📄 কতিপয় ইহুদির ব্যাপারে নবীজির কাছে সুপারিশ
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 যুবায়ের ইবনে বাতার ব্যাপারে সাবিত ইবনে কায়সের সুপারিশ
সাবিত ইবনে কায়েস ইবনে শাম্মাস রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে বলেন, আল্লাহর রসূল! আমাকে যুবায়ের ইবনে বাতা ইহুদিকে দান করুন। বুআস যুদ্ধে তার একটি অনুগ্রহের দায় এখনো রয়েছে আমার ওপর। রসূলুল্লাহ সা. তার প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। পরে জাবের ইবনে কায়েস যুবায়ের ইবনে বাতা-এর নিকট গেলেন এবং তাকে বললেন, হে আবু আবদুর রহমান, তুমি কি আমাকে চেনো? উত্তরে সে বলে, হ্যাঁ, কেউ কি তার ভাইকে ভুলে যেতে পারে? অতঃপর সাবিত বলেন, আমি বুআস যুদ্ধের দিন তোমার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অনুগ্রহের প্রতিদান আদায় করতে চাচ্ছি। উত্তরে যুবায়ের বলে, এটাই স্বাভাবিক। একজন উত্তম ব্যক্তি নিঃসন্দেহে অনুগ্রহের প্রতিদান আদায় করে থাকে। অতঃপর সাবিত বলেন, আমি এমনটিই করেছি। আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ থেকে তোমার ব্যাপারে অনুমতি পেয়েছি। একথা বলে সাবিত তার বাঁধন খুলে দেন।
যুবায়ের তাকে বলেন, তোমরা আমার পরিবারের সবাইকে আটক করে রেখেছো। আমার তো সাথে নিয়ে যাওয়ার মতো কিছু নেই। এ কথা শুনে সাবিত পুনরায় রসূলুল্লাহ সা.-এর খেদমতে উপস্থিত হলেন এবং যুবায়েরের পরিবারের মুক্তির জন্য অনুমতি চাইলেন। রসূলুল্লাহ সা. তার অনুরোধ রক্ষা করেন। সাবিত যুবায়েরের কাছে এসে জানালেন, রসূলুল্লাহ সা. তোমার পরিবারকে মুক্ত করে দিয়েছেন। জবাবে যুবায়ের বলে, আমার বাগানে কয়েক ধরনের খেজুর রয়েছে। এসব ব্যতীত আমার জীবিকা নির্বাহের আর কোনো উপায় নেই। সাবিত রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে পুনরায় উপস্থিত হয়ে এ মর্মে নিবেদন করলে রসূলুল্লাহ সা. তার সহায়-সম্পত্তি ফিরিয়ে দেন। সাবিত যুবায়েরকে লক্ষ্য করে বলেন, রসূলুল্লাহ সা. তোমার সহায়-সম্পত্তি ও পরিবার মুক্ত করে তোমার হাতে দিয়েছেন। এখন তুমি ইসলাম গ্রহণ করো ও চিরকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করো। যুবায়ের নিজের দুই সহচর তথা কাআব ইবনে আসাদ ও হুয়াই ইবনে আখতাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। ৯৮৭
সাবিত এদের দুজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানান। তিনি আরও বলেন, হয়তো আল্লাহ তাআলা তোমার সৎকর্মের কারণে তোমাকে জীবিত রেখেছেন। যুবায়ের সাবিতকে বলেন, হে সাবিত, আল্লাহর দোহাই দিয়ে তোমার কাছে আমি প্রার্থনা করছি এবং বুআস যুদ্ধের দিন আমি তোমার ওপর যে অনুগ্রহ করেছি তার দোহাই দিয়ে বলছি, আমাকেও মৃতদের অন্তর্ভুক্ত করে দাও। কারণ এ দুজনের মৃত্যুর পর আমার জীবনের প্রতি আর কোনো আগ্রহ নেই। সাবিত রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উক্ত কথোপকথন উপস্থাপন করলে রসূলুল্লাহ সা. যুবায়েরকে হত্যার আদেশ দেন। অতঃপর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৮৮
টিকাঃ
৯৮৭ আল ইয়াহুদু ফিস সুন্নাতিল মুতাহহারহ: ১/৩৭২।
*৮৮ আল ইয়াহুদু ফিস সুন্নাতিল মুতাহহারহ: ১/৩০২।
