📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 রসূলুল্লাহ সা.-এর ফুফু সাফিয়্যার বীরত্ব

📄 রসূলুল্লাহ সা.-এর ফুফু সাফিয়্যার বীরত্ব


নারী ও শিশুদের যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রসূলুল্লাহ সা. তাদের একটি শক্তিশালী দুর্গে পৃথকভাবে রেখেছিলেন। কেননা, যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তাদের প্রতি লক্ষ রাখা मुसलमानों জন্য ছিল কষ্টসাধ্য। বনু কুরায়যার ইহুদিরা মুসলমান নারী ও শিশুদের দুর্গ পর্যবেক্ষণে একজন ইহুদিকে পাঠায়। রসূলুল্লাহ সা.-এর ফুফু সাফিয়া রা. তাকে দেখে ফেলেন। তিনি তাঁবুর একটি খুঁটি খুলে দুর্গ থেকে নিচে নেমে আসেন এবং তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেন। সাফিয়ার বীরত্বপূর্ণ এ কাজ মুসলমান নারী ও শিশুদের দুর্গে আক্রমণের পরিকল্পনা করা ইহুদিদের ভয় পাইয়ে দেয়। বনু কুরায়যা ধারণা করে, মুসলমান নারী ও শিশুদের দুর্গ مسلمانوں পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ১৪৩
সাফিয়া রা.-এর বীরত্বপূর্ণ এ ঘটনার মাধ্যমে একটি মাসআলা স্পষ্ট হয়ে যায়, পুরুষের অনুপস্থিতিতে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মুসলিম নারীরাও আত্মরক্ষায় প্রতিরক্ষা যুদ্ধ করতে পারবে। ৯৪৪

টিকাঃ
১৪৩ আবু ফারিস প্রণীত গাযওয়ায়ে আহ্যাব: [পৃষ্ঠা? দেয়া নেই]।
১৪৪ ড. আবদুল্লাহ সাঈদ প্রণীত আল মুস্তাফাদ মিনাল ইসলামিয়্যাতি: ৪০১।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 হাসান ইবনে সাবিত রা. সম্পর্কে অসত্য বর্ণনা

📄 হাসান ইবনে সাবিত রা. সম্পর্কে অসত্য বর্ণনা


হযরত সাফিয়া রা. এক ইহুদিকে ঘুরতে দেখে হযরত হাসসান ইবনে সাবিত রা.-কে বলেছিলেন, এক ইহুদি চারদিকে ঘোরাঘুরি করছে। সে আমাদের দুর্বলতাগুলো জানতে দিতে পারে। তাকে হত্যা করুন। তখন হযরত হাসসান ইবনে সাবিত রা. বলেছিলেন, তা করতে আমি সক্ষম নই। সাফিয়া রা. বলেন, এরপর একটি কাঠের টুকরো নিয়ে কোমরে কাপড় বেঁধে নেমে যাই। ওই ইহুদিকে আমি পিটিয়ে হত্যা করি। দুর্গে ফিরে হাসসানকে বললাম, হাসসান! তুমি তার অস্ত্র ও সামগ্রীগুলো নিয়ে নাও। তিনি বলেন, আবদুল মুত্তালিবের বেটি! আমার এ সবের দরকার নেই।’ লোকমুখে প্রচলিত এ বর্ণনাটি বিশুদ্ধ নয়। এর কয়েকটি কারণ হচ্ছে:
সূত্রগত দিক থেকে এই বর্ণনাটি বিশুদ্ধ নয়; বরং ত্রুটিপূর্ণ। এটা বর্ণনা করা বৈধ নয়। আজীবন ইসলামের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত একজন সাহাবীর ব্যাপারে এমন উক্তি মিথ্যা অপবাদ হিসেবে গণ্য হবে।
এছাড়াও বর্ণনা অনুযায়ী যেভাবে হাসসান ইবনে সাবিতকে কাপুরুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যদি বাস্তবে তাই হতো তাহলে তার শত্রুরা অবশ্যই তার এ দুর্বল দিক আলোচনা করে তার নিন্দা করত। বিশেষত সারাজীবন তিনি কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে তার বিপরীত পক্ষের যেসব কবিদের নিন্দাবাদ করেছিলেন তারা অবশ্যই তার এই ত্রুটিটি তুলে ধরতে কার্পণ্য করত না। তিনি জাহেলি নেতাদের প্রত্যেকেরই নিন্দাবাদ করতেন। রসূলুল্লাহ সা. হাসসান ইবনে সাবিত রা.-এর জন্য দোয়া করতেন এবং তাকে সমর্থন করতেন। কাফেরদের বিরুদ্ধে তার নিন্দাসূচক কাব্যকে সাধুবাদ জানাতেন।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 প্রথম ইসলামী সামরিক চিকিৎসাকেন্দ্র

