📘 নবীজির যুদ্ধ জীবন পাঠ ও পর্যালোচনা > 📄 বনু কুরায়যা থেকে নিস্তার

📄 বনু কুরায়যা থেকে নিস্তার


মুমিনদের উত্তম পরিণতি ও কাফেরদের পরাজয় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَ رَدَّ اللهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوْا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ وَ كَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عَزِيزًا
আল্লাহ কাফেরদেরকে তাদের আক্রোশসহ ফিরিয়ে দিলেন, তারা কোনো কল্যাণ লাভ করেনি। যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ প্রবল শক্তিমান, পরাক্রমশালী। ৯১৬
বনু কুরায়যার বিরুদ্ধে মুমিনদেরকে আল্লাহ যে সাহায্য করেছেন, কোনো ধরনের সম্মুখযুদ্ধ ব্যতীত তাদেরকে যে বিজয় দান করেছেন, আল্লাহ তাআলা সেই অনুগ্রহের কথা মুমিনদের স্মরণ করিয়েছেন। অথচ বনু কুরায়যা নিজেদের দুর্ভেদ্য কেল্লাসমূহে আত্মগোপন করেছিল। আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে এতো প্রবল ভীতি সঞ্চার করে দিয়েছিলেন যে, তারা স্বেচ্ছায় مسلمانوں সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত হয়ে নিজেদের কেল্লাসমূহ থেকে নেমে এসেছিল। ৯১৭
এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে এসেছে :
وَ أَنْزَلَ الَّذِينَ ظَاهَرُوْهُمْ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَبِ مِنْ صَيَاصِيْهِمْ وَقَذَفَ فِي قُلُوْبِهِمُ الرُّعْبَ فَرِيقًا تَقْتُلُوْنَ وَ تَأْسِرُوْنَ فَرِيقًا وَ أَوْرَثَكُمْ أَرْضَهُمْ وَ دِيَارَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ وَ أَرْضًا لَّمْ تَطَوْهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرًا
আর আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা তাদের সহযোগিতা করেছিল, আল্লাহ তাদেরকে অবতরণ করালেন তাদের দুর্গসমূহ থেকে এবং তাদের অন্তরসমূহে ভীতির সঞ্চার করলেন। ফলে তোমরা হত্যা করছো একদলকে, আর বন্দী করছো অন্য দলকে। আর তিনি তোমাদেরকে উত্তরাধিকারী করলেন তাদের ভূমি, তাদের ঘর-বাড়ি ও তাদের ধন-সম্পদের এবং এমন ভূমির যাতে তোমরা পদার্পণও করনি। আল্লাহ সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান। ৯১৮
গাযওয়ায়ে আহযাব মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যুদ্ধ ছিল। এ থেকে मुसलमानों সুদূরপ্রসারী বিভিন্ন ফলাফল অর্জিত হয়। যেমন:
• মুসলমানরা বিজয় লাভ করে। শত্রুরা ক্রুদ্ধ অবস্থায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
• এই যুদ্ধ مسلمانوں জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। এতদিনের প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের পরিবর্তে মুসলমানরা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এই ব্যাপারটি বোঝাতে রসূলুল্লাহ সা. বলেন, এখন থেকে আমরা তাদের ওপর আক্রমণ করবো। আমরা তাদের ওপর হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বো। ১১৯
• গাযওয়ায়ে আহযাবের ফলে বনু কুরায়যার অবস্থাও স্পষ্ট হয়। নিজেদের ইসলামবিদ্বেষ লুকিয়ে রেখে মুসলমানদের বিপদাক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষায় তারা যেভাবে ঘাপটি মেরে বসে ছিল, তা সবার সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। তারা অত্যন্ত ভয়াবহ পরিস্থিতিতে রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে কৃত সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে।
• গাযওয়ায়ে আহযাবে مسلمانوں ঈমানী দৃঢ়তা প্রমানিত হয়। মুনাফেক ও ইহুদিদের প্রকৃত অবস্থা ধরা পড়ে।
• বনু কুরায়যার যুদ্ধ মূলত আহযাবের যুদ্ধেরই একটি ফলাফল ছিল। যার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছিল গাযওয়ায়ে আহযাবের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে তাদের কৃত সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করার প্রতিশোধ। ১২০
গাযওয়ায়ে আহযাব থেকে ফিরে অস্ত্রশস্ত্র খুলে ফেলার পরপরই আল্লাহ তাআলা তার নবীকে বনু কুরায়যার বিরুদ্ধে জিহাদের আদেশ দেন। রসূলুল্লাহ সা. সাহাবায়ে কেরামকে তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে বলেন। তিনি তাদের জানিয়েছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা জিবরীল আ.-কে ইহুদিদের দুর্গসমূহ প্রকম্পিত করার জন্য পাঠিয়েছেন। সুতরাং তাদের অন্তরে مسلمانوں ভয় ঢুকে যাবে। বনু কুরায়যা অভিমুখে যুদ্ধযাত্রার আদেশ দিয়ে রসূলুল্লাহ সা. বলেছিলেন, তোমাদের কেউ যেন বনু কুরায়যায় পৌছার পূর্বে আসরের নামায আদায় না করে। ১২১
