করলেন। তাকে যে অংশ তিনি দিয়েছিলেন, জনৈক সাহাবী তা তার নিকট পৌছে দেয়। লোকটি বকরি চরাতো। লোকটি উপস্থিত হলে তার বন্ধুরা তাকে তার অংশ দেয়। সে বললো, এটা কি? জবাবে তারা জানালো রসূলুল্লাহ সা. তোমাকে এ অংশ দান করেছেন। তখন লোকটি রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তার গণিমতের অংশ লাভের কথা নিশ্চিত করে বললো, আমি এ মালের জন্য আপনার আনুগত্য করিনি; বরং আমি তো আপনার আনুগত্য স্বীকার করেছি এজন্য যে, আমার এ দিকে তীর বিদ্ধ হবে-এ কথা বলে সে তীর দ্বারা তার গলার দিকে ইশারা করলো-আর মৃত্যু বরণ করে আমি জান্নাতে প্রবেশ করবো। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, ان تصدق الله يصدقك 'তোমার নিয়ত যদি সত্য হয়ে থাকে তবে আল্লাহ তা পুরণ করবেন।'

এরপর দুশমনের সঙ্গে লড়াই করার জন্য সাহাবীরা সকলেই রওয়ানা হলেন। লড়াই শেষে লোকটির মৃতদেহ রসূলুল্লাহ সা.-এর সমীপে উপস্থিত করা হলো। দেখা গেলো সে যেখানে ইশারা করেছিল, সেখানেই তীরের আঘাত লেগেছে। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, সে কি ওই ব্যক্তি? লোকেরা বললো, হ্যাঁ। তখন নবী করীম সা. বললেন, صدق الله فصدقه 'সে আল্লাহর সঙ্গে সত্য অঙ্গীকার করেছিল, আল্লাহ তার অঙ্গীকারকে সত্যে পরিণত করেছেন।' লোকটিকে নবী করীম সা. তার নিজের জুব্বা দ্বারা কাফন পরান এবং তার জানাযার নামায পড়ান। (নামায শেষে রসূলুল্লাহ সা.-এর মুখ থেকে) এ দোআ স্পষ্ট শোনা যায়:

اللهم هذا عبدك خرج مهاجرا في سبيلك قتل شهيدا হে আল্লাহ! লোকটি তোমারই রান্দা। তোমার রাস্তায় হিজরত করে বের হয়েছে। শহীদ হিসাবে সে নিহত হয়েছে, আমি এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছি।

খ. কালো রাখাল

খায়বারবাসীদের নিকট জনৈক হাবশী ক্রীতদাস এলো, যে ছিল তার মালিকের ছাগপালের রাখাল। সে যখন দেখতে পেলো যে, খায়বারবাসীরা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে, তখন সে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করে তোমরা কী চাও? তারা বললো, আমরা এ ব্যক্তির সঙ্গে লড়াই করবো, যে নিজেকে নবী বলে দাবী করছে। এতে নবীর প্রতি তার মন আকৃষ্ট হলো। সে বকরী নিয়ে রসূল সা. এর সমীপে হাজির হলো। জিজ্ঞেস করলো, আপনি কিসের দিকে আহ্বান জানান? তিনি বললেন: আমি তোমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাই। আমি আহ্বান জানাই যে, তুমি সাক্ষ্য দেবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ্ নেই, আমি আল্লাহর রসূল এবং আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করবে না।

তখন গোলাম বললো, আমি যদি একথার সাক্ষ্য দেই এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনি তাহলে আমি কী পাবো? রসূলুল্লাহ সা. বললেন, 'এই কথার ওপর অবিচল থেকে মৃত্যুবরণ করতে পারলে তুমি জান্নাত লাভ করবে।'

গোলামটি ঈমান এনে বললো, ইয়া রসূলাল্লাহ! এসব বকরি তো আমার নিকট আমানত। তখন রসূল সা. বললেন, 'এসব বকরিকে কংকর নিক্ষেপ করে আমাদের সৈন্যদলের আওতা থেকে তাড়িয়ে দাও। আল্লাহ তাআলা তোমার আমানত যথাস্থানে পৌঁছাবেন।'

সে তাই করলো। বকরিগুলো তার মালিকের নিকট ফিরে গেলো। তখন তার ইহুদি মনিব আঁচ করতে পারলো যে, তার গোলাম ইসলাম গ্রহণ করেছে।

তখন রসূলুল্লাহ সা. দাঁড়িয়ে লোকদেরকে উপদেশ দিলেন। এরপর আলী রা.- কে পতাকা দিলেন। আলী রা.-এর বাহিনীর সাথে সেই কৃষ্ণাঙ্গ দাসটিও লড়াই করতে গেলো এবং শহীদ হলো। তার মৃতদেহ মুসলিম সেনা ছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হলো। রসূল সা. সেনা ছাউনিতে উপস্থিত হলেন এবং সাহাবীগণকে সেখানে প্রত্যক্ষ করলেন। তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা এ দাসকে সম্মানিত করেছেন আর তাকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করেছেন। সত্যিকার অর্থে ইসলাম তার অন্তরে স্থান করে নিয়েছিল আর আমি তার শিয়রে দু'জন আয়তলোচনা হুর দেখতে পেয়েছি।' অথচ সে এখনো আল্লাহর দরবারে একটি সিজদাও করেনি।