📄 প্রথম ইসলামী সামরিক চিকিৎসাকেন্দ্র


মুসলমানরা প্রথম সামরিক চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন গাযওয়ায়ে আহ্যাব চলাকালে। রসূলুল্লাহ সা. যুদ্ধ চলাকালে মসজিদে নববীতে আহতদের জন্য আলাদা একটি তাঁবু নির্মাণ করিয়েছিলেন। রুফাইদা আসলামীকে সে চিকিৎসাকেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয়। এভাবেই মুসলিম নারীদের মধ্যে রুফাইদা রোগীদের নার্স হওয়ার সম্মানে ভূষিত হন।
সীরাতে ইবনে হিশাম-এ বলা হয়েছে, রসূলুল্লাহ সা. সা’আদ ইবনে মুআজকে মসজিদে নববীতে আসলাম গোত্রের একজন নারীর তাঁবুতে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন; যাকে রুফাইদা নামে অভিহিত করা হতো। যিনি আহত অসহায় অসুস্থ ব্যক্তিদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করতেন। খন্দকযুদ্ধ চলাকালীন সাআد ইবনে মুআয আঘাতপ্রাপ্ত হলে রসূলুল্লাহ সা. তার গোত্রের লোকদের বলেছিলেন, তাকে রুফাইদা'র তাঁবুতে রেখে আসো। যেন আমি সহজেই তার দেখাশোনা করতে পারি। ১৪৮
এ আলোচনা দ্বারা বোঝা যায়, مسلمانوں কেউ আহত হলে যদি তার বাসস্থান আশেপাশে থাকতো, তাহলে পরিবারের লোকেরা তার দেখাশোনা করতেন। কিন্তু যাদের বাসস্থান দূরে ছিল তাদের মসজিদে নববীতে সেবাদানের তাঁবুতে রাখা হতো। সাআد ইবনে মুআযের নিজস্ব বাসস্থান ছিল। কিন্তু রসূলুল্লাহ সা. তার শারীরিক অবস্থা দেখাশোনার জন্য তাকে মসজিদে নববীর তাঁবুতে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাই তাকে সেবাদানের তাঁবুতে রাখা হয়েছিল। কেননা, সে তাঁবুতে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিগণ রসূলুল্লাহ সা.-এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন।
সাআد ইবনে মুআযের আভিজাত্য, আল্লাহভীরুতা ও আল্লাহর পথে তার আত্মোৎসর্গের বিবেচনায় তাকে অত্যন্ত মর্যাদার চোখে দেখা হতো। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা যখন শুধু আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য আমল করেন এবং নিজেকে সাধারণ মানুষের কাতারে নামিয়ে আনেন তখন তাদের মর্যাদা আরও বেড়ে যায়। তাই তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা পাওয়ার উপযুক্ত হিসেবে গণ্য হয়েছিলেন। ১৪৯
রসূলুল্লাহ সা. মর্যাদাবান ব্যক্তিদের এভাবে গুরুত্ব দিতেন।

টিকাঃ
১৪৮ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/২৬৩।
১৪৯ মুঈনুস সীরাহ: ২৯৪।

📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 মুসলমান পাপ করলে দ্রুত তাওবার মাধ্যমে ফিরে আসে