দীর্ঘ পঁচিশ দিন যাবত মুসলমানরা বনু কুরায়যাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ১২২
দীর্ঘ অবরোধের কারণে বিপৎসংকুল পরিস্থিতিতে নিরাশ হয়ে বনু কুরায়যা রসূলুল্লাহ সা.-এর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসে। রসূলুল্লাহ সা. তাদের ব্যাপারে সাআد ইবনে মুআয রা.-কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব দেন। তারা ভেবেছিল, যেহেতু সা’আদ ইবনে মু’আযের সাথে তাদের গোত্রীয় ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক রয়েছে, তাই সা’আদ তাদের সাথে নম্র আচরণ করবেন। সা’আদ-এর বাহুতে ছিল খন্দকের যুদ্ধের তীরের আঘাত। তাকে বহন করে সেখানে আনা হলে তিনি তাদের ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দেন। বনু কুরায়যার ব্যাপারে তিনি তার সিদ্ধান্তে বলেছিলেন, বনু কুরায়যার সকল যোদ্ধা তথা যুদ্ধে সক্ষম ব্যক্তিদের হত্যা করা হবে, সকল নারী ও শিশুকে যুদ্ধবন্দী বানিয়ে নেওয়া হবে এবং তাদের সকল সম্পত্তি مسلمانوں মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সা. তার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হয়ে বলেন, তুমি আল্লাহ তা’আলার বিধান মোতাবেক ফয়সালা করেছ।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মদীনার বাজারে গর্ত খনন করা হয়েছিল। বনু কুরায়যার চারশো সদস্যকে হত্যা করে সে গর্তে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। অবশ্য তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও ইসলামে প্রবেশ করার কারণে বেঁচে গিয়েছিল। বনু কুরায়যার নারী ও শিশুদের বন্টন করে দেওয়া হয় मुसलमानों মধ্যে।
মুসলমানদের সাথে প্রতারণা ও সন্ধিচুক্তির লঙ্ঘনকারীদের ব্যাপারে এ সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত সঙ্গত। এটা ছিল তাদের অন্যায়ের প্রতিশোধ। বনু কুরায়যার নারীদের মধ্য থেকে শুধু একজন হত্যা করা হয়েছিল। আয়েশা রা. ওই নারী সম্পর্কে বলেন, তাদের একজন নারী আমার কাছে বসে ছিল এবং প্রফুল্ল মনে আমার সাথে কথা বলছিল। এদিকে রাসূলুল্লাহ সা. মদীনার বাজারে বনু কুরায়যার পুরুষদের হত্যা করাচ্ছিলেন। ইতোমধ্যে কেউ একজন উচ্চ নারীয়ের নাম ধরে ডাকলে জবাবে সে বলে, আল্লাহর শপথ! আমি এখানে আছি। আয়েশা রা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার অকল্যাণ হোক! তোমাকে ডাকা হচ্ছে কেন? উত্তরে নারীটি বললো, আমাকে হত্যা করা হবে। আয়েশা রা. বলেন, আমি তাকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে আমাকে বলে, কোনো একটি বিশেষ কারণে আমাকে হত্যা করা হবে। অতঃপর তাকে নিয়ে হত্যা করা হয়। আয়েশা রা. বলেন, আমি তার স্বাভাবিক আচরণ, প্রফুল্ল মনে কথাবার্তা বলতে দেখে অবাক হয়েছিলাম। অথচ সে জানতো যে তাকে হত্যা করা হবে।
বনু কুরায়যার ব্যাপারে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর মদীনার পবিত্র ভূমি পরিপূর্ণ পবিত্র হয়ে যায় ইহুদিদের নাপাক অস্তিত্ব থেকে। শুধু মুসলমানরাই তখন মদীনায় অবস্থান করছিলেন। অভ্যন্তরীণ বিপদ-আপদের আশঙ্কা থেকে নিরাপদ হয়ে যায় মদীনা মুনাওয়ারা। এভাবেই স্বপ্ন ভঙ্গ হয় কুরায়েשদের।
কেননা, মদীনার ইহুদিদের মাধ্যমে তারা মদীনা দখলের আশা করতো। ৯২৭
রসূলুল্লাহ সা. বনু কুরায়যার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে مسلمانوں অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।

টিকাঃ
৯১৬ সূরা আহযাব: ২৫।
৯১৭ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ২/৪৯০-৪৯১।
৯১৮ সূরা আহযাব: ২৬-২৭।
১১৯ সহীহ বুখারী: ৪১১০।
১২০ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ২/৪৪২।
১২১ সহীহ বুখারী: ৪১১৯।
১২২ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়‍্যাহ : ৩৭৩।
১২৩ সহীহ বুখারী : ৪১৬১।
১২৪ আস-সীরাতুন নাববীয়াহ আস-সহীহাহ : ৬১৪-৬১৭।
১২৫ উক্ত নারীটি হযরত খাল্লাদ বিন সুয়াইদের উপর চাক্কি নিক্ষেপ করে হত্যা করেছিলো।
১২৬ আস-সীরাতুন নাববীয়াহ আস-সহীহাহ : ৬৭১।
৯২৭ দিরাসাত ফি আহদিন নাবুওয়াতি লিশশুজা: ১৫৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00