📄 হুযায়ফা রা.-এর ঘটনা দ্বারা প্রাপ্ত শিক্ষা ও উপদেশ
১. রসূলুল্লাহ সা. মানুষের শক্তি-সামর্থ্যের ব্যাপারে যথেষ্ট ধারণা রাখতেন। তিনি হুযায়ফাকে কাফেরদের সম্মিলিত বাহিনীর তথ্য সংগ্রহে গুপ্তচরের দায়িত্ব দেন। কেননা, হুযায়ফা একদিকে অসাধারণ বীরত্বের অধিকারী ব্যক্তি ছিলেন। এ ধরনের কাজ সম্পাদনে সাহসী ব্যক্তির প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও বুদ্ধিমান। ভয়ঙ্কর প্রতিকূল পরিস্থিতিও তিনি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারতেন।
২. রণকৌশল সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত ছিলেন হুযায়ফা রা.। কাফের-সেনাপতিকে হত্যা করার পূর্ণ সুযোগ পেয়েও তিনি তাকে হত্যা করেননি। কেননা রসূলুল্লাহ সা.-এর এ নির্দেশ তার মনে পড়েছিল, 'তাদেরকে আমার বিরুদ্ধে উসকে দিয়ো না। তোমার কাজ শুধু তাদের সংবাদ আমার কাছে পৌঁছানো।' তাই তিনি হত্যার প্রস্তুতি নিয়েও তা থেকে বিরত থাকেন। ১০৪
৩. আলোচ্য ঘটনায় ওলীগণের কারামত-এর প্রমাণ পাওয়া যায়। হুযায়ফা রা. যখন শত্রুবাহিনীর সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন, তখন ছিল প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহ। বৃষ্টি ও পচণ্ড ঠাণ্ডা থাকা সত্ত্বেও তিনি মোটেও ঠাণ্ডা অনুভব করছিলেন না; বরং তিনি অনুভব করছিলেন, যেন গরম পানি দিয়ে গোসল করছেন। যতক্ষণ সেখানে ছিলেন, তিনি মোটেও ঠান্ডা অনুভব করেননি। এটিও ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তার মুমিন বান্দাদের ওপর বিশেষ অনুগ্রহ।৯০৫
৪. শত্রুবাহিনীর সংবাদ সংগ্রহ করে ফিরে আসার পর হুযায়ফার সাথে রসূলুল্লাহ সা.-এর আদুরে আচরণ থেকে বোঝা যায়, রসূলুল্লাহ সা. সবসময় তার সাহাবীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতেন। তিনি যে চাদর পরিধান করে নামায আদায় করতেন, তা হুযায়ফাকে দিয়েছিলেন। হুযায়ফা রসূলুল্লাহ সা.-এর চাদর মুড়ি দিয়ে ফজর পর্যন্ত নিদ্রামগ্ন ছিলেন। ফজরের নামাযের সময় হলে রসূলুল্লাহ সা. তাকে অত্যন্ত আদুরে ভঙ্গিতে ডেকেছিলেন, 'ওঠো, হে ঘুমকাতুরে।' রসূলুল্লাহ সা.-এর এমন আন্তরিকতাপূর্ণ সম্বোধন তার স্নেহ ও ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। ৯০৬
যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়। ৯০৭
৫. বিচক্ষণ এই সাহাবী খুব দ্রুত বিপজ্জনক পরিস্থিতি সামলে নিতে পারতেন। যারকানীর বর্ণনামতে, হুযায়ফা যখন শত্রুদের কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন, আবু সুফিয়ান তার সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে বলেছিল, প্রত্যেক ব্যক্তি যেন নিজের সাথে বসা ব্যক্তির হাত ধরে তার পরিচয় জেনে নেয়। হুযায়ফা রা. বলেন, আমি আমার এক হাত আমার ডান দিকে বসা ব্যক্তির হাতে স্পর্শ করি এবং তাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কে? উত্তরে সে আমাকে বলে, সে মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান। এদিকে আমি আমার বাম হাত দিয়ে বাম দিকে বসা ব্যক্তির হাত ধরে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কে? উত্তরে সে বলে, আমি আমর ইবনুল আস। ৯০৮
এভাবেই তিনি তার পাশে বসা ব্যক্তিদের প্রথমেই প্রশ্ন করে তাদেরকে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগই দিলেন না। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তিনি নিজের বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। অন্যথায় তার জীবন শঙ্কার মুখে পড়তো। ৯০৯