📄 রিফাআ ইবনে সামওয়ালের ব্যাপারে সালমা বিনতে কায়সের সুপারিশ
উম্মুল মুনজির সালমা বিনতে কায়েস রা. ছিলেন সালিত ইবনে কায়েসের বোন। তিনি ছিলেন রসূলুল্লাহ সা.-এর খালা এবং উভয় কেবলার অভিমুখী হয়ে নামায পড়া নারীদের অন্তর্ভুক্ত। রসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে অন্যান্য নারীগণের মতো তিনিও বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি জনৈক ইহুদি রিফাআ ইবনে সামওয়াল কুরাজির ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে সুপারিশ করেছিলেন। যে পূর্ব থেকেই তার পরিচিত ছিল এবং তার কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। সালমা রসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেন, আল্লাহর রসূল! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ! রিفاআকে মুক্ত করে দিন। সে ধারণা করছে, একদিন হয়তো সে নামাযও পড়বে এবং উটের গোশতও ভক্ষণ করবে। রসূলুল্লাহ সা. তার আবেদন মঞ্জুর করেন। এভাবেই তিনি রিفاআকে বাঁচাবার চেষ্টা করেন। ৯৮৯
আলোচ্য দুটি ঘটনা দ্বারা বুঝা যায়, ইসলাম নারীদের সম্মান করে এবং তাদের সুপারিশ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে। ৯৯০
টিকাঃ
৯৮৯ আল ইয়াহুদু ফিস সুন্নাতিল মুতাহহারহ: ১/৩৭৩।
৯৯০ আবু ফারিস প্রণীত আসসুরা মাআল ইয়াহুদ: ২/১১৬।
📄 মতভিন্নতার আদব
রসূলুল্লাহ সা. সাহাবীদের আদেশ করেছিলেন, 'তোমাদের কেউ যেন বনু কুরায়যার বাসস্থানে পৌঁছার পূর্বে আসরের নামায আদায় না করে।' রসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশ বুঝতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কেউ কেউ ভেবেছিলেন, এ নির্দেশনার মাধ্যমে মূলত রসূলুল্লাহ সা. দ্রুত যাত্রা করার আদেশ দিয়েছেন। আর তারা পথিমধ্যেই আসরের নামায আদায় করে নিয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, রসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশনার আক্ষরিক অর্থই উদ্দেশ্য। তারা বনু কুরায়যার বাসস্থানে পৌঁছেই আসরের নামায আদায় করেন।
উভয়দলের কাউকেই তিরস্কার করেননি রসূলুল্লাহ সা.। এভাবেই শরীয়তের একটি মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়, শাখাগত বিধানের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত থাকতে পারে। রসূলুল্লাহ সা. এই ধরনের ভিন্নমতকে সমর্থন করছিলেন এবং উভয় পক্ষের গবেষণাকেই যথার্থ মনে করেছেন। এতে এই মূলনীতিও ফুটে ওঠে যে, এ ধরনের শাখাগত বিধানের ক্ষেত্রে মতবিরোধ তৈরি হলে তা একেবারে দূর করা অসম্ভব। ৯৯১
শরয়ী বিধানের ক্ষেত্রে মতবিরোধ যদি শাখাগত বিধানে তৈরি হয়, তা সম্পূর্ণ দূর করা মূলত আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতিবহির্ভূত। যেসব বিধানে বিভিন্ন সম্ভবনা বিদ্যমান, আমাদের যুগে যদি এসব বিধানের ক্ষেত্রে মতবিরোধ দূর করা সম্ভব হয়, তাহলে রসূলুল্লাহ সা.-এর যুগে তো তা দূর করা অবশ্য সম্ভব ছিল। শাখাগত বিধানের ক্ষেত্রে তাহলে সাহাবায়ে কেরাম কখনও কোনো ধরনের বিরোধে লিপ্ত হতেন না। কিন্তু যেহেতু এ ধরনের বিধানের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরام পারস্পরিক বিরোধের শিকার হয়েছিলেন তাহলে আমরাও তা থেকে রক্ষা পেতে পারি না। ৯৯২