📄 মুসলমান পাপ করলে দ্রুত তাওবার মাধ্যমে ফিরে আসে


বনু কুরায়যার লোকেরা আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনজিরকে দুর্গত্যাগের ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য ডেকে পাঠালো। তিনি ইসলামপূর্ব সময়ে তাদের মিত্র ছিলেন। তারা পরামর্শ চাইলে তিনি তাদের নিজের গলার দিকে ইঙ্গিত করে বোঝালেন, তোমাদের ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ থেকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারপর তিনি অনুতপ্ত হলেন এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে না গিয়ে মসজিদে নববীতে চলে গেলেন। মসজিদের একটি খুঁটির সাথে নিজেকে বেঁধে বললেন, আমি যে ভুল করেছি তা আল্লাহ মাফ না করা পর্যন্ত আমি এই স্থান থেকে নড়বো না, যে মাটিতে আমি আল্লাহ ও তার রসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি, সেখানে আমি আর কখনো কাউকে মুখ দেখাবো না।
রসূলুল্লাহ সা. অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন আবু লুবাবার জন্য। পরে ঘটনা শুনে বললেন, সে যদি আমার কাছে আসতো তাহলে আমি তার জন্য ক্ষমা চাইতাম। কিন্তু সে যখন এরূপ প্রতিজ্ঞা করেই ফেলেছে তখন আল্লাহ ক্ষমা না করা পর্যন্ত তাকে আমি মুক্ত করতে পারি না।
উম্মে সালামা রা. বলেন, আবু লুবাবাকে ক্ষমা করা হলে আমি বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ, আমি কি তাকে এ সুসংবাদ জানাবো? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জানাতে পারো। অতঃপর উম্মে সালামা তাঁর ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, হে লুবাবা, সুসংবাদ! তোমাকে ক্ষমা করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, তখনো পর্দার আয়াত নাযিল হয়নি।
এরপর তাকে মুক্ত করার জন্য মুসলমানরা তার কাছে ছুটে গেলো। কিন্তু আবু লুবাবা বললেন, রসূলুল্লাহ সা. নিজ হাতে মুক্ত না করা পর্যন্ত আমি নিজেকে মুক্ত করবো না। একথা জানতে পেরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফযরের নামাযে যাওয়ার সময় তার বাঁধন খুলে দেন। ৯৫০
উপর্যুক্ত ঘটনা থেকে অনুধাবন করা যায়, আবু লুবাবা যখন অত্যন্ত গোপনীয় সামরিক তথ্য শত্রুপক্ষের কাছে ফাঁস করে দেওয়ার মতো অপরাধ করে ফেললেন, তখন তিনি নিজের অপরাধকে লুকানোর চেষ্টা করেননি। যেহেতু মানুষের সামনে তার অপরাধ প্রকাশিত হয়নি, তিনি ইচ্ছে করলে তা লুকিয়ে রাখতে পারতেন এবং ইহুদিদেরও এ সম্পর্কে মুখ না-খোলার পরামর্শ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ তাআলা সবকিছু সম্পর্কে অবগত। এদিকে রসূলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ থেকে সামরিক সিদ্ধান্ত গোপন রাখার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। আর তাই তিনি নিজের অপরাধের কারণে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। ৯৫১
তিনি নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেন এবং বিচারের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষা না-করে নিজেই নিজেকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসেন। এটি যেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা কর্তৃক গুনাহ সংঘটিত হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত পন্থার বাস্তবায়ন ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُوْنَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوْبُوْنَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَيكَ يَتُوْبُ اللهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
নিশ্চয় তাওবা কবুল করা আল্লাহর জিম্মায় তাদের জন্য, যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে। তারপর শীঘ্রই তাওবা করে। অতঃপর আল্লাহ এদের তাওবা কবুল করবেন আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। ৯৫২
নিজেই নিজের অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত করা এবং তা বাস্তবায়ন করার এটি একটি অসাধারণ ঘটনা। এটা একমাত্র সত্যিকার ঈমানদার ব্যক্তির মাধ্যমেই সম্ভব। এমন বিশুদ্ধ ঈমানের অধিকারী ব্যক্তি নিজের কোনো অপরাধের ওপর স্থির থাকতে পারে না। অনুতাপ তাকে তাড়া করবেই।
রসূলুল্লাহ সা. নিজে এবং সাহাবায়ে কেরামও আবু লুবাবার তাওবা কবুল হওয়ায় খুশি হয়েছিলেন। ৯৫৩
সাহাবায়ে কেরাম সবাই তার তাওবা কবুল হওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন। উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. রসূলুল্লাহ সা.-এর অনুমতি নিয়ে তাকে তার তাওবা কবুল হওয়ার সুসংবাদ জানান। আবু লুবাবার এই ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَخُونُوا۟ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ وَتَخُونُوٓا۟ أَمَٰنَٰتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও রসূলের খেয়ানত করো না। আর খেয়ানত করো না নিজদের আমানতসমূহের, অথচ তোমরা জানো। ৯৫৪
তার তাওবা সংক্রান্ত বিবরণীতে কুরআনে এসেছে: ৯৫৫
وَءَاخَرُونَ ٱعْتَرَفُوا۟ بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا۟ عَمَلًا صَٰلِحًا وَءَاخَرَ سَيِّئًا عَسَى ٱللَّهُ أَن يَتُوبَ عَلَيْهِمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
আর অন্য কিছু লোক তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে, সৎকর্মের সঙ্গে তারা অসৎকর্মের মিশ্রণ ঘটিয়েছে। আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ৯৫৬

টিকাঃ
৯৫০ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/২৬২।
৯৫১ আত তারীখুল ইসলামী লিল হুমাইদী: ৬/১৬৫।
৯৫২ সূরা নিসা: ১৭।
১৫০ সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মাদিনাহ: ২৬১।
৯৫৪ সূরা আনফাল: ২৭।
১৫৫ সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/২৬২।
৯৫৬ সূরা তাওবা: ১০২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00