টিকাঃ
১০৪ ফিকহুস সীরাহ লিমুনির আল গাদবান: ৫০৫। আবু ফারিস প্রণীত আসসীরাতুন নববিয়াহ : ৩৬৭।
৯০৫ আবু ফারিস প্রণীত আসসীরাতুন নববি্যাহ : ৩৬৭।
৯০৬ সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নববী ফিল মাদিনাহ: ২৪৬।
৯০৭ সূরা তাওবা: ১২৮।
৯০৮ শারহ্য যারকানী: ২/১২০।
৯০৯ মুঈনুস সীরাহ: ২৯৩।
📄 গাযওয়ায়ে আহযাবের ব্যাপারে কুরআনের বিবৃতি
গাযওয়ায়ে আহযাব সম্পর্কে বহু আলোচনা এসেছে কুরআনে। কুরআনে কারীমের পর্যালোচনাগুলো সাধারণত সর্বযুগ ও সর্বকালের বিবেচনায় করা হয়ে থাকে। পরবর্তী যুগে মুসলমানরা শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন। শত্রুবাহিনী আগ্রাসী হয়ে তাদের অবরুদ্ধ করে রাখতে পারে। এমনটিও সম্ভব যে, শত্রুবাহিনী তাদের পুরো বাহিনী নিয়ে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করে বসবে। সর্বকালের সকল স্থানের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কুরআনে কারীম গাযওয়ায়ে আহযাব ও বনু কুরায়যা যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছে। ১০
কুরআনে আলোচিত এ দুটি যুদ্ধের ঘটনাবলি থেকে উপদেশ গ্রহণ করা উচিত مسلمانوں। গাযওয়ায়ে আহযাব-সংক্রান্ত কুরআনে কারীমের অবতীর্ণ আয়াতসমূহ সম্পর্কে পর্যালোচনা করলে পাঠকদের সামনে যে বিষয়গুলো ফুটে উঠবে :
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ওপর তার বিভিন্ন অনুগ্রহ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودُ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَ جُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا وَ كَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيرًا
হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিআমতকে স্মরণ কর, যখন সেনাবাহিনী তোমাদের কাছে এসে গিয়েছিল, তখন আমি তাদের উপর প্রবল বায়ু ও সেনাদল প্রেরণ করলাম যা তোমরা দেখনি। আর তোমরা যা কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। ৯১১
কাফেরদের সম্মিলিত বাহিনী কর্তৃক মদীনা মুনাওয়ারা অবরুদ্ধ করায় مسلمانوں ওপর অপতিত বিপদাপদের পরিপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছেন। যে ব্যাপারে কুরআনে কারীমে বর্ণিত হয়েছে:
إِذْ جَاءُوْكُمْ مِّنْ فَوْقِكُمْ وَ مِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَ بَلَغَتِ الْقُلُوْبُ الحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظُّنُوْنَا
যখন তারা তোমাদের কাছে এসেছিল তোমাদের উপরের দিক থেকে এবং তোমাদের নিচের দিক থেকে আর যখন চোখগুলো বাঁকা হয়ে পড়েছিল এবং প্রাণ কণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। আর তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা রকম ধারণা পোষণ করছিলে। ৯১২
মুনাফেকদের মন্দ চিন্তাভাবনা, নোংরা আচরণ, কাপুরুষতার প্রদর্শনী, মিথ্যা অজুহাত তৈরি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার প্রবণতার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। তাদের অবস্থার চিত্রায়ন করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَإِذْ يَقُولُ الْمُنْفِقُوْنَ وَ الَّذِينَ فِي قُلُوْبِهِمْ مَّرَضٌ مَّا وَعَدَنَا اللَّهُ وَ رَسُوْلُه إِلَّا غُرُورًا