আলোচ্য হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, যদি কোনো ব্যক্তি কুরআনে কারীম বা রসূলুল্লাহ সা.-এর কোনো হাদীসের আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করে তাহলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যেতে পারে না। যদি কোনো গবেষক শরীয়তের কোনো নসের বিধান বিশেষ পরিস্থিতির সাথে বিশেষায়িত করে দেয়, তাকেও দোষী সাব্যস্ত করা যেতে পারে না। কাজেই বোঝা গেলো, গবেষণার ক্ষেত্রে ভ্রান্তির শিকার হলেও শাখাগত বিধানের ক্ষেত্রে গবেষণা করলে কোনো মুজতাহিদই অপরাধী হবেন না। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, কোনো বিচারক ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছলে তার জন্য আছে দু'টি পুরস্কার। আর বিচারক ইজতিহাদে ভুল করলে তার জন্য রয়েছে একটি পুরস্কার। ৯৯৩
যাই হোক, রসূলুল্লাহ সা. বনু কুরায়যার বাসস্থানে পৌঁছে আসরের নামায আদায়ের যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সাহাবায়ে কেরামের কেউ কেউ এ নিষেধাজ্ঞাকে বাহ্যিক অর্থেই ধরে নিয়েছিলেন এবং নামাযের সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার প্রতিও ভ্রূক্ষেপ করেননি। নির্দিষ্ট সময়ে নামায আদায় করার বিধানকে তারা সেদিনের জন্য বিশেষভাবে নামায দেরি করার বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করে তার ওপর আমল করেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন, হয়তো এই আদেশে বিশেষভাবে বনু কুরায়যার বাসস্থানে গিয়ে আসরের নামায পড়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তাই তারা এই বিশেষ বিধানটির ওপর আমল করেন। ৯৯৪
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, এই ঘটনাকে সকল মুজতাহিদের নিজস্ব গবেষণায় সঠিক হওয়ার পক্ষে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। এই ঘটনা থেকে শুধু এতটুকুই অনুমান করা যায় যে, এই ধরনের গবেষণার ক্ষেত্রে কাউকে নিন্দা করা যাবে না অর্থাৎ তাদের কেউ গুনাহগার হবে না। ঘটনার সারনির্যাস হচ্ছে, সাহাবায়ে কেরামের কেউ কেউ রসূলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশনা শাব্দিক অর্থে বুঝেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, যুদ্ধকালীন ব্যস্ততার কারণে নামায দেরি করা হয়তো বৈধ। কেননা, ইতোমধ্যে তারা দেখেছিলেন, খন্দকের যুদ্ধে কয়েক ওয়াক্ত নামাযে দেরি করা হয়েছিল। অন্যান্য সাহাবীগণ হাদীসের নির্দেশনা আক্ষরিক অর্থে বোঝেননি। তারা ভেবেছিলেন, রসূলুল্লাহ সা. এ নির্দেশনার মাধ্যমে মূলত দ্রুত যুদ্ধযাত্রা করতে বলেছেন। অধিকাংশ উলামায়ে কেরام এ ব্যাপারে ইজতিহাদকারী উভয় দলকে সঠিক বলে সাব্যস্ত করেছেন। কেননা, রসূলুল্লাহ সা. উভয় দলের কাউকেই কিছু বলেননি। যদি কারও গবেষণা ভ্রান্তির ওপর থাকতো বা কারও কৃতকর্ম অন্যায় হতো, রসূলুল্লাহ সা. অবশ্যই তাদের সাবধান করে দিতেন। ১৯৯৫
টিকাঃ
৯৯১ ফিকহুস সীরাহ লিলবুতী: ২৬২।
৯৯২ ফিকহুস সীরাহ লিলবুতী: ২৬২।
৯৯৩ সহীহ বুখারী: ৭৩৫২।
৯৯৪ আল মুসতাফাদ মিন কাসাসিল কুরআন: ২/২৮৬।
১৯৮০ ফাতহুল বারী: ৭/৪৭৩।