গ. জাহান্নামী বীর

খায়বারে রসূলুল্লাহ সা. তার সঙ্গীদের মধ্য থেকে মুসলিম হওয়ার দাবীদার এক ব্যক্তি সম্পর্কে বললেন, লোকটি জাহান্নামী। এরপর যুদ্ধ আরম্ভ হলে লোকটি সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করলো এবং তার দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলো। এতে রসূলুল্লাহ সা.-এর ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যাপারে কারো কারো মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল। অতঃপর লোকটি আঘাতের যন্ত্রণায় অসহ্য হয়ে তৃণীরের ভিতর হাত ঢুকিয়ে সেখান থেকে তীর বের করে আনলো এবং তীরটি নিজের বক্ষদেশে ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করলো। তা দেখে কতিপয় মুসলমান দ্রুত ছুটে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ আপনার কথা সত্য প্রমাণিত করেছেন। ওই লোকটি নিজেই নিজের বক্ষে আঘাত করে আত্মহত্যা করেছে। তখন তিনি বললেন, 'হে অমুক! দাঁড়াও এবং ঘোষণা দাও যে, মুমিন ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। যদিও কখনো কখনো আল্লাহ ফাসিক ব্যক্তি দ্বারাও দীনের সাহায্য করে থাকেন।

টিকাঃ
১০৫০. সুনানে নাসায়ি: ৪/৬০।
১০৫১. বায়হাকী প্রণীত দালাইলুন নুবুওয়াহ: ৪/২১৯, ২২০; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৯২, ১৯৩
১০৫২. যাদুল মাআদ: ৩/৩২৩। আস সীরাতুল হালাবিয়া: ৩/৩৯।
১০৫৩. সহীহ বুখারী: ৪২০৪ সহীহ মুসলিমের (১১১) রেওয়ায়াতে খায়বারের পরিবর্তে হুনাইনের কথা উল্লেখ আছে। অথচ কাযী আয়ায রহ. বলেন- খায়বারের উল্লেখই বিশুদ্ধ। (নববী প্রণীত শারহু মুসলিম: ২/১২২

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বেদুইন শহীদ

📄 বেদুইন শহীদ


জনৈক বেদুঈন রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ঈমান আনলো, আনুগত্য প্রকাশ করলো। সে বললো, আমি আপনার সঙ্গে হিজরত করবো। তাই রসূলুল্লাহ সা. তার ব্যাপারে কোনও একজন সাহাবীকে ওসিয়ত করলেন। খায়বার যুদ্ধ সংঘটিত হলে রসূলে কারীম সা. গনীমতের মাল বণ্টনকালে তাকে অংশীদার করলেন। তাকে যে অংশ তিনি দিয়েছিলেন, জনৈক সাহাবী তা তার নিকট পৌছে দেয়। লোকটি বকরি চরাতো। লোকটি উপস্থিত হলে তার বন্ধুরা তাকে তার অংশ দেয়। সে বললো, এটা কি? জবাবে তারা জানালো রসূলুল্লাহ সা. তোমাকে এ অংশ দান করেছেন। তখন লোকটি রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তার গণিমতের অংশ লাভের কথা নিশ্চিত করে বললো, আমি এ মালের জন্য আপনার আনুগত্য করিনি; বরং আমি তো আপনার আনুগত্য স্বীকার করেছি এজন্য যে, আমার এ দিকে তীর বিদ্ধ হবে-এ কথা বলে সে তীর দ্বারা তার গলার দিকে ইশারা করলো-আর মৃত্যু বরণ করে আমি জান্নাতে প্রবেশ করবো। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, ان تصدق الله يصدقك 'তোমার নিয়ত যদি সত্য হয়ে থাকে তবে আল্লাহ তা পুরণ করবেন।'

এরপর দুশমনের সঙ্গে লড়াই করার জন্য সাহাবীরা সকলেই রওয়ানা হলেন। লড়াই শেষে লোকটির মৃতদেহ রসূলুল্লাহ সা.-এর সমীপে উপস্থিত করা হলো। দেখা গেলো সে যেখানে ইশারা করেছিল, সেখানেই তীরের আঘাত লেগেছে। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, সে কি ওই ব্যক্তি? লোকেরা বললো, হ্যাঁ। তখন নবী করীম সা. বললেন, صدق الله فصدقه 'সে আল্লাহর সঙ্গে সত্য অঙ্গীকার করেছিল, আল্লাহ তার অঙ্গীকারকে সত্যে পরিণত করেছেন।' লোকটিকে নবী করীম সা. তার নিজের জুব্বা দ্বারা কাফন পরান এবং তার জানাযার নামায পড়ান। (নামায শেষে রসূলুল্লাহ সা.-এর মুখ থেকে) এ দোআ স্পষ্ট শোনা যায়:
اللهم هذا عبدك خرج مهاجرا في سبيلك قتل شهيدا হে আল্লাহ! লোকটি তোমারই রান্দা। তোমার রাস্তায় হিজরত করে বের হয়েছে। শহীদ হিসাবে সে নিহত হয়েছে, আমি এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছি।

টিকাঃ
১০৫০. সুনানে নাসায়ি: ৪/৬০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00