আর স্মরণ কর, যখন মুনাফেকরা ও যাদের অন্তরে ব্যাধি ছিল তারা বলছিল, আল্লাহ ও তার রসূল আমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। ৯১৩
সর্বত্র সব সময় সব সমস্যার সমাধানে ঈমানদার ব্যক্তিদের আল্লাহর রসূলের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতে হবে। কুরআনে কারীমে এই ব্যাপারে এসেছে :
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
অবশ্যই তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে। ৯১৪
প্রকৃত মুমিনদের গুণ তথা দৃঢ় মনোবলে শত্রুদের মোকাবিলায় যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া ও আল্লাহর সাথে তাদের কৃত প্রতিশ্রুতিপূরণের প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوْا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مَّنْ قَضَى نَحْبَه وَ مِنْهُمْ مَّنْ يَنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا
মুমিনদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত তাদের প্রতিশ্রুতি সত্যে বাস্তবায়ন করেছে। তাদের কেউ কেউ [যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে] তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার কেউ কেউ [শাহাদাত বরণের] প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা (প্রতিশ্রুতিতে) কোনো পরিবর্তনই করেনি। ৯১৫
টিকাঃ
৯১০ আল আসাসু ফিস সুন্নাহ: ২/৬৬২।
৯১১ সূরা আহযাব: ৯।
৯১২ সূরা আহযাব: ১০।
৯১৩ সূরা আহযাব: ১২।
৯১৪ সূরা আহযাব: ২১।
৯১৫ সূরা আহযাব: ২৩।
📄 বনু কুরায়যা থেকে নিস্তার
মুমিনদের উত্তম পরিণতি ও কাফেরদের পরাজয় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَ رَدَّ اللهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوْا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ وَ كَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عَزِيزًا
আল্লাহ কাফেরদেরকে তাদের আক্রোশসহ ফিরিয়ে দিলেন, তারা কোনো কল্যাণ লাভ করেনি। যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ প্রবল শক্তিমান, পরাক্রমশালী। ৯১৬
বনু কুরায়যার বিরুদ্ধে মুমিনদেরকে আল্লাহ যে সাহায্য করেছেন, কোনো ধরনের সম্মুখযুদ্ধ ব্যতীত তাদেরকে যে বিজয় দান করেছেন, আল্লাহ তাআলা সেই অনুগ্রহের কথা মুমিনদের স্মরণ করিয়েছেন। অথচ বনু কুরায়যা নিজেদের দুর্ভেদ্য কেল্লাসমূহে আত্মগোপন করেছিল। আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে এতো প্রবল ভীতি সঞ্চার করে দিয়েছিলেন যে, তারা স্বেচ্ছায় مسلمانوں সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত হয়ে নিজেদের কেল্লাসমূহ থেকে নেমে এসেছিল। ৯১৭
এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে এসেছে :
وَ أَنْزَلَ الَّذِينَ ظَاهَرُوْهُمْ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَبِ مِنْ صَيَاصِيْهِمْ وَقَذَفَ فِي قُلُوْبِهِمُ الرُّعْبَ فَرِيقًا تَقْتُلُوْنَ وَ تَأْسِرُوْنَ فَرِيقًا وَ أَوْرَثَكُمْ أَرْضَهُمْ وَ دِيَارَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ وَ أَرْضًا لَّمْ تَطَوْهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرًا
আর আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা তাদের সহযোগিতা করেছিল, আল্লাহ তাদেরকে অবতরণ করালেন তাদের দুর্গসমূহ থেকে এবং তাদের অন্তরসমূহে ভীতির সঞ্চার করলেন। ফলে তোমরা হত্যা করছো একদলকে, আর বন্দী করছো অন্য দলকে। আর তিনি তোমাদেরকে উত্তরাধিকারী করলেন তাদের ভূমি, তাদের ঘর-বাড়ি ও তাদের ধন-সম্পদের এবং এমন ভূমির যাতে তোমরা পদার্পণও করনি। আল্লাহ সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান। ৯১৮
গাযওয়ায়ে আহযাব মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যুদ্ধ ছিল। এ থেকে मुसलमानों সুদূরপ্রসারী বিভিন্ন ফলাফল অর্জিত হয়। যেমন:
• মুসলমানরা বিজয় লাভ করে। শত্রুরা ক্রুদ্ধ অবস্থায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
• এই যুদ্ধ مسلمانوں জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। এতদিনের প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের পরিবর্তে মুসলমানরা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এই ব্যাপারটি বোঝাতে রসূলুল্লাহ সা. বলেন, এখন থেকে আমরা তাদের ওপর আক্রমণ করবো। আমরা তাদের ওপর হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বো। ১১৯
• গাযওয়ায়ে আহযাবের ফলে বনু কুরায়যার অবস্থাও স্পষ্ট হয়। নিজেদের ইসলামবিদ্বেষ লুকিয়ে রেখে মুসলমানদের বিপদাক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষায় তারা যেভাবে ঘাপটি মেরে বসে ছিল, তা সবার সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। তারা অত্যন্ত ভয়াবহ পরিস্থিতিতে রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে কৃত সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে।
• গাযওয়ায়ে আহযাবে مسلمانوں ঈমানী দৃঢ়তা প্রমানিত হয়। মুনাফেক ও ইহুদিদের প্রকৃত অবস্থা ধরা পড়ে।
• বনু কুরায়যার যুদ্ধ মূলত আহযাবের যুদ্ধেরই একটি ফলাফল ছিল। যার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছিল গাযওয়ায়ে আহযাবের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে তাদের কৃত সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করার প্রতিশোধ। ১২০
গাযওয়ায়ে আহযাব থেকে ফিরে অস্ত্রশস্ত্র খুলে ফেলার পরপরই আল্লাহ তাআলা তার নবীকে বনু কুরায়যার বিরুদ্ধে জিহাদের আদেশ দেন। রসূলুল্লাহ সা. সাহাবায়ে কেরামকে তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে বলেন। তিনি তাদের জানিয়েছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা জিবরীল আ.-কে ইহুদিদের দুর্গসমূহ প্রকম্পিত করার জন্য পাঠিয়েছেন। সুতরাং তাদের অন্তরে مسلمانوں ভয় ঢুকে যাবে। বনু কুরায়যা অভিমুখে যুদ্ধযাত্রার আদেশ দিয়ে রসূলুল্লাহ সা. বলেছিলেন, তোমাদের কেউ যেন বনু কুরায়যায় পৌছার পূর্বে আসরের নামায আদায় না করে। ১২১
দীর্ঘ পঁচিশ দিন যাবত মুসলমানরা বনু কুরায়যাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ১২২
দীর্ঘ অবরোধের কারণে বিপৎসংকুল পরিস্থিতিতে নিরাশ হয়ে বনু কুরায়যা রসূলুল্লাহ সা.-এর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসে। রসূলুল্লাহ সা. তাদের ব্যাপারে সাআد ইবনে মুআয রা.-কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব দেন। তারা ভেবেছিল, যেহেতু সা’আদ ইবনে মু’আযের সাথে তাদের গোত্রীয় ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক রয়েছে, তাই সা’আদ তাদের সাথে নম্র আচরণ করবেন। সা’আদ-এর বাহুতে ছিল খন্দকের যুদ্ধের তীরের আঘাত। তাকে বহন করে সেখানে আনা হলে তিনি তাদের ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দেন। বনু কুরায়যার ব্যাপারে তিনি তার সিদ্ধান্তে বলেছিলেন, বনু কুরায়যার সকল যোদ্ধা তথা যুদ্ধে সক্ষম ব্যক্তিদের হত্যা করা হবে, সকল নারী ও শিশুকে যুদ্ধবন্দী বানিয়ে নেওয়া হবে এবং তাদের সকল সম্পত্তি مسلمانوں মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সা. তার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হয়ে বলেন, তুমি আল্লাহ তা’আলার বিধান মোতাবেক ফয়সালা করেছ।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মদীনার বাজারে গর্ত খনন করা হয়েছিল। বনু কুরায়যার চারশো সদস্যকে হত্যা করে সে গর্তে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। অবশ্য তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও ইসলামে প্রবেশ করার কারণে বেঁচে গিয়েছিল। বনু কুরায়যার নারী ও শিশুদের বন্টন করে দেওয়া হয় मुसलमानों মধ্যে।
মুসলমানদের সাথে প্রতারণা ও সন্ধিচুক্তির লঙ্ঘনকারীদের ব্যাপারে এ সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত সঙ্গত। এটা ছিল তাদের অন্যায়ের প্রতিশোধ। বনু কুরায়যার নারীদের মধ্য থেকে শুধু একজন হত্যা করা হয়েছিল। আয়েশা রা. ওই নারী সম্পর্কে বলেন, তাদের একজন নারী আমার কাছে বসে ছিল এবং প্রফুল্ল মনে আমার সাথে কথা বলছিল। এদিকে রাসূলুল্লাহ সা. মদীনার বাজারে বনু কুরায়যার পুরুষদের হত্যা করাচ্ছিলেন। ইতোমধ্যে কেউ একজন উচ্চ নারীয়ের নাম ধরে ডাকলে জবাবে সে বলে, আল্লাহর শপথ! আমি এখানে আছি। আয়েশা রা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার অকল্যাণ হোক! তোমাকে ডাকা হচ্ছে কেন? উত্তরে নারীটি বললো, আমাকে হত্যা করা হবে। আয়েশা রা. বলেন, আমি তাকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে আমাকে বলে, কোনো একটি বিশেষ কারণে আমাকে হত্যা করা হবে। অতঃপর তাকে নিয়ে হত্যা করা হয়। আয়েশা রা. বলেন, আমি তার স্বাভাবিক আচরণ, প্রফুল্ল মনে কথাবার্তা বলতে দেখে অবাক হয়েছিলাম। অথচ সে জানতো যে তাকে হত্যা করা হবে।
বনু কুরায়যার ব্যাপারে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর মদীনার পবিত্র ভূমি পরিপূর্ণ পবিত্র হয়ে যায় ইহুদিদের নাপাক অস্তিত্ব থেকে। শুধু মুসলমানরাই তখন মদীনায় অবস্থান করছিলেন। অভ্যন্তরীণ বিপদ-আপদের আশঙ্কা থেকে নিরাপদ হয়ে যায় মদীনা মুনাওয়ারা। এভাবেই স্বপ্ন ভঙ্গ হয় কুরায়েשদের।
কেননা, মদীনার ইহুদিদের মাধ্যমে তারা মদীনা দখলের আশা করতো। ৯২৭
রসূলুল্লাহ সা. বনু কুরায়যার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে مسلمانوں অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
টিকাঃ
৯১৬ সূরা আহযাব: ২৫।
৯১৭ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ২/৪৯০-৪৯১।
৯১৮ সূরা আহযাব: ২৬-২৭।
১১৯ সহীহ বুখারী: ৪১১০।
১২০ হাদীসুল কুরআনিল কারীম আন গাযাওয়াতির রসূল: ২/৪৪২।
১২১ সহীহ বুখারী: ৪১১৯।
১২২ সহীহ আসসীরাতুন নববিয়্যাহ : ৩৭৩।
১২৩ সহীহ বুখারী : ৪১৬১।
১২৪ আস-সীরাতুন নাববীয়াহ আস-সহীহাহ : ৬১৪-৬১৭।
১২৫ উক্ত নারীটি হযরত খাল্লাদ বিন সুয়াইদের উপর চাক্কি নিক্ষেপ করে হত্যা করেছিলো।
১২৬ আস-সীরাতুন নাববীয়াহ আস-সহীহাহ : ৬৭১।
৯২৭ দিরাসাত ফি আহদিন নাবুওয়াতি লিশশুজা: ১৫৩।